ঝিনাইদহে শতভাগ নলকূপে আর্সেনিক

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৬

ঝিনাইদহে শতভাগ নলকূপে আর্সেনিক

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২০

print
ঝিনাইদহে শতভাগ নলকূপে আর্সেনিক

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার খোর্র্দতালিয়ান গ্রামে দিন যত যাচ্ছে ততই আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হচ্ছেন লোকজন। গ্রামবাসীদেও ভাষ্য, এ পর্যন্ত তাদের গ্রামে ১৮ জন নারী-পুরুষ আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। গত বছর হেলাল উদ্দীন (৭৫) নামে একজন আর্সেনিকোসিসে মারা গেছেন। গ্রামটিতে খাবার পানির জন্য সরকারীভাবে মোট আটটি আর্সেনিকমুক্ত গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ঠ নয়। তারপরও সচেতনতার অভাবে গ্রামবাসীদের অনেকে এখনও প্রতিনিয়ত এ আর্সেনিক বিষযুক্ত পানি পান করে চলেছেন গ্রামের বাসিন্দারা।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কালীগঞ্জ উপজেলা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালের তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জরিপে মতে উপজেলায় ২৯,৫৬৩টি অগভীর নলকূপ রয়েছে। এরমধ্যে ২৬,৬১৩ টি আর্সেনিক দূষণমুক্ত। আর আর্সেনিক দূষনযুক্ত বাকি ২৯৫০টি নলকূপ। তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গ্রামে ছিল মাত্র একজন রোগী।

উপজেলায় মোট ২৯ জন আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত করা হয়। ওই গ্রামের নলকূপের পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় ১১৯টি খাবার পানির নলকূপের সবগুলোই আর্সেনিকযুক্ত। এরপর থেকে গ্রামটিতে সরকারিভাবে আটটি আর্সেনিকমুক্ত গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়।

সূত্রে মতে, খোদ তালিয়ান গ্রামটিতে আটটি আর্সেনিকমুক্ত গভীর নলকূপ রয়েছে। গ্রামের অনেকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে চর্মরোগ রয়েছে। ২০০৯ সালে এনজিও ফোরামের উদ্যোগে একটি প্রকল্পের আওতায় আর্সেনিকোসিস রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গ্রামের বয়োবৃদ্ধ হেলাল উদ্দীন, ইউসুফ মন্ডল, আব্দুল মজিদ মুন্সি, ময়নদ্দিন মিয়া ও তার স্ত্রী সখিনা বেগম, ওই গ্রামের ইসলাম মন্ডল ও তার ছেলে লিয়াকত আলী, সালেহা বেগম, জরিনা বেগম, আব্দুল বারেক মন্ডল, জিতেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ও তার স্ত্রী অহল্লা বিশ্বাস, শহীদুল্লাহ বিশ্বাস, নিধির মালাকারসহ মোট ১৮ জনকে এ রোগে আক্রান্ত হিসেবে সনাক্ত করা হয়। অবশ্য এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে ধারণা করছেন গ্রামবাসী। গত বছর আর্সেনিকে আক্রান্ত হেলাল উদ্দীন মারা গেছেন। তবে চিকিৎসকেরা বলেছিলেন তার মৃত্যু হয়েছে বার্ধক্যজনিত কারণে।

আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত ইসলাম মন্ডল জানান, ছোটবেলায় তাদের নিজেদের বাড়ির প্রচলিত কূপ বা কূয়ার পানি পান করতেন বাপ-দাদাদেও মত। পরে অগভীর নলকূপ স্থাপন করে তারা প্রায় ৪০ বছর ধরে পানি পান করলেও অসুবিধা হয়নি। অথচ গত ২০০৬ সালের দিকে হঠাৎ একদিন দেখেন তার, পিঠে, কোমরের নীচে ও হাতের তালুতে চুলকাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে তা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অনেকের শরীরে একই ধরণের অ্যালাজির্ও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ২০০৯ সালে তাদের গ্রামে এনজিওরকর্মীরা এসে পানি পরীক্ষা করে চিহ্নিত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছিলেন। তিনি চিকিৎসাসেবা নিলেও কিছুদিন পরে তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা খানিকটা বিপাকে পড়েন।

জামাল ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জয়নাল মন্ডল জানান, আজ থেকে ১৪-১৫ বছর আগে তাদের গ্রামে নলকূপ স্থাপন করতে এসে নতুন নলকূপের পানি দেখে মিস্ত্রিরা বলেছিলেন এ গ্রামের নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পেয়ে নলকূপগুলো লালরংয়ের চিহ্ন দিয়ে এগুলোর পানি পান না করার পরামর্শ দেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী জেসমিন আরা জানান, এ উপজেলায় আর্সেনিকের উপর ২০০৩ সালে জরিপ হয়েছে। তখন উপজেলাতে আর্সেনিকোসিসে মোট ১৬১ জন আক্রান্ত রোগী ছিল। দীর্ঘ সময় জরিপ না হওয়ায় এখনকার সঠিক পরিসংখ্যান তিনি জানেন না। জামাল ইউনিয়নের খোর্দতালিয়ান গ্রামে শতভাগ নলকূপে আর্সেনিক রয়েছে এটা তিনি জানেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শামীমা শারমিন লুবনা জানান, কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিক দূষনযুক্ত পানি পান করেন তাহলে আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।