হতবিহ্বল কুষ্টিয়া

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

হতবিহ্বল কুষ্টিয়া

দেবাশীষ দত্ত, কুষ্টিয়া ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

print
হতবিহ্বল কুষ্টিয়া

বাবার যে চওড়া কাঁধে চড়ে আবরার স্কুলে যেত, সে কাঁধেই আবরারের খাটিয়া গেল গোরস্তানে। অদম্য মেধাবী এ তরুণের নির্মম হত্যা মানতে পারেনি কুষ্টিয়াবাসী। ঘটনার বিভীষিকায় তারা হতবিহ্বল।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র নিহত আবরার ফাহাদকে তৃতীয় জানাজা শেষে তার নিজ গ্রাম রায়ডাঙ্গা গোরস্তানে সমাহিত করা হয়েছে। এদিকে হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এলাকার শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেন। হাতে প্লাকার্ড নিয়ে তারা হত্যাকারীদের বিচার ও ফাঁসির দাবি জানান।

গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নিহত আবরার ফাহাদের পিতা বরকত উল্লাহ, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজসহ স্বজনরা ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে আবরার ফাহাদের কফিনবাহী মরদেহটি কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডস্থ নিজ বাড়িতে নিয়ে এলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের কান্নায় সেখানকার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। ফাহাদকে এক নজর দেখার জন্য সেখানে আগে থেকে এলাকাবাসীসহ শত শত মানুষ ভিড় জমান। এ সময় আবরারের লাশ দেখে কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।

সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আল ইকরা জামে মসজিদের সামনে নিহত আবরার ফাহাদের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শত শত মানুষ এই জানাজায় অংশ নেয়। পরে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সবাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে আবরার ফাহাদের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামে। সকাল ৯টার দিকে আবরারের লাশ নিজ গ্রাম কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামে পৌঁছায়। সেখানে সকাল ১০টায় রায়ডাঙ্গা গোরস্তানে তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজা শেষ হওয়া মাত্রই বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাস্তায় নেমে হাতে প্লাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা আবরার হত্যাকারীদের গ্রেফতারসহ ফাঁসির দাবি জানান। সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে পাশের রায়ডাঙ্গা গোরস্থানে আবরার ফাহাদকে সমাহিত করা হয়।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রলীগের হাতে নির্মমভাবে নিহত আবরার ফাহাদ ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অদম্য মেধাবী। ক্লাসে প্রথম ছাড়া কখনো দ্বিতীয় হননি।

ফাহাদ ২০১৫ সালে কুষ্টিয়া জেলা স্কুল বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন ঢাকা নটর ডেম কলেজে। সেখান থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায়ও গোল্ডেন এ প্লাসসহ উত্তীর্ণ হন। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন। তিনি শেরেবাংলা হলের ১০১১ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিলেন আবরার। চান্স পেয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেলেও। পরিবারের সদস্যরা চেয়েছিলেন আবরার মেডিকেলে ভর্তি হোক। কিন্তু আবরার মেডিকেলে ভর্তি না হয়ে নিজ পছন্দে বুয়েটে ভর্তি হন। আবরার সম্পর্কে এসব তথ্য জানিয়ে চাচা মিজানুর রহমান দাবি করেন, আবরার ফাহাদ শিবিরকর্মী বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এটা বানোয়াট, আবরার একজন উদারমনা ও প্রগতিশীল ছেলে। আমরা গোটা পরিবার আওয়ামী লীগের সমর্থক। বুয়েটে ভর্তির পর দুই তিনবার সে তাবলিগে গিয়েছিল। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং পবিত্র কোরআন মজিদ পড়ত।

ছেলের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন মা রোকেয়া খাতুন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন তিনি।
আবরার ফাহাদের পিতা বরকত উল্লাহ অভিযোগ করেন তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। আবরারের বাবা বলেন, ‘এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যে ছেলেটা বিকেল ৫টায় ঢাকায় পৌঁছাল, তাকে ৮টার দিকে নির্যাতন করার জন্য ডেকে নিয়ে গেল। ছয় ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চালাল, এটা অবশ্যই পরিকল্পিত।’