নন-কটনে ভবিষ্যৎ পোশাক শিল্পে

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

নন-কটনে ভবিষ্যৎ পোশাক শিল্পে

জাফর আহমদ
🕐 ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০২১

নন-কটনে ভবিষ্যৎ পোশাক শিল্পে

শোভন ইসলাম। স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এক গৌরবময় অতীতের উত্তরাধিকারী। বাবা বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. মাজহারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত স্প্যারো ফ্যাশন লিমিটেডের কর্ণধার তিনি। যিনি কম্পিউটার বিজ্ঞানী। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করেছেন ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন থেকে। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। চাকরি করেছেন বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান হিলেট প্যাকার্ড ও মাইক্রোসফটে। দেড় দশক আগে বাবার অনুরোধে দেশে ফিরে হাল ধরেন গার্মেন্ট ব্যবসার। বাবার গড়া প্রতিষ্ঠানে দুই হাজার শ্রমিকের হাত ধরে যাত্রা শুরু করলেও এখন ১৩ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। তিনি কথা বলেছেন খোলা কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ...

 

* পোশাক শিল্পে শ্রমিকের কল্যাণের বিষয়টা কিভাবে দেখছেন?
মানব সম্পদই হলো আমাদের বড় সম্পদ। তারা যখন সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তখন স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে উৎপাদন বেড়ে যাবে। একজন অপারেটর যদি দীর্ঘদিন একই মেশিনে কাজ করে তাহলে তার উৎপাদন আস্তে আস্তে বাড়বে। অপারেটর যত বেশি মাইগ্রেশন হবে শিল্পের বিকাশ তত কমে আসবে, ইফিসিয়েন্সি বাড়াতে পারবে না। অপারেটর ধরে রাখা, তাদের সুখী রাখা- এটা কিন্তু একটি বিশাল ব্যাপার। সঠিক কমপ্লায়েন্সের মাধ্যমে অপারেটরদের সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে হবে। এটা আমরা কমপ্লায়েন্সের জন্যই করব না, নিজেদের স্বার্থেই এটা করব। শ্রমিকদের ফ্যাক্টরির অংশ মনে করে এমন ব্যবস্থাপনা নিতে হবে। যাতে তারা ফ্যাক্টরিকে নিজের মনে করতে পারে।

এজন্য কথায় কথায় চাকরিচ্যুত করা যাবে না, কথায় কথায় এবিউজ করা যাবে না। এই ধরনের প্র্যাকটিসগুলো যদি আপনি করতে পারেন, তারা যদি চাকরির নিশ্চয়তা পায়, তারা যদি মনে করতে পারে এটা তার ফ্যাক্টরি; তার বাবা যদি মারা যায় তাহলে অ্যাডভান্স নিয়ে বাবার সৎকার করতে পারবে। তার ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য ফ্যাক্টরি থেকে ঋণ নিতে পারবে। আপনার যদি এই ধরনের প্র্যাকটিস থাকে, তাহলে সে আপনার ফ্যাক্টরি ছেড়ে যাবে না।

* এটা তো আপনার ফ্যাক্টরিতেও পরিপালন করে থাকেন?
অবশ্যই। এটা আমার ফ্যাক্টরিতে পুরোপুরি পালন করি। আমার কারখানাতে ডেকেয়ার কেন্দ্র ও বেস্ট ফিডিং ব্যবস্থাও করেছি। এটা সবারই করার প্রয়াজন। আর একটি বিষয় হলো আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান এই জন্য যে, আমার বাবার নির্দেশনা আমি পালন করি। আবার বাবার মৃত্যুর আগে বিদেশে ছিলাম।

বাবা বলেছিলেন, আমার লোকগুলোর কি হবে, তুমি যদি দেশে ফেরত না আসো! আমার বড় ভাই চয়ন ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। বাবার কথাটি অনুসরণ করে এখনো সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরেরই প্রায় সাড়ে ছয় হাজার লোক কাজ করে।

* করোনা মহামারীর মধ্যে কিছু কারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিল তারা করোনা মহামারীকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। একজন উদ্যোক্তা নেতা দাবিও করে বসেছিলেন, শ্রম আইন স্থগিত করতে হবে, ইনক্রিমেন্ট স্থগিত চাই। যদিও প্রমিনেন্ট ও উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের অনেকেই এই কথার সঙ্গে একমত ছিলেন না।

করোনার সময় আমাদের ফ্যাক্টরিতে ধস নেমেছিল। বেশ কিছু কার্যাদেশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এদিক থেকে আমি ভাগ্যবান। সেটা হলো আমি খুবই বড় ব্র্যান্ডেড বায়ারের কাজ করি। মোটামুটি সকল বায়ারের কাজই রিইনস্টেট (পুনরায় চালু) হয়ে যায়। কোনো অর্ডারই ক্যানসেল হয়ে যায়নি। কাজেই সে সময় এক মাস ফ্যাক্টরি বন্ধ ছিল, এই এক মাস ৬৫ শতাংশ বেতন দেই।
কিন্তু আমি কোনো লোক ছাঁটাই করিনি। পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু করতে হয়। আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চালু করতে গেলে সেটা তো আগের মতো দূরত্বে শ্রমিককে বসানো যায় না, দূরত্ব বাড়াতে হয়। তখন আমরা শ্রমিকদের সঙ্গে বসি। বসে তাদের বলি এই অবস্থায় রোটেশনে কাজ করতে হবে। তোমাদের হাতে যে ছুটিগুলো পাওনা আছে, এই ছুটিগুলো যদি তোমরা কাজে লাগাও, তাহলে তোমরা রোটেশনে কাজ করতে পারবে।

এভাবে আমরা কাজটি চালু রাখি। দুই মাসের মতো আমরা কিছু লাইন বন্ধ রাখি, জায়গা করতে হয়েছিল। কিন্তু আমরা কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করিনি। তাদের আর্নলিভ, ক্যাজুয়েল লিভ ছিল, সেগুলো কাজে লাগাই। এই নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করে আমরা কাজ চালিয়ে যাই। তারপর ব্র্যান্ডগুলো ঘুরতে শুরু করে। যেহেতু আমি ব্র্যান্ডেড বায়ারের কাজ করি, তাদের অর্ডারগুলোই শুরু হয়ে যায়। জুলাই-আগস্ট থেকে ঘুরে দাঁড়াই; সেপ্টেম্বরে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াই। এদিক থেকে আমি ভাগ্যবান, আমার বড় ধরনের কোন ডিজাস্টার হয়নি।

* বিজিএমইএ থেকে বলা হচ্ছে সামনে ম্যানমেইড ফাইবারের সম্ভাবনা। তাহলে আপনি তো সেই সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে?

হ্যাঁ, আমরা যেটা বলছি, ম্যানমেইড ফাইভার যেটা, আমাদের এখন সেই দিকে যেতে হবে। ম্যানমেইড ফাইবারের পোশাক এখন এক্সপোর্টের হার হলো ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ। তাও আবার ইউরোপে ডিউটি ফ্রি পাওয়ার কারণে। বিশ্বে এই পোশাকের চাহিদা কমপক্ষে ৭০ পার্সেন্ট। অথচ আমাদের তার উল্টো। আমাদের ৭০ ভাগ কটনের, বাকি ৩০ ভাগ ম্যানমেইড। এটা যদি ৫০, ৫০ করতে পারি; ৪৫, ৫৫ পার্সেন্টও যদি করতে পারি তাহলে আমাদের বাজারটা সংকুচিত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখতে পারব। আবার সিনথেটিকের দামও বেশি হওয়ার কারণে এফওবিটাও বাড়াতে পারব।

এখন আমাদের কটনবেইজ বা সহজ স্টাইলের যে সব কাজগুলো করি, যেগুলো সবাই করতে পারে। কিন্তু যদি কঠিন কাজ হয় সেগুলো সবাই পারে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, আপনি যদি সিনথেটিকের কাজটি করতে পারেন তাহলে এটা সহজে চলে যাবে না। ভিয়েতনাম থেকে বাংলাদেশে যেটা চলে এসেছে, সেটা আর চলে যাবে না।

* সে ক্ষেত্রে তো আপনি একটি দৃষ্টান্ত, যারা এপথে এগুবেন?
অবশ্যই। তাদের আমি ওয়েলকাম করি। সিনথেটিকের অনেকেই কাজ করছে, অনেকে জ্যাকেটের প্রজেক্ট করেছে, কেউ স্পোর্টসওয়্যারের কাজ করছে। আমার পার্টিকুলারলি উইমেন্সের। উইমেন্সের সুন্দর ধরনের টপস, বটম ইত্যাদি। উইমেন্সের জন্য স্টিচিংয়ের মানটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা খুবই কঠিন। আর এটা করতে পেরেছি আমার দক্ষ শ্রমিকের জন্য।

ওই যে বলছিলাম, মানব সম্পদই বড়। আমার অপারেটর খুই পুরনো। এই দক্ষতার কারণে আমি কাজটি করতে পেরেছি। যতটুকুই করতে পেরেছি, ওই যে আমাদের নীতিগত যে অবস্থান, আমার বাবার নীতি শ্রমিকগুলো আমার বড় সম্পদ, শ্রমিকগুলো আমি ধরে রাখব। আমরা মনে করি শ্রমিক আমার কোম্পানির অংশ। আপনি যদি এটা না মনে করেন তাহলে শ্রমিকরা কোম্পানিকে নিজের মনে করবে না, নিজের মতো করে কাজ করবে না।

* তাহলে আপনি যেটা বলছেন, এখন দুটি জিনিস সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। সেটা হলো এথিক বিসনেস বা বেসিক ধরনের কাজ থেকে একটু উন্নত স্টাইলের দিকে যেত হবে। কটন থেকে মেইনমেড ফাইবারের দিকে যেতে হবে। সবগুলোই তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থান ধরে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। সেদিক থেকে আপনি যে অবস্থানে আছেন সেটা অনুসরণ করলেই তো আমরা এগিয়ে যেতে পারব?

আমি চেষ্টা করেছি যাতে পিছিয়ে না পড়ি। আমি যেহেতু পড়াশোনা করি, যেহেতু বায়ারদের সঙ্গে আমার একটি ওয়েবলিংক আছে, আইডিয়াগুলো হঠাৎ করে আসে না, আমরা মার্কেট রিসার্চ করছি। যখনই দেখেছি একটি ডেনিম বা একটি কটন প্যান্টের কস্টিং করতে যাচ্ছি, আরেকজন এসে সেটির কস্টিং কম করে দিচ্ছে। তাহলে আমি তো কম্পিটিশন করতে পারছি না। এক সময় বায়ারই আমাদের অ্যাডভাইস করছে- শোভন, তুমি যদি এটা চেঞ্জ করে এই ক্যাটাগরির দিকে যাও ভালো করবে। বাংলাদেশে তোমার মতো নির্ভরযোগ্য একজন উৎপাদনকারী দরকার। তাহলে প্রয়োজনে চায়না থেকে কিছু ব্যবসা তোমাকে দেব, ভিয়েতনাম থেকে তোমাকে কিছু ব্যবসা দেব। আমি তাদের বলেছি পারব, নিশ্চয়ই পারব।

এর জন্য কি লাগবে, এক্সপার্টিজ লাগবে, মিডলেভের ম্যানেজমেন্ট লাগবে। এটা করার জন্য আমি শ্রীলংকা ও ভারত থেকে এক্সপার্টিজ নিয়ে এসেছি। তারা সেটা করে দিয়েছে। আমার প্রায় ৪০ জন এক্সপার্টিজ আনতে হয়েছে। এক সময় প্রায় ৬০ জন বিদেশি এক্সপার্টিজ ছিল। এখন কমেছে। বিদেশি এক্সপার্ট আমি আরও কমিয়ে আনব। কারণ ক্যাটাগরিগুলো আমাদের শ্রমিকরা শিখে গেছে। সেভাবেই বিদেশি এক্সপার্টের দরকার নেই। তবে পাশাপাশি আমাদের কটনেও অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। কটনেও আমরা উচ্চমূল্যের যেতে পারি। ব্র্যান্ড বাংলাদেশ নিয়ে আমরা একসময় গর্ববোধ করতে পারতাম না, রানা প্লাজা ধসের পর আমরা আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছি, সেফটি স্ট্যান্ডার্ডটাকে অনেক উঁচুতে নিতে পেরেছি।

আমরা আমাদের কর্মীদের জীবনের মান উন্নয়ন করতে পেরেছি। কমপ্লায়েন্স, শ্রমিক ও গ্রিন ফ্যাক্টরি-এ তিনদিক বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। এখন ব্র্যান্ড বাংলাদেশের জন্য আমরা প্রাউড। এজন্য আমরা এখন অনেক বড় বড় ব্র্যান্ডের টপ এন্ডের কাস্টমার আছে তাদের আমরা আকর্ষণ করতে পারছি। ওয়ালমার্ট, জেসিপেনির ওপর আমার বিরূপ কোনো মনোভাব নেই। কিন্তু কথা হলো আমরা জেনেরিক ব্র্যান্ড থেকে বের হয়ে হায়ার ব্র্যান্ডের দিকে যেতে চাচ্ছি। যেখানে কটনের কাজ করলেও সেখানে কটনের দামটা অনেক বেশি। সেই ফেব্রিকের দামটা যদি বেশি হয়, তাহলে আমরা আরেকটি বিষয়ের প্রতি বেশি নজর দিতে পারি। এদিকে থেকে কর্মীর দক্ষতা, প্রপার ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজন। কারণ দক্ষ জনবল না থাকলে ফেব্রিক বা অ্যাসোসরিচ যে পরিমাণে নষ্ট হবে তা দিয়ে পোষানো যাবে না।

* আপনি দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তা, প্রমিনেন্ট উদ্যোক্তা। রানা প্লাজার পরবর্তী কারখানা শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা বলুন, জীবন মানের কথা বলুন বা গ্রিন ফ্যাক্টরির কথা বলুন। যার ফলে আপনারা ব্র্যান্ড বাংলাদেশ করতে সমর্থ হয়েছেন- এগুলো কি আপনাদের মতো দ্বিতীয় প্রজন্মের কারণে সম্ভব হয়েছে?

দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তারা যেমন করছে। প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তারাও পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। তারা পথটা তৈরি করতে পেরেছিল বঔেন, তারা বিনিয়োগটা এ পর্যন্ত আনতে পেরেছিল বলেই আমরা এটা করতে পারছি। কারণ এগুলো খুবই ব্যয়সাপেক্ষ, এগুলো করতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে। তারা ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছিল বলে আমরা বিনিয়োগ করতে পেরেছি, বেশি বিনিয়োগ করতে সাহস পেয়েছি। আর বেশি বিনিয়োগ করতে পেরেছি বলে আমরা আমাদের কোম্পানির মানটা উন্নত করতে পেরেছি। রানা প্লাজা ধসের পর আমরা কমপ্লায়েন্স ও সেফটিতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছি।

একইভাবে কোয়ালিটিতেও আমরা প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করতে পেরেছি। বিনিয়োগের কারণেই আমরা ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে পেরেছি। যখন কোনো প্রগ্রেস হয় তখন এভাবেই ধাপে ধাপে হয়। একবারে জাম্প করে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার মনে হয় বাংলাদেশ এ মুহূর্তে একেবারে সঠিক সময়ে উপনীত। যদি নীতিগত সাপোর্ট অব্যাহত থাকে, সরকারের কাছে যে সাপোর্ট পাই সেটা যদি অব্যাহত থাকে, আমাদের সামনে যে বাধাটি আছে লিড টাইম-ফেব্রিক আসা এবং শিপমেন্ট করার ক্ষেত্রে যদি সময় কমিয়ে আনা যেত, আমাদের যদি একটি গভীর সমুদ্র বন্দর থাকত, যদি লিড টাইম কমিয়ে আনতে পারতাম তাহলে বাংলাদেশের সামনে যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে সেটা কাজে লাগানো যেত।

* এই যে সম্ভাবনার কথা বলছেন, এই সম্ভাবনা কি আমরা কাজে লাগাতে পারছি?

কাজে লাগাতে পারলেও লিড টাইমস বড় সমস্যা। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্রচুর পরিমাণে অর্ডার আছে। আগামী এক বছর অর্ডারের সমস্যা হবে না। কিন্তু একটা সময় গিয়ে এই চাহিদা কমে যাবে। ধরুন একটি কার্ভ উপরে উঠতে উঠতে গিয়ে চাহিদা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছে আবার তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। এই কার্ভে আমরা এখন উচ্চমুখি আছি। ডিমান্ড কার্ভটা এখন ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু সাপ্লাই দিতে পারছি না। কারণ একদিকে কাঁচামাল ঠিক সময়ে ও দ্রুত পৌঁছাতে না পারা। পাঠালেও তারা ডিস্টিবিউ করতে পারছে না। এর ফলে জট তৈরি হয়ে আছে।

এখন এই ট্রান্সপোর্টেশন, ডিপ সি পোর্টের সমস্যা যদি আমরা সমাধান না করতে পারি, আমাদের নিজস্ব কাঁচামাল তৈরি সক্ষমতা যদি না বাড়াতে পারি, তাহলে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারব না। আমাদের ফেব্রিক কিন্তু যথেষ্ট নেই। সিনথেটিক তৈরি করার আমাদের নিজস্ব প্ল্যান নেই। এদিকে আমাদের বিনিয়োগটা বাড়াতে হবে। আমাদের সিনথেটিক ফেব্রিক বাড়াতে হবে। আমাদের আরও ডেনিম তৈরি করতে হবে, আরও টুইল কাপড় বানানো হবে-যার ফলে বাইরে নির্ভরতা কমাতে পারি। এজন্য প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগের প্রয়োজন। প্রচুর পরিমাণে গ্যাসের দরকার, প্রচুর পরিমাণে এনার্জি দরকার। আমাদের এনার্জি আছে। আমরা বলি বিদ্যুতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ।

* দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তারা কেমন করছে?
দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তারা প্রচণ্ড ভালো করছে। না হলে বাংলাদেশ আজ এই পর্যায়ে আসত না। এতগুলো গ্রিন কারখানা হয়েছে, এতগুলো কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরী হয়েছে, এত বড় বড় ব্র্যান্ডের কাজ করছি এবং করোনার মধ্যে আমরা যেভাব মোকাবিলা করলাম, একদিকে বলব আল্লাহর আশীর্বাদ। অন্যদিকে করোনা আমাদের শ্রমজীবী মানুষকে সেভাবে অ্যাফেক্ট করতে পারেনি।

* এই যে করোনা মোকাবিলা করার কথা বলছেন। দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা যদি বিবেচনা করি তাহলে সে সময় গ্রামের মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছে। তারা তো কারখানার শ্রমিকদের পর্যায়ের বাইরে কাজ করে। এ সময় বলা হয়েছিল কারখানা খুললে শ্রমিকরাও আক্রান্ত হবে। এজন্য প্রচণ্ড বিরোধিতা মোকাবিলা করে আপনারা কারখানা খুলেছেন, শ্রমিকরা আক্রান্ত হয়নি। এই ঝুঁকিটা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন শক্তিটা কাজ করেছে? আক্রান্ত হতেও তো পারত?

এ ক্ষেত্রে কয়েকটা ব্যাপার আছে। প্রথমটি হলো- আমরা তখন করোনার ঢেউটাই অ্যানালাইসেস করছিলাম- ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, দেশে করোনা সম্পর্কিত কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বসেছি। দুটি বিষয় হলো আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। প্রথমত, পৃথিবীর সব জায়গায় বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে বাজার, দোকান এবং গণপরিবহনে। আমাদের ৮০ শতাংশ শ্রমিকরা গণ পরিবহন ব্যবহার করেন না। তারা পায়ে হেঁটে, ছোট্ট ছোট্ট পরিবহন বা মোটরসাইকেলে কারখানায় যান। এটা আমাদের একটি বড় সাহস ছিল।

দ্বিতীয়ত হলো, শ্রমিকরা কারখানায় মাস্ক পরতে আগে থেকেই অভ্যস্ত। তারা রাস্তায়ও মাস্ক পরে। তৃতীয়ত হলো, তাদের এইজ গ্রুপ। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৭০ শতাংশ যাদের বয়স পঁচিশ বা তার নিচে। তারপর প্রথম ধাক্কায় খুবই কম আক্রান্ত হয়েছে। এই তিনটি বিষয় আমাদের কারখানা খোলা রাখার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করেছে। এরপর আমরা কারখানা খোলা রাখার ব্যাপারে স্ট্রিক্ট সেফটি মেইনটেইন্স করেছি।

আমরা কারখানা চালু করেছি। সর্বোপরি হলো বেঁচে থাকার তাগি। দেশের পাঁচশ এর বেশি ফ্যাক্টরি একশ’কোটি টাকার ওপর রপ্তানি করে প্রতিমাসে। এক কোটি টাকার রপ্তানি করলে ২০ কোটি টাকা বেতন, ৮০ কোটি টাকার কাঁচামাল ও অন্যান্য। যদি কারখানা বন্ধ রাখি তাহলে কত বড় ব্যর্থতা আমাদের সামলাতে হবে বুঝতে পেরেছেন! করোনার প্রথম ঢেউয়ে এক মাস কারখানা বন্ধ ছিল। আরও দুই মাস কারখানা বন্ধ থাকলে কারও বের হওয়ার ক্ষমতা ছিল না।

আপনি দেখবেন কারখানা খোলা থাকলে শ্রমিকরা কারখানায় কাজ করে। কারখানা বন্ধ থাকলে এখানে, ওখানে ঘোরাফেরা করে। এক্ষেত্রে কারখানা বন্ধ থাকলে আক্রান্ত হওয়ার বেশি ঝুঁকি থাকে। সেই সময় দেখলাম যে প্রচুর পরিমাণে চাহিদা আসছে। পশ্চিমাদের চাহিদা তৈরি হয়েছে, ভারতেও তখন খুলে দিয়েছে, ভিয়েতনাম খুলে দিয়েছে। সবাই যেখানে খুলে দিয়েছে আমরা যদি তখন বন্ধ করে রাখি তাহলে পিছিয়ে পড়ব; এটা থেকে বের হতে পারব না। দ্বিতীয় ধাপে দেশ যখন লকডাউনে গেল ততদিন আমাদের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। এরপর আমরা যখন আমাদের যুক্তি দিলাম প্রধানমন্ত্রী আমাদের কথা বুঝেছিলেন, বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কারখানা খুলে দিয়েছিলেন। আমরা সফল হয়েছিলাম।

* করোনার দ্বিতীয় ধাপে কারখানা খোলার সময় আপনাদের প্রতিশ্রুতি ছিল আপনারা শ্রমিকদের জন্য ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা করবেন। শ্রমিকরা অভিযোগ করেছিল তারা গাড়ি পাচ্ছে না, পায়ে হেঁটে ঝুঁকি নিয়ে কারখানায় যাচ্ছে। কোন কোন কারখানা করোনাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে গর্ভবতী নারী শ্রমিকদের মাতৃকালীন ছুটির পরিবর্তে ছাঁটাই করেছে। শ্রম আইন স্থগিত করার মতো দাবি তোলার চেষ্টা করেছে অন্য একটি তৈরি শিল্পের উদ্যোক্তা নেতা। এ ব্যাপারে কি বলবেন?

আপনি যেগুলো বলছেন আমি কোনোটাই অস্বীকার করব না। কিছু কিছু উদ্যোক্তা করেছে। এই মুহূর্তে ফুল অর্ডার আছে। আবার অন্য চিত্রও আছে প্রচুর ফ্যাক্টরি শিক হয়ে গেছে। করোনার আগে যারা শিক ছিল করোনার তারা একেবারে বসে গেছে। বহু বড় বড় শিল্প এখন বন্ধ। অনেক বড় শিল্প ভালো করছে। এখানে অনেক উদ্যোক্তা তাদের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এটা করেছে। যদিও এটা আমি সমর্থন করি না। কিন্তু তাদের কোনো উপায় ছিল না। বিজিএমইএ চেষ্টা করেছে, আমরা যারা উদ্যোক্তা আছি তারা নিজেরা একজনকে আরেকজন সহযোগিতা করেছি। বাসের একটি সমস্যার কথা বলে।

আমার ফ্যাক্টরিতে আমি বাস ব্যবহার করিনি। কিন্তু করোনার সময় যেখানে একটি বাস ব্যবহার করার কথা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার কারণে একটি বাসের মানুষকে বহন করার জন্য চারটি বাসের ব্যবহার করতে হলো। মিনিমাম দুইটা ব্যবহার করতে হলো। তখন বাসের স্বল্পটা দেখা দিল। লকডাউনের সময় বাস পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক বাস ড্রাইভার বাস চালাতে রাজি হচ্ছিল না। এই ধরনের ক্রাইসেসের কারণে ট্রান্সপোর্টেশনের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। শ্রমিকদের অনেক কষ্ট হয়েছে, তারা হেঁটে বা বাসে অফিসে গেছেন।

* শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। দেশে বড় তিনটি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকরা বকেয়া পাওনা ও কারখানা খুলে দেওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, এমনকি বিজিএমইএ-এর কার্যালয়ে এসে বিক্ষোভ করছে। এই যে বন্ধ হয়ে যাওয়া, এর পেছনে করোনার প্রভাব নাকি ব্যবস্থাপনার ত্রুটি বলবেন?

স্টাইল ক্রাফ্ট একেবারে আমার প্রতিবেশি। আমার বাউন্ডারি আর তার বাউন্ডারি পাশাপাশি।

* অনেকে বলছেন এই দুটি কারখানা বন্ধ তৈরি পোশাক শিল্পে একটি ভয় ভর করিয়ে দিয়েছে। এত বড় কারখানা, এত প্রমিনেন্ট সব উদ্যোক্তা ছিলেন এই প্রতিষ্ঠান দুটির পেছনে। দ্বিতীয় প্রজন্মের সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারা আর শ্রমিক ইস্যু সামনে আনছে। তাই যদি হয় তাহলে আমাদের শিক্ষাটি কী?

এটা ব্যবস্থাপনা বা পরিকল্পনার অভাব। ব্যবস্থাপনা ত্রুটি বলতে আমি নাম না উল্লেখ করে বলব। এর মধ্যে একটি কারখানা ছিল। উৎপাদনের বহুমুখী করা হয়নি। তারা একটি মাত্র বায়ারের কাজ করত। প্রডাক্টটির বায়ার হলো জাপানের। মারোবিনি তাদের কার্যাদেশটি দিত। মারোবিনি হলো তাদের এজেন্ট আর ইউনিক হলো তাদের বায়ার। ইউনিক্লু কন্ট্রাক্টটি যখন মারোবিনি হারিয়ে ফেলে তখন স্টাইল ক্রাফ্ট হারিয়ে ফেলে। এক রাতের মধ্যে কার্যাদেশটি ক্যানসেল হয়ে যায়।

স্টাইল ক্রাফট কারখানাটি অত্যন্ত ভালো একটি কারখানা। সামসুল হক সাহ্বে, যিনি শ্রম, ঘাম ও মেধা দিয়ে কারখানাটি তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন। তার দুজন ছেলে কারখানাটি চালাচ্ছিলেন, তারা মহৎ দুজন উদ্যোক্তা। স্টাইল ক্রাফ্ট যারা চালাচ্ছিলেন তারা অত্যন্ত ভালো উদ্যোক্তা। কিন্তু তারা তাদের কর্মচারীদের ওপর ডিপেন্ড করেছিল। নিজের ওপর নির্ভর করতে পারেনি।


এত বড় একটি ফ্যাক্টরি, পাঁচ হাজারের ওপরে যার শ্রমিক সংখ্যা। আপনি যেখানে একটি দুটি বায়ারের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারেন না। আপনি আপনার ব্যবসা ২০ ভাগের উপরে কোনো একক বায়ারের ওপর নির্ভর করা চলবে না। আমাদের ব্যবসার মিনিমাম একটি রুল হলো, আপনার ক্রয়াদেশ ২০ ভাগের উপরের একজন ক্রেতার উপরে রাখবেন না। কারণ যে কোনো ক্রেতা যে কোনো সময় দেউলিয়া হতে পারে। উনাদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নির্ভর ছিল একটিমাত্র বায়ারের উপরে। এই বায়ারটা যখন সরে গেল তখন তারা বিপদে পড়েছে।

ওপেক্স-সিনহার ব্যাপারে বলবো এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। সব কিছুরই সাইজের একটি ব্যাপারে আছে। যখন এক জায়গায় শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হয় তখন নানা রকম সমস্যা তৈরি হয়। ম্যানেজিবল থাকে না। কারখানাকে ম্যানেজেবলের মধ্যে রাখতে হবে। এ শিল্প একটি শ্রমিক বেইজ শিল্প। আমার মনে হয়, একটি ক্যাম্পাসের মধ্যে ১০ থেকে বারো হাজারের বেশি রাখা উচিত না। আমি নিজেও তাই করেছি, একটি কারখানাতে আরও বেশি শ্রমিক নিয়োগ দিতে পারি, কারখানা বাড়াতে পারি। একই জায়গায় আমি সেটা করছি না।

* শিল্পের বিকাশে বস্ত্র শিল্পের পরে অন্য শিল্পের দিকে অগ্রসর হয়। শ্রীলংকা তৈরি পোশাক শিল্পকে আগের জায়গায় ধরে রাখতে পারেনি। আমাদের প্রমিনেন্ট উদ্যোক্তারা বিশ্বের প্রথম সারির গ্রিন ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেছেন। শিল্পের বিকাশের ধারাবাহিকতার কথা যদি চিন্তা করা হয় তাহলে আপনারা অন্য কোন শিল্পের দিকে যাবেন?

অবশ্যই আমাদের অন্য শিল্পের দিকে শিফ্ট করতে হবে। তবে আমাদের গার্মেন্ট শিল্প পাট শিল্পের মতো হবে না। আমাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হবে না। গার্মেন্ট শিল্প একটি চলমান শিল্প, এ শিল্প এগুচ্ছে। আমরা আগেরকার ফ্যাক্টরিগুলো মর্ডানাইজ করছি, পুরাতন ফ্যাক্টরি ভেঙে নতুন করে গড়ে তুলছি। একসময় মিরপুরে নর্মাল বিল্ডিংয়ে আমাদের ফ্যাক্টরি ছিল। অনেকের বাড়ির মধ্যেও ফ্যাক্টরি ছিল। সেখান থেকে আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের দিকে যাচ্ছি। আমরা তৈরি পোশাক শিল্পকেই মর্ডানাইজেশন করতে পারি, প্রডাকশন বহুমুখিকরণ করতে পারি। আমরা এগুলো করছি। আমাদের অনেক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ আছে। আমাদের ফেব্রিক প্রয়োজন। টেক্সটাইলে আমরা আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারি।

আমাদের ড্রব্যাক হলো একটাই, সেটা হলো তৈরি পোশাক বায়ারের কাছে সঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়া। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে খারাপ বা দ্বিতীয় খারাপ অবস্থানে আছি। ক্রেতাদের কাছে পণ্য দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে উদ্যোগগুলো নেওয়া প্রয়োজন সেগুলো নিতে হবে। আমাদের গভীর সমুদ্র বন্দর নেই। গভীর সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠা করতে হবে, অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলেই আমাদের ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির যে ভিশন আছে ভিশনের কাছাকাছি আমরা নিশ্চিতভাবে যেতে পারব।

 
Electronic Paper