প্রণোদনা উদ্যোক্তাদের সাহস জুগিয়েছে

ঢাকা, শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রণোদনা উদ্যোক্তাদের সাহস জুগিয়েছে

জাফর আহমদ ৩:০২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১

print
প্রণোদনা উদ্যোক্তাদের সাহস জুগিয়েছে

আবদুস সালাম মুর্শেদী একজন কৃতী ফুটবলার, সফল ব্যবসায়ী, সফল ব্যবসায়ী নেতা। দায়িত্ব পালন করেছেন বিজিএমইএ-র সভাপতির। সর্বশেষ একজন রাজনীতিক। হয়েছেন জাতীয় সংসদ সদস্য। রাজনীতি ও ব্যবসা এখনো সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রয়োজনে ডাক পড়ে তার। এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী সংগঠন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নির্বাচনে সম্মিলিত পরিষদের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, করোনা মোকাবিলাসহ নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয় খোলা কাগজ-এর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ।

করোনার অভিঘাত কীভাবে মোকাবিলা করছেন?

কোভিড-১৯-এর অভিঘাতের বিষয়টিকে এটা দু’ভাগে দেখে থাকি। এর ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জানতে পারলাম। কোভিডে আক্রান্তের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থা ভোলাটাইল অবস্থা ধারণ করে, এটা একটা। দ্বিতীয়ত, পুরো বিশ্ব বাজার সংকুচিত হয়ে আসে। চাহিদা কমে যায়। অটোমেটিক্যালি দরপতন শুরু হয়। এটা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পণ্য ও দেশের বায়ারদের মাঝে শুরু করে। এর কারণে দেশে আমরা যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করি প্রত্যেকেই সাংঘাতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাই। কোভিড-১৯ আমরা তো আগে দেখিনি, এত বড় বিপর্যয় আমরা দেখিনি বা শুনিনি।

কীভাবে এই ভয়ঙ্কর ব্যাধি মোকাবিলা করতে হবে সে অভিজ্ঞতাও ছিল না। সে কারণে ব্যবসায়ী মহল খুবই ভেঙে পড়ে। এবং তাদের ভেতর সংশয়, অনাস্থা কাজ করে। এ অবস্থায় আমরা যারা বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা করি আমরা বিদেশি ক্রেতাদের আনএথিক্যাল বেহিবিয়ার শিকার হই। তারা কনফার্ম অর্ডার ঢিলে করছে, স্থগিত করে দিয়েছে, বাতিল করে দিয়েছে, ডিসকাউন্ট চেয়েছে অথবা ডেফার্ড চাচ্ছে-  পরের বছর নেব। বিজিএমইএ-বিকেএমএ-র সদস্যভুক্ত কারখানা থেকে এ ধরনের খবর আসতে থাকে। আমরা কী করব- তখন ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। এ রকম একটি সময়ে আমাদের দূরদর্শী নেতা সকলের প্রিয় মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। ওই ভাষণে তিনি এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার ২৩টি প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এই প্যাকেজ ক্ষুদ্র বা টেক্সটাইল বলেন গার্মেন্টস বলেন আবাসন খাত বলেন- সব খাতের জন্য এ প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পেল। ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি ফিরে পেল। করোনার কারণে উদ্যোক্তারা যেমন হতাশ-হতভম্ব হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার ফলে তারা সাহস ফিরে ফেলেন।

এ সময় অ্যাপারেল ও টেক্সটাইল খাতে সেল গঠিত হয়। প্রথমেই সাবসিডাইস রেটে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়- তা হলো পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চার মাসের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সেটা আমাদের একটি বিশাল বড় কাজ হয়েছে। এ জন্য যখন বাইরে থেকে কার্যাদেশ বাতিল হচ্ছিল, ব্যাংক থেকে ঋণ দিতেও সতর্ক হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য প্রণোদনা ঘোষণার কারণে আমরা শ্রমিকদের ধরে রাখতে পেরেছিলাম। ওই সময় প্রণোদনা না দিলে এই বিশালসংখ্যক শ্রমিক চার মাসের বেতন দিয়ে ধরে রাখতে পারতাম না। আবার ওই সময়ে আমরা পুরো একটি মাস বন্ধ রেখেছিলাম। যে ট্রাস্ট ফোর্স ছিল সেখানে আমি ছিলাম, সফিউল মহিউদ্দিন ছিল, এফবিসিআই-এর প্রেসিডেন্ট ছিল, বিজিএমইএ-বিকেএমইএ সভাপতি মিলে একটি কমিটি ছিল, যারা একসঙ্গে বসে মন্ত্রিপরিষদের সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। প্রধানমন্ত্রীকে আপডেট দিতাম।

সে সময় বন্ধ করার বিষয়টি একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল। আপনারা ঝুঁকি নিয়েছিলেন?

আমরা সে সময় বড় ঝুঁকি নিয়েছিলাম। আমাদের কারখানা যেহেতু শ্রমঘন শিল্প, এখানে অনেক মানুষ কাজ করেন, এ জন্য কোভিড-১৯ নিয়ে ভয়ে ছিলাম। স্বাস্থ্যবিধি মেনে, দূরত্ব বজায় রেখে, কারখানাতে ঢোকার আগে জীবাণুনাশক স্প্রে-র ব্যবস্থা করেছি, মাস্ক পরানোর ব্যবস্থা করেছি এবং অন্যান্য ব্যবস্থা আছে সেগুলো নিয়েই কারখানা চালিয়েছি। এতে স্বাভাবিক উৎপাদন না পেলেও শ্রমিকরা বুঝতে পেরেছিল স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলতে হবে এবং কারখানার লোকসান হলেও এটা করতে হবে।

কারখানা খোলা নিয়ে গণমাধ্যম আমাদের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছে। তবে আমাদের সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল। পরবর্তীকালে গণমাধ্যম আমাদের প্রসংশা করেছে। এই বস্ত্র-খাতে সবচেয়ে বেশি কর্মজীবী মানুষ আছে। তাদের আক্রান্তের হার খুবই কম, মৃত্যুর হার নেই বললেই চলে। এ কারণে শিল্পের উৎপাদন পাইপলাইনে চলে এসেছে, সময়মতো শিপমেন্ট করতে পেরেছি- তখন আন্তর্জাতিক বাজারও খোলা শুরু করল, দেশের লকডাউনও ক্রমন্বয়ে খুলে দেওয়া হলো। তারপর ক্রেতাদের চাহিদামতো তৈরি পোশাক সময়মতো পৌঁছাতে পেরেছি। যদি ঝুঁকি নিয়ে আমরা কারখানা খুলে না দিতাম তাহলে আমরা সময়মতো ক্রেতাদের পোশাক দিতে পারতাম না; ক্রেতা হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা ছিল। এ সময় রপ্তানি করতে পারার কারণে ক্রেতাদের আস্থা ফিরে আসে। এভাবে আমরা তৈরি পোশাক রপ্তানি স্বাভাবিক করে ফেলেছিলাম, প্রবৃদ্ধিও ফিরে এসেছিল; এখনো চলছে। আমরা স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টিও এখনো মেনে চলছি। কিন্তু দ্বিতীয় ওয়েব শুরু হওয়ার ফলে ক্রেতারা আবার ডেফার্ড চায়, কার্যাদেশ বাতিল করতে চায় ও ডিসকাউন্টের প্রস্তাব দিচ্ছে। এতে কাজ কমেছে, বিশ^বাজার সংকুচিত হয়েছে বাজার তো কমছেই- এখন এটা বড় চ্যালেঞ্জ।

টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এটা যেমন বাংলাদেশে, বিশ্ববাজারেও। আমাদের পণ্য যেসব দেশে রপ্তানি হয় সে সব দেশেও টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। মানুষের মনে সাহস এসেছে। এখন হ কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করছেন?

বাংলাদেশের বিষয়টি আলাদা। আমরা যেসব দেশে পণ্য রপ্তানি করি, যেসব দেশের চাহিদা মেটায়, সেখানে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাইরে বের হচ্ছে, কেনা-কাটা করছে। সেখানে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে খুব একটা বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। কিন্তু কেনা-কাটা কমেছে। এতে সব খাতেই প্রযোজ্য। বহির্বিশ্বে আমাদের দুটি বড় ডেস্টিনেশন আছে, তার একটি হলো হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ এবং সিঙ্গেল দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। দ্বিতীয় দফায় তাদের কিছু কিছু দেশ যখন লকডাউনে গেল তখন কেনাকাটা কিছু কমেছে। আর কেনাকাটা কমা মানেই দাম কমবে। দাম কমা মানেই প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা তীব্র হবে। এ কারণেই কার্যাদেশ বাতিল, ডিসকাউন্ট, ডেফার্ড এগুলো চলছে। তবে আমরা যারা উদ্যোক্তারা আছি তারা সরকারের সাপোর্ট নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছি। দ্বিতীয় ঢেউটাকেও ফেস করার চেষ্টা করছি। করোনা মোকাবিলা আমাদের খুব সহজ হচ্ছে না। শ্রমিকের বেতন দেওয়ার জন্য যে প্রণোদনাটি দেওয়া হয়েছিল ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে রি-পেমেন্ট শুরু হয়েছে। এটা অনেকেই দিতে পারছে না, যারা ফেরত দিচ্ছে তারা খুব কষ্ট করে ফেরত দিচ্ছে। আমি সংসদে দাবি তুলেছি, এটা জুন মাস থেকে ফেরতের সময় দেওয়া হোক। আবার অনুরোধ করছি, জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হোক, না হলে সমস্যা থেকে যাবে। আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি, তা ব্যাহত হবে।

করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বেশ খানিক সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে বলে বলা হচ্ছে। এ কারণে বার্ষিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের যে প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ তাতে খানিক এগিয়ে আছে। আশপাশের দেশগুলোর আগের বছরের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনই ধরে রাখতে পারছে না। এক্ষেত্রে কী বলবেন?

আমাদের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। করোনার কারণে শুরু থেকে লকডাউনের কারণে সবকিছু বন্ধ থাকলেও নিয়মিত ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে; মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক হয়েছে। যেখানে তিনি সব সময় উপস্থিতি থেকে সব মনোযোগ দিয়ে সব শুনছেন তারপর দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ডিজিটাল বাংলাদেশের যে অভিযাত্রা তা আমরা করোনাকালে কাজে লাগাতে পেরেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল আমরা করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু ঘরে তুলেছি।

কোভিড-১৯-এর কারণে আমাদের স্বাস্থ্য খাত দুর্বল ছিল- এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, দুর্নীতিও ছিল। তবে দেশের কম সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সঠিক ও সময়মতো ব্যবহারের কারণে করোনা মোকাবিলা করার সম্ভব হয়েছে। এ কারণে আমরা আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে ক্ষয়-ক্ষতি কম রাখতে পেরেছি। স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে করোনার মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নার্স, ডাক্তারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বেড়েছে। করোনাকালে এই মুহূর্তে এসে আমরা কোভিড-১৯-এর টিকা দিতে সফলকাম হয়েছি। অনেক উন্নত দেশ এখনো টিকা পায়নি। তারা সিরিয়ালে আসতে পারেনি। কিন্তু আমাদের সরকারপ্রধান অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, অর্গানাইজ করেছেন এবং মানুষকে টিকা দেওয়া শুরু করেছেন। কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বলেন আর পণ্য রপ্তানি বলেন, আমাদের প্রতি বাইরের দেশের আস্থা বাড়বে। আমরা যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা করি তাদেরও আত্মবিশ্বাসটা বেড়ে যাবে।

অবশ্যই এই টিকা যে কাজের- সন্দেহ নেই। প্রথম পর্বে এক লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হয়ে গেছে। এটা আরও আসবে। আরও দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী যে দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতা তাই-ই নন, তার মানবিক উচ্চ পর্যায়ে দৃষ্টিভঙ্গি এই করোনার মধ্যে ফুটে উঠেছে। কোভিড-১৯-এর মধ্যে লাখ করেছেন তিনি টাকা-পয়সার দিকে তাকাননি। বাজেটে নির্দিষ্ট বরাদ্দের বাইরেও ১০ হাজার কোটি টাকা প্রস্তুত রেখেছেন যাতে প্রয়োজন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজে লাগাতে পারেন।

তিনি টাকার দিকে তাকাননি, তিনি দেশের মানুষের জীবন কীভাবে রক্ষা করা যায় তার দিকে তাকিয়েছেন। তিনি করোনার টিকা আগে পাওয়ার জন্য বুকিং দিয়ে রেখেছেন। এর জন্য সমালোচনা করা হলেও তিনি দেশের মানুষের জন্য যা কিছু ভালো তা তিনি করেছেন। আমাদের কূটনৈতিক সফলতাও সামনে এসেছে। এটি আমাদের আরেকটি কূটনৈতিক সাফল্য প্রমাণ করেছি।

আগে করোনার টিকা পেয়ে আমাদের সরকারি কর্মকর্তা, বয়স্ক নাগরিক, সেবাকর্মী- তাদের আগে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশের তাদের একটি। তাই শুধু করোনা মোকাবিলা নয়, করোনা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে সঠিকভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা সফল হয়েছি।

করোনার আক্রান্তের পিক-টাইমে সরকার কারখানা খুলে দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিল, বিভিন্ন এলাকার লকডাউন পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়া শুরু করল, যানবাহন খুলে দেওয়া শুরু করল। একই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কঠোর নির্দেশনাও এলো সরকারের কাছে থেকে। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাইরে বের হওয়া শুরু করল। সে সময় সরকার ও উদ্যোক্তাদের কঠোর সমালোচনা হয়েছিল। বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সে সময় সংবাদপত্র, সুশীল সমাজ পশ্চিমা সমাজ ও তাদের গৃহীত ব্যবস্থা ফলো করার কথা বলেছিল। কিন্তু আমাদের মতো দেশ, যেখানে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের হার বেশি সেখানে এমন বিধিনিষেধ মানা কঠিনই। প্রধানমন্ত্রী একটি কাজ করেছেন- গরিব, দিন এনে দিন খায়, সমাজের একেবারে নিচুতলার সবার জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। নগদ অর্থ সরবরাহ রেখেছেন। কেউ না খেয়ে মরেনি। দ্বিতীয়ত অর্থনীতির চাকা যদি না ঘোরে তাহলে কতদিন আর টিকে থাকবে! এসব বিষয়কে মাথায় রেখে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছিল। এ কারণে আমরা সফল হয়েছি; অন্যরা যারা সবকিছু বন্ধ রাখার কথা কথা বলেছেন, তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা যখন কারখানা খোলা ও সচল রাখতে পেরেছি তখনই আমাদের পক্ষ থেকে জবাবটা দেওয়া হয়েছে। কাজের মাধ্যমে। মুখে জবাব দেওয়া লাগেনি। সফল কিছু শতভাগ সফল এটা বলা যাবে না। কিন্তু আমাদের সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে ক্ষয়-ক্ষতি সর্বনিম্নে রাখা সম্ভব হয়েছে।

আপনি তারকা ফুটবলার, সফল ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ী নেতা এবং এখন একজন রাজনীতিক। কোন পরিচয়কে উপভোগ করছেন? কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন?

যখন তরুণ ছিলাম তখন খেলতাম। তখন খেলাই আমার জীবনের সবকিছু ছিল। খেলাটাকেই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি। পরবর্তীকালে সংগঠক হয়েছি, তখন সাংগঠনিক কাজকে উপভোগ করেছি। প্রধান কাজ হিসেবে বিচেনা করেছি। তারপর যখন ব্যবসাতে নামলাম ব্যবসাকে ধ্যান-জ্ঞান করেছি। ব্যবসাতে ভালো করেছি। বিজিএমইএ-র সভাপতি ছিলাম। সংগঠনটাকে সুন্দরভাবে চালিয়েছি। সেটাও আমি এনজয় করেছি। সফলতা অর্জন করেছি। আমি যখন বিজিএমইএ-র সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছি তখন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরপরই আওয়ামী লীগ সরকারে এলো। সে সময় বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করছিল। সেই সময়ে সরকারের কাছে সহায়তা নিয়ে তৈরি পোশাক শিল্পকে শক্তিশালী রেখেছিলাম। সেই সময়ে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল তৈরি পোশাক শিল্প। সেটা সম্ভব হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সহযোগিতা কারণে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর জন্য প্রণোদনা; নতুন বাজার প্রণোদনা ইত্যাদি সহায়তা এনেছি। যে কারণে এখন নতুন বাজারে ছয় বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এবং শিল্প কারখানা আইনকে সে সময় কাজে লাগাতে পেরেছিলাম। সে সময় ২৭০ কারখানা এক্সিট করাতে সহায়তা করি। ওই সময়ে ওইটাও ভালো লেগেছে।

এই বয়সে এসে যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আমাকে সুযোগ করে দিলেন রাজনীতি করার জন্য- রাজনীতিতে একেবারে নতুন মানুষ। আমি মনে করি, এই বয়সটা সেবার বয়স। মানুষকে সেবা দিচ্ছি। আমি ও আমার সহধর্মিণী শুক্র-শনিবার আমার নির্বাচনী এলাকায় চলে যায়। পরের ফিরি। আগে হয়তো আমার সেই বুঝ ছিল না। অনেকেই আমাকে ভালোবাসত, দেখতে আসত। যখন রাজনীতিক হলাম, মানুষ সেবার জন্য এলাকায় যাচ্ছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে বলি, তুমি আমাকে এত বড় সুযোগ দিয়েছ মানুষকে সেবার জন্য। সত্যি এটা উপভোগ করি। আমরা এলাকায় এত সুন্দর করে গুছিয়েছি। এতে তারা আমার প্রতি খুশি। আমরা গেলে এলাকার আট-দশ হাজার মানুষ অফিসেই থাকে। আমি মনে করি এখন খুব ভালো উপভোগ করছি।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোভিড-১৯ আক্রান্তের উচ্চ হারের সময়ে এলাকায় ১৫ হাজার মানুষকে খাবার দিয়েছি। খুলনা মেডিকেলে কোনো হাইনোজাল ফ্লো মেশিন ছিল না, আমি দুটি মেশিন কিনে দিয়েছি। মানুষ যখন মারা যাচ্ছিল তখন মানুষ কেউ ওই লাশ ধরতে আসত না। আমি তখন আঞ্জুমান মুফিদুলকে ২৬ লাখ টাকা দিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স কিনে দিয়েছি। তারপর আমার নামে সালাম মুর্শিদী সেবা সংঘ আছে, একটি ব্লাড ব্যাংক আছে। যাদের রক্ত লাগে- দিই। সেবা সংঘে ১৫ জন সদস্য আছে। তারা ধর্মীয়ভাবে লাশ দাফন করছে। আমরা এ ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। তিনটা তিন সময়ে। এই সময়টা যেহেতু বেশি বসতে পারছি, মানুষের কাছে যেতে পারছি- মানুষের সেবা সবার সুযোগ পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, এটা আমার জন্য শ্রেষ্ঠ সময়।

যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানে সফল হয়েছেন। এই সফল মানুষ হিসেবে তরুণদের কী উপদেশ দেবেন?

তরুণদের বলব- স্বপ্ন দেখতে হবে, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে। আমি গ্রাম থেকে এসেছি, আমার বাবা শিক্ষক। বড় হতে হলে দেশের বাইরে যাওয়ার দরকার হয় না। যদি চেষ্টা করা যায় দেশেই করার মতো অনেক সুযোগ আছে। আমার উপদেশ থাকবে, যে স্বপ্ন জাতির পিতা আমাদের দেখিয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশের। সে স্বপ্ন দেখব এই দেশটাকে যেন আরও এগিয়ে নিতে পারি, সোনার বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। নিজে বড় হতে পারি, মানুষকে সেবা করছি পারি। শুধু নিজে বড় হব- এমন চিন্তা যেন না হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা মাথায় রাখতে হবে। যে দিকে যার মেধা আছে সে স্বপ্ন দেখতে হবে এবং বাস্তবায়নের জন্য পরিশ্রম করতে হবে। এবং স্বাধীনতার মূলবোধটা যেন থাকে।

আজ আমি তিন নামে পরিচিত। দেশ স্বাধীন না হলে হয়তো কিছু করতে পারতাম না। এই স্বাধীনতার জন্য জাতির পিতা লড়াই করেছেন। তার ত্যাগটা মাথায় রেখে যেন উন্নত-সমৃদ্ধ মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তার জন্য সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।