কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবচেয়ে সম্মাজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো

ঢাকা, শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবচেয়ে সম্মাজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো

জাফর আহমদ ১:০১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০২১

print
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবচেয়ে সম্মাজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে পিকে হালদার। এর ফলে কমপক্ষে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এর মধ্যে একটির অবসায়ন প্রক্রিয়া চলছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরাত দিয়ে এমন খবর এসেছে। বিপুল পরিমাণ এই অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে বের করে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ইন্সপেক্টরদের মাসে সাত লাখ টাকা করে দেওয়া হতো বলে দুদকের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক এমডি রাশেদুল হক। আর এই খবরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা, ভাবমূর্তি ও কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে দৈনিক খোলা কাগজের পক্ষ থেকে সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. ইয়াসিন আলীর সঙ্গে কথা হয়। কথা বলেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ। বক্তব্য বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

বিশ্বাস ও আস্থা ফেরাতে হবে
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ

আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্মরণকালের মন্দ খবর এসেছে। এর মাধ্যমে তুলনামূলক স্বচ্ছ, নীতিনিষ্ঠ ও গর্বের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের একটি খবর বাইরে এলো। আপনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর হিসেবে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
এটা অনভিপ্রেত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যারা চাকরি করেন তাদের স্বচ্ছতা, সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হয়। তাদের বিশ্বস্ত হতে হয়। কিন্তু ইদানীং আমাদের সেই বিশ্বাসের জায়গা, আস্থার জায়গাটা অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলব না, দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপর আমাদের আস্থা, বিশ্বাস ছিল, সেখান থেকে এসব হারিয়ে গেছে। বিশ^াস, সততা এবং দক্ষতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সবাই নানা রকম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করে বা কারও ইনফ্লুয়েন্সে বা মদদে টিকে থাকে, দক্ষতার ভিত্তিতে নয়। এটা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার একটি লক্ষণ। এটা খুবই দুঃখজনক বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য। আরও একটি বিষয়, তা হলো, স্পর্শকাতর জায়গা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি রেগুলেটরি বডিতে এক জায়গায় বেশি দিন কাউকে রাখা উচিত নয়। এটা রোটেট করতে হয়, এটা একটা নিয়ম। আর যারা ম্যানেজমেন্ট থাকেন ‘তাদের একটি থার্ড আই’ থাকতে হয়। ব্যবস্থাপনাকৃত নিজস্ব চ্যানেলের বাইরে অন্যভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। যা তার কাজে ব্যবহার করবে। এগুলো করলে এখন যে ধরনের সমস্যার কথা সামনে আসে সেগুলো একটু কম হতো।

যে কোনো বিষয়ে ইরেগুলার কিছু হলে তার আউটপুট কী, পারফরম্যান্স কী- ধরুন একটি তদন্ত প্রতিবেদন হলো তার অ্যাকশনটা কী নেওয়া হলো। সেগুলো তো মনিটরিং করার দরকার ছিল উচ্চ পর্যায় থেকে। যিনি ওখানে অনেক দিন ধরে আছেন, তদারকি করছেন তাদের ব্যাপারে বাইরে এই যে এ ধরনের রিউমার ছড়াচ্ছে সেগুলো সুষ্ঠু কোনো পথে হচ্ছে না- সেটা তো একটি পরিচয় যে, এটা সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করছে না, সমস্যা আছে। যেসব কথা এখন বাইরে আসছে, এটা কিন্তু হুট করে হয়নি। এর অবশ্যই আর্লি ওয়ার্নিং আছে। যেখানে আগে এ ধরনের ঘটনা সামনে আসলো তখনই তো উচিত ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

একজন কর্মকর্তা, যার বিরুদ্ধে এ ধরনের কথা বলা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আগেই এ ধরনের অভিযোগ এসেছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে তাকে বদলি করা হয়েছিল। তারপর তাকে আবার ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার আগের রেকর্ড পর্যালোচনা করা হলে তো তাকে আবার ওই দায়িত্বে দেওয়ার যৌক্তিকতা ছিল না। এ ধরনের ঘটনারও পুনরাবৃত্তি হতো না?

আমি সেটা আগেই বললাম, এক স্থানে একজন কর্মকর্তাকে বেশি দিন রাখা ঠিক নয়। রাখলেই তার বিরুদ্ধে কায়েমি স্বার্থ চলে আসে। তার রেকর্ড দেখে পারফরম্যান্স দেখে কাজ করা উচিত। এটা ম্যানেজমেন্টকে দেখে কাজ করতে হয়। তা ছাড়া একটি ব্যাপার হয়ে গেছে- সেন্ট্রাল ব্যাংক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো ভুল করলে তাকে জবাবদিহির অধীনে আনার কোনো লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছে না। আমার সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক নিয়ে একটি ঘটনা ঘটেছিল। পরে সে পদত্যাগ করেছিল। এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এটা কোনো কাজের কথা নয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তদন্ত করে দোষী হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে একই ধরনের কাজ করতে অন্যরা উৎসাহী হয়।
আমি মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। আরও দৃঢ় হতে হবে। তা না হলে আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে তা সমাধান করা কঠিন হবে।

তদন্ত করে দোষীর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে
ড. মির্জ্জা এবি আজিজুল ইসলাম

এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আমার বিশ্বাস কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে এসব কর্মকর্তা কীভাবে জড়িত ছিল তা বের করবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। ডিপার্টমেন্টের যে ব্যবস্থা নেওয়ার আছে তা নেবে। এমনিতেই ব্যাংকিং খাতের সমস্যা আছে। এই ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ হবে। অন্যান্য কর্মকর্তাও এ ধরনের কাজ করেছে কি-না, বিশেষ করে এনবিএফআই সম্পর্কে যে কথাগুলো আসছে- বিষয়গুলো অনুসন্ধান করতে হবে। এটা অনাকাক্সিক্ষত। দ্রুত তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংক আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান
মো. ইয়াসিন আলী

যে খবর এসেছে, তাতে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। বাংলাদেশ ব্যাংকে ৩৩ বছর চাকরি করেছি, এটাকে আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান মনে করি। এই ঘটনা যখন বের হচ্ছে, সত্যি আমি মর্মাহত, এটাই প্রথম। দ্বিতীয় হলো, যে কোনো ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি টপ মোস্ট প্রায়োরিটি। এখানে ছাড় দেওয়ার বা ল্যাফস হওয়ার কোনো অবকাশ নেই, সুযোগ নেই অথবা উচিত নয়।

এখন ওপর লেভেলে যদি এমন হয়, যে লেভেলের কথা সংবাদপত্রে দেখছি। এ রকম হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন ইনস্পেকশন সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ার কথা এবং ঠিক তাই হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে লেভেলের কথা সংবাদপত্রে আসছে, তারা তো দীর্ঘদিন ফিনান্সিয়াল-ব্যাংকের সুপারভিশনের দায়িত্বে ছিলেন। তারা থাকতে কীভাবে সুপারভিশন করতে হবে, কীভাবে এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেখানে যদি ভেঙে পড়ে, সেখানে আর কিছু থাকার কথা না। এখানে ভেঙে পড়া এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় যেমন ধরুন নিচের লেভেলে একটি নোট পুট-আপ করে সেখানে ওপর লেভেলে যদি এ রকম মন্তব্য পায়, এগুলো দেখার দরকার নেই অথবা যদি এমন ইঙ্গিত পায় ‘ইউ ওভারলুট ইট’, তাহলে তো ইনস্পেকশনের কিছুই থাকবে না, ভেঙে পড়বে।

নিচের লেভেলে যারা সৎ তারা ডি-মোটিভেটেড হবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিকাংশ সৎ- এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা হাইলি ডি-মোটিভেট হবে আর যারা অসৎ তারা লুটপাট করা শুরু করবে, যদি ওপর লেভেলে এ রকম থাকে। এ রকম হয়েছে বলেই ব্যাংক এক ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন এমন অবস্থা হয়েছে। ব্যাংকের অবস্থাও ভালো নয়। ব্যাংকের অবস্থা যেমন ধরেন আগে লুৎফর রহমান সরকার, ড. ফরাসউদ্দিন, ফখরুদ্দীন আহমদ, সালেহ উদ্দিন সাহেবরা ইনস্পেকশন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করতেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য যে জিহাদটা চালিয়ে গেছেন সেটা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। আর একটি বিষয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের উপরেও যে একটি অর্গানাইজেশন আছে, আমার মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে সঠিকভাবে কাজ করতে দেয়নি। তারা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধছে, বাংলাদেশের ব্যাংকের উপরে যেভাবে খবরদারি করেছে, বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়নি। আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ডি-মোটিভেটেড হয়ে গেলে, দুর্নীতি যদি ঢুকে পড়ে যা হওয়ার ঠিক তাই হয়েছে। তা না হলে তো সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা তো এক দিন-দুই দিনে বের হওয়ার কথা না, অসম্ভব। এটা এক দিন দুই দিনে বের হওয়ার কথা না।

অনেক দিন সময় নিয়েছে তারা এবং সময় পেয়েছে, সেই সময়ে তাদের প্রটেকশন দেওয়া হয়েছে। যদিও পরে এটা বাংলাদেশ ব্যাংকই ধরেছে। একটি পর্যায়ে এসে ইনস্পেকশন পরিবর্তন হয়। তারাই এটা ধরছে। কিন্তু ততদিন যা হওয়ার তাই হয়ে গেছে। এটা এখন লজ্জার ব্যাপার শরমের ব্যাপারে পরিণত হয়ে গেছে।

আমি বাইরে থেকে দেখেছি, ব্যাংক খাতে যে কয়টা দুর্নীতিগ্রস্ত এমডি ছিল তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের টপ-লেভেলে খুব সখ্য লক্ষ করেছি। তাদের ভালো সম্পর্ক দেখেছি। কেন? এটা কেন? আমরা যখন ছিলাম করাপ্ট এমডিরা আমাদের কাছে ভিড়তে পারত না। তখন তাদের একটি স্ট্যান্ডার্ড ছিল।
এই যে ওপর লেভেলের যাদের কথা আসছে তারা কিন্তু কাজে অদক্ষ ছিল, তা কিন্তু নয়। যারা জানত না, পারত না, তারা বুঝত না- এমন ছিল না তারা। যে দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম এসেছে তারা দক্ষ অফিসার। তারা সুপারভিশনের এবিসিডি। কিন্তু এটা হলো কেন? তারা এ নিয়ে গর্ববোধও করত, চাকরিতে ঢোকার পর থেকে তারা সুপারবিশন দেখে আসছে।

ইনস্পেক্টর লেভেলে যারা আছেন তাদের সঠিক নার্সিং করার পরিবর্তে বিপরীতটা হয়েছে। যে সব ইনস্পেক্টর ভালো কাজ করেছে তাদের পুরস্কৃত করে অনুপ্রাণিত করার কথা। কিন্তু পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। এ সব কর্মকর্তার কাছে থেকে সেটা হয়নি। বরং তারা নিজেরাই সমস্যাকে লালন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে ভালো কর্মকর্তা নেই- এমন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে ছিলাম, দেখলাম যে সেখানেও ভালো ও সৎ কর্মকর্তা আছে। তারা আমাকে চুপি চুপি এসে বলত, এ রকম ঘটনা ঘটছে। আমি আপনাকে বলছি, এখানে এই ঘটনা ঘটছে। আপনাকে বলছি, কেউ জানলে আমার ক্ষতি করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে সবাই ভালো না- এমন না। ভালো কর্মকর্তাও আছে। খারাপ লোক পেছনের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্য দিকে ভালো মানুষ যারা আছে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে ভালো কিছু করার। যে কথা উঠছে তদন্তের মাধ্যমে সঠিক ঘটনা বের করে অপরাধী হলে শাস্তি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সৎ, স্বচ্ছ ও যোগ্য লোকদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইমেজ ও শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিভাগীয় তদন্ত নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে
ড. আহসান এইচ মনসুর

আগেও এ ধরনের খবর আসত। এখন সত্য বলেই মনে হচ্ছে। এটা এখন অফিসিয়ালি চলে আসছে। এটা দুদকের ইনভেস্টিগেশন, অফিসালি ইনভেস্টিগেশন। যেটুকু জানা গেছে, এটুকুই আমাদের জন্য মেটার অব গ্রেট কনসার্ন। বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ক্লিন ইমেজ ছিল সেটাকে টার্নিস করেছে ব্যাপকভাবে।

এখন কী করা দরকার? এখন একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। গভর্নরই এটা ইনস্টিটিউট করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ভালো জিনিস, এখন পর্যন্ত যতগুলো গভর্নর হয়েছেন সবাই সফিটিকেড। সবাই সম্মানের সঙ্গে কাজ করছেন। আমি নীতি অপছন্দ করতে পারি কিন্তু মানুষ হিসেবে তারা সৎ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। সেটা ড. আতিউর রহমানের কথা বলি, ফরাসউদ্দিন সাহেবের কথা বলি, ফখরুদ্দীন সাহেবের কথা বলি বা সালেহ উদ্দিন সাহেব সম্পর্কে বলি বা তার আগে যারা ছিলেন, সবাই। তারা সবাই নীতিবান ছিলেন, তাদের দুর্নীতির কথা কেউ কোনো দিন বলেনি; এখনো বলে না। কিন্তু এই সুনামকে ধরে রাখতে হলে শুধু একজনকে পরিষ্কার থাকলে হবে না, প্রতিষ্ঠানটাতে তাদের পরিষ্কার রাখতে হবে। যারা দায়িত্বে আসে তাদেরই দায়িত্ব এটা।

এটা করতে হলে সাবেক কোনো গভর্নর সাহেব বা কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তি যার নীতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, তার নেতৃত্বে একটি ছোট্ট তদন্ত কমিটি করা হোক এবং ডিবি পুলিশ বা যাদের ইনভেস্টিগেশন করে তাদের সঙ্গে ট্যাগ করে দেওয়া হোক, যাতে ওই ইনভেস্টিগেশনের তথ্যগুলো এ কমিটি ব্যবহার করতে পারে। ইনভেস্টিগেশন মানে তদন্ত তলা পর্যন্ত যাওয়া। বিষয়টি দুজন তিন ব্যক্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ আছে। আমি কিন্তু এটা বিশ্বাস করি না। এটা আরও গভীরে; এটা এক নম্বর বিষয়। আর দ্বিতীয় হলো- ঘুষ হিসেবে ক্যাশ টাকা নেওয়া। এটা প্রচলিত আছে। বিষয়টি সংবাদপত্রে এসেছে। অনেক ব্যাংক নাকি দেয়; আমাদের ব্যাংক কোনো দিন দেয় না। ব্যাংকে আরেকটি জিনিস হয়, তাহলো- ইনফ্লুয়েন্স করার চেষ্টা করা, জামাই, মেয়ে, ছেলের চাকরি দেওয়া। এর মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে মূল যে কাজটি আছে সুযোগ নিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া হয়।

এ ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পাওয়ার খাটানো হয়। এটা কিন্তু ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কোথাও তদবির হতে পারে। তাই বলে কোনো রেগুলেটরি বডি, মূল কাজ না করে ছাড় দেওয়ার শর্তে সুযোগ নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যখন আমি রেগুলেটর তখন আমি এ ধরনের তদবির করতে পারি না। একজন সিটিজেন হিসেবে এটা করতেই পারি। কিন্তু যখন আমি রেগুলেটর তখন আমার ওপর রাষ্ট্রের বড় একটি দায়িত্ব কাঁধে। আমার ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্বকে এভাবে ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের কাছে বিকিয়ে দিতে পারি না। সে জায়গাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও কঠোর হওয়া দরকার। নীতিমালা আরও কঠোর হওয়া দরকার। কোনো ব্যাংকের কাছে কেউ ফোন করে চাকরির জন্য বা অন্য সুযোগ নেওয়ার জন্য তদবির করতে না পারে। এক্ষেত্রে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তের মাধ্যমে দোষীকে চিহ্নিতকরণ এবং শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে নির্দেশনা দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে সবাই সতর্ক থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বাড়ি-ঘর সম্পদের হিসাবও নেওয়া উচিত। যাতে জবাবদিহি থাকে।

এগুলো অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ব্যপার। এগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সাহেবকে করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজনমতো একটি কমিটি করে এগুলো করতে পারে। একটি তদন্ত কমিটি আর একটি রিঅর্গানাইজেশন কমিটি। যেভাবে ম্যানেজ করা যায়, যাতে মানুষের আস্থা ফিরে আসে। প্রয়োজন হলে বেতন বাড়াও, প্রয়োজনে আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়াও। তারপরও যেন নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো কম্প্রোমাইজ না করতে হয়। কারণ এর ক্ষতি বিশাল।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরাদ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যে নামটি এসেছে তার নাম আগেও আমরা শুনেছি। কিন্তু তার ক্ষমতার দাপট ছিল অনেক। এ ক্ষমতা তিনি ব্যাংক খাতে খাটাতেন। এ সবের বিচারও হওয়া উচিত। এ ধরনের দুষ্টচক্র বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকতে পারে না। এ দুষ্টচক্র পাওয়ার খাটিয়ে রেনুয়াল ও পছন্দমতো বিভাগে বদলি হয়েছে। দুষ্ট চক্র কিন্তু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তাদের শক্তি অনেক দূর পর্যন্ত প্রোথিত থাকে। যেই দোষী হোক তদন্তের মাধ্যমে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এটা যেন ডিপার্টমেন্টাল তদন্ত না হয়। এটা হতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত। পুরনো গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর বা এই ধরনের কর্মকর্তা যাদের ইন্টিগ্রিটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তারা বুঝবেন ভালো, তাদের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে। চূড়ান্তভাবে এই প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। তদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন কীভাবে বাস্তবায়ন করল সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা ফিরে আসবে।

এখনো রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কোনো সমস্যা হলেও সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যদিও দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া আছে। তারপর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপরই বিশ্বাস করছে। মানুষ মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যাংককে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার পর দুদকের বরাত দিয়ে যে খবর এলো, যদি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি না করা হয় তাহলে সে বিশ্বাসটুকু হারাবে।

এই যে পর্যবেক্ষক বসানো হলো- এই পর্যবেক্ষকের পারফরম্যান্স দেখার উপায় কী! তারা কী করল, কী করছে- সেটাও দেখা দরকার। তাদের অ্যাসাইন করে দিলাম, আর তারা ব্যাংকের সঙ্গে কী করছে সেটা দেখায় উপায় কী? যদি তাদের পারফরমেন্স দেখার কোনো ব্যবস্থা না থাকে তাহলে তো পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়ে তো কোনো লাভ হলো না।

পি কে হালদারকে সহায়তা করতেন ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালক
পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ অন্তত চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার)। তাকে এ অনিয়মে সহায়তা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী ও নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম।

এ ছাড়া এই লোপাটের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ আরও অনেকেই নীরব ভূমিকা পালন করেছেন। জালিয়াতির ঘটনাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকে জানলেও তারা এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেননি। সংশ্লিষ্টদের এমন নীরবতার কারণেই পি কে হালদার বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। পি কে হালদারের অন্যতম সহযোগী ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হকের আদালতে দেওয়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রাশেদুল হক। এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে আনে।

জবানবন্দিতে রাশেদুল বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য অবসরে যাওয়া ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীকে ‘ম্যানেজ’ করে পি কে হালদার অর্থ লোপাট করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিআইএফএমের (ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড মার্কেটস) বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা করে দেওয়া হতো। এ টাকা প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যাশ হিসাবে উত্তোলন করে ‘বিবিধ’ খরচ দেখানো হতো। যাতে ঘুষের টাকার কোনো প্রমাণ না থাকে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক ও রেজা গ্রুপের চেয়ারম্যান শহিদ রেজা পি কে হালদারের প্রধান সুবিধাভোগী ছিলেন বলেও জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। পি কে হালদার ও রেজা লোপাট করা অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নিতেন। জবানবন্দিতে রাশেদুল হক আরও বলেন, দুর্নীতির কাজে পি কে হারদারকে সহযোগিতা করতেন একটি গ্রুপের বেশ কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন বলে জানা যায়। পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আর্র্থিক খাতে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপপরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান। সূত্র জানায়, রাশেদুল হকের দেওয়া জবানবন্দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বর্তমানে নির্বাহী পরিচালকসহ যাদের নাম এসেছে তাদেরও তদন্তের আওতায় নিয়ে আসবে দুদক। এ বিষয়ে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। রাশেদুল হকের জবানবন্দি সূত্রে আরও জানা যায়, পি কে হালদার নিজের ইচ্ছামতো গ্রাহকদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে একদিনের মধ্যে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করতেন। অনেক সময় গ্রাহক জানত না যে, তার নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এভাবে এখানে শত শত কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন। এ কাজে তাকে সহায়তা করেন রিলায়েন্সের কর্মকর্তা- রুনাই আহমেদ, আল মামুন সোহাগ ও রাফসান আহমেদ চৌধুরী। পি কে হালদার তার জালিয়াতের কাজে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুরকে বিভিন্ন উপায়ে কাজে লাগাতেন। জবানবন্দিতে রাশেদুল আরও বলেছেন, পি কে হালদার এনআরবি গ্লোবালের এমডি হিসেবে চলে গেলে রাশেদুল হককে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পি কে হালদারের কথামতো রাশেদুল হক ২০১৫ সালের জুন মাসে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি হলেও প্রতিষ্ঠান চালাতেন মূলত পি কে হালদারই। তিনি নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে রিলায়েন্স লিজিংয়ে তার অনুসারী রুনাই আহমেদ, আল মামুন সোহাগ, রাফসান ও অভীক সাহাকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে নিয়ে আসেন। তারা মূলত পি কে হালদারের সঙ্গে সরাসরি ডিলিং করতেন। বেশির ভাগ পার্টিই (মক্কেল) ছিল পি কে হালদারের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু। তারা পি কে হালদারের কাছে ঋণের প্রস্তাব দিলে সহযোগী সোহাগ, রাফসানদের মাধ্যমে ওই প্রস্তাব রাশেদুল হকের কাছে পাঠাতেন পি কে হালদার। রাশেদ মার্ক করে তা রুনাই আহমেদকে দিলে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া এবং কোনো মর্টগেজ না নিয়ে পি কে হালদারের নির্দেশমতো ঋণ প্রস্তাব তৈরি করে তাতে রুনাই, সোহাগ ও রাফসান স্বাক্ষর করতেন। এমডি হিসেবে রাশেদুল হক অনুমোদন দিতেন। প্রতিটি বোর্ড মিটিংয়ে পি কে হালদার উপস্থিত থাকতেন এবং ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনে বাধ্য করতেন।

আদালত সূত্রে আরও জানা যায়, রাশেদুল হক স্বীকার করেন, বোর্ড সদস্যরা সবাই ছিলেন পি কে হালদারের লোক। তাই তারা ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান জেনেও ঋণ অনুমোদন করে দিতেন। মো. নওশের উল ইসলাম, মমতাজ বেগম, পাপিয়া ব্যানার্জি, বাসুদেব ব্যানার্জি ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালক হওয়া সত্ত্বেও অনিয়ম করে বেআইনিভাবে তাদের ভুয়া প্রতিষ্ঠান এমএসটি মেরিন, এমএসটি ফার্মা, নিউট্রিক্যাল ও জিএন্ডজি এন্টারপ্রাইজের নামে ঋণ নিতেন। সেই অর্থ পি কে হালদারসহ তার ঘনিষ্ঠদের হিসাবে স্থানান্তর করতেন। পরে ওই অর্থ উত্তোলন করে পি কে হালদার ও তার কয়েক সহযোগী বিদেশে পাচার করেছেন।

রাশেদুল হক তাদের সহকর্মীদের সহায়তায় আনাম কেমিক্যাল, রহমান কেমিক্যাল, নর্দান জুটসহ বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব, কাঠামো ও ঋণ নেওয়ার উদ্দেশ্য যাচাই ও মর্টগেজ ছাড়াই ঋণ দিয়েছেন। যা পরে পি কে হালদারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর হয়েছে। পি কে হালদার এখন বিদেশে পলাতক।