প্রস্তুতির পরিকল্পনা থাকা দরকার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২১ | ৮ মাঘ ১৪২৭

প্রস্তুতির পরিকল্পনা থাকা দরকার

ওয়ালিয়ার রহমান ৫:১৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০২০

print
প্রস্তুতির পরিকল্পনা থাকা দরকার

ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি (বিএসসি) রাষ্ট্রায়ত্ত সমন্বিত সাত ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষার কেন্দ্র ও আসন বিন্যাস প্রকাশ করেছে। আগামী ৫ ডিসেম্বর ৬৭টি কেন্দ্রে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার প্রস্তুতি, পরিকল্পনা-কৌশল এবং ক্যারিয়ারের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন মধুমতি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যাংকার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, যিনি এক সময়কার মেধাবী শিক্ষার্থী (যশোর বোর্ডে এসএসসি ও এইচএসসিতে মেধা তালিকায় স্থানপ্রাপ্ত) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স করে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্সে এমবিএ সম্পন্ন করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. ওয়ালিয়ার রহমান

মেধাবীদের জন্য ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যাংকিং খাত কেমন?
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : একটা সময় ছিল, এই তো মাত্র এক দশক আগেও, যখন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা মেধাবী ছেলেমেয়েরা ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ব্যাংক খাতকে পছন্দের তালিকায় সবার ওপরে রাখত। আমরা অনেকেই তখন বিসিএসে কোয়ালিফাই করেও সরকারি চাকরিতে জয়েন না করে বেসরকারি ব্যাংকে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এর প্রধান কারণ ছিল, তখনকার সময়ে সরকারি চাকরির তুলনায় বেসরকারি ব্যাংকের চাকরি অনেক বেশি লোভনীয় ছিল। তবে বর্তমানে এই ব্যবধান অনেক কমে গেছে। এখন সকল সুযোগ সুবিধার প্রকৃত আর্থিক মূল্য বিবেচনায় নিলে সরকারি চাকরি বেশ ভালো। তাছাড়া চাকরির নিরাপত্তা, কর্ম পরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদার সূচকগুলোকে বিবেচনায় নিলে সরকারি চাকরি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয়। আর এসব কারণে মেধাবীরা আগের মতো আর ব্যাংক জবে আসছে না। তবে যারা কর্মঠ, আত্মপ্রত্যয়ী এবং চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করে ব্যাংক খাত এখনো তাদের জন্য ক্যারিয়ার গড়ার উপযুক্ত স্থান।

রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি পেতে হলে কেমন প্রস্তুতি দরকার?
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে বিসিএস পরীক্ষার মতো ব্যাপক প্রস্তুতি দরকার। প্রস্তুতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। প্রথমে বিগত কয়েক বছরের প্রশ্নপত্র জোগাড় করে দেখে নিতে হবে কি ধরনের প্রশ্ন আসে। তারপর নিজের যোগ্যতা যাচাই করে খতিয়ে দেখতে হবে কোথায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে। এবং সবশেষে অনুশীলনের জন্য পরিকল্পনা সাজাতে হবে। মনে রাখতে হবে অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই।

গণিত ও ইরেজির প্রস্তুতি সম্পর্কে আপনার পরামর্শ...
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : লিখিত পরীক্ষায় গণিত অংশের প্রশ্নগুলো সাধারণত মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচি আলোকে করা হয়। সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ গণিত বইয়ের অধ্যায়গুলোর ওপর যদি কারো ভালো দখল থাকে তবে তার জন্য পূর্ণ নম্বর পাওয়া সম্ভব।
ভালো প্রস্তুতির জন্য শুরু থেকেই গণিতের ওপর বাড়তি জোর দিতে হবে। একেবারে বেসিক লেভেল থেকে প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। প্রয়োজন হলে পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ শ্রেণির বই দিয়ে শুরু করতে হবে। তারপর পর্যায়ক্রমে সপ্তম, অষ্টম, নবম এবং দশম শ্রেণির বইয়ের অংকগুলো করে ফেলতে হবে। বিগত বছরের পরীক্ষাগুলোতে যে অংকগুলো এসেছে তা সমাধান করতে হবে। তবে মনে রাখা দরকার, গণিত মুখস্থ করার মতো কোনো বিষয় নয়, এখানে বেসিকটা বুঝতে পারা জরুরি। অন্যদিকে ইংরেজিতে দক্ষতা আনার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন। এক্ষেত্রে কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানই যথেষ্ট নয়। বেসিক গ্রামারটা জানতে হবে, ভোকাবুলারি অর্থাৎ নতুন নতুন শব্দ জানা এবং সেগুলো প্রয়োগ করার ক্ষমতা থাকতে হবে এবং কোনো বিষয় সম্পর্কে চট করে দু-চার লাইন শুদ্ধভাবে লেখার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ইংরেজিতে যাদের বেশি দুর্বলতা রয়েছে, তাদের শুরু করতে হবে একেবারে শুরু থেকে অর্থাৎ Sentence বা Parts of speech দিয়ে। Paragraph writing এ দক্ষতা আনতে প্রতিদিন অনুশীলন করতে হবে। ইদানীং ইন্টারনেট তথা ফেসবুক বা ইউটিউবে বিষয়ভিত্তিক ভালো মানের অনেক lesson পাওয়া যায়। অনলাইনে পড়াশুনার এক বিশাল প্লাটফর্ম ইতোমধ্যে প্রস্তত হয়ে গেছে। জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্র এখন উন্মুক্ত। ম্যাটেরিয়ালের কোনো অভাব নেই। এক ক্লিকেই চোখের সামনে হাজির হয় হাজার হাজার তথ্য। দরকার শুধু আগ্রহ আর চেষ্টা- হাল ছেড়ে না দিয়ে লেগে থাকা।

বাংলা, আইসিটি এবং সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে প্রস্তুতির ব্যাপারে কিছু বলুন?
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা সাহিত্য-এই দুই অংশ থেকেই প্রশ্ন আসে। বাংলা সাহিত্যে ভালো করার জন্য বাজারের যেকোনো একটি বই অনুসরণ করা যেতে পারে। ব্যাকরণ অংশে ভালো করার জন্য নবম দশম শ্রেণির জন্য নির্ধারিত বোর্ডের ব্যাকরণ বইটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর। আইসিটি বিষয়ে সাধারণত গতানুগতিক ও পাঠ্যপুস্তক কেন্দ্রিক প্রশ্ন থাকে। বিভিন্ন ব্যাংকের বিগত পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো ভালোভাবে পড়তে হবে। আর সাধারণ জ্ঞানে ভালো করতে হলে সমসাময়িক বিষয়গুলো জানা থাকতে হবে।

এবার ভাইভা বোর্ডের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু বলুন?
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : চাকরি প্রার্থীর জন্য ভাইভা বোর্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রার্থীকে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। তাই ভাইবার জন্য সব সময় বিশেষ কিছু প্রস্তুতির দরকার রয়েছে। ভাইভা বোর্ডে প্রার্থী কি বলছে তার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিভাবে বলছে। তার শারীরিক ভাষা- যেমন, হাঁটার ধরন (stepping), সম্ভাষণ (salutation style), বসার ধরন (sitting), তাকানো (eye contact), প্রকাশভঙ্গি (way of delivery), হাতের নড়াচড়া (hands movement)- সবকিছুই কমবেশি দেখা হয়। আবার প্রার্থীর বাচনভঙ্গি (art of speaking), উচ্চারণ (pronunciation), বুদ্ধিমত্তা (level of intelligence) এগুলোর দিকেও বোর্ড নজর রাখে। ভাইবা বোর্ডে প্রার্থীর লুক একটি বড় বিষয়- অর্থাৎ প্রার্থীকে কেমন দেখাচ্ছে, তার মেকআপ, গেটআপ, ড্রেসআপ সবই গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে ভাইভার ওপর ভালো মানের প্রচুর ভিডিও ক্লিপ রয়েছে। সেগুলো দেখে নিলে যথেষ্ট উপকার পাওয়া যাবে। তবে আমার মতে, ভাইভা বোর্ডে ভালো করার প্রথম সূত্র হলো- স্বাভাবিক থাকা (staying normal)। অর্থাৎ মস্তিষ্ককে একেবারেই tensed রাখা যাবে না। এতে করে প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস (level of confidence) বেড়ে যাবে। আর কেউ যদি যথেষ্ট পরিমাণে আত্মবিশ্বাসী থাকে (not over confidence), তবে সে অন্তত ৫০% এগিয়ে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে ভালো করে শুনে নিতে হবে। তারপর, তাড়াহুড়ো না করে গুছিয়ে উত্তর দিতে হবে। প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে। কথা বলার মাঝখানে আটকে গেলে উম-আম না করে ২ সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে আবার কথা বলতে হবে। প্রশ্নকর্তা ইংরেজিতে প্রশ্ন করলে উত্তরও ইংরেজিতে হওয়াটা শ্রেয়। তবে সমস্যা হলে বিনয়ের সঙ্গে অনুমতি নিয়ে বাংলায় উত্তর দেওয়া যেতে পারে। এতে এমন দোষের কিছু নেই। মনে রাখা দরকার, ভুল ইংরেজিতে কথা বলার চেয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলায় বলা অনেক ভালো। কোনো প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত না জানলে, বিনয়ের সঙ্গে বলা উচিত, ‘সরি, এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।’ কথা বলার মাঝখানে উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনমতো পরিমিত হাসি, courtesy words (যেমন- thanks, please) বা বাক্যের মাঝখানে (বাংলায় বললে) power words (গুগল করে power words জেনে নিতে পারো) ইংরেজিতে বললে, বোর্ড ইম্প্রেস হতে পারে। তৃতীয়ত, প্রতিটি ভাইভাতেই একটা কমন প্রশ্ন থাকে- ‘নিজের সম্পর্কে কিছু বল’ (say something about yourself)। দুঃখজনক হলো, সিংহভাগ প্রার্থীই সঠিকভাবে এই প্রশ্নের উত্তর করতে পারে না। অথচ এটা একটা এসিড- টেস্ট প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তরে বোর্ড ইম্প্রেসড না হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থীর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সর্বশেষ, নিজের পড়াশুনার বিষয়গুলো, ব্যাংকের চাকরির প্রতি আগ্রহের কারণ, ভবিষ্যৎ পেশা পরিকল্পনা, লেখাপড়া ছাড়া অন্য বিষয়ে আগ্রহের বিষয়, নিজের সবলতা ও দুর্বলতার জায়গাগুলো (strength and weakness)- এসব বিষয়ের ওপর গুছিয়ে বলার জন্য অনুশীলন করতে হবে। বিশেষ করে নিজের পড়াশোনার বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার।

বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রায় বন্ধ। এ দুঃসময়ে চাকরি প্রত্যাশীদের প্রতি আপনার কোনো পরামর্শ?
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : সত্যি বলতে কি, আমরা একটা কঠিন সময় পার করছি। বিশ্ব অর্থনীতি এক ধরনের মন্দাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী অগণিত মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর অবস্থা এখন মোটামুটি সন্তোষজনক। যদিও নতুন কর্মসংস্থান এখনো সেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না, তবে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটছে। প্যান্ডেমিকের প্রথম ধাপে কয়েকটি ব্যাংক কিছু লোক ছাঁটাই করলেও এখন আর তেমনটি শোনা যাচ্ছে না। অনেক ব্যাংক তো ইতোমধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। তাই চাকরি প্রার্থীদের হতাশ হওয়ার তেমন কিছু নেই। তাদের উচিত বরং এই মধ্যবর্তী সময়টা নষ্ট না করে আরও অধিক অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে শতভাগ প্রস্তত করে তোলা।

সবশেষে আপনার নিজের সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করি। চাকরির পাশাপাশি আপনি লেখালেখিও করেন। এ সম্পর্কে যদি কিছু...
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : আমি আসলে বিশ^বিদ্যালয় জীবন থেকেই টুকটাক লেখালেখি করে আসছি। এটা আমার এক ধরনের নেশা। অবসর সময়ে সুযোগ পেলেই কিছু লিখতে চেষ্টা করি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সমকালীন বিষয়ের ওপর মাঝে মধ্যে কলাম লেখি। ইতোমধ্যে আমার দুটি বই প্রকাশ পেয়েছে; একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ- ‘বৃত্তের বাইরে’, অন্যটি উপন্যাস- ‘আলোর আকাশে’। সবকিছু ঠিক থাকলে আসছে বইমেলায় সায়েন্স ফিকশনের ওপর লেখা নতুন একটি বই প্রকাশ পেতে পারে।