মানুষের আস্থা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

মানুষের আস্থা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই

জাফর আহমদ ১১:০১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০১, ২০২০

print
মানুষের আস্থা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই

ড. জায়েদ বখত বিশিষ্ট গবেষক। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক। তিনি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বড় তিন ব্যাংকের অন্যতম অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। ব্যাংকটিতে এখনো কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেনি। চেয়ারম্যান হিসেবে ড. জায়েদ বখতের শক্ত ভূমিকা অগ্রণী ব্যাংকের এ অবস্থা তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। করোনাকালে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন ও প্রণোদনা বিতরণসহ নানা বিষয়ে তিনি খোলা কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ

করেনাকালে আর্থ-সামাজিক ইস্যুতে পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন আপনি কীভাবে দেখেন?
করোনাকালে যে পরিবর্তনগুলো সাধিত হয়েছে তার মধ্যে হেল্থ হেজার্ড বা স্বাস্থ্যহানির বিষয়টি আছে। এখানে পিওরলি স্বাস্থ্যের একটি দিক আছে। এটা আপামর জনসাধারণ থেকে শুরু করে উচ্চবৃত্ত লোকজনও আক্রান্ত হয়েছে। এখানে আল্লাহর একটি মেহেরবানি যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষ বা বস্তি এলাকাতে যত ব্যাপকভাবে আশঙ্কা করেছিলাম ততটা হয়নি। সেটা হলে সামাল দেওয়া মুশকিল হতো। সেখান থেকে একটি বিপর্যয় থেকে রক্ষা বলা যায়।

করোনার যে অভিঘাত আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দুইই কম হয়েছে। সব দেশেই প্রতিরোধ করার এবং করোনা থেকে মানুষকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে, আমরাও করেছি। সেগুলোরও কার্যকারিতা আছে। তারপর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায় আমাদের যতটা ভার্নাবিলিটি ছিল তার তুলনায় আমাদের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণটা সহনীয় ছিল।

দ্বিতীয়ত হচ্ছে এর ফলে মানুষের আয় উপার্জন, কর্মসংস্থান এগুলোর ওপর যে বিরূপ অভিঘাত, সেটার কারণে একটা হচ্ছে যে, দারিদ্র্যসীমার ধারে কাছে যারা ছিল তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এর অর্থনৈতিক অভিঘাত অনেক বেশি।

করোনার অভিঘাত এমন-একজন মানুষ অসুস্থ না হয়েও সে কাজে যেতে পারছে না। কাজে না গেলে সে আয় উপার্জন করতে পারছে না। এমনিতে সে সুস্থ থাকল, স্বাস্থ্যহানি হলো না কিন্তু পেটের ভাত জোগাড় হচ্ছে না। এটা অর্থনৈতিক গতি থামিয়ে দিয়ে। যেমন বিদেশ থেকে লোকজন চলে এসে দেশে তারা কাজ কর্ম করতে পারছে না, শহরের লোক গ্রামে চলে যাওয়া। সবগুলো মিলে ইকোনমিক ডিসলোকেশন সৃষ্টি করেছিল। শহরের লোক গ্রামে চলে গেলে দেখা যাবে শহরের বাড়ি ভাড়ার আয়ের ওপর নির্ভর করত- তাদেরও বিভিন্ন রকমের সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি এমন নয় যে গ্রামে গিয়ে ভালো থাকবে, সেখানে তাদের থাকার জায়গা, খাওয়ার ব্যবস্থা, কর্মের সুযোগের ব্যাপার আছে। এর ফলে সামাজিক সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক।

শহরের মানুষ গ্রামে চলে যাওয়ার কারণে কম বয়সি মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। কারণ তারা মনে করছে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। তারা চিন্তা করেছে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিলে সেই নিরাপত্তাহীনতা কমে যাবে। এ রকম বিভিন্ন রকম সামাজিক সমস্যা হয়েছে।

একটা সময়ে গিয়ে মনে হলো কোভিড-এর পিক টাইমটাতে আমরা আসিনি। একটা পর্যায়ে আমরা দেখলাম মৃত্যু ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর ওই জায়গায় স্থিতিশীল থেকে আস্তে আস্তে কমে এসেছে। এখন ২০ এর নিচে নেমে এসেছে। শনাক্তের হারও কমে এসেছে।

সেটার একটি ভালো দিক আছে, আবার খারাপ দিকও আছে। এর ভালো দিকটা হলো মানুষ সাহসী হয়ে কাজে ফিরেছে এবং অর্থনীতির চাকা সচল হওয়া শুরু করে। খারাপ দিকটি হলো আবারও আক্রান্তের সম্ভাবনা থেকে যায়। এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এর মধ্যে সরকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য লকডাউন ক্রমান্বয়ে তুলে নেওয়ার ফলে আক্রান্তের হার কমিয়ে এনেছে। আর তার সঙ্গে প্রণোদনা প্যাকেজগুলো অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকা-গুলোকে জোরদার করা হয়েছে।

এদিক থেকে যদি আমরা দেখি তাহলে সেটা আমাদের সৌভাগ্য। প্রথমত যেখানে আমাদের রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে রেমিট্যান্স বেড়েছে। রপ্তানি যতটা কমে যাওয়ার কথা ছিল ততটা কমেনি। বরং আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। এ কারণে, আজ যে আলোচনা হচ্ছে বাংলাদেশ ভারতকেও ছাড়িয়ে যাবে- এর পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলো কাজ করেছে। ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখবেন তাদের আমাদের চেয়ে অনেক বড় দেশ।

অন্য সময় দেখেছি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কাজ করতে পারেনি। কিন্তু করোনাকালে-
রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ইতিবাচক পরিবর্তন আগে থেকেই শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অদক্ষ, অনিয়ম ও দুর্নীতি- এ ধরনের অপবাদ রাষ্ট্র মালিকানা ব্যাংকের বিরুদ্ধেই আছে। তা কিন্তু নয়, বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধেও ছিল। ফারমার্স ব্যাংক, পিপলস লিজিং নিয়ে যা দেখলাম তাতে মানুষের আস্থার বিষয়টি উল্টোটা হলো। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পেল। এ সময় রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে নতুন ধরনের নেতৃত্ব এসেছে, তারা ডায়নামিক। ফলে রাষ্ট্র মালিকানা ব্যাংকগুলোর কর্মকা-ে গতির সঞ্চার হয়েছে, সেবার মান বেড়েছে ও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে।

আজকে যেমন রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংক বিশেষ করে অগ্রণী ব্যাংকের সবগুলো শাখা অনলাইন কর্মসূচিতে আছে। অ্যাকাউন্ট আপনার যেখানেই থাক দেশের যেকোনো জায়গা থেকে টাকা তুলতে পারবেন, টাকা পাঠাতে পারবেন। এই যে প্রযুক্তিগত সেবার মান বাড়ানো হলো এ ধরনের উদ্যোগের ফলে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে সাধারণ মানুষের আস্থা বেড়েছে।

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোই প্রথম দিন থেকে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার কার্যকর করতে পেরেছে। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলো সরকারের কাছে থেকে সুবিধা নিয়েও কথা রাখেনি।

কোভিডের সময় প্রণোদনা বিতরণ করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও একই কথা। আমরা যত তাড়াতাড়ি বিতরণ করেছি, বেসরকারি ব্যাংকগুলো তা করেনি। তারা চিন্তা করেছে তাদের টাকা ফেরত আসবে কি-না, এ রকম তারা দশটা চিন্তা করেছে। এছাড়া তারা ঋণও কমিয়ে দিয়েছে। এক সময় তারা ঋণ কমাতে বাধ্য ছিল। কারণ তাদের তারল্য কম ছিল। তাদের তারল্য সংকট ছিল, তাদের কাছে মানুষ টাকা রাখত না, আমাদের কাছে রাখত। আমাদের তারল্য উদ্বৃত্ত তাদের তারল্য কম। এখন আমাদের প্রতি বোর্ড মিটিংয়ে ১০টি পর্যন্ত এজেন্ডা থাকে অন্য ব্যাংক থেকে আমাদের চলে আসা বিষয়ক।

আগে এমন একটি কথা ছিল রাষ্ট্র মালিকানা ব্যাংক মানে অদক্ষ, নির্ভর করা যায় না, ভালো সেবা দিতে পারে না, আস্থার অভাব ছিল। এ জন্য তারা রাষ্ট্র মালিকানা ব্যাংক থেকে বেসরকারি ব্যাংকে চলে যেত। এখন উল্টোটা হচ্ছে।

প্রযুক্তির কথা বলছেন, প্রযুক্তির কারণে ব্যাংকগুলো করোনাকালে ভালো করেছে। আবার এরই মধ্যে প্রযুক্তিতে ঘাটতি ছিল- সেটাও বের হয়ে এসেছে।
এটা ঠিকই বলেছেন। করোনার আগে আমরা চিন্তা করেছি ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে যাব কি যাব না। আমরা ততটা উৎসাহিত ছিলাম না। আমরা ভয় পেয়েছি সাইবার ক্রাইমের মাধ্যমে কে কার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে টাকা নিয়ে যায়। এ জন্য ধীরে-সুস্থে যাব। কিন্তু এখন দেখছি বিষয়টি অনেক বেশি জরুরি। মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না, ঘরে বসে ইন্টারনেটে ব্যাংকিং করতে চাচ্ছে। আমরা তাদের সে সুযোগটা দিতে পারছি না। এ জন্য কোভিড-১৯ শুধু ব্যাংকিং নয়, পুরো অর্থনীতিতে পরিবর্তন এসেছে।

করোনাকালে মানবিক পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেকের মাঝে এমন ধারণা ছিল যে ব্যাংকের টাকা নিয়ে আর ফেরত দেওয়া লাগে না। করোনা পরবর্তী কি সেই প্রবণতা কমবে বলে মনে করছেন?
এখন তারা সাপোর্ট চাচ্ছে, আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি। পরবর্তীতে তারা কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, কতটা ঋণ পরিশোধ করে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির কতটা পরিবর্তন হয়- সেটা দেখা যাবে। যেটা দেখা গেছে সেটা হলোÑ সরকার সাপোর্ট দিচ্ছে, ব্যাংকগুলো সাপোর্ট দিচ্ছে, এমন হয়নি যে তারা ঋণ চেয়ে পায়নি।

করোনার মধ্যেই দেশের প্রধান শিল্প গার্মেন্ট কারখানাগুলো খুলে দেওয়া, বিভিন্ন এলাকাগুলো লকডাউন পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়া এবং মানুষকে কাজে নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল। বিশেষ করে সরকার প্রধান শেখ হাসিনার একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল-
সিওর হয়ে কেউ সিদ্ধান্ত নেয় না। কিন্তু উপায় ছিল না। ঝুঁকি নিয়েই করতে হয়েছে। এটা দুইদিকেই যেতে পারত। আপনি দেখুন আমেরিকার কী অবস্থা। ওখানে ট্রাম্প বলল- কিছু হবে না। সমস্যা চলে যাবে। তারপর দেখা গেল সেখানে কত লোক মারা গেল। নিউইয়র্ক সিটির কী অবস্থা হলো। আমাদের তো দেয়ালে পিঠ ঠ্যাকা। আমাদের তো পেছনে যাওয়ার জায়গা নেই। এটা আমরা বুঝতে পেরেছি এটা সহসায় চলে যাচ্ছে না। সুতরাং মানুষ যতটা এটাতে অভ্যস্ত হয়, তত ভালো। তাহলে সংকটের একটি প্র্যাকটিকেল সমাধান বের হয়ে আসতে পারে। প্রধানমন্ত্রী সেটাই করেছেন। আর এতে ফলও দিচ্ছে।

মহামারীকালে সম্মিলিত উদ্যোগ থাকে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কথা যদি চিন্তা করি তাহলে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকা- না থাকলেও রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব আছে। এই মহামারী মোকাবেলায় আমরা সম্মিলিত প্রয়াস কতটা দেখাতে পেরেছি?
রাজনীতিতে সে ধরনের সহনশীলতা দেখাতে আমরা পিছিয়ে আছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থগুলো আমরা বড় করে দেখি। এগুলোর বাইরে আমরা বের হতে পারি না। তবে অভার-অল আমাদের জনগণ, সাধারণ জনগণ সহানুভূতিশীল। একে অপরকে সহযোগিতা করেছে। বিভিন্ন ধরনের সংগঠন বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করছে। এগুলো আমাদের জাতীয় চরিত্রের ভেতরে আছে। রাজনীতিতে গেলে এটা টোটালি উল্টো ঘটনা। সর্বশেষ আমি বলব সামাজিকভাবে আমরা এই মহামারীকে যে ভাবে হ্যান্ডেল করেছি সে ক্ষেত্রে আমরা খারাপ করিনি।

আইএমএফ বা বাইরের পত্র-পত্রিকা বলছে করোনার মধ্যেই আমরা ভালো করছি। সে ক্ষেত্রে আমাদের অর্থনীতির ভিত্তিগুলোর কথা যদি বিবেচনা করি সেক্ষত্রে আমরা কেমন করছি?
আমাদের অর্থনীতির দুর্বল দিক আছে। আবার কিছু আমাদের স্ট্রেইন্থ আছে। আমরা উন্নয়নশীল বলি, তৃতীয় বিশে^র দেশ বলি বা স্বল্পোন্নত দেশের কথাই বলি সে দিক থেকে কয়েকটি খাত আমরা ভালো ছিলাম। কিছু বিষয় আছে আমাদের হাইলি রিকগনাইজড করছে, সামাজিক ইমিনাইজেশন বলেন, শিশু মৃত্যু হার বলেন, সেগুলো তো সারপ্রাইজিংলি একটি রক্ষনশীল ও ধর্মভিরু মানুষের সমাজে কমিয়ে এনেছি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আমরা কমিয়ে আনতে পেরেছি। এসব দিক থেকে আমরা বেশ ভালো করেছি। সামাজিক সূচকে আমরা ভালো করেছি।

আর অর্থনীতিতে যেগুলো আমরা স্বভাবগতভাবে করে গেছি। সামাজিক ব্যবস্থাপনা আমাদের সবসময় স্থিতিশীল ছিল। দেখুন আমাদের ১২ শতাংশ, ১৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কোনো দিন হয়নি। খুব বেশি হলে আট বা নয় শতাংশ হলে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। তারপর আবার সেটা কমে এসেছে। সরকার প্রতি বছর বাজেট বাড়িয়েছে। কিন্তু বাজেট ঘাটতি কখনো ৫ শতাংশের ওপরে উঠেনি। কখনো কখনো ৫ শতাংশ লক্ষ্য স্থির করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘাটতি হয়েছে ৩ শতাংশ।

সবসময় ৫ শতাংশের বেশি হয়নি। প্রবৃদ্ধি প্রথমে ৫ শতাংশ হলো, ৬ শতাংশ হলো, ৭ শতাংশ হলো। তারপর ৮ শতাংশ হলো। এভাবে আমরা আস্তে আস্তে এগিয়ে গেছি। আট শতাংশ হলো তারপর ধপাস করে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়নি। আমরা বড় ধরনের কোনো এক্সপেরিমেন্টে যাইনি। যেমন ভাতে অর্থনীতিতে মনিটাইজেশনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছিল। সেদিক থেকে আমরা ক্রমো-ঊর্ধ্ব গতিতে গেছি।

এভাবে আমরা স্ট্যাবল গতিতে সরকারি বিনিয়োগ, বেসরকারি বিনিযোগ-প্রত্যেকটা জিনিস আমরা ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছি। জনসংখ্যা কমিয়ে এনেছি। প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়েছি। এর ফলে মাথাপিছু আয়টা বেড়েছে। তার সঙ্গে আমাদের বৈদেশিক নীতি ব্যবস্থাপনা খুব সতর্কতার সঙ্গে করেছি। আমাদের এক্সপোর্টকে আমরা সঠিকভাবে সাপোর্ট দিয়েছি, প্রবাসী আয়কে সাপোর্ট দিয়েছি। তার ফলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার। আর আমরা ৪০ বিলিয়ন অতিক্রম করে গেছি। আমাদের মতো ছোট্ট দেশের জন্য এগুলো কম কথা না। আমাদের এক্সপোর্ট বেইজ যেখানে ছোট্ট, অনেক দুর্বলতা আছে, যেখানে আমাদের ট্যাক্স-জিডিপির অনুপাত মাত্র ১০ শতাংশ, এক্সপোর্ট যেখানে একটি মাত্র রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ ভাগ। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমরা বেশি ভালো করেছি।

আমাদের অনেক সামর্থ্যরে গল্প আছে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ আমাদের সব অর্জন আটকে দেয়, সব অর্জন ম্লান করে দেয়। খেলাপি ঋণ কমাতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এই ধারাবাহিকতা কতদিন অব্যাহত থাকবে?
খেলাপি হয় ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে। যে কোনো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের দুর্বলতা থাকে। ঋণ ব্যবস্থা দক্ষতার সঙ্গে করা হয় না। কাকে দিচ্ছে, কোন খাতে দিচ্ছে- এটা যতটা বিচার বিবেচনা করার কথা ততটা সঠিকভাবে করা হয় না। এগুলো কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে হয় এবং কমবেশি সব দেশেই এগুলোতে অ্যাফেকটেড হয়। এবং যেহেতু এখানে আর্থিক লেনদেন হয় সেহেতু দুর্নীতি অনিয়মের সম্ভাবনা থেকে যায়। জাপানের মতো দেশে আমরা ব্যাংক স্ক্যান্ডাল দেখি।

খেলাপি ঋণ ভারতেও প্রকট হয়ে গেছে। এটা আমি খুব সিম্পলভাবে দেখি। খেলাপি ঋণের প্রবণতা থাকবে। খেলাপি কমানোর প্রিভেন্টিভ ব্যবস্থা যেগুলো আছে সেগুলো নিতে হবে। নতুন করে যাতে খেলাপি না হয় সে জন্য ব্যবস্থাপনার যে উন্নয়ন বিশেষ করে সুশাসনের যে বিষয়গুলো আছে সেগুলো জোরদার করতে হবে। যেগুলো খেলাপি হয়ে গেছে- এর থেকে কীভাবে বের হয়ে আসা যায় সে জন্য স্টেইট ফরোয়ার্ড- এক হাতে থাকবে ক্যারোট আরেক হাতে থাকবে স্ট্রিক। ক্যারোট দেখাবেন যাতে সে টাকা ফেরত দেয়, না দিলে হাতে লাঠি আছে। এই নীতি যদি আপনি অনুসরণ না করেন তাহলে আপনি টাকা আদায় করতে পারবেন না।

শুধু শুধু লোকজনকে জেলে ঢুকিয়ে টাকা পাওয়া যাবে না। হলমার্কের সবাইকে জেলে ঢোকানো হয়েছে একটি টাকাও পাওয়া যায়নি। আর তার পিঠে হাত বুলিয়ে টাকা নিয়ে আসবেন, তাও পাবেন না। পিকে রায় চলে গেছে তাকে ধরা যাচ্ছে না। সে জন্য দুটিই দরকার।

এখানে দুদিকেই দুর্বলতা আছে। এক হচ্ছে- আমাদের আইনি ব্যবস্থায় হাজারো ফাঁক-ফোকর। আপনি লাঠি দিয়ে ভয় দেখাবেন সেটা ইফেক্টিভ হবে না। সাতটা আটটা রিট করে ঝুলিয়ে দেবে। অন্যদিকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা আছে। যখন বলা হয় খেলাপি ঋণের একটু ছাড় দেওয়া হচ্ছে সবাই হৈ চৈ করে উঠবে। না, না, না, ছাড় দেওয়া যাবে না, দেওয়া যাবে না, দেশের ক্ষতি হয়ে যাবে।

এখন একটি ব্যাপার হলো- সব লোক যে টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য টাকা নেয়, তা নয়। একটি ছোট্ট মেরে দেয়। বাকিরা বিভিন্ন কারণে নিজের ভুলে, অনেক সময় অভার-অ্যাম্বিসাস হওয়ার কারণে বা নিজেকে বেশি এক্সপার্ট ভাবার কারণে পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। সেখান থেকে তাকে বের আসতে হবে। কানের ভেতরে পানি ঢুকলে আরেকটু পানি দিয়ে সেটা বের করে আনতে হবে।

অর্থমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেখানে কি ‘এক হাতে ক্যারোট আরেক হাতে স্ট্রিক’ ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে?
হ্যাঁ। আমাদের অর্থমন্ত্রী দুই পার্সেন্টের আওতায় ১০ বছরের ও জন্য পুনঃতফসিলি করার জন্য বিশেষ সুবিধা দিয়েছেন এবং তার সঙ্গে স্ট্রিক হিসেবে ওই যে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের কথা বলেছেন- এটা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তোমাদের এই সুযোগ দেওয়া হলো, সুযোগ নাও। যদি সুযোগ না নাও তাহলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি তোমাদের যে জায়গার যে সম্পত্তি আছে তা নিয়ে নিতে কাজে লেগে যাবে।

এটা ব্যাংকগুলো করতে পারে না?
না, ব্যাংকের জন্য এত কিছু করা সম্ভব হয় না। একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাজই হয় তার এগুলো আদায় করা। তাই তারা সেভাবে লেগে যাবে। এটা যদি কার্যকরভাবে করা যায় তাহলে খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব।

এই যে ২ পার্সেন্টের যে সিস্টেম করা হলো। যেটাকে আমরা অনার্পিত সুদ বলি। এটা আমরা একশ পার্সেন্ট মাপ করে দেব। তবে আজকে মাফ করে দেব না। এটা আলাদা করে ব্লক অ্যাকাউন্টে রেখে দেব। আপনি যেদিন সব টাকা পরিশোধ করবেন সেদিন পুরো টাকা বিরাট একটি অ্যামাউন্ট মাপ করে দেব। ওটাই হলো মুলা ঝুলা ঝোলানো। এটা যদি দাও তাহলে ওটা মাপ পাবে। যদি দুইটা তিনটা কিস্তি দিয়ে তারপর টাকা না দাও তাহলে স্ট্রিক। এটা একটি দিক, আরেকটা দিক হলো আগে কোনো টাকাই পাচ্ছিলাম না। এখন তো কিছু পেলাম।

কৃষির কথায় আসি। কোভিড-১৯-এর শুরুর দিকে খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টিতে সরকারপ্রধান থেকে কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কৃষিতে ইনপুট দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাত কতুটুকু দায়িত্ব পালন করেছে?
কৃষির যে বিষয় সেটা হলো জাতির পিতার দেখানো পথেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাঁটছেন। কৃষির বেসিক বিষয়টি হলো খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি। খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত না করা গেলে যতই উন্নয়ন করেন না কেন কোনো সমস্যা হলে আপনার খাওয়ার থাকবে না। বিদেশ থেকে খাদ্য আনতে হবে এবং সময়মতো পাবেন কি-না, পেলেও তা আনার অর্থ থাকবে কি-না, এসব কারণে এবং অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খাদ্যে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

কৃষির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কৃষিতে অর্থায়ন করার কথা বলেছেন।

স্বাধীনতার সময় দেশে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ছিল। এখন ষোল কোটির বেশি। এখন জমির পরিমাণ বাড়েনি বরং প্রতি বছর আবাদী জমি কমছে। এক সময় আমরা খাদ্য ঘাটতির দেশ ছিলাম। এখন আমরা খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ। কী পরিমাণ খাদ্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছি!

করোনাকালে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখনো আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। খাদ্যে স্ট্রেইন্থ আছে। সে কারণে কোভিডের আক্রমণে খাদ্যে ততটা ক্ষতি করতে পারেনি। সামুদ্রিক ঝড় আম্মান বলেন, বন্যা বলেন- কৃষিকে বড় ধরনের বিঘ্নিত করতে পারেনি। আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়নি। এখন স্টক কিছুটা কমে যাচ্ছে। আগামীতে আবার সেটা সমান করতে হবে।

কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল সেগুলো শতভাগ অর্জন করেছি। এ জন্য অর্থমন্ত্রণালয় থেকে আমরা ধন্যবাদ পেয়েছি। এ ব্যাপারে সরকার সচেতন। বাংলাদেশ ব্যাংক সচেতন। আমার মনে হয় কোভিডকালে কৃষিতে সঠিক অর্থনৈতিক নির্দেশনা ছিল।

শেষে কী পরামর্শ দেবেন?
এখনো ভয় থেকে যায়। ইউরোপে দ্বিতীয় ওয়েব শুরু হয়েছে। সেটার একটা ইম্প্যাক্ট আমাদের ওপর আসবে। রপ্তানির দিক থেকে। ইউরোপের দোকানগুলো খুলে যাওয়ার কারণে ক্রেতারা তাড়াহুড়ো করে কার্যাদেশ দিয়ে শুরু করেছে। এ কারণে রপ্তানিকারকদের ওপর একটি চাপ তৈরি হয়েছে।

এখন সেকেন্ড ওয়েবের কারণে যদি সেখানকার দোকান-পাঠ বন্ধ হয়ে যায়, আমাদের পণ্য নিয়ে গিয়ে দোকান বিক্রি করতে পারবে না। এর একটা ব্যাকলেশন আসবে। এটা হচ্ছে রপ্তানির দিক থেকে।

আর একটি হচ্ছে আমাদের দেশে যদি সংক্রমণের হার বেড়ে যায়, মৃত্যুর হার বেড়ে যায়, তখন লকডাউন দেব কি দেব না- এমন একটি সমস্যা এসে যাবে। অনেক দেশে দেখছি লকডাউনের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় বের হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশে সেটা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য আল্লাহর মেহেরবানির ওপর নির্ভর করবে। সেকেন্ড ওয়েবটা যদি কাটিয়ে উঠতে পারি আমাদের রিকভারি খুব দ্রুত হবে। সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে আমরা যেন সতকর্তার সঙ্গে কাজ করতে পারি এবং প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে যেতে পারি।