প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার জরুরি

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার জরুরি

জাফর আহমদ ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২০

print
প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার জরুরি

ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ। তিনি সাবেক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সিভিল সার্ভিস, জাতিসংঘ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি ও অর্থনীতির জটিল বিষয়ে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তিনি কথা বলেছেন দৈনিক খোলা কাগজের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ

করোনা ক্ষত এখনো বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক মানিটারি ফান্ড তহবিল (আইএমএফ) সহ বিভিন্ন বিশ্ব গণমাধ্যম বাংলাদেশের অর্থনীতির আশার কথা শোনাচ্ছে। আপনি বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
আশার কথা হলো এই যে, অন্যান্য দেশে করোনা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে ক্ষতি কম, বাংলাদেশ এখনো ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় আছে। ভারতে যেখানে মাইনাস ১০ শতাংশে চলে যাবে। আশেপাশের অনেক দেশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় চলে যাবে। সেখানে বাংলাদেশ ইতিবাচক ধারা ধরে রাখার বিষয় আশার আলো দেখিয়েছে। তবে ভয়ের কারণও আছে। করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ আসে কিনা, পশ্চিমা বিশ্বে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ লেগেছে। এতে অনেক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব দেশ প্রথম থাক্কা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টার মধ্যেই দ্বিতীয়বার আক্রান্ত শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে এমন হলে যে আশার আলো দেখা দিয়েছে তা ম্লান হয়ে যাবে।

করোনায় আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
করোনার কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। কর্মসংস্থান কমে গেছে। স্বকর্মসংস্থান কমেছে। দারিদ্র সীমার নিচে অনেক মানুষ চলে গেছে। যারা দারিদ্র সীমার ওপরে ছিল তাদের বড় একটি অংশ দারিদ্র সীমার নিচে চলে গেছে। এসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে মানুষের জীবনে প্রভাব পড়েছে। জীবনযাপন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তন হলো কোভিড-১৯-এর মতো বৈশ্বিক মহামারী থেকে বাঁচতে অত্যাবশকীয় পথগুলো অনুসরণ।

করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রণোদনা স্কিম ঘোষণা করা হয়েছে, করোনা থেকে উত্তরণে তা কতটা ভূমিকা রেখেছে?
টাকা দিয়ে করোনার উত্তরণ হয় না। উত্তরণে অন্য ব্যবস্থা আছে। করোনার প্রভাবে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, গ্রুপ অব পিপল, প্রণোদনা দিয়ে তাদের সাপোর্ট দেওয়া আর কি।

সেখানে কিছুটা উপকারে এসেছে। কিন্তু এখানেও আবার বিতরণে সমস্যা আছে। কারা বেনিফিসারি হবে সেটা আইডেন্টিফিকেশনে সমস্যা। ফলে পাওয়ার কথা না, তারা পাচ্ছে। আবার যাদের পাওয়ার কথা তারা পাচ্ছে না।

আবার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের জন্য যে প্রণোদনা বরাদ্দ করা হয়েছিল তাদের ক্ষেত্রে বিতরণ ২০ শতাংশের নিচে। যে সব প্রতিষ্ঠান বড় তারা প্রণোদনার প্রায় ৮০ ভাগ নিয়ে গেছে। ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পর্যন্ত বরাদ্দ পাচ্ছে না। অথচ তারাই করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষিতে করোনা অভিঘাত মোকাবিলা করতে প্রণোদনারও ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী কৃষিতে প্রণোদনা বিতরণের হার ১০ ভাগের নিচে। এ অবস্থায় কৃষি কী আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে?
প্রণোদনার বিতরণের এ ধীর গতি ভালো খবর নয়। শুরুতে কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত লাগে। পণ্য উৎপাদন করেও বাজার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে কৃষক তার পণ্যের দাম পাননি। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এরপর আস্তে আস্তে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া শুরু হলে বাজারব্যবস্থার উন্নতি হয়। কিন্তু কৃষি পুরোপুরি দুর্যোগ থেকে বের হতে পারেনি। করোনার মহামারীর মধ্যেই আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব পড়ে।

কৃষিতে মূল বিষয় হচ্ছে আবহাওয়া। আবহাওয়াজনিত কারণে আমন ধানের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বন্যা, অতিবৃষ্টি, সামুদ্রিক ঝড় আম্পান কৃষির জন্য অনেক ক্ষতি করেছে। অনান্য অর্থকরী ফসলের ক্ষতি হয়েছে। গ্রামের ওই সব কৃষকের জন্য প্রণোদনা দরকার ছিল। তারা প্রণোদনা পেলে ভালো হয়, প্রণোদনা না পেলেও তারা জমি ফেলে রাখবে না, তারা বসে থাকবে না। তারা চাষ করবেই। যেভাবেই হোক তারা চাষাবাদ চালিয়ে যাবেন। এক্ষেত্রে সহায়তা পেলে কৃষকের স্বস্তি আসবে। তাদের স্বস্তি দেওয়া দরকার। কারণ তারাই খাদ্যের জোগান দিয়ে থাকে।

কৃষকের এসব ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কি কি উদ্যোগ নেওয়া দরকার?
কৃষককে সহায়তার জন্য সরকারের উদ্যোগ সঠিক পথে আছে। তবে এই উদ্যোগ কৃষককে কতটা স্পর্শ করতে পারছে সেটা দেখার বিষয় আছে। কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে কতটা পাশে দাঁড়াতে পেরেছে সেটা দেখার বিষয় আছে। যেখানেই যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে প্রকৃত যারা সুবিধা পাওয়ার কথা তারা যেন পায় তা নিশ্চিত করা। যারা প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য তারা যেন প্রণোদনা পায় তা নিশ্চিত করা দরকার। এমন যেন না হয় যাদের পাওয়ার দরকার তারা পাচ্ছে না। আর যাদের পাওয়ার দরকার নেই তারা পাচ্ছে।

কৃষি আধুনিকায়নে প্রণোদনা আছে, বীজ-সারে প্রণোদনা আছে। এসব ভর্তুকি যাতে সঠিকভাবে বিতরণ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

যেমনটা বলছিলেন বাইরের দেশের চেয়ে আমরা কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমরা পণ্য রপ্তানি করি তা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে। করোনার শুরুর দিকের অবস্থার চেয়ে আমাদের রপ্তানির উন্নতি হয়েছে। এই রপ্তানি নিয়ে আমরা কতটা আশা করতে পারি?
রপ্তানি খাতে আমরা খুব আশার আলো দেখছি না। রপ্তানিতে সম্প্রতি যে অগ্রগতি দেখছি তা নেতিবাচক থেকে ইতিবাচক দিকে গেছে মাত্র। ফার্স্ট কোয়ার্টারে প্রথমবারের মত ৩ শতাংশের মত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এটা বড় কিছু না। এছাড়া নন ট্রাডিশনাল মার্কেটগুলো আছে সেগুলোতে পতন হয়েছে।

আবার ইউরোপের দেশগুলোতে সেকেন্ড ওয়েব আসছে। আমেরিকার উন্নতি নেই। এসব দেশে করোনা পরিস্থিতির যদি অবনতি হয় তাহলে সেখানকার মানুষের ক্রয় ক্ষমতায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে। এজন্য অদূর ভবিষ্যতে রপ্তানিতে বড় কোনো খবর আসবে বলে আমার মনে হয় না।

পুরো অর্থনীতি যেভাবে যে ধারায় পুনরুদ্ধার হচ্ছে বিনিয়োগ সেভাবে হচ্ছে না-
করোনার মধ্যে জীবন বাঁচানোই যেখানেই প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে বিনিয়োগ আশা করা যায় না। হচ্ছে না। পুরাতন উদ্যোগগুলোই এখন সচল রাখা প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হচ্ছেও তাই। স্বাস্থ্য ছাড়া অন্য কোথাও নতুন কিছু করা হচ্ছে না। আগের ব্যবসা-বাণিজ্য ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেখো, আমদানিতে ধস। কাঁচামাল আমদানি কমেছে, মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কমেছে এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতেও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে, নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশে নেমেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে সাড়ে ১৪ শতাংশ। তার মানে বেসরকারি বিনিয়োগে ভালো খবর নেই। সরকারি বিনিয়োগে এডিপি বাস্তবায়নের যে তথ্য তা সন্তোষজনক নয়। কোভিড-১৯ বিনিয়োগকেও বাধাগ্রস্ত করেছে এ তথ্য তাই বলেন।

সবশেষ কি পরামর্শ দেবেন?
‘অর্থনৈতিক কর্মকা- স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে আরও কার্যকরভাবে করোনা মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা যাদের পাওয়ার কথা তারা যাতে পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্পগুলোকে আরও জোরদার করতে হবে এবং বণ্টনের ক্ষেত্রে যাতে দুর্নীতি না হয় সেটি দেখতে হবে। এছাড়া আস্তে আস্তে উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাহিদা বাড়াতে হবে।