বদলে দিয়েছে করোনা

ঢাকা, বুধবার, ২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বদলে দিয়েছে করোনা

টাকার বাজার ডেস্ক ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০২০

print
বদলে দিয়েছে করোনা

মো. সবুর খান সফল উদ্যোক্তা। তিনি বেসরকারি ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। সফল উদ্যোক্তার পাশাপাশি তিনি ট্রেড সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। চলমান করোনা মহামারী মোকাবিলা করে কীভাবে নব উদ্যমে কর্মকা- অব্যাহত রেখেছেন সে সম্পর্কে খোলা কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ

বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী চলছে। এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশও বাদ যায়নি। এই মহামারী কীভাবে মোকাবেলা করছেন?
করোনা প্রথম যে জিনিসটি করেছে আমাদের লাইফস্টাইলটা বদলে দিয়ে গেছে। আমরা যারা ব্যবসা করি, সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও যদি লক্ষ করি দেখব, কোনোদিন কল্পনা করতে পারিনি বাংলাদেশে ভার্চুয়াল কোর্ট বসবে। সেখানে সরকার অধ্যাদেশ জারি করে ভার্চুয়াল কোর্ট বসাতে বাধ্য হয়েছে। এ মাধ্যমে ইন্ডিকেশন সর্বত্র বড় ধরনের পরিবর্তন হয়ে গেছে।

একইভাবে যদি ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলি, আমি ৩১ বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম ব্যবসা কত বেশি অটোমেশন করা যায়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে, ল্যাক অব প্রফেশনের কথা বলি, ল্যাক অব কমিটমেন্টের কথা বলি বা আমাদের সংস্কৃতির কারণে বলি আমি তা করতে পারছিলাম না। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইমপ্লিমেন্ট করতে পারিনি। এখন আমি সেটা সাকসেসফুলি করতে পেরেছি। এই যে একটি সল্যুশন হয়ে গেল। আগে আমাদের ব্যবসায়ীদের একটি মানসিকতা ছিল কত সুন্দর হবে, কত বড় হবে। একটি ওয়েটিং লাউঞ্জ থাকবে। একটি কনফারেন্স রুম থাকবে। যাতে আমরা অফিসে এসে সবাই প্লিজড হয়ে যাই, কত সুন্দর অফিস।

করোনাকালে এটা কিন্তু পরিবর্তন হয়ে গেল। ১৯ মার্চ থেকে শুরু করে আজকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে মাত্র দুইদিন অফিসে গেছি। কিন্তু আমাদের অফিস ঠিকই চলেছে।

এ সময়ে যদি বলে আমার পরিবার, কলিগ সবার মধ্যে একটি পরিবর্তন এসেছে। কলিগরা বলেছেন, স্যার আপনি অফিসে না এসে কাজ করতে পারেন। যখন লিফটে উঠতে যাচ্ছি লিফটম্যান বলছে স্যার আপনি অফিসে না এলেই পারেন; গাড়িতে উঠে গেলে ড্রাইভার বলছে, স্যার অফিসে না গেলেই হয়। তার মানে সবার মধ্যে ওই চিন্তা শুরু হয়ে গেছে অফিসে না এসেই অফিসের কাজ করা যায়।

একেবারে যে ক্ষতি হয়নি তা কিন্তু নয়। এখন তা কাটিয়ে উঠেছি। এই কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি কিছু ব্যবসা উল্টো সফল হয়েছে। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অবিশ্বাস্যভাবে উপকৃত হয়েছে। যদিও এর পার্সেটেন্স খুবই কম। এ সব ব্যবসা কিন্তু উপকৃত হয়েছে। আবার নতুন কিছু ব্যবসা সুযোগ তৈরি করেছে।

আমরা কি কখনো কল্পনা করেছিলাম চাল, ডাল, সবজি অনলাইনে বিক্রি করা হবে। যদি করোনার পাঁচ বছর আগের কথা বলি, এমনটা কল্পনাও করতে পারিনি। কিন্তু এখন তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আমি আমার বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি তরিতরকারি, পানি পৌঁছে দিচ্ছে। যারা মাস্ক বা স্বাস্থ্য সামগ্রী ব্যবহার করছে তাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

সব ধরনের ব্যবসায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ব্যবসায়ী হিসেবে এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমি প্রথম এক মাস খুব বিব্রত হয়েছি। তিলে তিলে গড়া ওঠা প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়বে? আমার একটি প্রতিষ্ঠানের বেতন সাত কোটি টাকা। আমার ৪০টি প্রতিষ্ঠান, তাহলে এক মাসের মধ্যে ব্যাংক-ক্রাফট হয়ে যাব। কিন্তু যেখানে টেকনোলজি জানি, টেকনোলজির সুযোগ জানি। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলাম প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করে ব্যবসা চালু করা যায়, প্রতিস্থাপন করা যায়। তারপর প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলো চালু করলাম।

কেউ অন্যভাবে নিতে পারেন এরপরও বলি পেন্ডামিক এক অর্থে আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটা পরিষ্কার, তুমি সতর্ক হও, তুমি পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হও, মোকাবেলা কর, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করো। কারণ আল্লাহ প্রযুক্তি দিয়েছে ব্যবহারের জন্য। পেন্ডামিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

তাহলে বিনিয়োগেও পরিবর্তন দেখছেন?
হ্যাঁ, এখন বিনিয়োগের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এখনকার বিনিয়োগ পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিজনিত বিনিয়োগের সুযোগ। এখনকার বিনিয়োগ বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। বিনিয়োগে ডাইভার্সিটি এসেছে। এখানে কিন্তু প্রযুক্তিতে, স্বাস্থ্য খাতে অনেক কোম্পানি বিনিয়োগ করছে। বাইরে থেকেও বিনিয়োগ আসছে। আমি নিজেও প্রস্তাব পাচ্ছি। এটা কেন হচ্ছে, পরিবর্তিত চাহিদানির্ভর সেবা দিতে তারা নিজেদের প্রস্তুত করছে।

করোনাকালে যে সব খাতে সমস্যা হচ্ছে তা হলো- অবকাঠামো খাত। যে সব বিনিয়োগ ফিজিক্যাল ইনভলব লাগে। অর্থাৎ শারীরিকভাবে সংশ্লেষ লাগে এমন বিনিয়োগ আসতে আরও একটু সময় লাগবে।

করোনাকালে ব্যাংক খাতের কোনো সমস্যা হয়নি। তারা অনায়াসে লেনদেন করেছেন। কোনোই সমস্যা হয়নি। কারণ তারা আগে থেকেই প্রযুক্তির ব্যবহার করছিল। মোবাইল ফাইন্যান্সিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আপনি লক্ষ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন দিতে নগদকে বেছে নিয়েছেন। এটা একটি গুড আইডিয়া। কারণ হলো ওই শিক্ষককে আর ব্যাংকে যেতে হবে না। বেতন আনার জন্য তাকে আর আগের দিন থেকে প্রস্তুতি নেওয়া লাগবে না। সকালে উঠে মোবাইলে একটি ম্যাসেজ আসবে- তিনি বেতন পেয়ে গেছেন। আমি বলব, করোনাকালে সরকারি সহায়তা দেওয়ার জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সফলতার জন্য আজ এই পথে আসতে হলো।

শুরু থেকে যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করেনি তারা একটু সমস্যায় পড়েছে।

ফিজিক্যাল আসা লাগবে সে ধরনের বিনিয়োগ আসছে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে সব বিনিয়োগ সম্ভব সে সব বিনিয়োগ আনছে। আগে ফিজিক্যাল যাওয়া লাগত, তখন সে ধরনের বিনিয়োগ হতো এখন আর সে ধরনের বিনিয়োগ হচ্ছে না। যেমন ধরেন ভারতে বিখ্যাত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬০০ একাডেমিয়ান অংশগ্রহণ করল। সেখানে মন্ত্রী এলেন, বিশেষজ্ঞরা এলেন। আমি মনে করি শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে এ ধরনের কনফারেন্স যে ইম্প্যাক্ট হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করেছে এই সম্মেলন। কারণ হলো, সম্মেলনের রেকর্ড থাকছে, বেশিসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি থাকছে প্রপার টাইমিং থাকছে, সবাই দেখতে পারছে। এই যে পরিবর্তনটা, প্রযুক্তির এই যে ব্যবহার এই সুযোগ যারা নিতে পেরেছেন তারা প্রকৃতপক্ষে সফল হয়েছেন। কিন্তু যেমন রাস্তা-ঘাট, ভবন-কনস্ট্রাকশন এই ধরনের বিষয় যেখানে আছে সেখানে কাজ করা যাচ্ছে না। আমরা এ ধরনের যে সব কাজ আছে সেগুলো করতে পারছি না। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ কম হচ্ছে। আমরা প্রাইভেট সেক্টর, আমরা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। সেখানে সরকারি বা আন্তর্জাতিক যে বিনিয়োগ সেখানে একটু সময় নেবে।

যেমনটা বলছিলেন স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অনেক কাজ করতে হয়েছে, কাজ করতে হচ্ছে। করোনাকালে শিক্ষা খাতেও কি পরিবর্তন এসেছে?
শিক্ষা খাতে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কাজ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সর্বশেষ মানুষের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য হয়নি। ছাত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আপনি লক্ষ করবেন অনেকে ট্রল করত, এখনো অনেকে ট্রল করছে, মনোপুত হয়নি। কিন্তু যারা শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক বিনিয়োগ করেছে, এখনো বিনিয়োগ করছে সার্ভার লোকেশন, ক্লাউডিং, নানা রকম অপরচুনিটি নিয়ে অনলাইনে যে সব ক্লাসের ব্যবস্থা করেছি, স্টুডেন্টদের মতামত হলো পিজিক্যাল ক্লাসের চেয়ে অনলাইন ক্লাসগুলোর মজাটা অনেক বেশি ছিল, ইন্ডারেকটিভ ছিল। কিন্তু ডেফিনেটলি ফিজিক্যাল তো ফিজিক্যাল- এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই জন্য বলছিলাম যে, ভিজিক্যাল অনেক রিস্ক ফ্যাক্টও ইনভলব থাকে। আমাকে ইউনিভার্সিটিতে আসতে হবে, ক্লাসে অ্যাটেন্ট করতে হবে, আমাকে রাস্তার ট্রাফিক ফেস করতে হবে। পয়সার ফ্যাক্টরগুলো আছে, এই জায়গাগুলো যদি আমরা বাদ দিই- তাহলে সেক্ষেত্রে অনলাইনে অনেকগুলো টুলস ব্যবহার করতে হচ্ছে।

যেমন একজন শিক্ষক সরাসরি ছাত্রের সঙ্গে সরাসরি ইন্টারেকটিভ কোশ্চেন অ্যান্ড আনসার করে রিয়েলি তার শিক্ষাটা হলো কি-না- তার পালস রিয়ালাইজ করতে পারে এবং তার প্রবলেমটা এড্রেস করতে পারে। আমাদের ক্লাসে লক্ষ্য করা গেছে- দেড় ঘণ্টার ক্লাসে ছাত্ররা এক সেকেন্ডের জন্য বের হয়ে যায়নি। কারণ সে মনে করেছে বের হয়ে গেলে বিভিন্ন রকম যেসব অ্যাসেসমেন্ট আছে সেগুলো পাস করতে পারব না। সুতরাং নিজের স্বার্থেই সে মনোযোগী ছিল। এই ফোকাস ছিল এ জন্য একটি সফটওয়্যার ডেভেলপ করতে হয়েছে। এটাকে আমরা বলি আর্টিফিসিয়ালি ইন্টেলিজেন্ট। যদি ক্লাস থেকে চলে যায় সফ্টওয়্যার বলে দেবে ও কিন্তু নেই। আমরা এমন সিস্টেমও ডেভেলপ করেছি। কোনো ছাত্র যদি ঘাড় ফেরায়ও সিস্টেম বলে দেবে সে আরেক দিকে তাকাচ্ছে বা সে কপি করছে। এগুলো কিন্তু আমরা আগে ডেভেলপ করতে পারিনি। এ জন্য আমরা বলছি শিক্ষা ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীকে ধন্যবাদ, আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি তারা অনুমতি দেবেন। শিক্ষা ব্যবস্থাতে এগুলোর একটা ডিমান্ড ছিল। এখন কোভিড-১৯-এর কারণে সরকারও কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলো অনুমোদন করছে। এটুআই, সরকারের তথ্য বাতায়ন- এ রকম অনেকগুলো অনলাইন কার্যক্রম সরকার হাতে নিয়েছে। এ ধরনের অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামীতে এ ধরনের সুযোগ আরও তৈরি হবে।

এখানে প্রশ্ন করতে পারেন, যেগুলো ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা আছে সেগুলোর কী হবে? এগুলো ফিজিক্যাল ছাড়া হবে না, এগুলোর জন্য বিভিন্ন রকম সফটওয়্যার চলে আসছে, স্ট্রিমুলেশন সফটওয়্যার চলে আসছে। একজন ছাত্র পরীক্ষায় যে কম্পোন্যান্টগুলো ব্যবহার করে এ ধরনের সফটওয়্যার চলে এসেছে সে অনলাইনের মাধ্যমে যেন সুযোগ পায়। সে ক্লাসে সরাসরি না গিয়েও অনলাইনে সে কাজগুলো করতে পারবে এবং সে রিয়েলাইজ করছে অনলাইনে ক্লোজ ইন্টারেকশন করে একটা গাড়ি অ্যাসেম্বলি করতে পারছে। ওই ফ্যাসিলিটিগুলো চলে আসছে এবং আরও আসবে। এই সফটওয়্যারে হিউজ বিনিয়োগ হচ্ছে।

একটি জুম সফটওয়্যার, মাকের্টে যার কোনো ভেলুই ছিল না। এখন সারা বিশ্বে আইটিকে নাম্বার ওয়ান জায়ান্ট কোম্পানি হয়ে গেছে। বিশে^র বড় বড় কোম্পানিকে বিট করছে। কেন এটা হলো, কারণ হলো তারা নিত্যনতুন ফিচার যোগ করছে, পরিবর্তিত সময়ের চাহিদা পূরণ করছে। বলা হচ্ছে, সারা বিশে^ সব এয়ারলাইন্স যে ব্যবসা করতে পারেনি এক জুম তার চেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে।

এই যে পরিবর্তন, ইতিবাচক পরিবর্তন- এই পরিবর্তনকে যদি আমরা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে আমরা কতটুকু পরিবর্তন হতে পেরেছি বলে মনে করেন?
আন্তর্জাতিকভাবে আমরা এখনো অত ভালো না। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে এখন আমাদের সময় আসছে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডে প্রমাণ করার। আগে আমরা এই প্রমাণের সুযোগ পাইনি। লক্ষ্য করবেন আন্তর্জাতিকভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের ছেলে-মেয়েরা যাচ্ছে। তাদের ভালো ভালো প্রডাক্ট, ভালো ভালো সলিউশন তারা করছে। এগুলো তারাও যেমন ব্যবহার করছে, বাইরেও ব্যবহার করছে। এই পেন্ডামিক, এটাও একটি সুযোগ করে দিল।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে এসে ব্যবসা শুরু করি, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ধারে কাছে ছিল না কিন্তু এখন আমি পৌঢ়ের পর্যায়ে চলে আসছি। এখন ইয়ং যারা তারা নতুন নতুন চিন্তা করছে। নতুন কিছু শিখছে। আমার মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করছে, আমার সন্তানরা বলছে বাবা, তুমি যেটা বলছ ওই ভাবে না এই ভাবে। ওদের সঙ্গে সঙ্গে সাইক্লোজিক্যাল বা লজিক্যাল বিষয়ে কম্পিটিশনে পারি না। তার মানে আজকের প্রজন্ম আমার চেয়ে অনেক ফার্স্ট।

এ কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হলো নতুন প্রজন্মের সামনে জানা এবং সৃষ্টির দ্বার অবারিত। আর আমরা হাজারো চিন্তা হাজারো কাজ নিয়ে দিন পার করতে হয়। আর তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তী দুনিয়াকে প্রতি মুহূর্তে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। নতুন প্রযুক্তিগত যেমন ডেভেলপড সেটা গ্রহণও করছে খুব সহজে। এ জন্য আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে সুযোগ গ্লোবালি নিজেদের তুলে ধরার। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা আমাদের পুরো রিসোর্স কাজে লাগাতে পারব ইনশাআল্লাহ।

সাম্প্রতিক সময়ে মূল ধারার ছাত্র রাজনীতি মার খাচ্ছে। এখন মূল ধারার বাইরে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আন্দোলন গড়ে উঠছে। এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আইনের সংশোধন হচ্ছে, নতুন নতুন আইন হচ্ছে। এটা তরুণদের মনোজাগতিক যে পরিবর্তন তারই ফসল, আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
আমি মনে করি, এটা টেকনোলজির আশীর্বাদ। যদি শাহবাগের কথা বলেন, অন্য কোনো আন্দোলনের যে মাত্রা তার বড় ইমপ্রেশন বা কন্টেইন বলি বা আবেদন বলি- এটা তৈরি হয়েছে কিন্তু প্রযুক্তির মাধ্যমে। লক্ষ করে থাকবেন, আজকে ধর্ষণ বা নারীদের ওপর যে নির্যাতনগুলো হচ্ছে এগুলোর মূল ইম্প্যাক্টগুলো সরকার বুঝতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বোঝা যায় মানুষ কী চায়। একটি সময় রাজনীতি ছিল পুরানা পল্টনকেন্দ্রিক বা মাঠে।

রাজনীতি এখন পুরানা পল্টন বা মাঠ থেকে চলে আসছে প্রযুক্তিতে। আমাদের রাজনীতিক নেতা নেত্রীরা মাঠের রাজনীতিতে আগের মতো ওইভাবে আর লোক পাবে না। তারা তাদের জনপ্রিয়তা এখন প্রুফ করতে পারবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এখন রাজনীতিকের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেন ফেসবুক পেজে তার ফলোয়ার কত, গুগলে তার ফলোয়ার কত, টুইটারে তার ফলোয়ার কত এর ভিত্তিতে।

তুরস্কের সামরিক অভ্যুত্থানের কথা চিন্তা করেন। এরদোয়ানের বিরুদ্ধে এত বড় ক্যু হয়ে গেল। সেখানকার আর্মিরা সবকিছু কলাপস করে ফেলছে। কিন্তু কোনোভাবে বেঁচে একটি হোটেলে থেকে একটি ফেসবুক লাইভে এসে পুরো ক্যু-টাকে চেঞ্জ করে ফেলল। সিম্পলি একটি টেকনোলজি ব্যবহার করে একটি সামরিক ক্যু-কে বদলে দিল। পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলো।

আমাদের কিন্তু রাজনীতির জায়গাতে নেই। রাজনীতি চেঞ্জ হয়ে গেছে। এটাও একটি ভালো দিক, আমাদের তরুণ প্রজন্ম কীভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতার চেঞ্জে যেতে চায়, রাষ্ট্রকে কীভাবে দিতে চায়, কীভাবে পরিচালিত করতে চায়- তারা টেকনোলজি ব্যবহার করে এটা করছে। এটা কনস্ট্রাকটিভ ওয়ে এটা তরুণদের করতে হবে।
এই যে ধারাটা, ছাত্র রাজনীতির কলুষিত ধারা শুরু হয়ে গেল। আমরা সেটা থেকে বের হয়ে আসতে পারি না। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে একটি ভালো উপায় হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। এখন দাবি আদায় করার জন্য যে মাঠে নামতে হবে- এটাও মনে করি না। আমার মনে হয় এবারের আইনটা মাঠে না নেমেও সংশোধন করার সম্ভব ছিল।

সিলেটের ঘটনা যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় না আসত তাহলে এ পর্যায়ে আসত না। সিলেটে একটি ছেলে পুলিশ হেফাজতে নিহতের ঘটনা ঘটল। এ ধরনের ছোট্ট একটি ঘটনা থেকে বড় ধরনের অঘটনা ঘটে যেতে পারে। সরকারকে কেউ যদি গাইডলাইন দিতে চায় সেটাও টেকনোলজিকে ব্যবহার করে দেবে। সরকার পালস বুঝে যাবে।

আপনি লক্ষ করুন একজন রাজনীতিক যদি ভালো কথা বলেন, যদি মানুষের কথা বলেন, মানুষ যদি অনুধাবন করে মানুষ তার পেছনে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো লাইন ধরে। এখন একজন মানুষ যদি সরকার বা সরকারের যদি হুমকি হয়ে ওঠে সরকার পাল্টা টেকনোলজি ব্যবহার করে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। তার মানে এখানেও টেকনোলজির ব্যবহার হচ্ছে।

আমি আবার করোনাতে ফিরে যেতে চাই। করোনা মোকাবিলায় সরকার যে ঋণ-প্রণোদনা ঘোষণা শুরু করেছে তা কতটা সফল হয়েছে?
করোনা মোকাবেলায় সরকার জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। যে যতই সমালোচনা করুক না কেন, প্রধানমন্ত্রীর কথাই বলি করোনা মোকাবেলার কথা বলছেন। করোনা মোকাবেলার জন্য নানা রকম বরাদ্দের কথা বলছেন। যারা ইমপ্লিমেন্টশনে করবে তারা যদি দুর্বলতার কাজগুলো করে তাহলে সেটা কীভাবে সমাধান করবেন! সমস্যা হচ্ছে সুশাসনের। সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারার কারণে সমস্যাটি থেকেই যাচ্ছে।

যারা প্রাপ্য, যাদের প্রয়োজন সেখানে সরকারের প্রণোদনা পুরোপুরি যাচ্ছে না। প্রণোদনার জন্য যে কোন দল করে কোন মতাদর্শেরÑ এ বিষয়গুলো বাদ দিয়ে যার প্রয়োজন, যেখানে প্রয়োজন সেখানে দিলে কাজে লাগবে। আমার মনে হয় সরকারের উচিত এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করলে মোকাবেলার জন্য যে সব উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে পুরোপুরি রেজাল্ট বের করে আনা সম্ভব।

সব শেষে কী বলবেন?
কোভিড-১৯-এ যে ট্রান্সফরমেশন হয়ে গেল আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের উপেক্ষিত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে শক্ত ইমিউনিটি সৃষ্টি হয়ে গেছে।

আমার মনে হয় সরকারকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন ফুড পয়জনিং না হয়, ফুড অল্টারিং না হয়, খাদ্যে কেমিক্যালগুলো যেন ব্যবহার না করে- সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে। যার ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করোনা তাকে অ্যাটাক করছে। যারা মারা যাচ্ছে তারা কারা- তারা যাদের শরীরের কোনো একটা অংশ আগে থেকেই কলাপস্ট হয়ে আছে তারা জানেই না। আমার মনে হয় সরকারকে এগুলোকে নজর দিতে হবে।