অর্থনৈতিক দুর্বলতা রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

অর্থনৈতিক দুর্বলতা রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণ

টাকার বাজার ১:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২০

print
অর্থনৈতিক দুর্বলতা রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণ

দেশে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৪০ বিলিয়ন স্পর্শ করেছে। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয় ডেকে আনা করোনাকালে নতুন উচ্চতার এই রিজার্ভ একদিকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার জানান দিচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলোও ফুটে উঠেছে। এ ব্যাপারে কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ

দেশে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৪০ বিলিয়ন স্পর্শ করেছে। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয় ডেকে আনা করোনাকালে নতুন উচ্চতার এই রিজার্ভ যেমন অর্থনৈতিক সক্ষমতার জানান দিচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলোও ফুটে উঠেছে। এ ব্যাপারে কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ।

সাধারণত অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ (রিজার্ভ) বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে তার উল্টো ঘটনাও ঘটছে। অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণেও রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, করোনার কারণে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কমেছে, ভোগ কমেছে, আমদানি কমেছে, বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে। এর প্রভাবে দেশের রিজার্ভ বেড়ে গেছে। খোলা কাগজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হলে, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা কাটানোর জন্য রিজার্ভ কাজে লাগে। সেদিক থেকে আর্থিক একটা নিরাপত্তা রিজার্ভ থেকে আসে। অন্যদিকে করোনাকালে দ্রুত বৃদ্ধি-যদি এটার কারণ খোঁজার চেষ্টা করি দেখবো অন্য কারণ।

সাধারণত বহিঃবাণিজ্য খাতে যদি উদ্বৃত্ত থাকে, বৈদেশি মুদ্রার জোগান যদি চাহিদার চেয়ে বেশি থাকে তাহলে সেটা উদ্বৃত্ত থাকে। তাহলে উদ্বৃত্তটা রিজার্ভে চলে আসে। উদ্বৃত্তটাকে বাংলাদেশ ব্যাংক কিনে নেয়। উদ্বৃত্তটা যদি না কিনে নিতো তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার হার অতি মূল্যায়িত হতো।

তিনি বলেন, এখন উদ্বৃত্তের কারণটাও খুঁজে দেখতে হবে। উদ্বৃত্তের কারণটা এ যাবৎকালে আমরা যেটা দেখেছি জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর চলতি অ্যাকাউন্টে থাকবে। বৈদেশিক বাণিজ্যেও যে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সেখানে আমাদের উদ্বৃত্ত অনেক বেড়ে গেছে। গত বছর একই সময়ে যখন এটা ঘাটতি ছিল, এবার এই বছর তা বেড়েছে দুটি কারণে। তার প্রথমত, রেমিট্যান্স হঠাৎ করে বেড়েছে। দ্বিতীয়ত আমদানি কমে গেছে।

জাহিদ হোসেন বলেন, আমদানি দুর্বলের পিছনে কারণ হলো-ভোক্তা ব্যয় করোনাকালে যে আঘাতপ্রাপ্ত হয় তা পুরোপুরি আবার ফিরে আসেনি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করোনার আগেই একটা স্থবিরতা ছিল, করোনাকালে সেটা আরও স্থবির হয়।

এমনকি বর্তমানে কমে এলেও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। মূলধনী আমদানি ব্যয় কমেছে, ওদিকে যেহেতু ভোক্তা ব্যয় কমেছে, স্থানীয় শিল্পগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। তাদের কাঁচামাল ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উপাদান সংগ্রহ করতে পারছে না। অভ্যন্তরণী চাহিদা যেহেতু দুর্বল আমাদের আমদানিও দুর্বল। এর ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের চলতি হিসাব খাতে উদ্বৃত্ত বেড়ে গেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা কিনে নিচ্ছে। সেদিক থেকে অর্থনীতি গতিশীল হয়নি। অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঠিকই। কিন্তু আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে ফিরে যায়নি। সেটা এখনো নিচে আছে।

অর্থাৎ করোনা পূর্ববর্তী অবস্থাকে যদি স্বাভাবিক অবস্থা বিবেচনা করি সেই অবস্থা আসেনি। সেই সময়ের চেয়ে চাহিদার দুর্বলতার কারণেও আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার বৃদ্ধি হয় এবং তার সাথে তার সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমে গেছে। পণ্য আমদানি-রপ্তানির যে ঘাটতি কমে গেছে। আর অন্যদিকে রেমিট্যান্স অনেক বেড়ে গেছে। যার কারণে আমাদের উদ্বৃত্ত অনেক বেড়ে গেছে। সেদিক থেকে রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ার পিছনে অর্থনৈতিক দুর্বলতাও একটি কারণ।

বিনিয়োগের চেয়ে সঞ্চয় বেড়ে গেছে। সঞ্চয় বেশি হওয়ার কারণে ভোক্তা ব্যয় বেশি। এদিকে রেমিট্যান্স আয় বাড়ছে। এর মানে হলো দুটি দিক। একটি কয়েনের দুটি দিক বলে উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, প্রয়োজন মেটানোর জন্য যেটা বৈদেশিক মুদ্রা খুবই ভালো অবস্থানে রয়েছে। হঠাৎ যদি আমাদের ভ্যাকসিন কিনতে হয়; যদি বিদেশি সহায়তা না পাওয়া যায়; তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন আছে এবং সেটা বড় অংকের। রিজার্ভ থেকে সংগ্রহ করে তাহলে দেশেরে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার অস্বাভাবিক হবে না। বৈদেশিক মুদ্রা অতিমাত্রায় অবমূল্যায়ন হবে না।

বহিঃবাণিজ্যের ক্ষেত্রে রিজার্ভের ভূমিকা তুলে তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে এ ছাড়া যারা বিদেশিরা ঋণ প্রদান করে। তারা এই বৈদেশিক মুদ্রার এই স্থিতির বিষয়টি দেখে। বিদেশি যারা ঋণ দেয় তারা দেখে সুদ-আসলে পরিশোধ করার মতো ক্ষমতা আছে কি না। সে ক্ষেত্রে তারা রিজার্ভ দেখে। যদি রিজার্ভ পর্যাপ্ত থাকে তারা স্বস্তিবোধ করে।

যারা রেটিং করে তারাও রিজার্ভকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রিজার্ভকে ইতিবাচক হিসাবে দেখে থাকে। রিজার্ভের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী তা রিজার্ভ দিয়ে বিবেচনা করে থাকে।

সে জন্য ফাইন্যান্সিয়াল জায়গা যদি দেখি তাহলে রিজার্ভ বেশি থাকা স্বস্তির জায়গা। অর্থনীতির জায়গা থেকে দেখি তাহলে রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণ দেখতে হবে। রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণটা যদি বিনিয়োগ না হওয়ার কারণ হয় তাহলে বুঝতে হবে সঠিক কারণে রিজার্ভ বাড়ছে তা নয়। তাহলে অর্থনীতি দুর্বল তা প্রমাণ করে।

আমদানির জন্য টাকা খরচ করতে হচ্ছে না, বাইরে থেকে টাকা পাঠাচ্ছে-সেই কারণে রিজার্ভ বাড়ছে। এমন যদি হতো বিনিয়োগও বাড়ছে সঞ্চয়ও বাড়ছে। বিনিয়োগ যে হারে বাড়ছে সঞ্চয় তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে-এটা যদি হতো তাহলে অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। এটা কিন্তু তা নয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে একটি বড় অবদান রাখছে, তিনি বলেন।

তাহলে তো করোনার কারণে রিজার্ভ বাড়ছে? এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনার কারণে দুটি বিষয় হয়েছে। প্রথমত, ভোক্তা ব্যয় কমে গেছে। বিনিয়োগ নেই। বৈশি^ক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা। ফলে বিনিয়োগকারীরা সাহস পাচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত: বিদেশে কর্মরত কর্মীরা করোনার কারণে দেশে এসেছেন। অনেকে আবার বিদেশে আছেন, দেশে আসার অপেক্ষায় আছেন। তারাও অর্থ পাঠাচ্ছেন। আবার করোনার কারণে হুন্ডি বন্ধ হয়ে গেছে। যার কারণে ইনফরমাল চ্যানেলে টাকা আসার পরিবর্তে ফরমাল চ্যানেলে টাকা আসা বেড়ে গেছে। বিদেশে থেকে যারা ফিরে আসবেন তারা সঞ্চয়ের অর্থ সঙ্গে নিয়ে আসবেন। যার কারণে বৈদেশিক বাণিজ্যের চলতি হিসাবে বেড়ে গেছে।

করোনার কারণে প্রবাসে সঞ্চিত অর্থ রাখতে নিরাপদ মনে করছে, এ কারণে বেশি বেশি অর্থ পাঠাচ্ছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, বিদেশে টাকা রাখলে টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের কর্মীরা সৌদি আরব, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মত দেশে থাকেন। অর্থ রাখলে অর্থ পাওয়া যাবে-এ সব দেশে এমন অনিশ্চয়তা নেই। এমন যদি হতো যে আমাদের কর্মীরা আফ্রিকার কেনিয়া, সোমালিয়ার মতো দেশে আছে তাহলে তাদের অর্থ না পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারতো। বিশেষ করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে-এমন দেশে বাংলাদেশের কর্মীরা নেই। আমাদের দেশের কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল সেসব দেশে থাকেন।

তবে অন্য কারণে প্রবাসীরা টাকা পাঠানোর হার বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, করোনার কারণে ওই সব দেশে সুদ অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকার কোন কোন দেশের সুদ হার শূন্যের কোটায় নেমে গেছে। কোন কোন দেশে সুদ হার নেগেটিভ। ওই সব দেশে ব্যাংকে টাকা রেখে, সরকারি বা করপোরেট বন্ড কিনে আয় করার সম্ভাবনা নেই এবং আগামী দুই তিন বছরে এ সব বন্ড কিনে লাভ করার কোন সম্ভাবনা নেই। এ সব দেশে সঞ্চয় রেখে আসলটাই ফেরত পাওয়ার কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে আমাদের দেশে সঞ্চয়পত্র কিনে ডাবল ডিজিট সুদ পাওয়া যায়। দেশে ভালো ব্যাংক বলে পরিচিত ব্যাংকগুলোতে করোনার মধ্যেও ৪-৫ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যায়। কিন্তু বিদেশে টাকা রাখলে এ সুদ পাওয়াটা অনেকটা সৌভাগ্যের। ফলে বিদেশে অবস্থান করেই দেশে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছে।

রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীরা আবার বেশি সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা একাউন্টসে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবেও রাখতে পারবে। ওই অর্থ ইচ্ছা করলে প্রবাসীরা নিয়েও যেতে পারবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমতিও নেওয়া লাগবে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে ক্লারিফিকেশন দিয়েছে।

তারপরও ব্যাংকে রাখলেও সুদ পাবেই। অর্থাৎ বিদেশে থেকে অর্থ আনলেও ডলার হিসাবে রাখতে পারবে আবার তুলেও নিতে পারবে। এই সহজীকরণের ফলে প্রবাসীদের দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে শক্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। আগে যেটা ছিল না। প্রবাসীদের আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে এটাও একটি ভূমিকা রাখছে।