ধাক্কা সামলাতে সময় লাগবে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

ধাক্কা সামলাতে সময় লাগবে

জাফর আহমদ ১:৪০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৪, ২০২০

print
ধাক্কা সামলাতে সময় লাগবে

মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী আধুনিক ব্যাংকার হিসেবে সুপরিচিত। চৌকস অর্থনীতিতাত্ত্বিক। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর্থিক খাতে করোনা অভিঘাত মোকাবিলায় দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। করোনাকালের আর্থিক খাতের নানা বিষয়ে কথা বলেছেন খোলা কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমদ

ঋণ পরিশোধের সময় আরও তিন মাস বাড়ল। আগে ছিল সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ডিসেম্বর পর্যন্ত টাকা না দিলেও গ্রাহক খেলাপি হবে না। ব্যাংকগুলোর অনীহা লক্ষ করা গেছে। নতুন নির্দেশনাকে কীভাবে দেখছেন?
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো গ্রাহক খেলাপি হলেও তাকে খেলাপি করা যাবে না। তবে আদায় প্রক্রিয়া চলবে। আমরা পার্সু করে করে আদায় করছি, আদায় হচ্ছেও। বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো বিভিন্ন জায়গা থেকে চাপে আছে। এ জন্যই নতুন নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা গ্রাহকদের বলছি, যাদের ঋণ ফেরত দেওয়ার মতো অবস্থা আছে তারা ফেরত দেন, দু’দিন পরেও তো দিতে হবে। এর ফলে ছোট্ট গ্রাহকরা ঋণ ফেরত দিচ্ছে। না দিলে কী হবে, এটার ওপর ইন্টারেস্ট বাড়ছে। অনেকেই টাকা দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ হয়তো দিচ্ছে না। কিছু লোক তো আছে সব সময় না দেওয়ার চিন্তা করে। যারা স্যালারি পায়, কনজুমার ঋণে সব ঋণ ও ঋণের সুদ ফেরত দিচ্ছে। রিটেইল- এগুলো অধিকাংশই ফেরত দিচ্ছে, আমরা আদায় করছি।

বড় গ্রাহকরাই তাহলে সমস্যা?
বড়দের নিয়ে মাঝে মাঝে একটু সমস্যা হয়ে যায়। তারা বোঝেও বেশি ভালো, তারা প্রেসার গ্রুপও। তাদেরও আমরা পার্সু করছি, দুদিন পরে আরও বেশি হয়ে যাবে, জমে যাচ্ছে, তখনও দিতে হবে। অনেকেই আবার দিচ্ছে।
ঋণ রিকভারি না হলে তা ইনকামে দেখাতে পারবে না। এ কারণে আমরা পার্সু করে রিকভারির চেষ্টা করছি। পার্সু করলে মানুষ মোটিভেটেড হয়, সেটা হচ্ছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ ফেরত দেওয়ার মতো ক্ষমতা না থাকে, আমরা প্রেসার করছি না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রেসার করা যাবে না, ক্লাসিফাই করা যাবে না। আমরা সেটা করছিও না। ওটা আমাদের মানতেই হবে। কিন্তু যদি রিকভারি না আসে আমরা ইনকামে দেখাতে পারব না- এ কারণে আমরা পার্সু করছি। যেটা দেরি হয়ে যাবে তার ওপর সুদ হয়ে যাবে। সুদ তো মাফ হচ্ছে না। এ জন্য তারা টাকা দিচ্ছে।

কিছু কিছু খাতে তো ব্যবসা ভালো করছে, এর ইম্প্যাক্টও পড়ার কথা...
করোনাকালের শুরু থেকেই কিছু খাতে ব্যবসা হচ্ছিল। যেমন ধরুন ফুড আইটেম, চিকিৎসা সরঞ্জাম ইত্যাদি ভালো করেছে। তারা তো আগে থেকেই ভালো লেনদেন করছে। হাসপাতালগুলো ব্যবসা করছে। হোটেলগুলোতে নতুন করে লোক আসা শুরু করেছে। এরা প্রথমে আটকে গিয়েছিল, এখন ব্যবসা করছে। এখন তারা টাকা দিচ্ছে। করোনার কারণে পর্যটন বন্ধ ছিল, খবরে দেখছি কক্সবাজারের হোটেলগুলো পুরোদমে চালু হয়ে গেছে। হোটেলগুলোতেও বিজনেস চালু হয়ে গেছে। ঋণ ফেরত দিতে এদের সামর্থ্য সৃষ্টি হয়েছে। এদের বলছি- ভাই, টাকা দেন। ওরা দিচ্ছে।

আর তৈরি পোশাক নিয়ে আগে থেকেই আমরা বলছি, রীতিমতো ব্যবসা শুরু হয়ে গেছে, রপ্তানি হচ্ছে। শ্রমিকরা কারখানায় ফিরেছে। দেশের প্রধান এ রপ্তানি খাতে তো আগে থেকেই রপ্তানি অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গেছে। দুয়েকটি কারখানার ঋণ আমরা নবায়ন করলাম, দেখলাম তাদের হাতে কার্যাদেশও আছে। তৈরি পোশাক খাতে বড়রা আরও ভালো করছে। কিন্তু ছোটরা সমস্যায় পড়বে। এই ধাক্কা সামলাতে তাদের কষ্ট হবে। বড় কোনো গার্মেন্ট কারখানা বসে নেই। কোনো শিল্প এলাকায় কোনো হৈচৈ নেই, শ্রমিক অসেন্তাষ নেই। এখন শ্রমিকদের জন্য আমরা আর টাকা দিচ্ছি না, কারখানা মালিকরা নিজেরাই শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে।
নিত্যদিনের কাজগুলো করার জন্য মানুষ বাইরে বের হয়ে পড়েছে। করোনার কারণে মানুষ ঘরে বসে নেই। ঢাকার রাস্তায় করোনাকালের আগের মতোই জ্যাম, লম্বা লাইন ধরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ বের হচ্ছে, কাজ করছে- এটা তারই লক্ষণ। তবে দোকানগুলো এখনো পুরোপুরি জমেনি। তবে অর্থনীতিতে স্পন্দন ফিরে এসেছে। টাকা তার নিয়মে ঘুরছে।

আমাদের অর্থনীতি ভোগনির্ভর। ভোগেই অর্থনীতির সামর্থ্য তৈরি হয়ে, প্রবৃদ্ধি বাড়ে?
হ্যাঁ, এ জন্য পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে আরও খানিক সময় লাগবে। দোকানপাটগুলো যেভাবে জমার কথা ছিল, সেভাবে জমেনি। আবার নিত্যদিনের প্রয়োজনগুলোও থেমে নেই। গ্রাহকদের দিক থেকে যদি দেখি, স্পিনিং মিলগুলো, টেক্সটাইল মিলগুলো করোনাকালে টাকা দিতে পারছিল না, এখন তারা অনেকেই টাকা দিতে পারছে।
মানুষ কাপড়-চোপড় কিনছে, রপ্তানি হচ্ছে। এর ইতিবাচক ধাক্কা লাগছে তাদের রোজগারে।

মানুষের রোজগার হওয়া শুরু হলে নিশ্চয়ই কেনাকাটাও করবে। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের এত বড় ধাক্কা সামাল দিতে আরও খানিক সময় তো লাগবেই।

যেমনটা বলছেন, বড় বড় খাতগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যে কৃষি আমাদের আহার দেয়- সেই কৃষির জন্য ব্যাংক থেকে কী করলেন? সরকার প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে?
কৃষিতে কি প্রণোদনা দরকার!

ব্যবস্থাপনার দিকে তো তাকাতেই হবে!
কৃষিতে সেটা হচ্ছে। বাংলাদেশে কৃষিতে এত যান্ত্রিকীকরণ ছিল না। করোনাকালে ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য ব্যাপকহারে যন্ত্র ব্যবহার হয়েছে। ভাটি অঞ্চলে ব্যাপক হারে হার্ভেস্টার ব্যবহার হয়েছে। এ জন্য সরকারের যেমন প্রণোদনা ছিল, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও কৃষিতে অর্থায়ন করেছে। আগামীতে আরও ব্যাপক হারে যান্ত্রিকীকরণ হবে।

করোনা যন্ত্রায়নের গতি বাড়িয়ে দিল...
করোনাকালে যান্ত্রিকায়নকে গতি এনে দিয়েছে। মহামারী থেকে মানুষ নতুন শিক্ষা নিয়ে আগামীর কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার আরও বাড়াবে। শিক্ষিত মানুষরা কৃষিকাজ শুরু করেছে। কৃষিপণ্যগুলো একটু ভালোভাবে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাব সেখানে মেধা, সামর্থ্য, অর্থ সবকিছুর সমন্বয় ঘটেছে। দেখুন না, আমাদের ফলগুলোর সাইজ; ফসলের ফলন! এগুলো সবই সর্বোচ্চ চেষ্টার ফল। কৃষিতে খুবই ভালো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। উত্তরের জেলাগুলোতে মঙ্গাসহ কত কী হত। এখন সেগুলো আর দেখা যায় না। করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারীতেও উত্তরাঞ্চলে খারাপ কিছু ঘটেনি। এটা কৃষির অবদান। কৃষি আগে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান ছিল না, এখন বাণিজ্যিকভাবেও লাভবান হয়ে গেছে। অনেকে খামার করছে, অনেকে বাগান করছে- এগুলোও আগে এত বেশি ছিল না। এখন হয়েছে। সবাই উচ্চফলনশীল জাতের চাষ করছে। করোনাকালে এখানেই বেশি ইতিবাচক ফল দেবে। এই যান্ত্রিকীকরণ ও উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন ও ব্যবহারের অর্থ কৃষিকে প্রয়োজনীয় ইনপুট দিতে পারছি।

গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ভারত গরু পাঠানো বন্ধ করে দিল, আর এখানে গরু পালন বেড়ে গেল। দেশের খামারের গরু দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। গরুনির্ভর ব্যাপক ব্যবসা শুরু হয়ে গেল। কৃষিখাতে আসলে বড় ধরনের বিপ্লব হয়ে গেছে। কৃষিতে মতিয়া চৌধুরীর কত অবদান আমরা এখন তা দেখছি।

অর্থনীতির প্রতিটি খাতে একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর বিচরণ সকল খাতের যে ব্যাংকের স্পর্শ পড়েছে এটা কি তারই ফল?
কয়েকটি কোম্পানি আগে ট্রাক্টর আমদানি করত। এখন হার্ভেস্টার আমদানি করছে। হার্ভেস্টারে কত সুবিধা এবার আমরা দেখলাম। অবশ্যই সেখানে ব্যাংকের অর্থায়ন আছে। মাঠ পর্যায়ে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি কৃষকদের মধ্যে একধরনের প্রাণচঞ্চল্য ফিরেছে।

ছয়জন শ্রমিক সারাদিন যে কাজ করেছে একটি হার্ভেস্টার আধাঘণ্টায় সে কাজ করে দিচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে করণীয়, অর্থনীতিতে এর প্রভাব বিবেচনা করে অর্থায়ন করা হয়। একটু যারা সামর্থ্যবান তারা নিজেরাই হার্ভেস্টার কিনে ফেলছে। আগে কৃষাণ-গরু দিয়ে জমি চাষ করা হতো, এখন সেখানে যান্ত্রিক লাঙ্গলে চাষ হচ্ছে। এগুলো ব্যাংকের অর্থায়নের ফসল।

খামার বলেন, বাগান বলেন- এগুলো এখন বেশ আধুনিকভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর পেছনে ব্যাংক থাকছে।

তৃণমূলে অবশ্যই আমরা যাচ্ছি। যাওয়ার কাজটি সহজ করে দিচ্ছে নতুন নতুন ধরনের ব্যাংকিং। মোবাইল ব্যাংকিং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু করা হয়েছিল। এজেন্ট ব্যাংকিং সারভাইভ করা কঠিন হচ্ছিল। এখন উপশাখা খুলছি। ছোট্ট ছোট্ট বাজারেও উপশাখা খুলে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। এভাবে মানুষ হাতের কাছে ব্যাংকের সেবা পাচ্ছে।

মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা ব্যাংকিং সেবার আমূল পাল্টে দিয়েছে। এবার করোনা মহামারীর সময় বেতন দেওয়ার মতো জনসমাগম থেকে বিরত থেকে মোবাইলের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আমার ব্যাংকের মাধ্যমেই প্রায় ৯০ হাজার লোককে সুন্দরভাবে টাকা পৌঁছে দিয়েছি।

এতে লিকেজ নেই, মধ্যস্বত্বভোগীর কোনো হস্তক্ষেপ নেই। করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরকার আড়াই হাজার করে টাকা দিয়েছে। আগে কেয়ারের টাকা মহিলাদের কাছে পৌঁছাতে নানা রকম অভিযোগ উঠত, মেরে দেওয়া হতো। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মেরে দেওয়া হতো। এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সরাসরি অ্যাকাউন্টেই টাকা চলে যাচ্ছে। রেমিটেন্স নিতে আগে মহিলারা আসতে পারত না, এখন পারছে। ব্যাংকিংয়ের পুরোটাই চলে যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তিতে। মোবাইল ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিংয়ে পরিণত হয়েছে। আমরা এতদিন মোবাইল ব্যাংকিং থেকে দূরে ছিলাম। নতুন করে আবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দিকে যাচ্ছি।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
খোলা কাগজকেও ধন্যবাদ।