‘সুন্দরবনের ওপর চাপ কমেছে’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২০ | ১৮ আষাঢ় ১৪২৭

‘সুন্দরবনের ওপর চাপ কমেছে’

তানজেরুল ইসলাম ৭:৩৮ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

print
‘সুন্দরবনের ওপর চাপ কমেছে’

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) পদে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বনবিদ্যা বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৩ সালে বিসিএস (বন) ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করে সহকারী বন সংরক্ষক পদে যোগদান করেন। চাকরিতে যোগদান করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বনবিদ্যা বিষয়ে দ্বিতীয়বার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। দেশের নৈসর্গিক বনাঞ্চল নিয়ে পরিকল্পনা, অধিদফতরটির প্রতিবন্ধকতা ও সাফল্য নিয়ে তিনি কথা বলেছেন খোলা কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানজেরুল ইসলাম

 

প্রয়লঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বুক পেতে দেয় আমাদের সুন্দরবননৈসর্গিক সুন্দরবন নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
খুলনায় ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন প্লানের অধীন সুন্দরবন ব্যবস্থাপনা হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সাল মেয়াদি এই কার্যক্রম চলবে। আগামী ২০২১ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের জন্য নতুন করে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা হবে। সেই পরিকল্পনায় সুন্দরবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

খুলনা সাতক্ষীরা বনাঞ্চলের বেশ কিছু স্থানে গড়ান বৃদ্ধি পেয়েছেএর প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনেগড়ান আহরণের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
প্রয়লঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় সিডরের কারণে সুন্দরবনে এ পর্যন্ত সবচাইতে বেশি ক্ষতি হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে সুন্দরবন যাতে নিজের শক্তিতে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে এই কারণে গত একযুগ সময় ধরে সুন্দরবনে হাত দেওয়া হয়নি। ফলে সুন্দরবন থেকে গড়ান আহরণ হয়নি। এমন সিন্ধান্তের প্রয়োজন ছিল। পর্যাপ্ত সময় পেয়ে সুন্দরবন নিজের শক্তিতে সিডরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পেরেছে। গড়ানের বিষয়ে এখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সার্ভে করতে হবে। ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটারের সুন্দরবনের কিছু এলাকা দেখে গড়ান আহরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। গড়ান আহরণের সার্ভে রিপোর্টে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকতে হবে। তবে ২০২১ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় গড়ান আহরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভোলা নদীর বেশ কিছু এলাকায় পলি জমে ভরাট হয়েছেস্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছেএর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বিভিন্ন খালসহ সুন্দরবনেব্যাপারে পরিকল্পনা কী?
সুন্দরবনে চারটি রেঞ্জে ভোলা নদী। ভোলা নদীসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ তিনটি খাল পলি ভরাটের কারণে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। ওই নদী এবং খালগুলো গত প্রায় ৩০-৩৫ বছরে উঁচু হয়ে গেছে। এই কারণে ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে খালগুলো খনন করা হয়েছিল। ওই তিনটি খালসহ সাতক্ষীরা এবং শরণখোলার দিকে আরও কিছু খাল রয়েছে। বর্তমানে চিহ্নিত সর্বমোট ৪১ কিলোমিটার খাল খনন জরুরি। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদ ও বন্যপশু পাখি বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে বনে খালের মাধ্যমে নিয়মিত জোয়ারের পানি প্রবেশ জরুরি। সুন্দরবনে যারা বনজীবী আছেন তাদের চলাচলের জন্য খালগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প’ নামে আমাদের একটি প্রস্তাবনা আছে। যেটি বর্তমানে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নদী ও খালগুলো খনন কার্যক্রম শুরু হবে।    

সুন্দরবনে বনজীবীদের পেশা পরিবর্তন কতটা জরুরি?
সুন্দরবনের আশপাশে গড়ে ওঠা জনবসতি বনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তবে এই নির্ভরশীলতার হার দিন দিন কমছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এর মূল কারণ। এখন আর আগের মতো সুন্দরবন থেকে জ্বালানি লাকড়ি সংগ্রহের দৃশ্য দেখা যায় না। এসব পরিবর্তন রাতারাতি হয়নি। পরিবর্তনের জন্য বন বিভাগকে দীর্ঘদিন ধরে শ্রম দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। বর্তমানে সুন্দরবনের ওপর থেকে চাপ কমেছে। তবে চাপ নেই তা কিন্তু নয়। মানুষকে সচেতন করতে আমাদের আরও অনেক কিছুই করণীয় আছে। অনেক ভদ্রলোক মোংলায় বেড়াতে যান। তার মনে শখ জাগে হরিণের গোস্ত খাওয়ার। এই শখ পরিহার করতে হবে। আপনার শখ না জাগলে শিকারিরা হরিণ শিকার করবে না।

দেশের কিছু জেলার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যর সঙ্গে শালবন সম্পৃক্তএসব জেলার বেশ কিছু এলাকায় শাল কপিচ ম্যানেজমেন্ট কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছেঅনেক এলাকায় শাল কপিচ ম্যানেজমেন্টের আওতায় উপকারভোগী থাকলেও বহু বছরেও থিনিং হয়নিএতে যেমন উপকৃত হয়নি উপকারভোগীরা তেমনি সৌন্দর্য বাড়েনি শাল বনেরএই ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রংপুর, নওগাঁ ও দিনাজপুর জেলায় প্রাকৃতিক শালবন আছে। আমাদের মূল শাল বৃক্ষ আর নেই। এসব শাল বাগান কপিচ থেকে হয়েছে। কোথাও কোথায় শাল গাছের কোয়ালিটি নষ্ট হয়ে গেছে। শাল কপিচ সমৃদ্ধ এলাকায় বন দখলের চেষ্টা খুব প্রবল। দখল চেষ্টাকারীরা মনে করে এখানে তো বড় গাছ নেই। এসব কারণে ১৯৯৯-২০০০ সালের দিকে ‘ফরেস্ট সেক্টর প্রজেক্টের’ মাধ্যমে শাল কপিচ বাগানের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের সম্পৃক্ত করা হয়। শাল কপিচ বাগান থিনিং বা খারাপ কপিচগুলো কেটে মানসম্পন্ন কপিগুলো কর্তনের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও উল্টো চিত্র দেখা গেছে। কেউ কেউ ভালো কপিচগুলো কেটে খারাপ কপিচগুলো রেখে দিয়েছে। এছাড়া উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত থাকে। শালবন সংশ্লিষ্ট এলাকায় ম্যানেজমেন্ট কমিটি আছে। কোথাও থিনিং প্রয়োজন হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভূমি সংস্কার বোর্ডের কোর্ট অব ওয়ার্ডস বনের জমি লিজ দিয়েছেএতে বেহাত হচ্ছে বনবনভূমি লিজকাণ্ড বন্ধে বন অধিদফতরের অবস্থান কী?
ঢাকা বন বিভাগের অধীন সাভার উপজেলার ছোট কালিয়াকৈর মৌজায় বনভূমি লিজ দেওয়া হয়েছে। ভূমি সংস্কার বোর্ড এবং বন অধিদফতর দুটোই সরকারি সংস্থা। আমরা সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি করতে পারি না। এসব ব্যাপারে ভূমি সংস্কার বোর্ডকে আমরা লিখিতভাবে জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখেছি। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে কিছু বিষয় ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ে এসব সমস্যা সমাধান হলে সাভার ও গাজীপুরে সুন্দর বন ব্যবস্থাপনা হবে।

দেশে হাজার হাজার রেকর্ড সংশোধনী মোকদ্দমার নিষ্পত্তি হচ্ছে নাশিল্প অধ্যুষিত জেলাগুলোতে বনভূমি রক্ষা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছেভূমি সংক্রান্ত জটিলতায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্ভোগের শেষ নেইএসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বন অধিদফতরের পরিকল্পনা কী?
ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘদিনের। এসব সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। ভূমি রেকর্ড সংক্রান্ত সমস্যা থাকলে উচ্ছেদের সুযোগ নেই। দেওয়ানি আদালতে মামলা আছে, হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতার শিকার হচ্ছে বন বিভাগ। বাংলাদেশ রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথসহ ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট করে এমন প্রতিটি দফতরে ‘স্টেট অফিসার’ পদ আছে। বন অধিদফতরে স্টেট অফিসারের কাজ করতে হচ্ছে রেঞ্জ কর্মকর্তাকে। একজন রেঞ্জ কর্মকর্তাকে একসঙ্গে হরেক রকম কাজ করতে হচ্ছে। তাকে হরেক দায়িত্ব দিয়ে তার কাছ থেকে শতভাগ ফলাফল প্রত্যাশা করা সম্ভব নয়। তেমনি একসঙ্গে সব কাজে সময় দেওয়া একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা আছে এমন জেলায় স্টেট অফিসার নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। আশাবাদী মানুষ ছাড়া পৃথিবী চলবে না। নৈরাশ্যের রাজ্যতে ভেসে গেলেও পৃথিবী চলবে না। প্রতিটি প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য বনভূমি প্রয়োজন। এই কারণে বনভূমি রক্ষায় প্রতিটি সরকারি সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় অধিবাসী, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে।

খোলা কাগজকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
খোলা কাগজকে ধন্যবাদ। আমি নিরলস শ্রম দিতে চাই, মানুষ যাতে আমাকে মনে রাখে।