মিডিয়া আমার বিপক্ষে ছিল

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

মিডিয়া আমার বিপক্ষে ছিল

ড. কাজল রশীদ শাহীন ১০:১১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৯

print
মিডিয়া আমার বিপক্ষে ছিল

সদ্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হয়েছেন আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী। নানা কারণে গত দুই দশক ব্রাত্য হয়ে পড়েছিলেন দল ও দলের বাইরে। নতুন করে উপদেষ্টা পদ পাওয়ার পর কথা বলেছেন খোলা কাগজের সঙ্গে। সঙ্গে ছিলেন সম্পাদক ড. কাজল রশীদ শাহীন

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা বানানো হয়েছে আপনাকে। অনুভূতি জানতে চাই... 

ভালো লাগছে। অনেক চাপের মধ্যে ছিলাম, সেটা কেটে গেল। এই স্বীকৃতি আর সম্মান আমার জন্য বড় পাওয়া। কারণ দীর্ঘ ২০ বছর পর এটা পেয়েছি। এই বিশ বছরই অনাদরে-অবহেলায় কেটেছে। যদিও তিনবার এমপি ছিলাম। দীর্ঘ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও ছিলাম। কিন্তু দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে দলের কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারিনি। তখন মনের মধ্যে একটা দুঃখবোধ আর হতাশা ছিল। আজ যখন প্রধানমন্ত্রী আমাকে এই সম্মান দিলেন তখন দুঃখ কেটে গেছে। আসলে এটা আমার জন্য খুবই আনন্দের বিষয়।

দলে অংশ নিতে পারেননি কেন? দেওয়া হয়নি?
এক শ্রেণির লোক, কুচক্রীরা এতদিন প্রচার করেছে, জয়নাল হাজারীকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা উচিত। নিজে থেকেই মনে করেছিলাম, হয়তো কিছু একটা হয়েছে, নয়তো নেত্রী ডাকে না কেন? ওদিকে দায়িত্বও দেয় না, এমন কি নমিনেশন চেয়েছি, তাও দেওয়া হয়নি। সে সব কারণে কিছুটা অনাদরে, অবহেলায় নিজের মধ্যেই হতাশা এসে গিয়েছিল। তবু মনের বল ছিল, ধৈর্য ধরেছি। ধৈর্য ধারণ যে একটা উপকারী জিনিস, এটা বিশ্বাস করতাম। সেই ফলটা এ মুহূর্তে পেলাম।

শুধুই কী কুচক্রীরা...নাকি কোনো কারণ ছিল?
কারণ থাকতেই পারে না। কী কারণ থাকবে? আমি তিনবার এমপি হয়েছি। যখন কক্সবাজার থেকে সাভার পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কোনো এমপি নেই, তখন আমি এমপি হয়েছি দুবার। তৃতীয়বারের সময় অর্থাৎ নাইনটি সিক্সে ওবায়দুল কাদের, মোশারফ সাহেব, চৌদ্দগ্রামের মুজিবুলরা এমপি হয়েছে। কিন্তু এইটি সিক্সে, নাইনটি ওয়ানে কেউ ছিল না এই বিশাল এলাকায়। যদিও ফেনী বিএনপি অধ্যুষিত, তারপরও এই জায়গায় আমি তিনবার এমপি হয়েছি।

বিএনপি অধ্যুষিত হলে আমি নির্বাচিত হলাম কীভাবে-এমন প্রশ্ন উঠতে পারে। আসলে আমাকে ব্যবসায়ীরা ভোট দিয়েছে। ফেনী বাজারে অন্তত বিশ হাজার দোকান আছে, কর্মচারী নিয়ে প্রায় এক লাখ লোক হবে। এই ব্যবসায়ীরা সব আমার পক্ষে। আমি আওয়ামী লীগের জোরে জিতেছি এমন নয়, জিতেছি ব্যবসায়ীদের জোরে।

অভিযোগ আছে, এমপি থাকা অবস্থায় আপনার কারণে দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ নিয়ে কী বলবেন?
আওয়ামী লীগের কোনো রকম ইমেজই আমি ক্ষুণ্ন করিনি। যে কারণেই হোক, একটা সময় মিডিয়া আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। তারা বানিয়ে বানিয়ে অনবরত আমার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। বরং আমার আমলে চাঁদাবাজি ছিল না, হানাহানি ছিল না। আমার হাজার হাজার কর্মী ছিল, এদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকি নেওয়া পর্যন্ত নিষেধ ছিল।

কিন্তু মিডিয়া আপনার বিপক্ষে চলে গেল কেন?
এখন যখন মিডিয়ার সঙ্গে কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা করি, তখন তারা খুশি থাকে। ক্ষিপ্ত হয় না। আসলে ওই সময় এই সেন্সটা ছিল না। তারা কোনো উল্টাপাল্টা কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে তার কঠোর জবাব দিতাম। কাউন্টার করতাম। ফলে সে সময় সেটা তারা আমার বিরুদ্ধে কাজ করেছে। তাছাড়া ওই সময় মিডিয়া যত শক্তিশালী ছিল, এখন তার অর্ধেকও নেই। এখন মিডিয়াতে কোনো বিষয়ে হাজারও লিখলেও কাজ হয় না। এই তো সাগর-রুনিকে নিয়ে মিডিয়া তো অনবরত লিখে গেছে কিন্তু কিছু তো হয়নি। মিডিয়া দুর্বল হয়ে গেছে এখন।

কিন্তু মিডিয়া কি একবারে শূন্যের ওপর কিছু করতে পারে? ধরেন আমরা যদি টিপু সুলতানের কথাই বলি...
টিপু সুলতানের বিষয়টা সম্পূর্ণ বানোয়াট। টিপু সুলতাম যখন এ সম্পর্কে সাক্ষাৎকার দিয়েছে, সেখানে আমার নামও উচ্চারণ করেনি। পরবর্তী সময়ে এটাকে ইস্যু করা হয়েছে। যেমন বঙ্গবন্ধু আমলে ‘বাসন্তী’কে ইস্যু করা হয়েছিল।

কেন আমি তাকে মারলাম, তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। একটা সময় তাকে শিখিয়ে দিলে সে বলেছে, আমার বিরুদ্ধে একটা ভয়াবহ খরব ছাপানোর কারণে। সেই ভয়াবহ খবরের কোনো অস্তিত্ব নেই। বিনা কারণে একটা লোককে আরেকটা লোক মারে নাকি?

আপনার লোকজন তাকে নির্যাতন করেছিল না?
যেভাবে প্রচার করা হয়েছে, সেভাবে না। গণ্ডগোল টুকটাক একটা হয়েছিল কিন্তু সেখানে আমার কোনো ইনভলমেন্ট ছিল না। মোটকথা টিপু সুলতানকে নিয়ে একটা ইস্যু সৃষ্টি করে সেখানে আমাকে জড়ানো হয়েছিল।

আপনি তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন...
অবশ্যই। তখন আমার বয়স ছাব্বিশ থেকে আঠাশ হবে। বেলুনিয়া এলাকায় আমি ফ্রন্টে থেকে যুদ্ধ করেছি। এটা ছিল সেক্টর টু, সাব-সেক্টর ডি-থ্রিতে।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কি একাত্তরের আগে আপনার কোনো স্মৃতি ছিল?
সব তো একাত্তরের আগেই। সিক্সটি ফোর-এ বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে গেলেন এক সম্মেলনে। সেখানেই প্রথম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। আমার সঙ্গে ছিলেন খাজা মোহাম্মদ এমপি। আরও দুজন ছিলেন তাদের নাম এখন নেব না। বঙ্গবন্ধু সে দিনই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ওখানে ছাত্রলীগের খবর কী? আমি বললাম, আছে তবে অল্প। কমিটিও তেমন নেই। তিনি বললেন, তুমি একটা কমিটি দাঁড় করাও, আমি নূরে আলম সিদ্দিকীকে পাঠাচ্ছি।

তারপর এক সময় আমি ঢাকা এলাম। দেখা করতে গেলে উনি নূরে আলম সিদ্দিকীকে ডাকালেন। বললেন, তুমি এর সঙ্গে ফেনী যাও, সে যেভাবে যেভাবে পরিকল্পনা করে, একটা কমিটি করে দিয়ে এসো। এভাবে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই ছাত্রলীগে আমার রাজনীতি শুরু। একটা মফস্বলের ছাত্রলীগ কর্মীকে বঙ্গবন্ধু এতটা গুরুত্ব দেন, তা দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। তারপর অনেকবার বত্রিশ নম্বরে গিয়েছি, সালাম দিতাম, দোয়া নিয়ে আসতাম।

আপনার এলাকায় এখন যে এমপি, তিনি কেমন চালাচ্ছেন?
একেবারে স্বৈরতন্ত্র, এক নায়কের মতো। আমার আমলে নিজেদের লোকরা মারামারি করত না। কিন্তু তার আমলে আমাদেরই একজন উপজেলা চেয়ারম্যানকে গাড়িসুদ্ধ জ্বালিয়ে মেরে ফেলা হলো। তার অপরাধ, সে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। এখনো তাই চলছে। কেউ বিরুদ্ধে গেলেই তার শাস্তি অবধারিত। তার বিরুদ্ধে কথা বলারও কোনো সুযোগ নেই।

কেন্দ্র এসব বিষয়ে অবহিত নয়?
অনেকেই অবহিত। তবে সবাই জানে তাকে কে শেল্টার দিচ্ছে। তিনি পার্টি সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের। বিভিন্ন কারণে এখন কিছু কথা বলা যাচ্ছে না। সবে উপদেষ্টা হলাম। এখনই কোনো বিপদে পড়ি, তা চাই না। কিছু কথা আছে, সেগুলো বলা মুশকিল। তবে এটা পরিষ্কার, এখন যে এমপি তাকে দলের সাধারণ সম্পাদক আগাগোড়া সমর্থন করেন। এমনকি আমার উপদেষ্টা পদ নিয়েও ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছিল।

তাহলে উনার সঙ্গে আপনার একটা দূরত্ব আছে...
কঠিনভাবে আছে।

এটা কেন?
কারণ অনেক। উনার মধ্যে একটা দুর্বলতা আছে, সেটা হলো, আমি ফেনীতে গেলেই উনার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এখন ফেনীতে গেলেই তিনি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সেখানকার নেতকর্মীও তাকে খুব বেশি আদর-যত্ন করে। মোটকথা, ফেনী সার্কিট হাউসটা তার জন্য আকর্ষণীয় জায়গা। কিন্তু এখন যদি আমি ফেনীতে যাই তাহলে উনি আর ফেনীতে যেতে পারবেন না, এটা তার ধারণা।

আরেকটা বিষয় আছে। ‘বাঁধনের বিচার চাই’ নামে আমি একটা বই লিখেছিলাম। ওবায়দুল কাদের তখন ক্রীড়া ও সংস্কৃতিমন্ত্রী। তিনি বইটা ব্যান করলেন। ওটা নিয়ে একটা বিরোধ হয়েছিল। আমিও ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। আমি তখন স্ট্যান্ডিং কমিটিতে ছিলাম, উনি ছিলেন মন্ত্রী। ওই সময় একটা কঠিন বাগবিতণ্ডা হয়। সেটা প্রায় হাতাহাতির পর্যায় চলে যায়।

সে কারণেই কী উপদেষ্টা হওয়ার পরও আপনাকে ফেসবুক লাইভে আসতে হলো?
উনি কিছুতেই চান না আমি উপদেষ্টা হই। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে লাইভে আসতে হয়েছে। উনার ধারণা, উপদেষ্টা হলেই আমি ফেনীতে যাব। তখন ওখানে উনার আর কোনো স্বাচ্ছন্দ্য থাকবে না।

তাহলে ফেনীতে যাচ্ছেন কবে?
আমি একবারেই যাচ্ছি না। কখনোই যাব না, যদি নেত্রী না বলেন। যখনই নেত্রী বলবেন, তখনই যাব। নেত্রী বলা ছাড়া আমি যাব না।

উপদেষ্টা হিসেবে দলের জন্য কী করবেন?
কোনো কিছুই করার নেই আমার। দল নিয়ে কোনো উন্নয়ন, পরিকল্পনা, ভাবনা-চিন্তা কিছুই নেই। কোনো দায়িত্বও নেই আমার। নেত্রী যখন যেটা বলবে, তখন সেটা করব। ব্যাস, এটুকুই।

এখন তো আপনি শুধু ফেনীর নেতা না, সারা দেশের নেতা...
আমি যা-ই হই না কেন, আমার কোনো চিন্তা নেই, কোনো পরিকল্পনা নেই। কোনো কাজও নেই। আমাকে উপদেষ্টা বানিয়েছে, আমি সম্মান পেয়েছি, স্বীকৃতি পেয়েছি। এরপর নেত্রী যদি কখনো কোনো দায়িত্ব দেয়, সেটা করব।

কিন্তু যে ফেনী আপনার এত প্রিয়, যেখান থেকে তিনবার এমপি হয়েছেন, সেখানে যাবেন না?
যে ব্যক্তি বাংলাদেশ স্বাধীন করল, সেই বঙ্গবন্ধুই তো সপরিবারে নিহত হয়ে গেলেন। এই দেশে তো এও সম্ভব।

রাজনীতি থেকে আপনার কী প্রত্যাশা...
উত্তর একটাই। কোনো চাওয়া নেই, পরিকল্পনা নেই, কোনো চিন্তা নেই। আমি খুশি যে, আমাকে একটা সম্মান দেওয়া হয়েছে। নেত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমি সন্তুষ্ট। এখন আমার কোনো কিছুই করার পরিকল্পনা বা চিন্তা নেই। শুধু নেত্রী যখন যেটা করতে বলবে, সেটা করব।