দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী

মাহমুদুর রহমান মান্না

কাজল রশীদ শাহীন ১০:২১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৭, ২০১৯

print
দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী

চাকসুর সাবেক জিএস, ডাকসুর ইতিহাসে রেকর্ড দুবারের নির্বাচিত ভিপি ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না। বর্তমানে তিনি নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক, জোটের সদস্য হিসেবে আছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। বরাবরই উচ্চকণ্ঠ এই নেতা খোলা কাগজের সঙ্গে বলেছেন ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান, ছাত্ররাজনীতি, জাসদ-বাসদের অতীত-বর্তমান, আওয়ামী লীগে যোগদান ও ছেড়ে আসাসহ বর্তমানের বিবিধ প্রসঙ্গে। আলাপচারিতায় কাজল রশীদ শাহীন

সরকার হঠাৎ ক্যাসিনোর দিকে মনোযোগ দিল কেন?
এটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়। হঠাৎ করেই করেছে, ঘটনাপ্রবাহ অবশ্য তা বলছে না। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেন, আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এত কিছু জেনে তাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে, আমি তা মনে করছি না। বেশ আগে থেকেই সে অবজারভেশনে ছিল। দু-তিনজন লোককে ফোকাস করা হয়েছিল, নিশ্চয় তাদের মধ্যে সম্রাট ছিল না। এই অ্যাকশনটা যে জায়গা থেকে নেওয়া হয়েছিল, সেটা মেজর জায়গা। তবে লক্ষ্যটা আমার কাছে পরিষ্কার নয়।

ছাত্রলীগের ঘটনার সঙ্গে এর পরম্পরা আছে?
পরম্পরা থাকতেই পারে কিন্তু সেটা খুব দৃশ্যমান নয়। ওরা ঘুষের বখরা চেয়েছে, পায়নি। ওদের আপনি পদ থেকে বের করে দিয়েছেন। কিন্তু যিনি ভাইস চ্যান্সেলর, তার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিলেন না! অথচ তিনি নিজে টাকাটা ভাগ করে দিলেন।

আমি মনে করি, এটা প্রমাণিত। তদন্ত হোক, বের হোক। ভিসি যেহেতু তদন্ত চেয়েছেন। তদন্ত যে কেন হচ্ছে না, সেটাও আমার কাছে রহস্যের মতো লাগে। কিন্তু পত্রপত্রিকায় যেভাবে আসছে-তারা বলেছে, টাকা পেয়েছে। আমি ধরছি, এ কথা সত্য। তার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেননি। কোনো অভিযোগ নয়, বরখাস্ত তো দূরের কথা। আমি তো মনে করি, তার নামে মামলা হওয়া উচিত। কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি। ফলে এটাকে আমি শুদ্ধি অভিযানের মধ্যে কিছুতেই ফেলতে পারছি না।

ছাত্রলীগের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটাও আমি মনে করি না। শুধু তো শোভন-রাব্বানী নয়, এই সংগঠনে আরও অনেক দুর্নীতিবাজ আছে, তাদের বিরুদ্ধে তো কিছু করা হচ্ছে না। উনারাই তো অনেকবার বলেছেন, সরকারের সব অর্জন বিসর্জন দিচ্ছে ছাত্রলীগ। তা ছাড়া শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তারও তো কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে না। এমন অপরাধের শাস্তি তো শুধু পদত্যাগ হতে পারে না।
এরপর যেটা হচ্ছে, তা হলো নিয়োগ বাণিজ্য। রোকেয়া হল বলেন, বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বলেন কিংবা ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভর্তি কেলেঙ্কারি, রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলেন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন দুর্নীতির অভিযোগ আছে। কোথাও তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু পদত্যাগ করলে তো আর হয় না। সো এটিকে আমি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান মনেই করছি না।

আরেকটা কথা বলা খুব জরুরি মনে করছি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যদি আপনি অভিযান চালাতে চান, তাহলে সবচেয়ে জরুরি জায়গা হচ্ছে রাজনীতি। যে দল ক্ষমতায় আছে, সে দলের মধ্য থেকে যদি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু না হয়, তাহলে তা আস্থা অর্জন করতে পারবে না। শুধু পুলিশ দিয়ে এটা হতে পারে না। প্রথম দিন যুবলীগ চেয়ারম্যান অভিযানের বিরুদ্ধে একদম সিরিয়াসলি বলেছিল। পরদিনই দেখা গেল, সাপ যেভাবে ফণা নামিয়ে ফেলে, সেভাবে ফণা নামিয়ে ফেললেন তিনি। এরপরই দেখা গেল, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কথা বলতে শুরু করলেন। উনি বোঝাতে চাইলেন বিরাট একটা কিছু হবে। জানি না কতদূর কী হবে? আমি শেষটা দেখার অপেক্ষায় আছি।

অভিযানের কারণে জনগণের কাছে কিছুটা হলেও তো পজিটিভ মেসেজ যায়...
না, কোনো পজিটিভ মেসেজ যায় বলে আমি মনে করি না। তবে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। দেখেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তখন সাইকেল চালানো শুরু করেছিলেন। সেভ ফুয়েল, যানজট কমাও, পরিবেশ বাঁচাও-এগুলো বলেছিলেন। পরে তো দেখলাম আমরা! যতগুলো সামরিক শাসন এসেছে, আইয়ুব খান থেকে শুরু করে, তারা ক্ষমতায় এসে নানা কথা বলত। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও দেখেছেন কিন্তু শেষ পরিণতিটা কী?

তো এই অভিযানের ব্যাপারেও একই কথা। একজন হুইপ তো রীতিমতো রিঅ্যাকশন দেখিয়েছেন। অন্যরা চুপ। কারণ দল তো আসলে এই আন্দোলনের সঙ্গে নেই। দু-একজন মন্ত্রী বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছেন, এর বেশি কিছু না। তাই এটাকে সমাজ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার আন্দোলন মনে করার কোনো কারণ নেই।

যাদের ধরেছেন, তারা কত লাখ কোটি দুর্নীতি করেছে? আপনি তো বাংলাদেশ ব্যাংকের বেলায় কিছুই করেননি, হলমার্কের ব্যাপারে কিছু করেননি। ব্যাংকগুলো যে ডুবে গেল, কিছুই করেননি। সো এখানে দুর্নীতিবিরোধী কোনো মেসেজ যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে মানুষ হয়তো কিছুটা বিভ্রান্ত হতে পারে, তবে এটা খুব অল্প দিন। এখন আবার আপনি ফুয়াং ক্লাবে যাচ্ছেন, পার্লারে গিয়ে হামলা দিচ্ছেন।

তাহলে সরকারের মধ্যেই বা হঠাৎ কী এমন ঘটল যে, তারা এটা করতে গেল?
এটা আমি বলতে পারব না। আমার কাছে এটা বিগ পাজল। এতে যুবলীগ প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ছাত্রলীগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৬ এমপির নামে নাকি লিস্ট হয়েছে, তার মানে দলও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সো, প্রধানমন্ত্রী এ কাজটা কী বুঝে করছেন আমি তা জানি না। উনি যদি অ্যাস্টাবলিশ করতে পারতেন, আমি দল চিনি না, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করছি। কিন্তু সেটা তো হয়নি। তাহলে ব্যাংকগুলো রক্ষা করার জন্য আরও আগে নামতেন। করেননি। এখন শুরু করতে পারতেন, করেননি।

ইউনিভার্সিটিগুলোতে যে দুর্নীতি হচ্ছে তারও কিছুই করেননি। জাহাঙ্গীরনগরের বিষয়টা নিয়ে কথা হচ্ছে, ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারিকে ৬০ কোটি টাকা ডিমান্ড করেছেন। কেন? কারণ আপনি ইউনিভার্সিটির কমিটিকে দিয়েছেন দেড় কোটি টাকা। ওটা শত শত কোটি টাকার প্রজেক্ট। সেই প্রজেক্টের বিরুদ্ধে সেখানকার ছাত্র-শিক্ষকরা আন্দোলন করেছেন, সেসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি আপনি। আমি কীভাবে বলব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান হচ্ছে! বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর মতো গল্প বলা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিরকুট দিয়ে ভর্তির যে বিষয়টা বলা হচ্ছে, এটা আগের ধারাবাহিকতা মাত্র...
যারা জানেন না, তারা বলছেন। এডমিশনের কোনো সিস্টেমই ছিল না তখন। শিক্ষার্থী সংখ্যার দিকে থেকে তখন জগন্নাথ কলেজ ছিল বিগেস্ট এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন। সেখানে ভর্তি নিয়ন্ত্রণ করত ছাত্রনেতারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও একই সিস্টেম ছিল। আমি নিজেই করেছি এটা। তখন উপাচার্য ছিলেন প্রফেসর মতিন চৌধুরী। আমার কাছে দেড়শ না দুইশ ফরম ছিল। আমি স্যারকে গিয়ে বললাম, এগুলো এডমিশন করতে হবে।
উনি প্রথমে খুব রিয়েক্ট করলেন, বললেন, আমি এসব করি না। আমি বললাম, আমি জানি, আপনি তিনশর মতো ফর্ম মুজিববাদী ছাত্রলীগকে দিয়েছেন, কাকে কাকে দিয়েছেন তাও জানি। আপনি ওটা না করলে আমি আপনার কাছে আসতাম না। আমি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, আমাকে কোনো এডমিশন টেস্ট দিতে হয়নি। কাউকেই দিতে হয়নি। বিকজ এই সিস্টেমটা ছিল না।

পরে আমরা যখন ডাকসুতে, সে সময় ভিসি ছিলেন ফজলুল হালিম চৌধুরী। তখন এডমিশন টেস্ট সিস্টেমটা এসেছে। একবার আমি গেছি তার কাছে, তিনি বললেন, তোমাকে তো ভালো জানি, তুমি এটা করছ কেন? আমি বললাম, আপনারা করছেন তাই আমাকে করতে হচ্ছে। তারপর আমি বললাম, তাহলে আপনারা এটা বন্ধ করেন। তিনি বললেন, তোমরা সহযোগিতা করবে? বললাম, করব।

তারপর এটা নিয়ে একাডেমিক কাউন্সিলে আলোচনা হলো। একটা সিস্টেম দাঁড় করানো হলো। ফোরটি পার্সেন্ট এসএসসি, ফোরটি পার্সেন্ট এইচএসসি, টুয়েন্টি পার্সেন্ট রিটেন। তারপর ভাইভা দিয়ে তবেই ভর্তি। সিস্টেমটা এখনো চলছে এবং প্রত্যেকে এটা ফলো করছে এত বছর ধরে। তাহলে হঠাৎ করে এখন এটা চেঞ্জ হলো কেন? আমাদের সময় এরকম করে ভর্তি হতো, এটা ঠিক। এটা ভালো ছিল আমি তা বলছি না কিন্তু ওই রকমই ছিল। ফলে তখন সেটাই নিয়ম, আমরা নিয়মের ব্যত্যয় করিনি। কিন্তু তারপর তো আপনি আইনগতভাবে এটা বন্ধ করেছেন, তারপর করলেন কেন? এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

আপনার সময় মুজিববাদী ছাত্রলীগকে সুবিধা দেওয়ার কথা বলছিলেন। এভাবে ওরা করেছে, তাহলে আমরাও করব-এই রেওয়াজটাই তো সমস্যা...
এটা করতে হবে তো। এটা দুর্নীতির প্রতিযোগিতা নয়। ওরা একশো কোটি টাকা লুট করেছে, আমরা আরও বেশি করব, বিষয়টা এমন নয়। কিন্তু আমরা যখন ছাত্র সংগঠনে প্রতিযোগিতা করছি, তখন বিষয়টা অন্যরকম। আমার প্রতিপক্ষ যদি দুশজনকে এভাবে ভর্তি করাতে পারে, আমার সংগঠনও কিন্তু করতে চাইবে। অন্যথায় আমি টিকব না তো। এই প্রতিযোগিতা কিন্তু সারা পৃথিবীতেই আছে। আবার আপনি যদি বন্ধ করতে চান তাহলে সবার জন্যই বন্ধ করে দেন। আমরা বন্ধ করেছিলাম তো।

ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি নিয়ে গত কয়েক বছরে কোনো আনফেয়ার ব্যাপার ছিল না। আমরা ব্যালান্স করেছি, আল্টিমেটলি তুলে দিয়েছি। কিন্তু এখন তো সেটা হচ্ছে না। অমুক অপরাধ বিএনপি করেছে, জুয়া তো জিয়া চালু করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্যাসিনো তো দুটি দলের প্রতিযোগিতার বিষয় হতে পারে না। কিন্তু আমার কতজন সমর্থক ভর্তি হলো, এটা প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল।

আপনার তো রাজনীতির দীর্ঘ জার্নি। আপনার কী ধারণা, রাজনীতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে?
না, ক্রমশ খারাপের দিকে গেছে, এরকম না বিষয়টা। তবে আমি বলব, নব্বইয়ের পর থেকে এটা হচ্ছে বেশি। এর আগে ছিল না, তা কিন্তু না। আমরা কতগুলো ইল্যুশন তৈরি করার চেষ্টা করি, যার ক্যাম্পেইনের শক্তি বেশি থাকে ওরা জয়ী হয়ে যায়। সেভেন্টি থ্রির ডাকসু আমি সরাসরি দেখেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের সেটাই প্রথম ঘটনা। এখন কেউ যদি বলে, ওই সময়টা স্বর্ণযুগ ছিল, তাহলে তো হবে না। তবে নৈতিকতার যে অধঃপতনটা এখন হচ্ছে, এটা সর্বগ্রাসী। স্বাধীনতার পর থেকে এটা গ্র্যাজুয়েলি হয়েছে, এখন প্রায় চূড়ান্ত জায়গায়।

তাহলে এখান থেকে মুক্তি কীভাবে? নাকি নিয়তির ওপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া...
না, নিয়তির ওপর ছেড়ে দিলে তো কিছুই পাবেন না। নিয়তি মানে কি, আপনি ওটার কাছে সারেন্ডার করছেন। কিন্তু না, এর বিরুদ্ধে আপনাকে দাঁড়াতে হবে, সমাজকে দাঁড়াতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে, যে রাজনৈতিক দলগুলো সমাজকে কমান্ড করতে পারে, তারা যদি এই নীতিতে আসেন তাহলে মুক্তিটা তাড়াতাড়ি আসবে। এখন যাদের কমান্ড পাওয়ার আছে, ওইসব রাজনৈতিক দলের প্রতি আমি আশাবাদী না। তারা ক্ষমতায় ছিলেন। তাদের অতীত এটা বলে না যে, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। যখন আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলি, তারা আমাদের বলেন, অতীতে যাই হয়েছে, ভবিষ্যতে আর করব না। কিন্তু বাস্তবতা তো তা বলে না। মেইন কথা, রাজনীতি শুদ্ধ না হলে সমাজ শুদ্ধ হবে না।

কিন্তু রাজনীতিকে তো কাউকে না কাউকে শুদ্ধ করে তুলতে হবে। সেই নেতৃত্বের শূন্যতা প্রকট আমাদের...
দেখুন, আমি তো আওয়ামী লীগের শূন্যতা পূরণ করতে পারব না। আমি বিএনপির শূন্যতাও পূরণ করতে পারব না। অথবা ধরুন, আপনি কোনো দলই করেন না সুতরাং আপনি কোনো দলের মধ্যেই কোয়ালিটি আনতে পারবেন না। তবে একটা হতে পারে যে, সামাজিক প্রভাব বা চাপে এই দলগুলো সিধা পথে চলতে বাধ্য হবে। সে রকম আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, যেত। কিন্তু হয়নি। আরেকটা হতে পারে, এর বাইরে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠলে। সেই শক্তির পেছনে মানুষ এসে দাঁড়াল, ঐক্যবদ্ধ হলো। পৃথিবীতে এমন অজস্র উদাহরণ আছে। বাংলাদেশে হয়তো এরকম উদাহরণ দেওয়া যাবে না। তবে আমরা, আমি যে রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, আমাদের এইমটা মূলত তাই।

এটা সহজ কাজ নয়। অনেকের কাছে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এর বিকল্প নেই। নিয়তির কাছে ছেড়ে দেওয়া মানে তো আত্মসমর্পণ করা। তার মানে, এভাবে চলতে চলতে আরও অধঃপতন হবে। আমরা এখন যে অধঃপতন দেখছি, এর চেয়েও যে অধঃপতন হতে পারে না, তা কিন্তু না।

আপনি ভেনেজুয়েলার মতো দেশ দেখেন, কত ভালো ছিল অথচ এখন কোথায় চলে গেছে। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে, যারা সম্ভাবনাময় ছিল কিন্তু দারিদ্র্যের চূড়ান্তে নেমেছে। আমরা যদিও এখনো অতদূর যাইনি তবে এভাবে চলতে থাকলে যেতে বেশি সময় লাগবে না। তাই এর বিরুদ্ধে সামাজিক শক্তি, রাজনৈতিক শক্তির প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ছাত্ররাজনীতির সময় আপনি যে দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরে তাদের ব্যাপারে আপনার মোহভঙ্গ হয়েছে। আরও অনেকের ব্যাপারেও আমরা এমনটা দেখি। প্রতিবাদী বলে দল আপনাকে ধরে রাখতে পারেনি নাকি অভিযোজনেরও সমস্যা ছিল?
মে বি আমি এভারেজের চেয়ে একটু ডিফারেন্ট। ভালো-মন্দ আমি বলছি না, সেটা মানুষ জাজ করবে। তবে আমি একটু আলাদাই। একটা ঘটনা বলি, মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার সেফগার্ড হিসেবে পরিচিত। উনি একবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তাররা বলল, অপারেশন করতে হবে। বিদেশ নিয়ে যেতে হবে। মাহাথিরের প্রশ্ন, কেন, দেশে করা যায় না? বলা হলো, আমাদের হসপিটাল নেই।

ডাক্তাররা জানালেন, বিদেশে এই চিকিৎসার ভালো হসপিটাল আছে। কত সময় লাগবে? এত সময়। ততদিনে আমার অবস্থা কী হবে? কষ্ট পাবেন তবে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। উনি বললেন, আমি কষ্টটা সইতে রাজি আছি। দেশেই কর এবং উনি তাই করেছিলেন। এটার মধ্যে কোনো মিশেল দেওয়া আছে কিনা জানি না তবে আমি এটাকে সত্য মনে করি।

মাহাথিরের এমন আরও কাহিনী পড়েছি। এবার বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে কি এরকম একজন রাষ্ট্রনায়ক এসেছেন? আসেনি। ধরেন, মহাত্মা গান্ধী, তাকে নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু এটা ঠিক, উনি একজন সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ ছিলেন। খুবই সিম্পল লাইফ লিড করেছেন। আজকে যে লুটপাট হচ্ছে, সরকারের লোকরা করছে, গান্ধীজি এটা দেখলে বোধহয় সুইসাইড করতেন। ভাবা যায়, একজন নেতা এরকম হতে পারে! আমাদের এরকম একটা উদহরণও নেই।

আপনার প্রশ্নে ফিরে আসি। আপনি বলেছিলেন, কেন আমি থাকতে পারলাম না? আমি মনে করি, স্বাধীনতার পরে আমাদের এই এক্সামপলগুলো সেট করার দরকার ছিল। আমাদের দলগুলো সেরকমভাবে গড়ে তোলা দরকার ছিল। কিন্তু তা হয়নি। আমি আওয়ামী লীগ করিনি, জাসদ করতাম। জাসদের মধ্যে আমি এরকম অনেক ডেডিকেশন দেখেছি, প্রতিভা দেখেছি। কিন্তু জাসদ রাজনীতিটা একটা হঠরারিতার মধ্যে নিয়ে গেল।

জাসদের জন্মের ভেতরেই কি হঠরারিতা ছিল না?
হঠরারিতা বলব না, ওই সময় আসলে কোনো বিকল্প ছিল না। ধরেন, বাহাত্তর সালের সম্মেলনে যদি বন্ধবন্ধু রেসকোর্সে না যেতেন, মানে উনি যদি কোথাও না যেতেন, তাহলেই তো ছাত্রলীগ ভাঙে না। আমি তখন চাকসুর জিএস। আমাকে বক্তৃতা করার জন্য মঞ্চে ডাকা হয়েছিল। আমি বললাম, কী বক্তৃতা করব? বলা হলো, বঙ্গবন্ধুকে রেখে বক্তৃতা করতে হবে। তারপর আমাদের ওপর হামলা হলো, রব ভাইয়ের উপর হামলা হলো। তখন দাবি উঠল, পার্টি করতে হবে। মানে সিচুয়েশনই আমাদের ফোর্স করল পার্টি গঠন করতে। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, কেন, সেটাকে কি সামাল দিয়ে রাখা যেত না। আসলে এত বছর পরে এসে এটা নিয়ে আর ভাবতে চাই না। যা হয়েছে তা তো হয়েছেই।

স্বাধীনতার পর এত অল্প সময়ে জাসদের এত বড় একটা বিস্ফোরণ ঘটল। এটা না ঘটলেও তো পারত?
আসলে দুঃশাসনটা দ্রুতই মানুষের সামনে চলে এসেছিল। এত স্বপ্ন, এত জীবন উৎসর্গ, এত ত্যাগ-তিতিক্ষার পরও আপনার কম্বলটা চুরি হয়ে যাচ্ছে। আপনার টিন নিয়ে যাচ্ছে অন্য একজন। ফলে এসবের প্রতিবাদ যখন উঠল তখন মানুষ তরতর করে এর পেছনে দাঁড়িয়ে গেছে। আমার কথা হলো, ওই দাঁড়াবার পরে একটু যে থামবে, সেটা আর হয়ে ওঠেনি। ফলে হঠরারিতার পথে চলে গেল জাসদ। এটা যখন আমি স্পষ্টভাবে বুঝলাম, তখন আমার বয়স কম। তারপরও আমি এগুলোর প্রতিবাদ করলাম।

আমি খুব ক্যাটাগরিক্যালি মনে করতাম, গণবাহিনী গঠন ভুল ছিল। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর ভুল ছিল। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ভুল ছিল। এখন তো এসব প্রমাণিত সত্য। কিন্তু তখন তারা এটা মানতেই চায়নি। আমি এগুলো লিখেছি, সেই লেখাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বই ছাপা হয়েছে, জাসদ ন্যাশনাল কমিটি সেটা পাসও করেছে। সিরাজ ভাইরা জেল থেকে বেরুনোর পর সেটাও বন্ধ করা হয়েছে। এরপর তো আমাকে জাসদ থেকে বের করে দেওয়া হলো। তখন আমি ছাত্রদের মাঝে এমন পপুলার ছিলাম যে, আমার বহিষ্কারের কথা শুনে ঢাকা ইউনিভার্সিটির আপামর ছাত্র মিছিলে বেরিয়েছিল। আমি মিছিলে থেকে ভাবছি, কী হলো! ছাত্ররা ধরেছে, আপনাকে কিছু বলতে হবে। কিন্তু কী বলব আমি! প্রায় পাঁচ থেকে দশ হাজার ছাত্র। তখন আমি বললাম, আমি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। যা ঘটেছে, তার জন্য আমি মনে খুবই কষ্ট পেয়েছি। আমি সাত দিন পরে বলব, বটতলা সভায়। সাতদিন পরে যে সভা হয়, সেখানে মানুষ টইটম্বুর করছিল।

জাসদ সম্পর্কে যে কথাটা বলা হয়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ তারা তৈরি করে দিয়েছিল। তাহলে এটা কি কিছুটা হলেও সত্য?
না, মোটেও সত্য নয়। ১৫ আগস্ট যে ঘটনা ঘটল, তার সঙ্গে আমাদের বা জাসদের তো কোনো রিলেশনই ছিল না। আমার তখনো বলেছি, এটা ঠিক হয়নি।

আপনার রাজনীতির শুরু তো জাসদ দিয়েই। নাকি তার আগে অন্য রাজনীতি করতেন?
আমি ছাত্রলীগই করেছি। অন্য কিছু করিনি। ছাত্রলীগ তখন তো আর জাসদ ছাত্রলীগ ছিল না। ছাত্রলীগ ছিল একটা। আমি চাকসুর জিএস ছিলাম ইউনাইটেড ছাত্রলীগ থেকে। কিন্তু মুজিববাদীরাও একটা প্যানেল দিয়েছিল আমাদের বিরুদ্ধে। সেটাতে তারা জেতেনি। জাসদ থেকে যখন বেরিয়ে এসেছি, তখন পল্টনে একটা টিকিট ঘর ছিল, বাইতুল মোকররমের সামনে। ওখানে দাঁড়িয়ে আমি বলেছিলাম, জাসদ একটা তাসের ঘর। তারা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। আমাকে বের করে দিয়ে তারা যদি মনে করে তারা সেফ, তাহলে আমি মনে করি তারা ভুল করছে। যারা জাসদ করে, তাদের অনেকেরই এটা মনে থাকার কথা।

আপনি একাই, নাকি আরও অনেকে এ কথা বলেছিল।
ছাত্রদের মধ্যে অবশ্য জাসদ কিছুই পায়নি। তখন থেকে আমিও আর তাদের সঙ্গে কাজ করিনি। দলটির মধ্যে আসলে কিছু ছিলও না। জাসদ জোড়াতালি দিয়ে চলতে লাগল। তারপর তা ভেঙে গেল। বাসদ থেকে বেরিয়েও আমি একই কথা বলেছিলাম। আমাকে যে সমালোচনা করে আপনারা বের করছেন, এটা আপনাদের মধ্যেই আছে। আপনারাও টিকতে পারবেন না। মূল কথা হলো কি, তারা বলতে চায়, সমাজতন্ত্র এমন এক মতাদর্শ যার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করতে হবে। ব্যক্তি বলে কোনো জিনিস নেই, সে সমষ্টির কাছে নিবেদিত। ব্যক্তিগত কোনো বিষয় থাকা চলবে না।
জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ করতে হবে। আমি বুঝলাম, এভাবে হবে না, হওয়ার জিনিস না। এগুলো থেকে আমার বিরোধিতা শুরু হতে লাগল। যখন বাসদ থেকে আসলাম, একা এসেছি। জাসদ থেকেও একা এসেছি। লোকজন এসেছে আমার সঙ্গে তবে আমি কাউকে ডাকিনি। কাউকে কিছু বলিনি। তবে আমি আগেও ওয়েলফেয়ার স্টেটের কথা বলেছি। আমি মনে করি, এটা বাস্তবায়িত হলে সেটা হবে সমাজতন্ত্রের চেয়ে বেটার। যেমন স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো সমাজতান্ত্রিক দেশের চেয়ে অনেক ভালো আছে।

তার মানে আপনার নিজের একটা দার্শনিক লড়াই আছে...
জি। আমি আগে থেকে খুব পড়াশোনা করতাম। দেখতে চাইতাম, ঘুরতে চাইতাম। এখন তো বয়স হয়েছে। দেখতে দেখতে এমন একটা জায়গায় এসেছি, আমি মনে করি, বর্তমান সময়ের জন্য কল্যাণ রাষ্ট্রের বক্তব্য সঠিক।

(চলবে)