আমাদের সাহিত্যে দেশভাগ আসেনি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬

আমাদের সাহিত্যে দেশভাগ আসেনি

ড. কাজল রশীদ শাহীন ১০:২৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯

print
আমাদের সাহিত্যে দেশভাগ আসেনি

নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও মানববিদ্যা অনুষদের অধিকর্তা ড. মননকুমার মণ্ডল। অধ্যাপনার বাইরে তিনি সুপরিচিত বিশেষ গবেষণার জায়গা নিয়ে, তা হলো পার্টিশন স্টাডিজ। দেশভাগের সাহিত্য, প্রজন্মের ওপর তার প্রভাব, বয়ে বেড়ানো ট্রমার বয়ান, দেশভাগের ঐতিহাসিকতা নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। খোলা কাগজের পক্ষে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন ড. কাজল রশীদ শাহীন

আপনার কাজ বা আগ্রহের জায়গা নিয়ে বলুন।
বিশেষত আমার আগ্রহের জায়গা সাতচল্লিশ এবং একাত্তর। আমরা কিছু কাজ করতে চেয়েছি বিগত কয়েক বছর ধরেই। মানববিদ্যা বিভাগের অধীনে আমাদের একটা সেন্টার আছে- ‘সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেশন কালচারাল স্টাডিজ।’ আমার ব্যক্তিগত আগ্রহও তাই- পার্টিশন চর্চা, বাংলায় কীভাবে পার্টিশন হলো, পার্টিশনের পরবর্তী ফলাফল কী, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সেগুলোর রিফ্লেকশন কেমন...। ২০০৫-এ আমি যখন নেহরু ফেলোশিপ পেয়েছিলাম, কাজ করেছি বাংলা উপন্যাসের ওপর, আপনাদের এই ঢাকাতেই এসে কাজ করেছিলাম। সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর সময়কালে (ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বাংলাদেশ নামক একটি দেশ তৈরি হয়নি কিন্তু ডিপারচার হয়েছে) পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের যে উপন্যাস নিয়ে বেশকিছু আলোচনা করেছিলাম। সেই সূত্র ধরে আমার প্রথম বই ছিল, ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাস : ব্যষ্টি ও সমষ্টি’।

বাংলা উপন্যাসে দেশভাগের প্রতিফলন কতটুকু?
কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, লেখকরা এই জায়গাটায় খুব একটা ফোকাস করেননি। এটা বড় একটা অভিযোগ, দুঃখ এবং বেদনার জায়গা যে, আমাদের বড় সাহিত্যিকরা দেশভাগকে তাদের উপন্যাসের বিষয় করেননি। অন্তত প্রত্যক্ষভাবে করেননি। এত বড় একটা ঘটনা, এত প্রজন্ম ধরে বহমান একটা ঘটনা, তার প্রভাব তো কিছুটা আসবেই কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে দেশভাগ যে একটা বিষয় সেটা ষাটের দশকের পশ্চিমবঙ্গের উপন্যাসে দেখাতে পারবেন না।

এটা কেন নেই, আপনার কাছে কী মনে হয়?
আমরাই আসলে গোটা ইন্ডিয়ার পার্টিশন স্টাডিজের ন্যারেটিভটাকে পাঞ্জাবমুখী করে তুলেছি। তাই পাঞ্জাবের পার্টিশন যতটা ট্রমাটিক এক্সপেরিয়েসন্স নিয়ে সাহিত্যে প্রতিফলিত হলো, আমাদের পার্টিশন এমনকি তারপর আরেকটি দেশ জন্ম নিলেও সাহিত্য তার দ্বারা আক্রান্ত হলো না? এখনও পার্টিশন নোভেল বলতে অনেকেই খুশবন্ত সিংয়ের ট্রেন টু পাকিস্তানকে বোঝে, মান্টোর গল্পকে বোঝে। অথচ এগুলো পাঞ্জাব বেজড। পার্টিশন স্টাডিজের টেক্সট মানেই পাঞ্জাবের টেক্সট- এটা কে ঠিক করে দিল? আসলে কেউ ঠিক করে দেয়নি, তখন এই নোভেলগুলো ছিল। পরবর্তীতে আমরা তাদের সঙ্গে কমপিট করতে পারিনি।

দেশভাগ নিয়ে গবেষণায় আমাদের কোনো ত্রুটি আছে কি?
নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ভারতভাগের ইতিহাসকে হাই পলিটিক্স দিয়ে দেখা হতো। কোন নেতা কী বলেছে, কোন রাজনৈতিক দল কী বলেছে, সেগুলোর ইমপেক্ট কী- এ হিসেবেই আমরা পার্টিশনের হিস্ট্রি পড়তাম। খেয়াল করে দেখবেন, এই সময়ের পর থেকে ‘ওরাল ন্যারেটিভস’ একটা বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে। মেইনলি ইট ওয়াজ ডান বাই উর্বশী বুটালিয়া। বইয়ের নাম ‘আদার সাইড অব সাইলেন্স’। এই বইতে যে ইন্টারভিউগুলো নেওয়া হয়েছে সেগুলো পাঞ্জাবের পার্টিশন অ্যাফেক্টেড মানুষের ইন্টারভিউ। আমাদের এখানকার আশীষ নন্দী, শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় কাজ করলেন। এরাও সেই হাই পলিটিক্স দৃষ্টিকোণ থেকে দেশভাগকে দেখার চেষ্টা করলেন- কে দায়ী, কে দায়ী নয়; কে পক্ষে কে বিপক্ষে। কিন্তু যারা এফেক্টেড, সেসব সাধারণ মানুষের মুখ থেকে দেশভাগের কথা কেউ নিল না!

পার্টিশন নিয়ে আপনার গবেষণার পদ্ধতি কী ছিল?
দেশভাগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি ৪০০ ঘণ্টা ইন্টারভিউ করেছি! যাদের কথা নিয়েছি তারা কেউ কলকাতা শহরের নন, ওই প্রান্তিক জেলার একজন সাধারণ মানুষ। তারা কেউ কিন্তু কোনো নেতাকে দায়ী করেননি। পার্টিশনের তলার দিকের ছবি কেমন সেটা জানা যায় এদের মুখ থেকে।

একাত্তরে বাঙালির যে সংগ্রাম, এটাকে কীভাবে দেখেন?
একাত্তরের যে সংগ্রাম, এমন বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম বাঙালি মধ্যযুগের পরে আর করেনি। যুদ্ধে বাঙালি জিতেছে এমন ঘটনা কিন্তু বাঙালির ইতিহাস বলে না। একাত্তর বাদে আপনি বাঙালির এমন কোনো ঘটনা দেখাতে পারবেন না, যেখানে যুদ্ধে জিতে সে তার অধিকার আদায় করে নিয়েছে। বাঙালি তো মেনে নেওয়া জাতি, সে সবকিছু অ্যাকোমোডেট করেছে। তার চিন্তা-চেতনা সংস্কৃতির মধ্যে একটা সংমিশ্রণ আছে। অবিমিশ্র বাঙালি সংস্কৃতি বলে কিছু হয় না। তার মধ্যে ভাষাগত সমন্বয় আছে, সংস্কৃতির সমন্বয় আছে, ধর্মের সমন্বয় আছে।

যারা সুবিধাভোগী তাদের ন্যারেটিভ আর যারা নয় তাদের ন্যারেটিভ তো এক হবে না...
অবশ্যই আলাদা। এটা আপনি ওই ন্যারেটিভ থেকেই ধরতে পারবেন। তারপরও ন্যারেটিভ আপনার লাগবেই। কারণ ইতিহাস দিয়ে পার্টিশনের কাছে পৌঁছানো যায় না। যে বর্ডারে থাকে সে বর্ডারের মধ্য দিয়ে পার্টিশনের দিকে যায়। যে লোয়ার ক্লাসের মানুষ, সে তার মতো করে পার্টিশন দেখে। তারা যে নিগ্রহের ভেতর দিয়ে গেছে তা দিয়েই তারা দেশভাগকে দেখার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ দলিত সম্প্রদায়ের কথা ভাবতে পারেন।

পার্টিশন নিয়ে আপনার গবেষণার উপসংহার কোথায়? আপনাদের কোনো দাবি-দাওয়া আছে?
দাবি-দাওয়ার কিছু নেই। একটা আর্কাইভ করতে চাই। বাংলার পার্টিশনের ফলে এত বড় একটা দেশের (বাংলাদেশ) জন্ম হলো অথচ তার কোনো ডিজিটাল আর্কাইভ নেই। মুক্তিযুদ্ধকে গ্লোরিফাই করা হচ্ছে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাধারণ মানুষের যে ভয়েস, সেগুলো সংরক্ষিত হয়নি ভালোভাবে। দ্বিতীয় কথা হলো, আর্কাইভটা হবে বাংলায়। ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের সংরক্ষণ নয়।

ইংরেজিতে কাজ হলে কোনো সমস্যা?
ভাষাটা সমস্যা নয়; কিন্তু অবশ্যই কাজটা হতে হবে আমাদের কারও। সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ নামে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যা হচ্ছে, এগুলো আসলে বড় একটা চক্র। আপনার লিটারেরি এজেন্ডা কোনোভাবেই বাইরে থেকে ঠিক হয়ে আসতে পারে না। আপনার তো নিজস্ব একটা লিটারেরি হিস্টোরিওগ্রাফি আছে। উপমহাদেশের ভাঙন নিয়ে যত কাজ সেগুলো কোথায় হচ্ছে? সব ইউরোপের কোনো ইনস্টিটিউট কিংবা জার্মানির কোনো ইনস্টিটিউটে। এটা ঠিক নয়।