ব্যাংকিং খাত গরিববান্ধব নয়

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ২ কার্তিক ১৪২৬

ব্যাংকিং খাত গরিববান্ধব নয়

আহসানুল আলম পারভেজ

কাজল রশীদ শাহীন ১০:১৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০১৯

print
ব্যাংকিং খাত গরিববান্ধব নয়

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ। ব্যাংকিং খাতের এই বিশেষজ্ঞ ছিলেন রূপালী ব্যাংক এবং সাধারণ বীমা করপোরেশনের সাবেক পরিচালক। বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে। খোলা কাগজের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কথা বলেছেন গরিবের অর্থনীতি, ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থা, মানবিক ব্যাংকিং, সিএসআর প্রসঙ্গে। সঙ্গে ছিলেন কাজল রশীদ শাহীন

আপনার ‘গরিবের অর্থনীতি’ দিয়ে শুরু করি। দেশের প্রেক্ষাপটে গরিবের অর্থনীতির ক্ষেত্রে আপনার অবদান কী?
গরিবের অর্থনীতি নিয়ে ব্যক্তিপর্যায়ে, আমি আপনি বা একজন ব্যক্তি রাজনীতিবিদ খুব ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন না। আপনি যখন ‘গরিবের অর্থনীতি’ বলছেন, তখন এর সঙ্গে রাষ্ট্রের ভূমিকাটাই আসল ভূমিকা। আমরা শুধু গরিবের পক্ষে বলতে পারি। বলতে পারি যে রাষ্ট্র গরিবের পক্ষে না।

রাষ্ট্র চালাচ্ছে যারা, তারা গরিবের দুঃখ বোঝে না। আমরা বলতে পারি, জাতীয় সম্পদের হিস্যা গরিব লোকটি ঠিকভাবে পাচ্ছে না। আমি শুধু বলতে পারি, আমার বুয়ার ছেলে, আমার ড্রাইভার, আমার কাজের ছেলে, পাশের চায়ের দোকানের ছেলেটা ‘১৭৫২ ডলার’ পাচ্ছে না।

এখনো আমাদের দেশে চার কোটি মানুষ আনব্যাংকড। বিতর্ক হচ্ছে, ব্যাংকের সংখ্যা বেশি না কম, আমি সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। আমার কথা হচ্ছে, এদেশে এখনো চার কোটি মানুষ আনব্যাংকড আছে। আমি গরিবের অর্থনীতি বলতে ওটাই বুঝাচ্ছি। কথাটা হচ্ছে, এখন কি আমরা আরও বিশটা ব্যাংক খুলব বাকি এই চার কোটি লোকের অর্থ আত্মসাৎ করার জন্য? মালয়েশিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুরে টাকা পাচার করার জন্য? নাকি আমরা ওই চার কোটি মানুষকে ব্যাংকিংয়ে আনব টাকা দেওয়ার জন্য।

আমার অর্থনীতির গুরু আতিউর রহমান সাহেব, আতিউর ভাই দশ টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট করার পদ্ধতি চালু করলেন। বিভিন্ন মিডিয়া, পত্রপত্রিকা বলার চেষ্টা করল, এটা একটা গরিববান্ধব পদক্ষেপ। আমি এ ব্যাপারে একেবারেই দ্বিমত পোষণ করি। যেসব পত্রপত্রিকা এটাকে গরিববান্ধব বলেছে, আমি শুধু তাদের একটা অনুরোধ করব, দশ টাকা দিয়ে কতজন অ্যাকাউন্ট খুলেছে, একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন।

যদি বিশ লাখ লোক অ্যাকাউন্ট খুলে থাকে এবং ওখানকার মধ্যে যদি শুধু দুইশ জনকে ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে ওই বিশ লাখ লোকের বালিশের নিচে, মাটির ব্যাংকে, টিনের ব্যাংকে যে টাকাগুলো লুকানো ছিল সেটাও আমরা ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে এসে সম্ভবত সেই একশ পরিবারের কাছে পাঠালাম। তেলে মাথায় তেল গেল আর এদিকে হাতছাড়া হলো গরিবের দশটা টাকাও।

যদি এই দশ টাকার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বলত, দশ টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলেন তারপর গরু কেনার জন্য চল্লিশ হাজার টাকা নিয়ে যান, ঠেলাগাড়ির টাকা নিয়ে নেন, এক লাখ-দুই লাখ টাকা নিয়ে যান, তাহলে ঠিক ছিল। কিন্তু আসেন, আসেন বলে গরিবের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে কিন্তু তাদের দেওয়া হচ্ছে না। সো দ্যাট স্টেপ নট পুওর ফ্রেন্ডলি। কারণ দশ টাকা দিয়ে যে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, সেটা ডিপোজিট নেওয়ার জন্য, লেন্ডিং করার জন্য নয়।

আরও চার কোটি মানুষকে ব্যাংকিং খাতে নিয়ে আসব নিশ্চয়ই ওদের শেষ সম্বলটুকু লুট করার জন্য নয়। তাদের কাছে ঋণের প্রবাহ পাঠাবার জন্য, যেন তাদের হিস্যাটা তারা পেয়ে যায়। ‘গরিববান্ধব’ অর্থনীতি আসলে একটা টার্ম, যা আমি ব্যবহার করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

তাহলে আমাদের ব্যাংকগুলো এখন লুটেরার ভূমিকা পালন করছে?
ব্যাংকগুলো লুটেরার ভূমিকা পালন করছে না, ব্যাংকগুলো তাদের টাকা লুটেরাকে দিচ্ছে। আমাদের ব্যাংকে এখন এইটটি-টু রুল পালন করছে। আমার, আপনার, গরিবের, মজুরের, ভালো-মন্দ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের টাকাগুলো নিয়ে তারা এটা করছে। অর্থাৎ আশি পার্সেন্ট মানুষের টাকা নিয়ে গিয়ে দুই পার্সেন্ট মানুষকে দিচ্ছে! সো লুটেরারা টাকাগুলো পাচ্ছে এবং এর ক্লান্ডারিং হচ্ছে, টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। আবার সে টাকা আনা, না আনা, রং খোঁজাসহ নানা কিছু হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র কি সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে?
রাষ্ট্র একটা বড় জায়গা। আমি মনে করি, কোনো রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রত্যেকটা সেক্টর, প্রত্যেকটা অরগান ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হয় না। কোনো কোনো জায়গায় রাষ্ট্রের অনেক সাদা জোন আছে, কোনো কোনো জায়গায় অ্যাশ জোন আছে, কোনো কোনো জায়গায় ব্ল্যাক জোন আছে। যারা মাফিয়া বা ডন, তারা রাষ্ট্রের যেসব অরগান চালাচ্ছে, ওইসব অরগান তাদেরই কোটারি স্বার্থই রক্ষা করে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ কেন, উন্নয়নশীল যে কোনো দেশই এই কথাটা বলে।

এক্ষেত্রে পুঁজিবাদের দায় কতটা?
আমরা পুঁজিবাদের স্ট্রাকচারে আছি-এটা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। তবে ‘আলোকিত পুঁজিবাদ’ নামে আরেকটা শব্দ আছে, যেটা আমাদের চর্চা করা উচিত। এনলাইটেন্ড ক্যাপিটালিজম। যে সমাজতন্ত্রের মধ্যে কম্পিটিশন সেন্সটা নেই, আমি অনেক বড় হব, হিমালয়ের সমান হব-সেই সুযোগ নেই, রাষ্ট্র যেখানে ফুলের বাগানের মতো, গাছের মতো ব্যক্তিকে ছেঁটে দেয়, তার থেকে মোর সাস্টেনেবল বলেই পুঁজিবাদ এগোচ্ছে। কিন্তু পুঁজিবাদ যখন আত্মবিধ্বংসী প্রসেসে চলে যায়, তখন সেটা হয় ব্লাইন্ড ক্যাপিটালিজম এবং এখানেই যত সমস্যা।

আলোকিত পুঁজিবাদ মানে অন্তত শ্রমিক তার শ্রমের একটা সম্মানজনক মুনাফা পাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন যেটা বারো, তের, পনের ডলার হয়ে গেছে পার আওয়ার। অর্থাৎ আপনি যে কোনো কাজ করেন, হোক উঁচু বা নিচু, এসবের পার্থক্য কম। কিন্তু আমাদের এখানে কি অবস্থা?

তো গরিববান্ধব অর্থনীতি বলতে আমি বুঝি এই ব্যবচ্ছেদ করা-আমাদের পাঁচ লাখ তেইশ হাজার একশ নব্বই কোটি টাকা বাজেটের কত অংশ রেভিনিউ খাতে স্যালারিতে চলে গেল। কত অংশ ঋণ শোধ করার জন্য চলে গেল। কত অংশ লুট হয়ে যাওয়া ব্যাংকে ভর্তুকি হিসেবে চলে গেল। কত অংশ আমার চিকিৎসা খাতে তাও আবার উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, অ্যাম্বুলেন্সে চলে গেল। ওখান থেকে ফরটি পার্সেন্ট টাকা আবার লুট হলো। কারণ যেখানেই প্রজেক্ট, সেখানেই অন্তত চল্লিশ পার্সেন্ট টাকা লুট হবে এটাই স্বাভাবিক।

এটাকে স্বাভাবিকভাবে ধরছি কেন?
পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, তারা করাপশনকে স্বীকার করে নেয়। কোনো কোনো দেশে এটাকে স্পিড মানি বলে। যাই হোক, বাজেটের কথা বলি। এই যে বলা হয় জনবান্ধব বাজেট-এই জনতার মধ্যে আমি আছি, আপনি আছেন, এমপি সাহেবও আছেন। আমরা কিন্তু গরিবের কাতারে নেই।

র‌্যাডিসন হোটেলের সামনে যে টোকাইগুলো উচ্ছিষ্ট খাদ্য নেয় বা একমুঠো খাবারের জন্য যারা কাগজ খুঁজে বেড়ায় তাদের কাছে বাজেটের পাঁচ লাখ তেইশ হাজার একশ নব্বই কোটি টাকার ফ্লোটা কীভাবে গেল, না গেলে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে সেটা ঠিক করাটাই হলো গরিবের অর্থনীতি।

ধরুন, রাষ্ট্র কৃষককে অনেক কিছু দিচ্ছে কিন্তু একজন বুয়াকে কী দিচ্ছে? এদেশে কৃষক, শ্রমিক, গার্মেন্টের মেয়ে, বুয়াসহ আরও অনেক মানুষ আছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা কী? শুধু এই ভূমিতে তারা জন্মগ্রহণ করেছে, এটাই! অন্যথায় এটা ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের প্রতিনিধিত্ব কোথায়? অর্থনীতিতে তাদের স্টেক কোথায়? গরিবের অর্থনীতি বলে আমি এই মানুষগুলোকে অ্যাড্রেস করার কথা বলে থাকি।

আতিউর রহমান মানবিক ব্যাংকিংয়ের কথা বলেন। এ নিয়ে আপনার কী মন্তব্য?
আতিউর রহমান আমার চেয়ে ওপরের স্কেলের মানুষ। আমার চেয়ে বয়সও দশ-বারো বছর বেশি। তাই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো উনি খুব সফট স্পোকেন। উনি অনেক কম্প্রোমাইজিং কিন্তু আমি এখনো কিছুটা রাগী। দশ টাকার অ্যাকাউন্টকে উনি মানবিক বলছেন কিন্তু আমার কাছে এটা শোষণমূলক।

উনি ব্যাংকিংয়ের বর্তমান ফ্রেমওয়ার্কটাকে অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছেন আর আমি অ্যাকসেপ্ট করে নিচ্ছি না। পৃথিবীর কোনো দেশে ‘কুশান’ অর্থাৎ আমানতের হার থেকে ঋণের সুদের হারের ব্যবধান তিন পার্সেন্ট হয় না। আমার কষ্ট করে অর্জিত টাকা আমি ব্যাংকে রাখলাম, সে আমাকে দিচ্ছে ছয় পার্সেন্ট। ব্যাংক এখানে আমার ব্রোকার, এজেন্ট। সে ওই টাকাটা নয় পার্সেন্ট বা তারও বেশি দরে বিক্রি করছে। ইট ইজ ইটসেল্ফ এন্টি ডিপোজিটর, এন্ট্রি পিপল ব্যাংকিং সিস্টেম। এই ব্যবধান পৃথিবীর কোনো দেশে এক পার্সেন্টের বেশি নেই। আমি বুঝাতে চাচ্ছি, একশ টাকা ছয় টাকায় টাকা কিনে নিয়ে এসে আপনাকে নয় টাকায় বেচতে দেব না তো! কিন্তু আমাদের এখানে তাই হচ্ছে। সো এটা মানবিক না, দানবিক ব্যাংকিং। কুশান মাস্ট বি রিডিউজড। তো এই তিন পার্সেন্ট টাকা কোথায় যাচ্ছে? এটা দিয়ে ব্যাংক বিশাল অ্যামাউন্টের লাভ গুনছে। সেই লাভের টাকা দিয়েই এনপিএলকে (নন-পারফরমিং লোন) গোঁজামিল দিচ্ছে।

এনপিএল ডাবল হয়ে যাবে, যদি আপনি কুশানকে তিন থেকে দেড় পার্সেন্টে নামিয়ে আনেন। সো, পুরো ব্যাংকিং সিস্টেমটাই এন্টি পিপল। এখানে সাধারণ মানুষের টাকাগুলো এনে আপনি একটা ভল্টে রাখবেন। তারপর মাফিয়ারা সেই টাকাগুলো লুট করে নিয়ে চলে যাবে। সো ব্যাংকিং সিস্টেম নিডস বিগ রিফর্ম। পুরো সিস্টেমটাকেই গরিববান্ধব করতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বা ব্যাংকাররা ব্যাংক খাতের এই অন্ধকার দিকগুলোতে আলো ফেলার চেষ্টা করেন না কেন?
আপনারা মিডিয়ার লোকরা কি আলো ফেলছেন? হঠাৎ করে মিডিয়া এমন ভদ্র হয়ে গেল কেন? আপনারাও জানেন, আমরাও জানি-কোনো এক জায়গা থেকে একটা ‘নিয়ন্ত্রণমূলক ছক’ আছে। সেই ছকের বাইরে কেউ কথা বলছে বলে আমি মনে করি না। আমাকে অনেকে বলে, আপনি অনেক বেশি অপ্রিয় কথা বলেন, এসব কথা না বললেই ভালো। কিন্তু এখন আপনি এমন কিছু আমার কাছ থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছেন, যেটা আমার জন্য বিপজ্জনক!

বিপজ্জনক কথা হলেও আপনি কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্যে বলছেন...
আমি বলছি ব্যাংকিং খাতটা দানবীয়। শুধু নিবর্তনমূলক না, শোষণমূলকও। ব্যাংকিং ব্যবস্থাটা কিছু মানুষের জন্য, বহু মানুষের জন্য না। আমি বেসিক ব্যাংকের কথা বলতে চাই, আমি ফারমার্স ব্যাংকের কথা বলতে চাই। আরও ব্যাংকের কথা বলতে চাই না, কারণ ওইসব ব্যাংকের মালিক এবং ডিরেক্টররা আমার বন্ধুবান্ধব। তাদের ক্ষতি আমি চাই না। আমি চাই, তাদের সংসারটা আরেকটু সুন্দর হোক। লুটেরা ব্যাংকিং সিস্টেমের যারা কর্ণধার; যারা ড্রাইভিং সিটে ছিল, ওদের কখনো এথিক্যাল বা মোরাল সাহস হবে না এসবের বিরুদ্ধে কথা বলার। খারাপ সিস্টেমের ভেতর থেকে তারা যখন কথা বলেনি তখন সিস্টেম থেকে বেরিয়েও তারা কথা বলতে পারবে না।

এ ধরনের সমস্যা হয় তখন যখন সবাই একটা নষ্ট সিস্টেমের মধ্যে কাজ করে। কিন্তু আমি এগুলো ভয় পাচ্ছি না। কারণ আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা চান এই সত্য কথাগুলো উঠে আসুক। আমি যেহেতু বোকাসোকাই আছি, তাই মহাবিপদে পড়ে যেতে পারি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, জাতির জনকের কন্যা ইদানীং চাইছেন, এ রকম কিছু সত্য কথা উঠে আসুক। এই বিশ্বাসের কারণও আছে।

ডিআইজি মিজান উনি গ্রেফতার হয়েছেন। ওসি মোয়াজ্জেম গ্রেফতার হয়েছেন। এগুলো কিন্তু সিগন্যাল। এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন যেদিকে যাচ্ছে, এটাই কিন্তু যৌক্তিক পরিণতি। মানুষ ঠকতে ঠকতে, কষ্ট পেতে পেতে, সিস্টেম নষ্ট হতে হতে আমরা যারা সিস্টেমের বেনিফিশিয়ারি, এখন আমরাও ভুক্তভোগী হব।

আপনাকে যদি একটা ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে ব্যাংক নিয়ে আপনি যে প্রত্যাশার কথা বললেন, আপনার পক্ষে কি সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব?
একশ দশ পার্সেন্ট বাস্তবায়ন সম্ভব। এক হাজার পার্সেন্ট সম্ভব। ভবিষ্যতের কথা বাদ দেন, বর্তমানের কথা বলি। সরকার আমাকে একটি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছিল। সেটা দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক। আমি ওই ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করার আগে তারা দশ পার্সেন্ট ডিভিডেন্ড এবং পাঁচ পার্সেন্ট স্টক ডিভিডেন্ড দিত। আমার নয় মাস বা এক বছরের শাসনামলে আমি ত্রিশ পার্সেন্ট ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছি। আগের ম্যানেজমেন্ট প্রফিট করেছিল পনেরশ বা ষোলোশ কোটি টাকা। আমি বাইশশ কোটি টাকা প্রফিট করেছি। আমি ওই ব্যাংককে বলেছি, আপনারা মানবিক না, আপনারা ইসলামিক না। আপনারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হয়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবচেয়ে কম বেতন দিচ্ছেন। সো, আমি আপনাদের এই ফিলসোফির সঙ্গে একমত না।

আপনি ওই ব্যাংকের নাম লিখতে পারেন-ইসলামী ব্যাংক। আমি দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকের সব কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য হাউজ লোন বিশ লাখ থেকে চল্লিশ, চল্লিশ থেকে ষাট, ষাটকে আশি, আশিকে এক কোটি, এক কোটিকে এক কোটি বিশ লাখ করে দিয়েছি। তাদের কাছ থেকে আট পার্সেন্ট মুনাফা নেওয়া হতো, আমি এটা পাঁচ পার্সেন্ট করে দিয়েছি। তখন আমাকে বলা হয়েছিল, আপনি যে এভাবে কমাচ্ছেন, ব্যাংকের প্রফিট তো কমে যাবে।

আমি বলেছি, আপনারা ব্যাংকিং জানেন না বলে মনে করেন এভাবে ব্যাংকের প্রফিট কমে। ব্যাংকের প্রফিট তো হবে তার এফিশিয়েন্সি দিয়ে। ব্যাংকের কাজ হলো টাকা কিনে এনে তা ভাড়া দেওয়া। এখন ভাড়া দিতে গিয়ে যদি টাকা চলে যায় তাহলে তো প্রফিট হবে না। সো এটা প্রুফড, আমার সময় ইসলামী ব্যাংক তার আগের চেয়ে বেশি প্রফিট করেছে। সব মানুষের সব প্রফিট ডাবল করে দেওয়ার পরও ইসলামী ব্যাংক বিশ পার্সেন্ট ডিভিডেন্ড দিয়েছে। সো, আমি মনে করি, আমি ব্যাংকিং অনেক ভালো বুঝি। কারণ আমি একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের সন্তান।

কোন পিরিয়ডে আপনি ইসলামী ব্যাংকে ছিলেন? কেন বেরিয়ে গেলেন?
২০১৬’র মে থেকে ২০১৭’র মে পর্যন্ত। তারপর আমি পদত্যাগ করেছি। আমি আসলে এ নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে চাই না। যেহেতু ইসলামী ব্যাংক একটি প্রাইভেট ব্যাংক, তারা যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। এই মানুষের বেতন বাড়িয়ে দেওয়া, ইসলামী ব্যাংকে হিন্দু নেওয়া, বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়া-এসব নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার অ্যাডজাস্টমেন্ট হয়নি মনে করে আমি পদত্যাগ করেছি।

কিন্তু আপনি তো তাদের দ্বিগুণ লাভ দেখাচ্ছিলেন...
কিন্তু কর্তৃপক্ষের যদি সেটা পছন্দ না হয়, তাহলে আপনার আর কী করার থাকে।

আপনি তো নিজেই ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন...
তাতে কী? ভাইস চেয়ারম্যানের কি নিয়োগকর্তা নেই? চেয়ারম্যানের নিয়োগকর্তা নেই? নিশ্চয়ই আছে। আমি মায়ের মাসির কথা বলছি।

অন্যদের ক্ষেত্রেও তো তাহলে একই প্রবলেম?
হয়তো তাই। আমি ফেইস করেছি তাই পদত্যাগ করেছি। আর অন্যরা সিস্টেমের অংশ হয়ে ভাগ্য গড়েছে। সিস্টেমের অংশ হয়ে না থাকাটা আসলে খুব কঠিন। কঠিন মানে কি, নিজের স্বার্থটা হাসিল হয় না উপরন্তু কখনো কখনো বিপদেও পড়তে হয়। যেমন ব্যাংকিং সেক্টরের লুৎফর রহমান সরকার (বাংলাদেশ ব্যাংকের ষষ্ঠ গভর্নর)। ব্যাংকিং খাতে উনিই প্রথম ছাত্রদের জন্য লোন, সার্টিফিকেট বন্ধক রেখে টাকা দেওয়া শুরু করেছিলেন। আমার দৃষ্টিতে উনি ডায়নামিক চেঞ্জ আনার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু যথেষ্ট সমর্থন পাননি। লুৎফর রহমান তো স্মরণীয়, সেটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। একইভাবে অধ্যাপক পারভেজ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন কিনা-সেটাও ইতিহাসের বিষয়।

ব্যাংকিং খাতে সিএসআর বলে যে বিষয়টা আছে সেটা কি শুভঙ্করের ফাঁকি?
সিএসআর হচ্ছে ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ সোজা কথায় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বলতে চাই, সিএসআর আমাদের এখানে একটা ফাঁকিবাজির বিষয়! নিয়ম হচ্ছে, আপনি যখন সিএসআর-এ খরচ করবেন, তখন রিটার্নের কোনো প্রত্যাশা থাকবে না। যদি রিটার্ন আসে তবে সেটা সিএসআর হবে না। এটা কোনো বিজ্ঞাপন নয়, প্রফিট করার কোনো বিষয় নয়।

যেমন ধরেন, কোনো প্রত্নতত্ত্ব বা মিউজিয়াম সংস্কারের অভাবে নষ্ট হচ্ছে কিন্তু সরকারের কোনো বাজেট নেই সেখানে সিএসআর করতে পারবে। কিন্তু সিএসআর দিয়ে আপনি এটা ফুটবল খেলার আয়োজন করতে পারবেন না, কারণ এটা এক প্রকার বিজ্ঞাপন। এমন আরও অনেক কিছুই করতে পারবেন না, যেটা আপনার জন্য বিনিময় নিয়ে এলো। তাই পরিষ্কার কথা, আমাদের ব্যাংকগুলোতে সিএসআর বলে কোনো কাজই হয় না। ওরা প্রফিটকে, প্রসারকে, বিজ্ঞাপনকে সিএসআর বলে চালিয়ে দিচ্ছে। সিএসআর বিষয়টাই এখানে অবৈধ।

[চলবে]