পাল্টা গবেষণায় ত্রুটি ধরান

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯ | ২৭ কার্তিক ১৪২৬

পাল্টা গবেষণায় ত্রুটি ধরান

আ ব ম ফারুক

তুষার রায় ৯:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০১৯

print
পাল্টা গবেষণায় ত্রুটি ধরান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক সম্প্রতি এক গবেষণায় উল্লেখ করেন, ‘পাস্তুরিত দুধে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন্ট এবং ফরমালিন পাওয়া গেছে।’ এরপর থেকে এই গবেষণার পক্ষে-বিপক্ষে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খোলা কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তুষার রায়

কোন ভাবনা থেকে পাস্তুরিত দুধ নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ?
জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় উৎপাদন, ভোক্তা, মনিটরিং এজেন্সিকে সতর্ক করার জন্য গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এভাবে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের উদাহরণ রয়েছে।

গবেষণায় ত্রুটি আছে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়...
একটি গবেষণার ত্রুটি বের করতে হয় আরেকটি গবেষণা দিয়ে-এটা হচ্ছে নিয়ম। মন্ত্রণালয় এ ধরনের পরীক্ষা করেছে কিনা আমি জানি না। তারা যদি পরীক্ষা করে থাকেন তাহলে আমাদের ত্রুটিগুলো দেখাক। ত্রুটি থাকলে আমরা নিশ্চয়ই তা শুধরে নেব। কিন্তু যদ্দুর জানি, আমাদের কাজে এখনো কোনো ত্রুটি খুঁজে পায়নি। কারণ আমরা মোটামুটি চেষ্টা করেছি আন্তরিকভাবে কাজ করার জন্য।

আরেকটা বিষয় হলো, ত্রুটি পাওয়ার আগেই আমার তথ্য সঠিক ছিল না এটা তারা (মন্ত্রণালয়) বলল কীভাবে? তিনি (অতিরিক্ত সচিব) তো আমার সঙ্গে কথা বলেননি। তারপরও আমার যদি কোনো ত্রুটি থেকেই থাকে তাহলে মন্ত্রণালয়কে বিনীতভাবে অনুরোধ করবো, এটা থার্ড পার্টির কাছে পাঠানো হোক। এটা দুনিয়ার সব জায়গাতেই করে এবং আমি মনে করি বাংলাদেশে কালো টাকার যেরকম দাপট, সেখানে বিএসটিআই, আইপিএস, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বা আমাদের প্রতিবেদন-সবকিছু নিয়েই সমালোচনা হবে। এ জন্য কারো পরীক্ষার ফল আমলে নেওয়ার দরকার নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনেকগুলো ল্যাব আছে। ওইসব ল্যাবে স্যাম্পল পাঠানো হোক। তারা যে রিপোর্ট দেবে আমরা তা মেনে নেব। আর মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে জানতে চাইলে আমরা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরব।

বিএসটিআই কিসের ভিত্তিতে আপানাদের গবেষণাকে অস্বীকার করছে?
বিএসটিআই দুধের নয়টা নমুনা টেস্ট করেছে। তাদের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী আদর্শ দুধ হতে গেলে ওই নয়টা প্যারামিটার থাকতে হবে। কিন্তু আমরা মনে করছি, সঠিক ফলের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক, ফরমালিন, ডিটারজেন্ট এগুলোও পরীক্ষা করা দরকার। এটা শুধু আমাদের পরীক্ষায় ধরা পড়েছে তা নয়। আইপিএস, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষাতেও এসবের নমুনা মিলেছে। তাহলে সব আক্রমণ আমাকে করা হচ্ছে কেন? ওদের কি ধরতে পারে না, যারা এসব পরীক্ষার ফলাফল আমার আগেই প্রকাশ করেছে। তারাও তো অ্যান্টিবায়োটিক পেয়েছে। এই বিষয়টা কেন জানি সামনে আসছে না। আমি সরকার না, এজন্য? আমি দুর্বল, তাই?

প্রশ্নটা হচ্ছে, আমরা যদি অ্যান্টিবায়োটিক পেয়ে থাকি তাহলে এটার পরীক্ষা আবার করলেই তো হয়। আমরা তো পরীক্ষাগুলোর ব্যাপারে ওপেন। আমরা স্বচ্ছভাবে তালিকাও দিয়ে দিয়েছি। পরীক্ষা পদ্ধতিও দিয়ে এসেছি বিএসটিআইকে। তারা পরীক্ষাগুলো দেখুক না একবার। এখন বিএসটিআই যদি অ্যান্টিবায়োটিকের পরীক্ষা না করেই বলে দুধে অ্যান্টিবায়োটিক নেই, তাহলে আমাদের আর কী করার আছে!

আমরা করেছি ১৯টি পরীক্ষা। এর মধ্যে আবার বিভিন্ন প্যারামিটার করেছি আর ওরা করেছে মাত্র ৯টা। ওই নয়টায় অ্যান্টিবায়োটিক নেই হয়তো এজন্য যে, যখন স্ট্যান্ডার্ডটা তৈরি হয় তখন এতগুলো ঝামেলা ছিল না। এখন নানা অপবিজ্ঞান তৈরি হচ্ছে, যারা ভেজাল দেয় তারা নানাভাবে লিখছে কাজেই আমাদের তো সেইভাবে তৈরি হতে হবে। আমি যদি মনিটরিং এজেন্সি হই, তাহলে অপকর্ম যে করবে তাদের প্রযুক্তির ত্রুটি ধরার জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তি থাকা লাগবে। তা না হলে আমি কীভাবে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করব? সেজন্য আমার অনুরোধ, বিএসটিআই যেন তাদের প্যারামিটারকে আপডেট করে। একই সঙ্গে যেন ডিটারজেন্ট, অ্যান্টিবায়োটিক, নাইট্রেট-এগুলোকেও ইনক্লুড করে। তারা এই প্যারামিটারগুলো অন্তর্ভুক্ত করে পরীক্ষা করুক। এরপর যদি এসব উপাদান না পাওয়া যায় তাহলে আমিই সবচেয়ে খুশি হব। কারণ আমি নিজেও দুধ খাই। আমি তো বিদেশি দুধ খাচ্ছি না, কারণ সেটা আমার পক্ষে সম্ভবও না।

হাইকোর্ট দুধ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আমি হাইকোর্টের প্রতি খুবই আস্থাশীল। সম্প্রতি খাদ্যপণ্যের বিষয়ে হাইকোর্ট যে ভূমিকা নিয়েছেন, সেটাই তো আমরা আদালতের কাছ থেকে আশা করি।

সব দেশেই মানুষ আদালতের কাছে এই বিষয়গুলো আশা করে। আমি মনে করি, দুধসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের বিষয়ে আদালত যে সিদ্ধান্ত নেবেন তা নিরপেক্ষভাবেই নেবেন। আদালত বিষয়গুলো যাচাই করেই নেবেন। সে কারণে সবচেয়ে ভালো হয়, আদালত আমার কিংবা বিএসটিআই-কারও বক্তব্য শোনার দরকার নেই। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, আইসিডিডিআরবি ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের মতামত নিক। একই সঙ্গে অভিযোগটি নিশ্চিত করতে আদালত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে নমুনা পাঠাক।

এর পেছনে প্রভাবশালী দুগ্ধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর কোনো প্রভাব কাজ করছে বলে মনে করেন?
তৎপরতা তো দেখাই যাচ্ছে। আমরা যখন প্রেস কনফারেন্স করলাম, রিপোর্ট যখন প্রকাশ হচ্ছে তখন তথ্যটা যাচাই না করে বিভিন্ন জায়গায় নানা কথা বলে বেড়াচ্ছে। তারপর দেশের একটি বড় গ্রুপের মালিকানাধীন মিডিয়ায়ও নানা নিউজ করা হয়েছে। এখন এভাবে যদি নানাভাবে ছলচাতুরী করে তাহলে তো জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে। আরেকটা কথা হলো, মানুষ তো আর আগের মতো নেই। তারা যাচাই করতে পছন্দ করেন। ফলে আমার আশঙ্কা এটা (তরল দুধ) এক সময় আবার বিদেশি দুধের বাজারে বাজারে পরিণত না হয়। মানে দেশীয় কোম্পানিগুলোর প্রতি আস্থা চলে গেলে তারা বিদেশি পণ্যের প্রতি ঝুঁকতে পারেন। আমরা তো সেটা চাই না। আমরা চাই, আমাদের দেশি ডেইরি ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা লাভ করুক।

আমাদের দেশীয় দুধের বাজার ক্রমশ বড় হচ্ছে। এখানে আমাদের নিজস্ব ব্যবসার পরিসর বাড়–ক এটাই চাই। তবে দেশি দুধের মান ভালো হোক এটাই কাম্য। কিন্তু দেশি পণ্য বলে মানহীন জেনেও কিনতে হবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। ক্রেতার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। ভোক্তার অধিকার সবার ওপরে। সেদিন এক ভদ্রলোক বলছিলেন, আহা কোম্পানিগুলোর কত লস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লস তো হওয়ার কথা না। যদি হয়ও আমি তো মনে করি কোম্পানির স্বার্থের চেয়ে ক্রেতার স্বার্থ আগে। কোটি কোটি টাকার জীবনহানির বিনিময়ে কোম্পানিগুলো নিশ্চয়ই লাভ করতে পারে না। কোম্পানিগুলোর লোকসানের চেয়ে বড় হওয়া উচিত দেশের মানুষের স্বাস্থ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সীতেশ চন্দ্র গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছেন, ওই গবেষণার দায় ফার্মেসি বিভাগের নয়...
আমরা কখনো বলিনি, এই গবেষণা প্রতিবেদনের দায় ফার্মেসি বিভাগকে নিতে হবে। আমরা বলেছি গবেষণায় কোনো ভুল থাকলে দায় আমরাই নেব। আমাদের ভুলের জন্য ডিপার্টমেন্ট কেন দায়ী হবে? ডিপার্টমেন্টকে দায় নিতে বলেছে কে? উনাকে আগ বাড়িয়ে গণমাধ্যমে বলতে হবে কেন? আমরা ডিপার্টমেন্টেই কাজ করেছি। কিন্তু একটা বিষয় হলো, আমরা বারবার ফার্মেসি অনুষদ বলেছি, ফার্মেসি বিভাগ কখনোই বলিনি। কিন্তু কোনো কোনো মিডিয়ায় এসেছে ফার্মেসি বিভাগ।

আসলে ফার্মেসি বিভাগে শিক্ষক আছে মাত্র একজন, উনিই চেয়ারম্যান। বাকি যারা আছেন তারা ফার্মসিউটিক্যাল টেকনোলজি, ফার্মসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি এবং কেমিক্যাল ফার্মেসি এই তিন ডিপার্টমেন্টের। তিন বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে যারা কোথাও কোনো খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানির কনসালটেন্সি করেন না, এ ধরনের কয়েকজনকে আমরা বাছাই করেছি। এছাড়া যাদের উচ্চ নৈতিকতা আছে তাদের আমার সঙ্গে নিয়েছি। এখানে সবাইকে নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

একটা কাজের জন্য সবাইকে নেওয়া যায় না। তো আমরা ৯ জন শিক্ষক মিলে কাজটা করেছি। অনুষদের তিন বিভাগের শিক্ষকই আমাদের গবেষণায় অংশ নিয়েছেন। আমাদের ল্যাবেই আমরা কাজ করেছি। এমনকি তিন ডিপার্টমেন্টের ল্যাবের বাইরেও অত্যন্ত মর্যাদাশীল, উন্নত ল্যাবে আমরা এ গবেষণার কিছু কিছু কাজ করেছি। আমরা কোনো পাল্টা বিবৃতি বা বক্তব্য দেইনি এ কারণে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এটা নিয়ে কিছু হচ্ছে দেখে আমাদের খারাপ লেগেছে।

আমরা পাল্টা কিছু বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়টা বাইরে আনতে চাইনি। কারণ এসবের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির বিষয় জড়িত। আমার শিক্ষক বন্ধুরা মনে করছেন, এটা নিয়ে পাল্টা কিছু বলা নিরর্থক। তবে দেখা যাক, প্রয়োজন মনে করলে আমরা এটা নিয়ে কথা বলতেও পারি।

আপনাদের গবেষণার ফান্ডিং কোথা থেকে এসেছে, জানানো যাবে?
ফান্ডিংটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যানবেইজের একটা প্রজেক্ট থেকে পেয়েছি। খুব সামান্যই অনুদান পেয়েছি। তবে এ কাজে আমরা কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো অর্থ নেইনি। আমরা কারও বিরুদ্ধেও না, কারও পক্ষেও না।