আমরা নই শ্রমিকরাই তারকা

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬

আমরা নই শ্রমিকরাই তারকা

ক্রিড়া প্রতিবেদক ৯:১০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ০৬, ২০১৯

print
আমরা নই শ্রমিকরাই তারকা

মাশরাফি শুধু ভালো খেলোয়াড় নন, ভালো কথকও। দেশে-বিদেশে নানা সময় অজস্র প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। সেসব থেকে সংকলিত কিছু প্রশ্ন ও উত্তর-

খেলোয়াড়ের জীবন আসলে কেমন?

আমাদের এই উপমহাদেশে খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সই তার জীবনের মাপকাঠি। এটা একটু অদ্ভুত। ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশে বোধ হয় এটা হয়। শ্রীলঙ্কাতে তেমন হয় না। এখানে একটা খেলোয়াড় মানে, চব্বিশ ঘণ্টাই ওই পারফরম্যানন্সের কারণে বিচার হচ্ছে তার। খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত, পারিবারিক জীবনটা খেলা দিয়ে মাপা হয়। এটা আসলে খেলাধুলার মূল সুরের সঙ্গে ঠিক যায় না।

কেন ক্রিকেট খেলেন?
এখন তো এটা আমার পেশা। এই যে আমার ঘর, সোফা-টিভি যা দেখছেন সব ক্রিকেট থেকেই আয় করা। ফলে ক্রিকেট তো খেলতেই হয়। এটা অবশ্য একটু নিষ্ঠুর করে বললাম। আমি ক্রিকেটে কোনো লাভালাভের কথা ভেবে আসিনি। স্রেফ মজা করতে ক্রিকেট খেলতাম। আমি ভাগ্যবান যে, এখনো এটাতে মজা পাই; ক্রিকেট খেলার চেয়ে বেশি মজা আর কোনো কিছুতে তো পাই না। খেলা না থাকলে কী করব, জানি না।

ইনজুরির গল্প বলতে বলতে তো আপনি ক্লান্ত...
জঘন্য। একটা খেলোয়াড়ের জীবনে সবচেয়ে বাজে সময় সম্ভবত এটাই। এই পুরোটা সময় আপনি একা। আপনাকে এই সময় এই বিরক্তিকর ছোট ছোট রুটিন মেনে চলতে হবে। আমি বলি একটা ইনজুরির পর বিহ্যাব শুরু করা মানে, সব আবার শূন্য থেকে শুরু করা; কম্পিউটার রি-স্টার্ট দেওয়া আর কী!

আপনার ভবিষ্যৎ নাকি হুইলচেয়ারে?
দেখেন, হাঁটুতে একটা অপারেশন থাকলেও একটা বয়সের পর ধুঁকতে হয়। আমার হাঁটুতে সাতটা অপারেশন। ডেভিড না বললেও তো আমার বোঝার কথা, অবশ্যই আমাকে ধুঁকতে হবে একটা সময়। একটা পর্যায়ে হয়তো হাঁটু রিপ্লেস করতে হবে। হুইলচেয়ারে বসতে হবে কি না জানি না, চলাচল সীমিত হয়ে যাবে। আমার সেই স্ট্রাগল শুরু হয়ে গেছে। খেলা ছাড়লে এত জিম থাকবে না, নিয়ম থাকবে না; একটা বিপর্যয় তো আসবেই।

আপনি নিজেকে তারকা বলতে নারাজ। তাহলে তারকা কে?
অবশ্যই আছে। তারকা হলেন একজন ডাক্তার। আমি ক্রিকেটার; একটা জীবন কি বাঁচাতে পারি? কক্ষনো না। একজন ডাক্তার পারেন। কই দেশের সবচেয়ে ভালো ডাক্তারের নামে কেউ তো একটা হাতে তালি দেয় না। তারাই তারকা। তারকা হলো লেবাররা। দেশ গড়ে ফেলছে। ক্রিকেট দিয়ে আমরা কী বানাতে পারি? এতটা ইটও কি ক্রিকেট দিয়ে তৈরি করা যায়? একটা ধান জন্মায় ক্রিকেট মাঠে? যারা এই ইট দিয়ে দালান বানায়, যারা কারখানায় আমাদের জন্য এটা-ওটা বানায় বা ক্ষেতে ধান জন্মায়; তারকা হলো তারা।

ভালো ক্যাপ্টেনের বৈশিষ্ট্য কী?
এই বৈশিষ্ট্যটা বলা খুব কঠিন। ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা থাকে একেকজন ক্যাপ্টেনের। রিকি পন্টিং। দৃশ্যত সেরা ক্যাপ্টেন। কিন্তু তার হাতে ছিল সর্বকালের সেরা একটা দল। তার চ্যালেঞ্জটা ছিল অন্য রকম। ১১ জন সেরা ইন্ডিভিজুয়ালকে এক মাঠে ঠিকঠাক রাখা, তাদের সেরাটা পাওয়া; একটা অন্য মাত্রার চ্যালেঞ্জ। আবার সৌরভের কথা ভাবেন। হাতে দেওয়া হয়েছিল আগোছালো একটা দল। শচীন-দ্রবিড় ছাড়া দলে কিচ্ছু নেই। তাকে ওই দল নিয়ে পারফর্ম করতে হচ্ছে। আসলে এভাবে ভালো ক্যাপ্টেন খুঁজে বের না করে অনেক ভালোকে দেখা যেতে পারে।

জীবনে বন্ধুদের ভূমিকা কতটা?
এটা আসলে বলে বোঝানো আমার পক্ষে কঠিন। অনেক বলেন বা এমন একটা ধারণা আছে যে, একজন খেলোয়াড়ের বন্ধুসংখ্যাটা সীমিত থাকা উচিত। বড় জীবন, সফল জীবন চাইলে বন্ধু নাকি কমাতে হয়। হ্যাঁ, যারা বড়, তাদের জন্য হয়তো ওটাই সত্যি। আমি তো অত বড় খেলোয়াড় নই; ফলে আমি বিশ্বাস করি, আমার জীবনে বন্ধুরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একটা হালকা প্রসঙ্গ-আপনার নাকি লুঙ্গির প্রতি বিশেষ দুর্বলতা আছে।
ওহ হো। এটা বলা যাবে? আহা। লুঙ্গি পরে তো সব জায়গায় যেতে পারি না বলে বলিনি। নইলে লুঙ্গি তো আমার এক নম্বর পছন্দ। নড়াইলে গেলে তো প্যান্ট-শার্ট আর পরতে চাই না। আমার সবচেয়ে আরামের সময়টা লুঙ্গি পরা সময়। ইদানীং অবশ্য একটু সমস্যা হয়, লোকজন খুব ছবি তুলতে চায় বলে নড়াইল গেলেও সেজেগুজে থাকতে হয়। নইলে লুঙ্গির ধারে-কাছে কিছু নেই।

জীবন মানে?
ছোট করে বললে, জীবন মানে ভালো থাকা, ভালো রাখা। নিজে ভালো থাকার চেষ্টা করি, অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা করি। পারলে অন্তত একজন মানুষের উপকার করি, সেটি না পারলে অন্তত কারও ক্ষতি যেন না করি। মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে থাকা। মনে হতে পারে যে খুব সহজ কাজ এটি। কিন্তু আসলে এটির ব্যাপ্তি বিশাল। এক জীবনে এই কাজটি ঠিকঠাক করতে পারা মানেই অনেক কিছু করা।

বাংলাদেশ দল মানে?
হৃদয়ের খুব কাছের কিছু। আরেকটা পরিবার। সেই আকরাম ভাই, বুলবুল ভাইদের সঙ্গে শুরু। এরপর বিদ্যুৎ ভাই, রোকন ভাই, অপি ভাইদের সঙ্গে খেলেছি, সবশেষ অভিষেক অপুর, সবাই একটা বড় পরিবারের অংশ। গত ১৭-১৮ বছর তো পরিবারের চেয়ে বেশি সময় তাদের সঙ্গেই কাটিয়েছি। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনায় সময় কেটেছে। দল মানে দেশের প্রতিনিধি। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে! আমার দল তাই আমার অস্তিত্বের একটি অংশ।

জীবনের সেরা সময়?
আমার মেয়ের জন্ম, ২০১১ সাল। প্রথমবার বাবা হওয়ার অনুভূতি, বলে বোঝানোর নয়। অনুভূতিটা আমার এখানেও নাড়া দেয়, ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। আমার এখনো মনে আছে, সুমির (মাশরাফির স্ত্রী) প্লাজমা লাগবে, আমি জোগাড় করতে গিয়েছি। এসে দেখি বাবার কোলে আমার মেয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তটায় ভেতর যে কতকিছু খেলে গেল! হুমায়রা জন্মের পর এতটা সাদা হয়েছিল, আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কারণ ওর জন্মের আগে থেকেই ওর মা তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল।

মাঠের ঘাসের সঙ্গে কথা হয়?
ঘাসের সঙ্গে সম্পর্ক ছোট্টবেলা থেকে। ঘাসে গড়াগড়ি করে, ঘাস মাড়িয়ে, ঘাস চিবিয়ে, লুটোপুটি করে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে। ক্রিকেটার হওয়ার পর ঘাস আরও আপন হয়ে গেছে। এখানেই আমাদের ছুটে চলা, আমাদের ঘামের ফোটার স্পর্শ। ঘাসকে আমার মনে হয় ভীষণ জীবন্ত, মনে হয় আমাদের সবকিছুর সাক্ষী।

যখন ক্রিকেট খেলবেন না?
কিছুদিন অন্তত আর সবকিছু বাদ দিয়ে মায়ের সেবা করতে চাই। আমার কেবলই মনে হয়, প্রথম জীবনে দুরন্তপনা আর পরে ক্রিকেটে ডুব দিয়ে মায়ের সেবা যথেষ্ট করা হয়নি আমার। নিত্যদিনের ছোট ছোট অনেক কিছু করা, শারীরিক ও মানসিকভাবে পাশে থাকা, কাছ থেকে মায়ের হাসি দেখা। ক্রিকেট থেকে মুক্তি পেলে একদম মায়ের কৌশিক হয়ে থাকতে চাই।