সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে হবে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ২ আশ্বিন ১৪২৬

সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে হবে

শাহরিয়ার কবির

ড. কাজল রশীদ শাহীন ১০:২৬ অপরাহ্ণ, জুন ১৭, ২০১৯

print
সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে হবে

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের অন্যতম সাহসী সংশপ্তক শাহরিয়ার কবির। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির বর্তমান সভাপতি। ছিলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক। নির্মাণ করেছেন বেশকিছু প্রামাণ্যচিত্রও। খোলা কাগজের সঙ্গে একান্ত আলাপে বলেছেন মানবতাবিরোধীদের বিচার, নিজের নিরাপত্তা, শিশু সাহিত্য, সাংবাদিকতা সম্পর্কে। সাক্ষাৎকার- ড. কাজল রশীদ শাহীন

মানবতাবিরোধীদের বিচার হচ্ছে, সেটা কি বর্তমানে খুব মন্থর মনে হচ্ছে না?
আমি আপনার সঙ্গে একমত, আসলেই বিচারকার্য মন্থর হয়ে গেছে। এটা শুরু হলো যখন বিচারপতি সিনহা সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হলেন। তিনি প্রথমে দুটি ট্রাইব্যুনালকে একটা করে দিলেন। তারপর বললেন, এই ট্রাইব্যুনালকে হাইকোর্ট থেকে সরিয়ে নিতে হবে। আপিলে যে শুনানি ছিল, সেগুলো তার সময় থেকে স্থগিত হয়ে গেছে। দুটি ট্রাইব্যুনালকে একটা করা আমরা বন্ধ করতে পারিনি। যখন ট্রাইব্যুনালকে সরাবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তখন আমাদের সভাপতি বিচারপতি গোলাম রাব্বানী বলেছেন, ‘ট্রাইব্যুনাল যদি সরাতে হয়, আমার লাশের ওপর দিয়ে সরাতে হবে। এই ট্রাইব্যুনাল আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল। এই ট্রাইব্যুনালকে আমরা রক্ষা করব।’ যাই হোক, আমাদের চ্যালেঞ্জের কারণে ট্রাইব্যুনাল আর সরানো হয়নি। কিন্তু বিচারের গতি মন্থর হয়ে গেছে এবং সেখানে লজিস্টিক সাপোর্ট যতটা দেওয়ার দরকার ছিল সেটাও দেওয়া হচ্ছিল না।

বিচারটা আরও গতিশীল করতে হবে। কারণ ঘটনা তো এখন থেকে ৫০ বছর আগে ঘটেছে। ভিকটিমরা যেমন মারা যাচ্ছে, যারা গণহত্যাকরী তারাও মারা যাচ্ছে। ফলে বিচারটা কার জন্য? বিচারটা হচ্ছে, গণহত্যাকারীর শাস্তির জন্য। ভিকটিমদের ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য। কিন্তু অপরাধীরা শাস্তি না পেয়ে মারা যাচ্ছে, ভিকটিমরা ন্যায়বিচার না পেয়ে মারা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিচার গতিশীল করা ছাড়া উপায় নেই। দরকার হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে, জেলায় সম্ভব না হলে অন্তত বিভাগীয় শহরে নিয়ে ১০ বছরের মধ্যে বিচারটা শেষ করা প্রয়োজন। যাতে আর একজনও যুদ্ধাপরাধী না থাকে বা একজনও ভিকটিম যাতে বলতে না পারে আমি বিচার পাইনি। আরেকটা বিষয় এখানে হচ্ছে, এখনো ব্যক্তি বিচার চলছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় অপরাধী সংগঠনগুলোর বিচারে কোনো অগ্রগতি নেই।

চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার হচ্ছে কিন্তু তৃণমূলে যারা অপরাধ করে গেছে, তাদের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল...
এখন কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে অনেকের বিচার হচ্ছে। শীর্ষস্থানীয়দের বিচার এক প্রকার শেষ হয়ে গেছে। এখন যাদের বিচার চলছে, তারা জেলা-উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের মানবতাবিরোধী অপরাধী। ধাপ বাই ধাপ এগোনোর কারণে একটু দেরি হতে পারে। বিচার করতে গেলে নিয়মানুযায়ী অভিযোগপত্র তৈরি করতে হবে এবং তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে হবে। যারা ভিকটিম; তাদের এগিয়ে আসতে হবে। আবার ওইখানেও একটা সমস্যা আছে। ভিকটিমদের কোনো নিরাপত্তা নেই। এটার জন্য ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ করতে হবে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন না হলে, ভিকটিমরা সাক্ষী দেবে না। অনেক জায়গায় যুদ্ধাপরাধীরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। সেখানে যদি ভিকটিমকে সুরক্ষা দেওয়া হয়, নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাহলে মামলা আরও গতিশীল হবে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারেরও কেউ কেউ সাক্ষী দিতে গররাজি প্রকাশ করেছেন, শুধু ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ নেই বলে?
অবশ্যই। কারণ সাক্ষ্য দেওয়া কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদেরও (শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন, সুলতানা কামাল) নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছি।

এ সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও আপনাদের হুমকি দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়া হয় না কেন?
এটা নিয়ে কয়েক দিন আগেও প্রেস কনফারেন্স করেছি। হুমকি বন্ধ করার ব্যাপারে সরকার তেমন উদ্যোগ নিচ্ছে না। আমার বাড়িতে পুলিশ রেখেছে। গানম্যান দিয়েছে আমাকে। এ রকম ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আমাকে এক ধরনের বন্দিদশার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমাকে যখন গানম্যান দেওয়া হলো, বলা হলো, আপনি পাবলিক প্লেসে যেতে পারবেন না। পাবলিক প্লেস মানে, বাংলা একাডেমির মতো জায়গা, পহেলা বৈশাখে রমনার মতো জায়গায়। এত নিরাপত্তা আমরা দিতে পারব না। আমাদের এত পুলিশ ফোর্স নেই। সে জন্য আমরা বলছি, আমরা কেন নিরাপত্তার ঘেরাটোপে আটকে থাকব স্বাধীন দেশে? জেলখানায় থাকবে তারা, যারা আমাদের হুমকি দিয়েছে বা হত্যা করেছে।

আপনাদের মতো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেও যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে অন্যদের...
শুধু আমাদের ক্ষেত্রেই না, অতি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও বলেছি। আমাদের উপদেষ্টা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনার সময় সেখানে গিয়ে ওখানকার এসপি এবং ডিসিকে ধমক দিয়েছেন। যখন তারা বলেছেন, কেউ মামলা করেনি, সে জন্য কিছু করতে পারছে না পুলিশ। উনি বলেছেন, ‘কেউ মামলা না করলে, আপনারা মামলা করবেন। আপনারা জানেন ঘটনা কি ঘটেছে। আপনারা কেন মামলা করেননি?’ এরপর তিনি যখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ছিলেন, কয়েকজন জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন। ভিকটিমরা জানের ভয়ে মামলা করবে না। একজন হিন্দু মানুষ, সে থানায় যাবে, না জান নিয়ে পালিয়ে যাবে! মামলা করলে তাকে আবার হুমকি দেবে। এসব ভিকটিমদের পাশে দাঁড়ানো পুলিশের দায়িত্ব, রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেটা বহু জায়গায় হচ্ছে না।

সাংবাদিক, সাহিত্যিক হিসেবে আপনার ব্যাপক পরিচিতি ছিল। এই পর্যায়ে এসে এখনো কি সেই জীবনের কথা মনে পড়ে?
সাহিত্য তো দুই ধরনের। একটা হচ্ছে ফিকশন, আরেকটা নন-ফিকশন। নন-ফিকশন মানে প্রবন্ধ-গবেষণা। প্রতিবছর আমার দু’একটা গবেষণার বই বেরুচ্ছে। আর বাচ্চাদের জন্য যে শিশুসাহিত্য লিখতাম, সেখানে কিছুটা ভাটা তৈরি হয়েছে। বলতে গেলে ২০০১ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর বাচ্চাদের জন্য তেমন কিছুই লিখিনি। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে। আমি যখন ১৯৭৫-৭৬ সালে বাচ্চাদের জন্য লেখা শুরু করলাম তখন তাদের জন্য তেমন করে কেউ লিখত না। হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র লিখতেন। ’৭৪ সালে আমরা বর্ষপঞ্জি বের করেছি, বছরের সালতামামি আকারে। এখানে গ্রন্থের সালতামামি করতে গিয়ে দেখি শিশুদের জন্য একটা বইও বেরোয়নি! ওই ক্ষোভ আর রাগ থেকে আমি পরপর দুটি উপন্যাস লিখে ফেললাম শিশুদের জন্য। একটা বাংলা একাডেমি আরেকটা বর্ণমালা থেকে বই আকারে বেরিয়েছিল। এখন শিশুদের জন্য বহু লেখক আছেন।

বর্তমানে শিশুদের জন্য উপযুক্ত রচনা আমরা কি পাচ্ছি?
বর্তমানে শিশুসাহিত্য মোটামুটি সন্তোষজনক জায়গায় আছে। কিন্তু আমি সব সময় সেই জায়গায় কাজ করতে পছন্দ করি, যেখানে খুব কম কাজ হয়েছে বা একেবারেই হয়নি। আমি গবেষণা করে দেখেছি এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে যেখানে কোনো কাজই হয়নি। একটা উদাহরণ দিতে পারি। পশ্চিমবঙ্গেও আজ পর্যন্ত কেউ বাঙালির সামরিক ইতিহাস নিয়ে লেখার উদ্যোগ নেয়নি। কাজটা খুব বড় কাজ, খুব কঠিন। সময়সাপেক্ষ, অর্থসাপেক্ষ, শ্রমসাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল কাজ। আমি নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে যাচ্ছি। এখানে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের বাঙালির ইতিহাস চার হাজার বছর নয়, আরও পেছনে যাবে। পাঁচ হাজার বছরের লিখিত এবং অলিখিত ইতিহাসের প্রমাণ পাচ্ছি। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ হয়েছিল, ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জ্যোতির্জ্ঞান অনুযায়ী তা পাঁচ হাজার বছর আগের ঘটনা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বিবরণে পাচ্ছি, বাংলার দুই রাজা-চিত্র সেন এবং সমুদ্র সেন-যুদ্ধ করার জন্য ১২০০ মাইল হেঁটে, সৈন্য সামন্ত নিয়ে, হাতি, ঘোড়া নিয়ে হরিয়ানা থেকে গিয়েছিলেন। যুদ্ধে তারা পৌরাতের পক্ষ নিয়েছেন। কিন্তু হেরেছেন। তবে সেই হারাটা বড় কথা নয়।

আমার বক্তব্য হচ্ছে, পাঁচ হাজার বছর আগে, আমাদের এখানে এমন একটা সভ্যতা ছিল যেখান থেকে আমরা অত বিশাল একটা সৈন্যবহর ওখানে পাঠাতে পেরেছি। এমনকি আড়াই হাজার বছর আগে, আলেকজান্ডারের যে ভারত আক্রমণ, তার যতটুকু আপনি মেগা সিরিজ বা টলেমির লেখাতে পাবেন। সেখানে বাংলার যে রাজা ছিল, তার সামরিক শক্তি কতটা ছিল? এগুলোর মিসিং লিংকগুলো আমি খোঁজার চেষ্টা করছি। ডি এল রায়ের কবিতায় আছে, ‘বাংলার ছেলে বিজয় সিংহ, হেলায় করিল লঙ্কা জয়’। কিন্তু এটা আসলে কিংবদন্তি চরিত্র না, সত্য ঘটনা। শ্রীলঙ্কায় ইতিহাস আছে। ওদের প্রাচীন ইতিহাসের যে উৎস, ‘দিকবংশ’ এবং ‘মহাবংশ’ নামে দুটি প্রাচীন বংশ। সেখানে আছে, বিজয় সিংহ কীভাবে লঙ্কা জয় করলেন, কীভাবে আড়াইশ বছর ধরে শ্রীলঙ্কা শাসন করেছে বাঙালিরা। এগুলোই আমাদের সামরিক সাফল্য।

বলা হচ্ছে, সাংবাদিকতার জায়গাটা সংকীর্ণ হয়ে আসছে। প্রবীণ সাংবাদিক হিসেবে আপনার কী মনে হয়?
সাংবাদিকতায় নৈতিকতার জায়গাটা অনেকটাই শিথিল হয়ে গেছে। আমাদের সময় যে নৈতিকতার জায়গায় যেভাবে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম, এখন কিন্তু সেই জায়গাতে নেই। সাংবাদিকরা বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন করপোরেট হাউসের কাছে। পত্রিকা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, সম্পাদক বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন বা কর্মরত সাংবাদিক বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন। সেসব ঠেকানো যাচ্ছে না।

সেলফ-সেন্সরশিপের যে ব্যাপারটা...
সেলফ-সেন্সরশিপ আপত্তিকর মনে করি না। সেলফ-সেন্সরশিপ মানেটা কী? মানে হলো, আমার নিজের একটা দায়বদ্ধতা আছে। সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি বা মানুষের প্রতি আমার এক ধরনের দায়বদ্ধতা আছে। আমি সাংবাদিক, সত্য প্রকাশ করতে হবে বলে, যে কোনো সত্য আমি প্রকাশ করতে পারি না। যেমন অনেক সংবাদপত্র বিকৃত মৃতদেহের ছবি ছাপে না। কারণ এটা এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করবে শিশুদের মধ্যে। এটাই কিন্তু সেলফ-সেন্সরশিপ। এসব সরকার বলে দেয়নি, সাংবাদিকরা নিজেরাই করেছেন। এটাকে আমি আপত্তিকর মনে করি না। আপত্তিকর মনে হচ্ছে তখনই, যখন নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করছি, তখন। সাংবাদিককে ডেকে বলে দিচ্ছি, সম্পাদকে ডেকে বলছি, ওই রিপোর্টটা করো না। তার মানে আমার সঙ্গে ডিল হয়ে গেছে সেই করপোরেট হাউসের বা মালিকের বা সেই ব্যক্তির। এটা খুবই নিন্দনীয় কাজ।

আমি মনে করি, গণমাধ্যম হিসেবে প্রত্যেকেরই কতগুলো দায়িত্ব আছে। আমি সব সময় বলেছি, গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষ হতে হবে। আমি যখন বিচিত্রায় কাজ করতাম, নিঃসন্দেহে তখন পক্ষপাতিত্বমূলক সাংবাদিকতা করিনি। তবে একদিকে আমাদের পক্ষপাতিত্ব ছিল, তা হলো সত্য এবং মানবতার প্রতি।

শুধু কি করপোরেট হাউসের কারণে? নাকি রাজনৈতিক...
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তো আছেই। আমি যখন বিচিত্রায় ছিলাম, তখন সেটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা চেতনার প্রতি দায়বদ্ধ ছিল। যখন যে সরকার এসেছে, আমরা এ জায়গাতে কোনো সরকারকেই কম্প্রোমাইজ করিনি। বিএনপি-জামায়াত, জাতীয় পার্টির এরশাদ ক্ষমতায় ছিল, সরকারের পক্ষে হয়তো লিখতে হয়েছিল কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের জায়গায় আমরা আপস করিনি।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির যে আন্দোলন, তাতে আপনার যুক্ততার কারণে সেটি আরও বেগবান হয়েছে?
বিষয়টা এ রকম না। জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর আমরা একটা যোগ্য লিডারশিপ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আমাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করতে চেষ্টা করেছি। আমরা যারা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তার মধ্যে মুনতাসীর মামুনই তিনশর ওপর বই লিখেছেন। তার মধ্যে দুইশর মতো বই শুধু মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা-এসব গবেষণামূলক। এগুলোই আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে। আজকে পিএইচডি গবেষণা, এমফিল গবেষণা হচ্ছে-একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনের ওপর। এমনকি ইউরোপ থেকেও বই বেরুচ্ছে। নির্মূল কমিটি নাগরিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটা দিকনির্দেশনাকারী বা দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী একটা আন্দোলন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিভিল সোসাইটি মুভমেন্টের স্থায়িত্ব হয় খুব অল্পকাল। কারণ একটা নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে এটা হয় এবং দাবি পূরণ হয়ে গেলে বা পূরণ না হলেও, ক্যাশ করে দেওয়া হয়, ধ্বংস করে দেওয়া হয়। একইভাবে নির্মূল কমিটিকেও ধ্বংস করবার বহু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিন্তু এটা বারবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে। কারণ আমরা পেয়েছি জাহানারা ইমামের মতো অসাধারণ ব্যক্তিত্বকে। তার একক নেতৃত্ব; কর্তৃত্ব যেটাই বলি, সেটা দিয়ে তিনি আন্দোলন অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

যিনি শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে ধমক দিতে পারতেন। বাংলাদেশে এমন দ্বিতীয় ব্যক্তি আছে, যে শেখ হাসিনাকে টেলিফোনে ধমক দিতে পারে? বা কোনো অর্ডার দিতে পারে বা নির্দেশ দিতে পারে? কিন্তু আমরা এমন একটা শক্তি অর্জন করেছি, তা হলো আদর্শিক শক্তি। যেমন আমাদের নির্মূল কমিটির মধ্যে নিয়ম আছে, আপনি যদি কোনো সরকারের পদে যান, আপনার মেম্বারশিপ খারিজ হয়ে যাবে। এবার মন্ত্রী সভায় আমাদের নির্মূল কমিটির কয়েকজন সদস্য হয়েছেন। তারা নির্মূল কমিটির সঙ্গে এখন নেই। আমরা এতে খুশি। কারণ তারা তাদের স্থানে আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারবে।

এটার ফান্ডিং কীভাবে হয়?
সম্পূর্ণ নিজেদের থেকে। বাইরে থেকে কোনো এনজিও বা কোনো ডোনার মাঝে মাঝে জোগাড় করতে পারি। সেটা তিন-চার বছরে একবার হয়। তখন এটার ফান্ড রেইজ হয়। আর আমাদের যে শাখা বিদেশে আছে, তাদের কাছ থেকে বড় ধরনের সহযোগিতা পাই।

অসংখ্য বাধা-বিপত্তি, জীবনের হুমকি নিয়ে আপনি সংশপ্তকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এই সাহসটা কীভাবে অর্জন করেছেন?
আমি না। আমি সব সময় একটা কথা বলি, তা হলো আমরা। এখানে আমি খুবই স্মল-ফ্লাই বা ক্ষুদ্র পতঙ্গ। এখানে একটা কালেকটিভ লিডারশিপ আছে। যৌথ নেতৃত্ব; এটা আমরা গড়ে তুলেছি। হুমকি-ধমকি শুধু আমার ক্ষেত্রেই হয়নি। ২০০১ সালে জামায়াত-বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, মুনতাসীর মামুনকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল।
প্রচণ্ড মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল। জেলা-উপজেলায় আমাদের শত শত নেতাকর্মীকে নিগৃহীত হতে হয়েছে। অনেকের হাত ভেঙে দিয়েছে, পা কেটে দিয়েছে, জানে মেরেছে। অনেককে দেশছাড়া করেছে। এখানে আমাদের শক্তিটা হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা, মানুষের সমর্থন। যেখানেই যাচ্ছি আমি, তারাই বলছে, আমরা আপনার পাশে আছি।

(শেষ পর্ব)