বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছড়িয়ে দিতে হবে

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছড়িয়ে দিতে হবে

শাহরিয়ার কবির

ড. কাজল রশীদ শাহীন ১০:২৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৬, ২০১৯

print
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছড়িয়ে দিতে হবে

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের অন্যতম সাহসী সংশপ্তক শাহরিয়ার কবির। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির বর্তমান সভাপতি। ছিলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক। নির্মাণ করেছেন বেশকিছু প্রামাণ্যচিত্রও। খোলা কাগজের সঙ্গে একান্ত আলাপে বলেছেন বঙ্গবন্ধুর দর্শন, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির কর্মকাণ্ড, ধর্মনিরপেক্ষতা, সংবিধান, জঙ্গিবাদ ও জামায়াত সম্পর্কে। সাক্ষাৎকার- ড. কাজল রশীদ শাহীন

আছেন কেমন?
চলছে মোটামুটি। এই বয়সে যতটুকু থাকা যায়।

দেশের যে রাজনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি বা বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে মানসিক অবস্থা কেমন?
এক প্রকার অস্বস্তির মধ্যে আছি। পরিস্থিতি বাংলাদেশ বা বাইরে-কোথাও ভালো না। যে বিষয়ের ওপর আমরা (একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি) কাজ করছি-জঙ্গি, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা-এটা তো বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতেই মহাপ্রলয় আকার ধারণ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবিকতা, প্রগতিশীলতা সংকুচিত হচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশে না, পৃথিবীর সব দেশেই। মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই।

আপনারা যে কাজটা করছেন, সেটা কীসের দায় থেকে?
এটা শুধু আমরা কেন, প্রত্যেকেই নিজের সামাজিক আর মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে এ কাজ করে যাচ্ছে। মানুষ হিসেবে আমাদের কতগুলো দায়িত্ব রয়েছে। সেসব হলো- নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবতার প্রতি দায়িত্ব। অন্যথায় তো আমরা মানুষ থাকব না।

কিন্তু এ কাজে রাষ্ট্রেরও তো দায় থাকা উচিত...
হ্যাঁ, রাষ্ট্রের দায় থাকা উচিত। বঙ্গবন্ধুর আমলে বাংলাদেশে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। এটা বঙ্গবন্ধু না থাকলে, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি না থাকলে সম্ভব হতো না। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লাখ মানুষকে ধর্মের নামে হত্যা করা হয়েছে বা অন্য যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ, তার সবকিছু হয়েছে ধর্মের দোহাই দিয়ে। যার ফলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সহজ হয়েছিল, বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এরপর বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো। এর বড় কারণ, বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের আদর্শিক পরাজয়। একাত্তরে তারা সামরিকভাবে যেমন পরাজিত হয়েছিল তেমন পরাজিত হয়েছিল আদর্শিকভাবেও। আসলে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর একটা চক্রান্তের অংশ হিসেবেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। এখন আবার সংবিধানে কিছু কিছু বিষয় চলে আসছে যার কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবেও মৌলবাদীরা পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এটা অবশ্য শুরু হয়েছে ’৭৫-এর পর থেকেই। যদিও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু করেছেন। এবং সংবিধানের চার মূলনীতি ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু ২৭ বছর ধরে আমরা বলছি, জামায়াত-শিবির-মৌলবাদীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। যেভাবে এটা বাহাত্তরের সংবিধানে নিষিদ্ধ ছিল। ১০ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর দলই তো ক্ষমতায় আছে। কিন্তু তারা আমাদের কিছু কথা শোনে, কিছু শোনে না।

শোনা না শোনার ভেতরে কি কোনো দূরত্ব আছে?
না। এটা হলো রাজনৈতিক সমীকরণ। ক্ষমতায় থাকতে হলে অনেক রকম সমীকরণ করতে হয়। প্রয়োজন হলে মৌলবাদের সঙ্গে সমঝোতাও করতে হয়। এসব আমরা অতীতে দেখেছি। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বঙ্গবন্ধু সরকার। কোনো রকম সমঝোতা করেননি তিনি।

সমীকরণ তো অনেক সময় আত্মঘাতীও হয়!
সেটা আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা মনে করেন না। তারা মনে করেন, তারা ঠিকমতো দেশটা চালাচ্ছেন। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটছে। কিন্তু এই উন্নয়নের পাশাপাশি মানব উন্নয়ন সূচকেও উন্নয়নের অগ্রগতি ঘটাতে হবে। সে সূচকে আমরা ক্রমশই নিচে নেমে যাচ্ছি।

পাকিস্তানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না?
পাকিস্তানের যারা মিত্র, জাতিসংঘের প্রবল শক্তিশালী যে দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা এবং চীন-তারা তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে পাকিস্তানের পাশে আছে। আমেরিকা, চীনের একটা ঘাঁটি দরকার পাকিস্তানে, রাশিয়া এবং ভারতকে নজরদারিতে রাখার জন্য। এখন জাতিসংঘে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব নিতে গেলে, এসব দেশ বিরোধিতা করে, করবে। আমি মনে করি, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সচেতন করতে হলে একটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার। আমরা ২০১২ সালে পাকিস্তানে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাখা গঠন করেছি। আমাদের বন্ধুরা সেখানে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্দোলন করেছেন, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। অনেকে বলছেন, শুধু ক্ষমা নয় বাংলাদেশকে এর ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। এই জনমতটা পাকিস্তানে আগে ছিল না, এখন ক্রমশ বাড়ছে। এই বছর পাকিস্তানের খবরের কাগজে একটা জনমত জরিপ বেরিয়েছে, পাকিস্তানে এখন শতকরা ৩৪ ভাগ মানুষ মনে করে, ‘একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে’। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, আমাদের বন্ধুরা যারা পাকিস্তানে আছেন, কমিটির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বা সমর্থন দিচ্ছেন, তাদের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার কারণেই এমনটা সম্ভব হয়েছে। এমনকি আমরা অতীতেও দেখেছি, পাকিস্তানের অনেক সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী আমাদের পক্ষে ছিলেন। শুধু পাকিস্তানেই না, সারা পৃথিবীতে এ রকম অসংখ্য প্রতিবাদকারীকে আমরা দেখতে পাই।

এ ব্যাপারে আপনাদের কোনো উদ্যোগ আছে কি?
অবশ্যই। সেসব বন্ধুর তালিকা তৈরি করেছি, যারা একাত্তরে বাংলাদেশের গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করতে গিয়ে নির্যাতিত হয়েছেন, নিহত হয়েছেন, জীবন দিয়েছেন বা নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। তাদের তালিকা আমাদের কাছে আছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনার সরকার চমৎকার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত এবং পাকিস্তানসহ যেসব মানুষ, সরকার এবং জনগণ মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন, তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবর্ধনা দেওয়া। এটা আমরা ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছি। ওখানে আমাদের প্রায় ৬০০ জনের মতো তালিকায় ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বিশেষভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

শ্রীলঙ্কায় যে ঘটনাটা ঘটল, এ ঘটনার পর আপনাদের কার্যক্রমে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত আছে?
শ্রীলঙ্কার ঘটনায় আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। আমাদের জন্য এটা নতুন ঘটনা না। শ্রীলঙ্কায় এটা ঘটেছে। পৃথিবীর যে কোনো দেশেই এটা ঘটতে পারে। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় যেটা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ‘ক্রাইস্টচার্চের মসজিদ’-এ হামলার বদলা নিয়েছে তারা। ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে যে হামলা করেছে, সেটা একটা খ্রিস্টান মৌলবাদী হতে পারে, কিন্তু একটা উন্মাদনা সেখানে কাজ করেছে। সে বলেছে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। এটা এক ধরনের উন্মাদনা। সে খ্রিস্টান ধর্মের নামে করলেও এটা একটা উন্মাদনা। আইএস যেটা করছে, আলকায়েদাও সেটা করছে, এসবই উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই না।

সর্বশেষ গুলিস্তান ও মালিবাগে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটল। আইএস তো এর দায়ও স্বীকার করেছে...
এটা নিয়ে একটা টেলিভিশনের টকশোতে কথা বলেছিলাম। সেখানে একজন মন্তব্য করলেন, আইএসের সঙ্গে এ হামলা কোনোভাবেই যুক্ত নয়। আরেকজন মন্তব্য করলেন, আইএস এর দায় স্বীকার করেছে। আবার একজন বললেন-বাংলাদেশে আইএস আছে, অন্যজন বললেন নেই। আমার বক্তব্য হলো, বাংলাদেশে আইএস আছে কী নেই তা বোঝাতে তাদের অফিস খুলে বসার কোনো দরকার নেই; যে এটা ‘বাংলাদেশ আইএস কার্যালয়’। বাংলাদেশে আইএসের অনুসারীরা আছে! এরা যত দিন বাংলাদেশে অ্যাকটিভ আছে, কাজকর্ম চালাচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত আইএস বা আলকায়েদার এজেন্ডা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করা এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। এর আগেও বহু হামলা হয়েছে পুলিশের ওপর। পুলিশকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। এসবের অন্যতম কারণ, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গি দমনের ব্যাপারে যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। ‘ক্রসফায়ারে’ তারা জঙ্গিদের হত্যা করেছে। এর ফলে পুলিশের ওপর তাদের আক্রোশ বেশি। সুযোগ পেলেই হামলা চালায়।

জামায়াত নিষিদ্ধের ব্যাপারে বলা হয়, জামায়াত নিষিদ্ধ করলে ওরা আরও ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।
আমরা এটা কখনো মনে করি না। এটা ঠিক নয়। কারণ নিষিদ্ধ করলে তারা নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে পরিচিতি পাবে। একজন তরুণ-যুবক-ছাত্র; কখনো জেনে-বুঝে অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হবে না। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এখন একটা বৈধ সংগঠন; তাদের শত শত এনজিও আছে, বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন আছে।

ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রদের প্রাইমারি লেভেল থেকে টার্গেট করে। তারা ছোট ছোট বাচ্চাদের স্কুলে যাবে, অনেক রকমের উপহার দেবে-রং পেনসিল, বই, খাতাসহ আরও অনেক কিছু। তার সঙ্গে কিছু জামায়াতি সাহিত্যও দেবে। গোলাম আযম বা মওদূদীর জীবনী দেবে। সুন্দরভাবে প্রকাশিত ঝলমলে প্রকাশনা দেখে বাচ্চারা সহজে আকৃষ্ট হয়। জামায়াত-শিবির বাচ্চাদের বোঝাতে সক্ষম হয়, তারা যেটা বলছে, এটাই হচ্ছে সত্যিকারের ইসলাম এবং তাদের যারা বিরোধিতা করে, তারা হচ্ছে ইসলামের শত্রু। বাচ্চা বয়স থেকে তাদের এভাবে ব্রেন ওয়াশ করা হয়। এখন নিষিদ্ধ করলে তারা তো আর এ কাজ করার সুযোগ পাবে না। কারণ ‘আউট ল’। ‘আউট ল’ মানে ‘অপরাধী’ হয়ে যাচ্ছে তারা।

আমাদের যারা জঙ্গি মৌলবাদীর বিরুদ্ধে কাজ করছে; তারা মনে করে এরা নিছক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। কিন্তু আমরা বারবার বলছি, আইএস, আলকায়েদা, জামায়াতে ইসলামী বা এই ধরনের বিভিন্ন সংগঠন যারা বিভিন্ন দেশে আছে, এরা কিন্তু মাফিয়াদের মতো নিছক সন্ত্রাসী নয়। এদের সন্ত্রাসের একটা আদর্শিক ভিত্তি আছে। এই সন্ত্রাসকে মূলত, আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে।

২০১৬ সালে যখন আমেরিকাতে গিয়েছিলাম, তখন আমার সেমিনারে এসেছিলেন আমেরিকার নীতি-নির্ধারকরা। সেখানে উইলিয়াম বি মাইলাম (বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত) জানিয়েছেন, তিনি আমার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে সন্ত্রাসের কোনো সম্পর্ক নেই। জামায়াত হচ্ছে, বাংলাদেশের একমাত্র গণতান্ত্রিক দল। তাদের আর্থিকভাবে একটা স্বচ্ছতার জায়গা আছে। আমি মাইলামকে বলেছি, জামায়াত সন্ত্রাসী কি না, তা জানতে হলে মওদূদীর লেখা পড়তে হবে। আইএস, আলকায়েদা কীভাবে মওদূদীর লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়, সেটা বুঝতে হবে। আর গণতান্ত্রিক বলছ, যে দলের ভেতর নির্বাচন হয় না, যারা নারী-পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করে না, যারা অমুসলিম-মুসলিমের সমান অধিকার মর্যাদায় বিশ্বাস করে না, তারা গণতান্ত্রিক হয় কি করে? তোমরা কি এই গণতন্ত্রকে সমর্থন করতে চাও? লাগাতরভাবে এসব প্রচারণার কারণে গত বছর জামায়াত নিয়ে আমেরিকার কংগ্রেসে প্রস্তাব ওঠে। এটাই হচ্ছে আমাদের আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা বা সাফল্য।

উইলিয়াম বি মাইলাম যখন এখানকার রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তখন কি তিনি জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেখেননি?
না। তিনি এগুলো বিশ্বাস করেন না। কারণ জামায়াত এগুলো স্বীকার করে না। জামায়াতের নেতারা যা বলেন তাই তিনি বিশ্বাস করেন। আমি বলেছি, আপনি যা বলছেন তা জামায়াতের নেতার কথা। কিন্তু যারা ভিকটিম তাদের সঙ্গে কথা বলেন। আপনি কি কোনো গণহত্যার ভিকটিমকে জিজ্ঞেস করেছেন, আলবদররা কী ধরনের নৃশংসতা চালিয়েছে? এসব তো আমেরিকার বহু গবেষণায়ও বেরিয়েছে। পরে সেমিনারে তার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পর, যিনি সঞ্চালক ছিলেন, তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন, আপনি শাহরিয়ারের কোনো জবাব দেবেন কি না? উনি কোনো জবাব দেননি। ফলে সবাই কনভিন্স হয়েছে। আমি যে তথ্যগুলো দিয়েছি, যে কথাগুলো বলেছি, সেসব তথ্যের ভিত্তিতে বলেছি। কিন্তু মাইলাম যেটা বলছে, সেটা তার ধারণা থেকে বলছে।

এসব তথ্যের বিকৃত হওয়ার অনেক কারণ আছে। যার মধ্যে স্বার্থেরও একটা ব্যাপার আছে। আজকে যদি সারা পৃথিবীতে জঙ্গি-সন্ত্রাসী-মৌলবাদ শেষ হয়ে যায়, আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসাটা কোথায় যাবে? সন্ত্রাস বা গৃহযুদ্ধ-এগুলো না থাকলে তো আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এই যে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে ২০১১ সাল থেকে, এখানে আমেরিকার ইনভলভমেন্টের দরকারটা কী? সিরিয়ার মানুষ ঠিক করবে, তারা কি ধরনের স্বার্থ চায়। আসাদ স্বৈরাচারী হতে পারে। তবে আসাদ স্বৈরাচারী কি না, সেটা তো সিরিয়ার মানুষ ঠিক করবে!

সাদ্দামের ক্ষেত্রেও একই হয়েছে?
হ্যাঁ। নজিবুল্লাহর ক্ষেত্রে আফগানিস্তানেও একই হয়েছে। আমেরিকা এই কাজগুলো দুনিয়াব্যাপী করছে। মূলত, তাদের অস্ত্র ব্যবসার জন্য। তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য। আমি বহুবার আমেরিকায় গিয়ে বলেছি, তোমাদের এই সামরিক, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে কী হয়েছে? আফগানিস্তান, ইরাক দুটিই ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ছিল, দুদেশেই ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে। আফগানিস্তানে তারা এখন ইসলামী কনস্টিটিউশন মেনে চলছে। ওখানে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো জায়গা নেই। আমেরিকাকে বোঝাতে হবে এসব তাদের হস্তক্ষেপের কারণেই হয়েছে। এটা যত দিন পর্যন্ত আমেরিকার গণমাধ্যম, সাধারণ মানুষ বুঝবে না, তত দিন আমেরিকা সরকারের নীতি পরিবর্তনের কোনো বাস্তবতা নেই। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে আমেরিকা সরে এসেছে কখন? যখন আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে উঠেছিল। ছাত্ররা, তরুণরা যখন অস্বীকার করছে, না, আমরা যুদ্ধে যাব না। মায়েরা রাস্তায় বেরিয়েছেন, বলেছেন, আমাদের সন্তানদের এভাবে নিহত হওয়ার জন্য আমরা যুদ্ধে পাঠাব না। তারপর আমেরিকা ভিয়েতনাম থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সেটাই আমরা বলছি, আমেরিকার ভেতরেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

গুলশানে যে হামলা হয়েছিল, সেই হামলার পর সরকার কী আরও কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছিল এ ব্যাপারে?
গুলশানের আগে এরা যে এতটা সফল, এতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে বা এতটা সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারে, এ নিয়ে আমাদের গোয়েন্দাদের কোনো ধারণা ছিল না। হলি আর্টিজানের ঘটনা সরকারের দৃষ্টি উন্মোচন করেছে। এরপর বাংলাদেশে আর কোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেনি। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা। ওদের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গিদের বহু আস্তানা ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন তো এক হাজারের মতো জঙ্গি জেলখানায় আছে। মাঠ পর্যায় বিভিন্ন জঙ্গিকে হত্যা (ক্রসফায়ার) করা হয়েছে। ফলে জঙ্গি দমনের এই তৎপরতায় একটা উল্লেখযোগ্য সাফল্য বাংলাদেশ প্রদর্শন করেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

আমাদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও জন্মশতবার্ষিকী। এ দুইয়ের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করতে চান...
এটা নিয়ে কিছুদিন আগে সংবাদ সম্মেলন করেছি। মূলকথা হচ্ছে, যে আদর্শ এবং লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন। ৩০ লাখ মানুষ এর জন্য জীবন দিয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুকে এ জন্য হত্যা করা হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সবাইকে হত্যা করা হয়েছে এই আদর্শের জন্য। এখন সেই আদর্শই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বলুন, মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে বলুন- আমাদের প্রধান এজেন্ডা হওয়া উচিত। দুঃখ হলো, এত দিন ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর হতে যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে আমরা আমাদের জাতির পিতার জীবনী প্রকাশ করিনি। প্রত্যেক দেশের জাতির পিতার একটা সরকারি জীবনী থাকে।

বাংলা একাডেমির যে বইটা, এটার বাইরে?
না না। সেটা একজন লেখকের লেখা। সরকারি জীবনী মানে, এটার একটা কমিশন করতে হবে ইতিহাসবিদদের দিয়ে। সেটা লিখবেন তারা আর সিনিয়র ইতিহাসবিদরা যাচাই করে দেখবেন। এটা পৃথিবীর সব দেশেই আছে। আপনি তুরস্কে যান, সেখানে মিউজিয়ামে কামাল আতাতুর্কের জীবনী পাবেন। আব্রাহাম লিংকন, জর্জ ওয়াশিংটনের জীবনী পাবেন আমেরিকায় গেলে। ইন্ডিয়াতে যান, মহাত্মা গান্ধীর জীবনী পাবেন। আমরা প্রস্তাব করেছি, শতবর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর জীবনী সিম্বলিক্যালি একশটা প্রধান ভাষায় প্রকাশ করার। বঙ্গবন্ধুর রজনৈতিক দর্শনটা আজ শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীর। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনে খুব সহজ করেই বলা, ধর্মটাকে ধর্মের জায়গায় রাখতে, ধর্মকে রাজনীতি এবং রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে দিতে।

আর মুক্তিযুদ্ধের যে বাংলাদেশ, সে বাংলাদেশ...
সে বাংলাদেশই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ। আমরা বারবার বলছি, শুধু আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে উন্নয়নের একমাত্র সূচক ধরা ঠিক হবে না। কারণ পার কেপিটা ইনকাম দুই হাজার ডলারের কাছাকাছি হয়তো গিয়েছি। সৌদি আরবের পার কেপিটা ইনকাম ৩৬ হাজার ডলার। আমাদের দশগুণ বেশি। মানবাধিকার সূচকে সৌদি আরব বাংলাদেশের অনেক নিচে। আমরা তো সৌদি আরব হতে চাই না। আমরা একটা সভ্য আধুনিক রাষ্ট্র হতে চাই। সেটা হতে গেলে, অর্থ উন্নয়নের সূচকের সঙ্গে সঙ্গে মানবিক উন্নয়নের সূচকে সাফল্য অর্জন করতে হবে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ছে। মানবিক উন্নয়নের সূচক হলে এই ব্যবধানটা কমে যেত। যতক্ষণ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে আমরা বইয়ে রাখব, বাস্তবায়ন না করব ততক্ষণ এর সুফল আমরা পাব না।

‘গণতান্ত্রিক মানবিক উন্নয়ন...’এ রকম?
কিছুটা সে রকমই। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ধারণা দিয়ে গেছেন। তার চেয়ারম্যান-মেম্বারের ভাষণে বলেছেন, আত্মজীবনীর বহু জায়গায় বলেছেন, তিনি আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন। তিনি বলেছেন, আমি শোষিত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গরিব মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন। ধনী-গরিবের ব্যবধান কমাতে চেয়েছেন। বারবার বলেছেন, আমি কমিউনিস্ট না। কিন্তু আমি কমিউনিজমে বিশ্বাস করি। তো এই জায়গায় আমাকে দাঁড়াতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে, তার দর্শনকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ সামনে এগোবে, আমি এটা বিশ্বাস করি না। তাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছড়িয়ে দিতে হবে।

[চলবে]