গণতন্ত্রের স্পেস ছোট হয়ে গেছে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

গণতন্ত্রের স্পেস ছোট হয়ে গেছে

অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ

ড. কাজল রশীদ শাহীন ১০:২৮ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০১৯

print
গণতন্ত্রের স্পেস ছোট হয়ে গেছে

এক সময় সক্রিয় রাজনীতিকও ছিলেন অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। ছিলেন ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক। আলাপচারিতায় সেসব রোমন্থনের পাশাপাশি বলেছেন শিক্ষক রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ও র‌্যাঙ্কিং, উপাচার্য নিয়োগ, গণমাধ্যম, নির্বাচন ব্যবস্থা, উগ্র জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে। বাদ যায়নি সদ্য সমাপ্ত ভারতের লোকসভা নির্বাচন প্রসঙ্গও। সঙ্গে ছিলেন ড. কাজল রশীদ শাহীন

(শেষ পর্ব)
জাফর ওয়াজেদ সম্প্রতি পিআইবির মহাপরিচালক হয়েছেন। ডাকসুতে তো আপনারা একসঙ্গেই ছিলেন?
হ্যাঁ। আমি ’৭৯-৮০-এর সংসদে সাহিত্য সম্পাদক ছিলাম। জাফর ছিল সদস্য। তখন মুজিববাদী ছাত্রলীগ থেকে চারজন বিজয়ী হয়েছিল সদস্য হিসেবে, জাফর তাদের একজন। ১৯৮০ সালের নির্বাচনে জাফর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, আমিও করি। ওই সময় জাফর বিজয়ী হয়। তারপর আবার তৃতীয় নির্বাচনে জাফর আর আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। এবার আমি বিজয়ী হই। এভাবে আমি তিনবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। দুইবার বিজয়ী আর একবার ফেল করেছি। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, সিটিং সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আমি পরাজিত হয়েছি। সিটিং সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে জাফরও পরাজিত হয়েছে।

জাসদ রাজনীতির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হয়েছিলেন, মনে পড়ে?
প্রত্যক্ষ যোগাযোগটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া যাকে বলে। এর আগে থেকে যোগাযোগটা অবশ্য ছিল। এগুলো তো আসলে এক দিনের ঘটনা না। জাসদ ছাত্রলীগ করার আগে আমি আর কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তখন ওই আদর্শকেই অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও আবেদনময় মনে হয়েছে।

ডাকসুতে ইলেকশন করলেন কোন প্রেক্ষাপটে? সেটা কী আপনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
না না। উৎসাহ নিয়েই নির্বাচন করেছি। আমি দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই যুক্ত ছিলাম। তবে হল শাখার সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ওমুক কিংবা কেন্দ্রীয় কমিটির ওমুক- এমন কোনো সাংগঠনিক পদে কখনই ছিলাম না। ধরুন ল’র নির্বাচন। আমি তখন লেখালেখির জন্য পরিচিত। আমরা সবাই পরিচিত ছিলাম-আমি, জাফর, কামাল, রুদ্র। উনআশি সালে আমরা তিনজন সাহিত্য সম্পাদক পদে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে রুদ্র মুহম্মদ্র শহীদুল্লাহ, মুজিববাদী ছাত্রলীগ থেকে কামাল চৌধুরী, জাসদ ছাত্রলীগ থেকে আমি। তবে আমরা কিন্তু খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমরা একই সঙ্গে সাহিত্য আন্দোলনের জন্য লিটলম্যাগ বের করেছি। ফজলুল হক হলে কামালের রুমে আমাদের বহু রাত্রি কেটেছে। গফুর মিঞার ক্যান্টিনে আক্ষরিক অর্থেই চার আনার ছোলা তিনজনে ভাগ করে খেয়েছি। ওই নির্বাচনের কারণে আমাদের সম্পর্কে কিন্তু কোনো টানাপড়েন তৈরি হয়নি। তখন আমি, কামাল, রুদ্র, মইনুল হাসান সাবের, শাহজাদী আঞ্জুমান আরা- আমরা এক গোত্রীভূত হয়ে সাহিত্য আন্দোলন করেছি। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হলে যা হয় আর কী!

জাসদ থেকে বাসদে আপনারা কীভাবে গেলেন?
জাসদের ভেতরের বিতর্কের কারণেই বিভক্তি হলো। তখন ওই বিতর্কে আমি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলাম। যুক্ত ছিলেন মান্না ভাই, আক্তার ভাই, জিয়াউদ্দিন বাবলু, আবু আলম, মোমেন ভাই। আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবেই যুক্ত ছিলাম। সাতাশি সালে পিএইচডি করার জন্য দেশের বাইরে চলে যাই। পরবর্তী সময় ১৯৮৮ সালে গ্রীষ্মকালের কিছু আগে আমি বেরিয়ে গেলাম। তখন বাসদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার মধ্যে সংশয় ছিল, প্রশ্ন ছিল। আমি আমার প্রশ্নগুলো আলোচনার জন্য উত্থাপন করেছিলাম। তখন মাহবুব ভাই ও অন্য নেতারা সেটা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেননি। ওই পর্যায়ে আমাকে বলা হলো, আমার সঙ্গে যে মত-পার্থক্য তা মিটিয়ে ফেলার মতো নয়। ওই থেকে আমি আর কখনই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত হলেন কবে?
আমি শিক্ষকতা শুরু করেছি চুরাশি সালে। চুরাশি থেকে সাতাশি পর্যন্ত পড়িয়েছি। তারপর ছুটি নিয়ে চলে গেলাম। আবার ফেরত এসেছি তিরানব্বইয়ে। এবার দুই বছর পড়ানোর পর ১৯৯৫ সালে বিবিসির চাকরি নিয়ে চলে গেছি। তখন ছুটি নিয়েছিলাম এক বছরের জন্য। এক বছরের ছুটি নিয়ে পরে আমি ছুটি এক্সটেশন না করে পদত্যাগপত্র দিয়ে দিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির মধ্যে আমি যে প্রবণতা দেখেছি তাতে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। আমার কাছে মনে হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে আমার চলে যাওয়াই ভালো। দলীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতা, শিক্ষকদের মাঝে দলীয় প্রভাব, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব এবং তাদের গোষ্ঠীগত স্বার্থ উদ্ধার-এই বিষয়গুলো আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়নি। এটা হয়তো আগেও ছিল। কিন্তু আমি ছয় বছর বাইরে ছিলাম তো, ফেরত এসে দেখলাম, হলের প্রভোস্ট হওয়ার জন্য, হাউস টিউটর হওয়ার জন্য, এক ধরনের রেট-রেইস অর্থাৎ ইঁদুরের মতো লোকজন ছোটাছুটি করছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি এটার জন্য প্রস্তুত না।

আপনার জানার কথা, এশিয়ার সেরা চারশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই...
এটা নিয়ে যতটা হইচই হচ্ছে, বিষয়টা আমি ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। এই র‌্যাঙ্কিংয়ের চিন্তাটা বাদ দিন। সমাজে বা রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দায়িত্ব, সেটা পালন হচ্ছে কি না তা দেখুন। র‌্যাঙ্কিং পরে হবে, আগে বলুন-জ্ঞান, মুক্তবুদ্ধি, সহনশীলতা চর্চার জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভূমিকা, সেটা কী সে পালন করতে পারছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ভূমিকা, শিক্ষকদের ভূমিকা কী ঠিক আছে? এগুলো তো ঠিক নেই, এবার ধরুন আপনার র‌্যাঙ্কিং তিন নম্বরে তাহলে কী সেটা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য হতো? ফলে আমি র‌্যাঙ্কিংয়ের এই বিতর্কে যেতে চাই না। আপনি হয়তো বলবেন, র‌্যাঙ্কিং তো এগুলো থেকেই হয়-গবেষণা হয়েছে কি না, শিক্ষকের মান ঠিক আছে কি না, ছাত্রছাত্রীরা চাকরি পাচ্ছে কি না-আমি একথা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য র‌্যাঙ্কিংয়ের তালিকায় যুক্ত হওয়া নয়। তার লক্ষ্য হওয়া উচিত, সমাজে তার যে দায়িত্ব সেটা পালন করা। র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢুকতে পারলে সেটা বাড়তি পাওনা।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিষয়ে আপনার কী মন্তব্য?
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার যে যোগ্যতা নির্ধারিত হয়ে গেছে, এটা নিয়ে আপনি কী গর্বিত? কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কী এটা নিয়ে গর্বিত হতে পারে? যোগ্যতাটা হলো, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে হবে-এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার যোগ্যতা হতে পারে নাকি? এবং এর কোনো ব্যতিক্রম নেই তো। একটা ব্যতিক্রম দেখান, তাহলে অন্তত বলতে পারতাম, একজন তো অন্তত আছেন!

আমাদের মিডিয়া সম্পর্কে আপনার কী মতামত?
আমাদের মিডিয়াগুলো করপোরেট হয়ে উঠতে পারেনি। আমি মনে করি, মিডিয়া নিজেই করপোরেশন হবে। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান-এরা নিজেই প্রতিষ্ঠান। এরা অন্য প্রতিষ্ঠানের অংশ নয়। আমাদের এখানে প্রত্যেকটা মিডিয়ার মালিকের অসংখ্য রকম ব্যবসা আছে। সেগুলোকে প্রটেক্ট করার জন্য মিডিয়া তৈরি করা হয়েছে। আচ্ছা, আপনি কী নিউইয়র্ক টাইমসের মালিকের নাম জানেন?

কি যেন নাম ছিল...
এই যে, কি যেন নাম ছিল...তার মানে আমরা জানি না। জানার দরকার নেই আমাদের। এটাই হচ্ছে মিডিয়া, তার কাজটাই আসল। মিডিয়া যখন নিজেই করপোরেশন হবে, তখনই এটা সম্ভব। আমার অনেক সাংবাদিক বন্ধু হয়তো রাগ করতে পারেন, আমি করপোরেশনের পক্ষে। কিন্তু এটা না হলে মিডিয়া তার যথাযথ দায়িত্বটা পালন করতে পারবে না। এটা গেল মিডিয়ার কাঠামোগত ব্যাপার। দ্বিতীয় সমস্যাটা হচ্ছে সেন্সরশিপ। একটা বিষয় খেয়াল করে দেখবেন, বাংলাদেশে একসময় পত্র-পত্রিকায় কার্টুন ছাপা হতো। এখন ছাপা হয় কি? হয় না। কেন ছাপা হয় না? কারণ সোসাইটিতে, রাজনীতিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, ওটা ছাপা যাবে না। বিচিত্রা ছিল সরকারি প্রতিষ্ঠান, সেখানেও রফিকুন্নবী সপ্তাহে একটা কার্টুন আঁকতে পারতেন। অথচ গত ছয় মাসে বাংলাদেশের প্রধান কোনো গণমাধ্যমে কার্টুন দেখতে পেয়েছেন, যা আপনাকে নাড়া দিয়েছে? কার্টুনিস্টের অভাব রয়েছে? তাও তো নয়। মানে হচ্ছে, রাজনীতির ওই জায়গাটা আর নেই। এমন পরিস্থিতিতে আপনি কী আশা করেন, মিডিয়া হঠাৎ করে শক্তিশালী, স্বাধীন এবং প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করবে?

এটা কি সেলফ-সেন্সরশিপ?
বটে। কিন্তু সেলফ-সেন্সরশিপটা হচ্ছে কেন? সোসাইটিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা যদি না থাকে, হঠাৎ করে মিডিয়া আলাদাভাবে গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারবে না। আবার গণতন্ত্র না থাকলে তো মিডিয়াকে সেটার জন্য লড়াই করার কথা। সে পারছে না, কারণ সে বৃত্তচক্রের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। যে মালিকের পঁচিশ রকম ব্যবসা আছে, সেই পঁচিশের তেইশটার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ। মিডিয়া কী সেগুলো প্রোটেক্ট করবে নাকি এগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবে? এখন রাজনীতিতে গণতন্ত্রের স্পেসটা ছোট হতে হতে খুবই ছোট হয়ে গেছে, তাই বাইরের চাপ আসার আগেই, চাপ আসবে সে জন্য আগে থেকেই সেলফ-সেন্সরশিপ করা হয়ে যায়।

আরেকটা বিষয় হল, গত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচার কমিটিতে প্রায় দেড়শ সাংবাদিক ছিল। এবার আপনি আমাকে বলেন, টেলিভিশনের চিফ, নিউজ এডিটর, ডিরেক্টর নিউজ, চিফ নিউজ- এমন সবাই যদি গিয়ে ওখানে যুক্ত হয়, তাহলে আপনি তাদের কাছে কী আশা করতে পারেন? এক ব্যক্তি দলের অফিসে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারাভিযানের কৌশল তৈরি করবেন, আবার সন্ধ্যার সময় অফিসে এসে সেই কৌশলের সমালোচনা করবেন- সেটা কী হয় নাকি?

তাহলে আগামীতে কি আরও অন্ধকার অপেক্ষা করছে?
গণমাধ্যমের কথাই বলেন আর রাজনীতির কথাই বলেন, চূড়ান্ত কথা বলতে তো কিছু নেই। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশের মানুষ তো বিভিন্নভাবে এসব মোকাবেলা করেছে। ফলে স্বল্প মেয়াদে আশাহত হতে পারেন কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। নৈরাশ্য মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে। একমাত্র আশাবাদী মানুষই সক্রিয়। আর সক্রিয়তা ছাড়া পরিবর্তন হয় না। যতই নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতির তৈরি হোক, তারপরও আশা তৈরি করতে হবে। সেই আশায় আস্থা রাখতে হবে, ভরসা করতে হবে।

মিডিয়ার এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো কী কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে?
কী ধরনের রেস্ট্রিকশন আছে, তারা ফাইন্ড আউট করতে পারে। বলতে পারে, মিডিয়ার ফ্রিডমের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত, কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু অবস্থাটা বদলাতে হবে তো যারা গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত, তাদেরই। মালিক তো বদলাবে না, আপনি যদি সাংবাদিকতা করতে চান, আপনাকেই বদলাতে হবে। সাংগঠনিকভাবে দলীয় বিবেচনার বাইরে এসে সাংবাদিকদের একত্র হওয়ার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো দলের বিবেচনায় বিভক্ত হওয়ার কারণে এখন কোনো কমন প্ল্যাটফর্ম নেই।

সাতচল্লিশের আগে তো আমরা একত্রেই ছিলাম। আলাদা হওয়ার পর কলকাতা কিংবা ভারতের অন্য অংশ এতটা এগিয়ে গেল আর আমরা পেছনেই পড়ে থাকলাম। এ জন্য কী এখানকার মানুষ দায়ী?
না, মানুষকে আমি দায়ী করি না। মানুষের দায়-দায়িত্বের চেয়ে বড় প্রশ্নটা হচ্ছে, এখানে চর্চার অভাব। গণতান্ত্রিক চর্চা না হলে এমনটা হবেই। ত্রুটিপূর্ণ হলেও ভারতে গণতন্ত্রের চর্চাটা বন্ধ হয়নি। একমাত্র ইন্দিরা গান্ধীর সময়কার জরুরি অবস্থা ছাড়া। সে সময়ও কিন্তু সাংবাদিকরা দাঁড়িয়েছিল, সিভিল সোসাইটি দাঁড়িয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ করেছে। অবশ্য গত চার বছরের মোদির আমলে আমরা দেখলাম- প্রতিষ্ঠানে, সংবাদপত্রে ভয়াবহ রকম ধস নামছে। সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনার সময় ভারতীয় গণমাধ্যমে যে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রকাশ আমরা দেখলাম, এটা তো উদ্বেগজনক। টেলিভিশনে একজন উপস্থাপক সামরিক পোশাক পরে চলে এসেছেন উপস্থাপনা করতে- এটা কোন ধরনের সাংবাদিকতা। একাত্তর সালে যুদ্ধের সময়ও তো এমনটা হয়নি। এই অবনতি গত কিছুদিনের। তারপরও ভারতে এখনো অনেক কিছু টিকে আছে। সিভিল সোসাইটিতে আছে, লেখকদের মাধ্যে আছে, শিল্পীদের মধ্যে আছে। আমি মনে করি, যদি রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক চর্চার উপাদান থাকে, তাহলে এগুলো আস্তে আস্তে মানুষ নিয়ে নেবে। আমরা বরং উল্টোপথে চলেছি। তাতে করে অসহিষ্ণু হয়েছি। চিন্তা-ভাবনার জায়গাগুলো সীমিত করে দিয়েছি।

বিশ্ব কি আবার উগ্র জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকছে?
উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বল্প মেয়াদে এটা হয়তো আমরা আরও দেখতে পাব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাস যদি আপনি লক্ষ করেন, এ ধরনের প্রবণতা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। আগের চেয়ে এখন পরিস্থিতি আরও কঠিন, কঠোর। এটা তিরিশের দশক নয়। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে আমরা যা দেখেছি, এখনকার পরিস্থিতি সেটা না। তখন ফ্যাসিবাদকে মোকাবেলা করা হয়েছে, নাৎসিবাদকে মোকাবেলা করা হয়েছে, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে মোকাবেলা করেছে লিবারেল ডেমোক্রেসি। এখন এই যে চীনের উপস্থিতি, রাশিয়ার উপস্থিতি, সোশ্যাল মিডিয়ার উপস্থিতি- সবকিছু মিলে কাজটা আরও কঠিন হচ্ছে। চ্যালেঞ্জটা আরও বড় আকারে দেখা দিচ্ছে।

আমাদের এখানে আইএস আছে কি নেই, এই তর্ক লেগেই আছে। বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?
আইএসের একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটেছে। আগে তারা একটা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন ছড়িয়ে গেছে। এখন এটা ট্রান্সন্যাশনাল টেররিস্ট গ্রুপে পরিণত হয়েছে। এটা অনেকটা আল-কায়েদার মতো, একসময় তারা আফগানিস্তানে ছিল তারপর সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এখন তার বিপদ আমরা বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পাব। কোনো জায়গায় ছোট আকারে দেখব, কোথাও বড় আকারে, কোথাও সংগঠিত আকারে আবার কোথাও অসংগঠিতভাবে। তদপুরি তার সঙ্গে আবার যুক্ত হবে একেবারেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নয়, এমন ব্যক্তিরা।

ভারতের নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন?
ভারতে মোদি সরকার যদি আবার ক্ষমতায় আসে, তাহলে সেটা হবে দেশটির জন্য এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। এমনকি কম সমর্থন নিয়েও ক্ষমতায় ফেরত আসে, সেটা ভারতের জন্য একটি বড় রকমের বিপদের কারণ হবে। অশনি সংকেত যাকে বলে আর কী। পাঁচ বছরে যা হয়েছে, তার চেয়েও আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

নির্বাচনের ফলাফল কী হতে পারে বলে আপনার ধারণা?
আমার ধারণা, শেষ পর্যন্ত বিজেপিবিরোধী দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে। হয়তো আমি মনে মনে আশা করছি বলেও হতে পারে। তবে বিজেপিবিরোধী দলগুলো তো এখনো একত্র হতে পারেনি। তাই অবস্থাদৃষ্টে আমার মনে হচ্ছে, বিজেপি যে একেবারে বড় রকমের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে যাবে, তা নয়। কংগ্রেসসহ সবাই যদি তাদের বিভিন্ন রকম মত-মতবাদ ইত্যাদিকে অ্যাভয়েড করে একটা সরকার গঠনের মতো জায়গায় যেতে পারে, তা হলে সেটা হবে খুব ভালো। আমি আশাও করছি, সেটা হবে।

সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসের যে রোল প্লে করার দরকার ছিল, সেটা তো তারা পারল না...
কংগ্রেসের কাছ থেকে আরও বেশি প্রত্যাশিত ছিল। যেমন বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, এখানে যে ধরনের ঐক্যের উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল, সেটা তারা করতে পারেনি। এ ছাড়া আঞ্চলিক দলগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে বিজেপিকে হারানোর যে কৌশল নেওয়া দরকার সেটাও যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। আঞ্চলিক দলগুলো যদি যে যার জায়গাটা দখলে রাখতে পারে তাহলে কিন্তু বিজেপিকে ঠেকানো সম্ভব। যেমন পশ্চিমবঙ্গে যদি তৃণমূল বিজেপিকে ঠেকিয়ে দেয় তাহলে কিন্তু সম্ভব। এই ইক্যুয়েশনে কিন্তু আশাবাদী হওয়া যায়।

ইশতেহার বলি আর ব্যক্তি মোদি বলি- প্রেজেন্টেশনেও কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপি অনেক শার্প...
তার বিভিন্ন কারণও আছে। বিজেপির পেছনে ভারতের যে করপোরেট ইন্টারেস্ট কাজ করে, এখন কংগ্রেসের জন্য তো সেটা করে না। তা ছাড়া আপার মিডল ক্লাস বিজেপিকে যে সাপোর্টটা করে, সেই সমর্থন কংগ্রেস পায় না। অন্য আঞ্চলিক দলগুলোও পায় না। ফলে বিজেপির এই অ্যাডভান্টেজ তো আছেই।

আমাদের সর্বশেষ নির্বাচন নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। বলা হয়, বিরোধী দল তাদের ক্যারিশমা দেখাতে পারেনি...
আমাদের এখানে নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে অন্যভাবে। আমি আপনি সবাই জানি, কীভাবে নির্বাচনটা হয়েছে। দল, প্রশাসন, পুলিশ মিলে একটা নির্বাচন করেছে। এখানে বিরোধী দলের ক্যারিশমা থাকা না থাকার কীই-বা পার্থক্য? থাকলেই বা কী এমন পরিবর্তন ঘটত। বিরোধী দল ওয়েভ তৈরি করতে পারেনি- নির্বাচনটাকে ওইভাবে যদি আপনি ব্যাখ্যা করেন তাহলে মূল ঘটনাটা কিন্তু আড়াল হয়ে যায়। বিরোধী দল যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে পরাজিত হতো, তাহলে কিন্তু আমরা এই আলোচনা করতে পারতাম না। নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমে একটি প্রশ্ন উঠেছিল, ডেভেলপমেন্ট অর ডেমোক্রেসি? আমরা কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। এখন একটা সুষ্ঠু নির্বাচনে যদি মানুষ আওয়ামী লীগের উন্নয়নের ন্যারেটিভটা একসেপ্ট করত তাহলে আমি মেনে নিতে বাধ্য হতাম। কিন্তু তা তো হয়নি।

কিন্তু বিরোধী দল কি আসলেই প্রস্তুত ছিল?
নির্বাচনের আগে তো একটা বিশাল প্রক্রিয়া থাকে। নির্বাচন কমিশনের আচরণ কি পক্ষপাতশূন্য ছিল? ছিল না। কোনো নির্দিষ্ট এলাকার কথা বাদ দিন। আপনি গোটা দেশে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতশূন্য নয়। প্রার্থীদের আদালতের দরজায় ঘোরাঘুরি করতে হচ্ছে। যেই কারণে একজনে প্রার্থীপদ বাতিল হচ্ছে, এই কারণে অন্য আরেকজনের প্রার্থীপদ বাতিল হচ্ছে না। এগুলো তো একটা মেসেজ দিচ্ছে। আপনি প্রশাসনকে এমন ব্যবস্থা করছেন, যেগুলো দৃশ্যত সাধারণের মনে কোনো আস্থা তৈরি করে না। তারপরে আপনি কী করে আশা করতে পারেন, হুট করে একটা ওয়েব তৈরি হয়ে যাবে। নির্বাচন কোনো অবস্থাতেই এক দিনের নয়। নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা বিভিন্ন রকম ইনস্টিটিউশনের সঙ্গে যুক্ত।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আপনার কী মনে হয়?
ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা আমি যেখানে দেখতে পাই সেটা হচ্ছে, যেই ব্যবস্থার মধ্যে এই নির্বাচন হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাটাই তারা বুঝতে পেরেছেন কি না- সেটা নিয়েই আমার মনে প্রশ্ন আছে। এ ধরনের নির্বাচন শুধু যে এখানেই হচ্ছে, তা তো না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় আমি এটাকে বলি হাইব্রিড রেজিম। আপনি যদি এটা না বুঝতে পারেন, তাহলে কিন্তু আপনি হোঁচট খাবেন। আপনাকে বুঝতে হবে, রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে, ক্ষমতাসীনের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। এ অবস্থায় নির্বাচনগুলো এরকমই হবে। তখন ভিন্ন কৌশলে ভাবতে হবে।