আন্তর্জাতিকীকরণের পথে ইবি  

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯ | ১ শ্রাবণ ১৪২৬

আন্তর্জাতিকীকরণের পথে ইবি  

ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী

সাজ্জাদ হোসেন ১০:২৪ অপরাহ্ণ, মে ০৮, ২০১৯

print
আন্তর্জাতিকীকরণের পথে ইবি   

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইসলামী
বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রকল্প, আবাসন-পরিবহন সংকট, আন্তর্জাতিকীকরণ সেশনজট নিরসন, বর্ধিত ফি, সবুজ ক্যাম্পাস, শিক্ষক নিয়োগে
অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে বলেছেন খোলা কাগজকে
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন

গত বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট পেয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশাল অঙ্কের টাকা কোন কোন খাতে ব্যয় করা হবে?
এটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ববৃহৎ প্রকল্প। এর আগে এখানে আরও ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। সবগুলোর অর্থ মিলে এই প্রকল্পের অর্ধেকও হয় না। সুতরাং আমি মনে করি, এই ৫৩৭ কোটি টাকার প্রজেক্ট ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল একটি তৎপরতা। এই টাকা মূলত ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং একাডেমিক উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হবে। ল্যাব ও পরিবহনের উন্নয়ন তো আছেই। অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টা যদি আরও নির্দিষ্ট করে বলি, নতুন করে দশতলা ভবন করা হবে ৯টি। তাছাড়া বিদ্যমান ১৯টি ভবন যথাসম্ভব ঊর্ধ্বমুখী করা হবে। এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আশা করি শিগগিরই আমরা ই-টেন্ডারিংয়ের কাজ এবং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারব।

প্রকল্প অনুমোদনের এক বছর হলেও টেন্ডার শুরু হয়নি। কোনো বাধা বা হুমকি আছে কি?
কিছু সংকট তো থাকেই কিন্তু আমি এ কাজের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলে একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি। তাছাড়া এ রকম বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জেলা পুলিশ প্রশাসনেরও একটা নজর থাকে। সুতরাং বাধা হয়তো আসবে কিন্তু সেগুলো উত্তরণ করা কঠিন হবে না। এ প্রসঙ্গে বলতে চাই, গত প্রশাসনের সময় প্রায় ৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাশ হয়েছিল সেটিরও পুরোটা কিন্তু আমাকেই বাস্তবায়ন করতে হয়েছিল।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। এরমধ্যে আবাসন সুবিধা আছে মাত্র ৩০০০ জনের। এই সমস্যাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আবাসন সমস্যা তো অবশ্যই আছে। এজন্যই এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ছেলেদের জন্য দুটি হল, মেয়েদের জন্য দুটি দশতলা হল। বর্তমানে ২২-২৫ পার্সেন্ট একোমোডেট করতে পারছি কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ৮৫ পারসেন্ট পারব। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮০ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী এটি যে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, আমাদের প্রজেক্টটি বাস্তবায়িত হলে আমরা তা বলতে পারব। আর তখন শিক্ষার্থীদের আর কোনো আবাসিক সমস্যা থাকবে না।

পরিবহন সংকট নিয়ে কী বলবেন?
সত্যি কথা বলতে কী, এটি একটি ইনবর্ন সংকট। বিশ্ববিদ্যালয়টি কুষ্টিয়া থেকে ২৪ কিলোমিটার এবং ঝিনাইদহ থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফলে পরিবহন নির্ভরতার কারণে এই খাতে একটা বিশাল অঙ্কের বাজেট দিতে হয়, যা আমাদের বাজেট ঘাটতির অন্যতম কারণ। স্থাপনের সময় তারা এটা ভেবেছিলেন কিনা, জানি না। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় যেমন শহর থেকে ২-৪ কিলোমিটারের মধ্যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়টিও যদি কুষ্টিয়া কিংবা ঝিনাইদহের এমন কাছাকাছি হতো তাহলে পরিবহন সংকটে পড়তে হতো না।
বাস্তবতা যেহেতু এমন, তাই এর ওপর গুরুত্ব দিয়েই পরিবহন সংকটের সমাধান করতে হবে। এতদিন আমরা ভাড়া করা গাড়ির ওপর নির্ভরশীল ছিলাম, এ নির্ভরতা ক্রমাগত কমানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা ঝিনাইদহে একটি দোতলা বাস চালু করেছি। অনতিবিলম্বে এমন আরও দুটি বাস চালু করা হবে। এছাড়া আমাদের মেগা প্রজেক্টটিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বড় গাড়ি ক্রয়ের ব্যাপারটি অন্তর্ভুক্ত আছে। ইতোমধ্যে গাড়ি কেনার ব্যাপারে টেন্ডার আহ্বান করেছি। সর্বোপরি আমাদের যে পরিবহন পুল রয়েছে সেখানে নিজস্ব গাড়ির সংখ্যা বাড়ানো আমাদের উদ্দেশ্য। তাছাড়া প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পর আমাদের যে আবাসন সমস্যা রয়েছে তার প্রায় ৮৫ শতাংশ দূর হয়ে যাবে। ফলে এমনিতেই পরিবহন সংকট আর থাকবে না। আমি আশাবাদী আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে এর সমাধান হয়ে যাবে।

১৭ বছর পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ সমাবর্তন সম্পন্ন করেছে আপনার প্রশাসন। কীভাবে সম্ভব হলো?
আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শিক্ষার্থীদের এই অভিলাষকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। ফেসবুক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি তাদের প্রবল আগ্রহ সমাবর্তনকে ঘিরে। সেই থেকে সমাবর্তন করার ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ গ্রহণের স্পৃহা জাগল আমার মনে। ব্যাপক সাড়াও পেলাম চারদিক থেকে। শিক্ষার্থীরা এত সুন্দরভাবে আমাদের সহায়তা করল যা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্য আরও যারা আছেন তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন মিলে সমন্বিতভাবে এমন একটা মহাকর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করেছি এবং আমি আশাবাদী, আমার সময়ের মধ্যে আরেকটা সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে।

চতুর্থ সমাবর্তনের থিম ছিল ‘আন্তর্জাতিকীকরণের পথে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’। সে পথে কতটা এগিয়েছে?
আন্তর্জাতিকীকরণের পথে আমরা অনেকটাই এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। আমরা যখন এই স্লোগান ঠিক করেছি তখন প্রথমে অনুসন্ধান করলাম এক্ষেত্রে কোন কোন ক্রাইটেরিয়া রয়েছে। দেখলাম, তার মধ্যে একটি হচ্ছে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি। আমাদের হলের একটা অংশ আছে ‘আন্তর্জাতিক ব্লক’, সেখানে এযাবৎকালে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে বিদেশি ছাত্র এনেছি। এখন প্রায় ৪০ জনের মতো বিদেশি ছাত্র পড়ছে, তাদের মধ্যে একজন মাস্টার্স সম্পন্ন করে দেশে ফিরে গেছে। শত শত ছাত্র নতুন করে ভর্তির জন্য আবেদন করছে আমরা তাদের যোগ্যতা বিচার করে পরবর্তীতে ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।

এক সময়ের ভয়াবহ সেশনজট কমিয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছেন। এটি কীভাবে সম্ভব হলো?
আমি দায়িত্বগ্রহণের পর প্রথমেই সেশনজট নিরসনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি। সেশনজটের অনেকগুলো কারণ ছিল, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কারণে অনির্ধারিত ছুটি থাকত। আমার দায়িত্বভার নেওয়ার পর থেকে একদিনও অযাচিতভাবে বন্ধ থাকেনি এটা বড় সাফল্য। এছাড়া শিক্ষক, সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার এবং সংগঠনের সহযোগিতার কারণে এখন সেশনজট নেই বললেই চলে। আমি আশা করি, আগামী ৬ মাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কোনো সেশনজট থাকবে না। একাডেমিক রুটিনগুলো পরিবর্তন করেছি। ২২ বিভাগে সেলফ অ্যাসেসমেন্টসহ কারিকুলাম পরিবর্তন করা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়েই সেশনজট কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি বর্ধিত ফির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
এখন যদিও সেসব সমস্যা প্রায় সমাধান হয়ে গেছে, তারপরও বলি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এক সময় মাদ্রাসাগুলো ছিল, তখন সেখান থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে সমস্যা মেটানো সম্ভব হয়েছিল। তারপর যখন মাদ্রাসাগুলো চলে গেল, তখন আমাদের দুটি সংকট তৈরি হলো। প্রথমত, আমাদের ১২৩ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়। আমার সময়কালে আড়াই বছর চেষ্টা করে সেটির বৈধতা দিয়েছি। এই জায়গাটিতে বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যেত। দ্বিতীয়ত, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল রাজস্বভুক্ত ছিল না যার জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি দেখা দেয়। এতকিছুর পরও সমস্যা সেভাবে টের পাওয়া যায়নি যখন মাদ্রাসা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু মাদ্রাসা চলে যাওয়ার পর আর্থিক সংকটটি বড় করে দেখা দেয়। দীর্ঘদিন কিন্তু কোনো ফি বাড়ানো হয়নি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যদি তুলনা করে দেখেন তাহলে দেখতে পাবেন, সেখানে কিন্তু অনেক ফি। আমি এসব কথা চিন্তা করে একটি কমিটি তৈরি করে দিই। তারা তুলনামূলক আলোচনা করার পর আমাদের ফি বাড়ল। কিন্তু এমনভাবে বাড়ানো হয়নি যাতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি অন্যদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। আসলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি অনেক কম ছিল সে বিচারে বেশ খানিকটা বেড়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা ভেবেছে, লাফ দিয়ে দুই তিন গুণ বেড়ে গেছে, আসলে তুলনামূলক বিচারে ফি কিন্তু ঠিকই আছে। এটা যে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম তারা হয়তো সেটা ভেবে দেখেনি। যাই হোক শিক্ষার্থীরা যেহেতু দাবি করেছে, আমরা রিভিউ কমিটি করে দিয়েছি। তারা যদি মনে করে ফি যথাযথ হয়নি তাহলে যে সিদ্ধান্ত হবে সেটাই বাস্তবায়ন করা হবে।

ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির দাবিতে আরেকটি আন্দোলন হয়েছে...
আমার প্রশাসনের যতগুলো সাফল্য তার মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অন্যতম একটি। আমার সময়ে ৮টি ফ্যাকাল্টি খুলেছি এবং পাঁচটি বিভাগের জন্য একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি খুলেছি। শিক্ষার্থীদের তো বুঝতে হবে যখন থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি খুললাম তখন থেকে ওই বিভাগের কোর্স কারিকুলাম কিন্তু চেঞ্জ হয়ে গেল। একটি হিউজ সিলেবাস তাদের পড়তে হচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দাবি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। যারা পাস করে বেরিয়ে গেছে তাদের জন্য আমাদের কিছু করার থাকছে না কিন্তু যারা কারেন্ট শিক্ষার্থী তাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স পড়িয়ে ডিগ্রি দেওয়া হবে। কেবল ডিগ্রি দিলেই তো হবে না, মানসম্মত সিলেবাসও পড়াতে হবে। এক কথায়, আমরা ডিগ্রির প্রতিও অবিচার করতে চাই না আবার শিক্ষার্থীদের প্রতিও অবিচার করতে চাই না।

সবুজ ও বর্ণিল ক্যাম্পাস তৈরিতে আপনার প্রশাসন বেশ সরব। এর পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে কি?
এটি আমার পরিকল্পনার অংশ। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের অফিস আওয়ারও বাড়ানো হয়েছে। আগে দুটা পর্যন্ত ছিল, একটি প্যাকেজ আওয়ারের মতো। আসতো চলে যেতো। কিন্তু অফিস টাইম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ক্যাম্পাসের প্রতি আকৃষ্ট করার কাজটিও আমরা করেছি। ক্যাম্পাসের লেক পরিষ্কার করে নয়নাভিরাম লেক করেছি, শিক্ষার্থীদের খাবারের মান বৃদ্ধি করেছি। বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি যাতে অধিক সময় ক্যাম্পাসে সবাই থাকতে পারে। যার কারণে এই সবুজ ক্যাম্পাস, বর্ণিল ক্যাম্পাসের ধারণাটা আমার মাথায় আসে।

শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি একটি অডিও ফাঁস হয়েছে। বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় দুজন শিক্ষকের শাস্তিও হয়েছে। এ বিষয়ে কী বলবেন...
বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলে আসছিল, আমার প্রশাসন তা সসম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে। আগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অপকর্মের বিচার হতো না। আমি ঘোষণা দিয়ে যে কোনো ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি। আক্ষরিক অর্থেই ১৫ থেকে ১৭ জন লোকের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে পর্যন্ত চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের যে অডিও ফাঁস হয়েছে সেখানে টাকা নেওয়ার কথা হয়েছে, কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে আবার টাকা ফেরত দেওয়ার কথা হয়েছে। এগুলো যখন প্রমাণিত হল তখন অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাগ্রহণ করেছি। একজন প্রফেসরকে অ্যাসোসিয়েট করা হয়েছে এবং একজন অ্যাসোসিয়েটকে অ্যাসিস্ট্যান্ট করা হয়েছে। এটা কিন্তু যে কয়েকটা গুরুদ- আছে তার মধ্যে অন্যতম। হয়তো আরও বেশি শাস্তি দেওয়া সম্ভব ছিল কিন্তু আমরা চিন্তা করেছি পরবর্তীতে তারা আবার কোর্টের আশ্রয় নিতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার অত্যন্ত সাহসী এই পদক্ষেপ বর্তমান প্রশাসনের জন্য মাইলফলক।

অযোগ্য প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে...
বিচ্ছিন্নভাবে এজাতীয় কথা আসতে পারে। কারও এমন পছন্দের প্রার্থী থাকতে পারে, যে প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে আসতে পারেনি। তখন তারা এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা প্রচার করে থাকেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ সততা নিষ্ঠা এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে প্রশাসন চালাচ্ছি। সেই দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে বলতে পারি, কোনো রকমের অনিয়মের ঘটনা ঘটতে দেইনি। যদি প্রমাণসহ কেউ কোনো অভিযোগ করতে পারে তবে সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি বদ্ধপরিকর। কথা দিতে পারি, আমার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অপরাধ তামাদি হবে না, ৫ বছর পরও অপরাধ প্রমাণিত হলে আমি সেটার শাস্তি দিয়েছি।

মেডিকেলের চিকিৎসার মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে...
আমার সময়ে মেডিকেলের ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। সুন্দর রুমসহ দোতলা করা হয়েছে। তবে ওষুধপত্রের ব্যাপারে একটু সমস্যা রয়েছে। এর পেছনের কারণ বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি। কিন্তু আমাদের তাৎক্ষণিক এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে সব ব্যবস্থা রয়েছে। কারও যদি কোনো বড় ধরনের সমস্যা হয় তাহলে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সে করে রেফার করে দিই। কিছু ওষুধপত্রের ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে কিন্তু সেগুলোর ব্যাপারে আমি কড়া নিজরদারি রেখেছি। এখন সংশ্লিষ্ট দফতরেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্বে মাঝে মাঝে অবহেলা পরিলক্ষিত হয়। কোনো কোনো দফতর বেশি সুবিধা নিয়েও ভালোভাবে চলছে না, আবার কোনো কোনো দফতর অল্প সুবিধা নিয়েও ভালোভাবেই চলে। তাই আমি মনে করি যদি দফতর ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করে তাহলে বড় ধরনের সমস্যা হবে না।

সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটি রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
প্রতিটি মৃত্যুই অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে শুধু আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে না অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন ঘটনার কথা জানি। আমাদের মধ্যে একটা জেনারেশন গ্যাপ রয়েছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় খুবই সংগ্রামী জীবনযাপন করতাম। সার্ভাইভ করার জন্য নিজে নিজে ১০১টা রাস্তা খুঁজতাম। এত সহজে গিভ আপ করা কিংবা কুইট করা আমাদের পলিসিতে ছিল না। এখনকার জেনারেশনকে আমি ঠিক বুঝি না কেন এত হতাশ হতে হবে? আমি ব্যক্তিগতভাবে উপাচার্য হিসেবে বিভিন্ন সময় বলে এসেছি, যদি কখনো তোমাদের এ রকম মনে হয়, তাহলে তোমরা সরাসরি কিংবা বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে আমার কাছে এসো। আমি নিজে হেল্প করব।
আর সার্বিকভাবে আমি সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছি। সামনে আমরা ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে প্রোগ্রাম করাব। এর আগেও আমরা বড় ধরনের আত্মহত্যাবিরোধী প্রোগ্রাম করেছিলাম রাজশাহী মেডিকেলের একজন স্বনামধন্য সাইকিয়াট্রিস্টকে দিয়ে। আমার কাছে মনে হয়, এটা জেনারেশনের মনোদৈঘিক একটি সংকট, যার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। এই দিকগুলো জাতীয়ভাবে চিন্তা করতে হবে। জেনারেশনের সংকটগুলো চিহ্নিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মেডিকেল হেলথ কেয়ার খোলার ব্যাপারে আমার প্ল্যান রয়েছে।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে থাকেন, ফলে যে কোনো সংকট নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী আলোচনা হতে পারে...
অবশ্যই আমরা এসব উদ্যোগ নিচ্ছি। শিক্ষকরা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে পারেন সে ব্যাপারে আমার ব্যাপক পরিকল্পনা আছে। শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের গেস্ট হাউজ করেছি। শিক্ষকদের ডরমেটরি বর্তমানে পরিপূর্ণ। এরপরও আমাদের যে মেগা প্রজেক্ট রয়েছে সেখানে শিক্ষকদের জন্য ১০ তলা একটি বিল্ডিং এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য একটা বিল্ডিং নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে অধিকাংশ, পারতপক্ষে সবাই ক্যাম্পাসে থাকুক এ ব্যাপারে তাদের আকৃষ্ট করতে আমি মেগা প্রজেক্টের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ল্যাবরেটরি স্কুল রয়েছে সেটিকে ৮-৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি যাতে করে শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীদের সন্তানদের কোয়ালিটি এডুকেশন দেওয়া যায়। এমনকি মসজিদের নিচে সুবিশাল জায়গাজুড়ে একটি শপিং কমপ্লেক্স করার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান হবে। এসবের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে টাউনশিপ গড়ে তোলা হবে যাতে করে শিক্ষকরা শহরমুখী হওয়া থেকে বিরত থাকেন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে যদি তার প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা পান তাহলে সেগুলো তাদের ক্যাম্পাসে থাকার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উৎসাহ জোগাবে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় মৌলবাদের তৎপরতা ছিল, বর্তমানে সেসব দেখা যায় না-কীভাবে এই এটি সম্ভব হলো?
আমি মনে প্রাণে একজন প্রগতিশীল মানুষ। আমার ব্যক্তিগত জীবনাচরণে আমি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনষ্ক এবং আধুনিক। এখন আমার যে আদর্শ- বিশ্বাস সেটা তো আমার প্রশাসনে পড়বেই। আমি এই প্রথম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি সুবিশাল ম্যুরাল তৈরি করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সংকীর্ণ জলাশয় কিংবা বদ্ধ ডোবা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অবাধ জ্ঞান সাধনা, সাংস্কৃতির চর্চা, প্রগতিশীলতার চর্চা এবং চিত্ত বিনোদন, খেলাধুলার চর্চা হবে মুক্তভাবে। বর্তমানে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদ মোকাবেলার জন্য, মাদক সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার জন্য খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছি। এর অংশ হিসেবে আমরা ক্যাম্পাসে বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছি, বইমেলার আয়োজন করেছি। এসব সমস্যা মোকাবেলায় লোকাল কমিউনিটির মানসিক পরিবর্তনও জরুরি। এই প্রথম আমরা বৈশাখী মেলা অত্যন্ত জমজমাটভাবে করেছি। মেলায় ইন্ডিয়ান আইডলের শিল্পী এনে গান করানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক জনগণকে চিত্ত বিনোদন দিতে আমাদের যে একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে সেখান থেকে আমরা তাদের এসব অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দিয়েছি। সেই সঙ্গে আমি আইনি কাঠামোও প্রয়োগ করেছি, যাতে জেলা প্রশাসনের সহযোহিতায় এখানে কেউ স্বাধীনতাবিরোধী, দেশবিরোধী কোনো কর্মকান্ডের পক্ষে সংগঠিত হতে না পারে।
(চলবে)