নীতি নিয়ে চললেই যত সমস্যা

ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ | ৬ বৈশাখ ১৪২৬

নীতি নিয়ে চললেই যত সমস্যা

ড. এসএম ইমামুল হক

ড. কাজল রশীদ শাহীন ৯:২৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৯

print
নীতি নিয়ে চললেই যত সমস্যা

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এসএম ইমামুল হক। ১৫ দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চলছে অচলাবস্থা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নিজের অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট, শিক্ষক-কর্মচারী সম্পর্ক, স্থানীয় রাজনীতির ভেতর-বাইরের নানা বিষয়ে কথা বলেছেন খোলা কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ড. কাজল রশীদ শাহীন

গতকালের পর...


আপনি আগের ভিসির অনিয়মের বিষয়ে বললেন, আপনার ব্যাপারেও তো অভিযোগ আছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম করেছেন...
আমি তো বলেছি, আমার পদে থাকা অবস্থায় কোনো নিয়োগে যদি অনিয়ম প্রমাণ হয় তাহলে আমি যে কোনো শাস্তি মেনে নেব। উল্টো নিয়মটাকে অনিয়মের মাঝে নিইনি বলেই তো ওরা আজ এসব করছে। ওখানকার লোকাল লিডাররা বলে, আমি লোক পাঠাই, কিন্তু আপনি তো চাকরি দেন না।

কিন্তু পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপন এসেছে, সেখানে....
না, এটা সঠিক নয়। যারা এটা তুলছে তারা কিছুই জানে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপন আর এই বিজ্ঞাপন এক। একজন অধ্যাপক কিংবা সহযোগী অধ্যাপকের জন্য যখন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, তখন তো এসবই লেখা থাকে। আমরা বলেছি, ‘অধ্যাপক পদপ্রার্থীদের অবশ্যই প-িত হতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে তৎসংক্রান্ত বিষয়ে পিএইচডি বা সমমানের ডিগ্রি থাকা বাঞ্ছনীয়।’ এখানে আর কী বাদ থাকল? এই বিজ্ঞাপনে যারা ভুলের কথা বলে, তারা ভুলটা পেল কোথায়?

তার মানে বিষয়টাকে তারা অতিরঞ্জিত করেছে?
করেছে তো বটেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপনে দেখেন, যখন লেকচারার নেওয়া হয়, তখন বলা হয়, এসএসসি-এইচএসসির ফলাফল এমন হওয়াটা শর্ত। কারণ তখন তো সে ফ্রেশ। অধ্যাপকের ক্ষেত্রে এটা কেন লাগবে? যে ইতোমধ্যে ১২ বছর চাকরি করেছে, সে তো সেসব শর্ত পূরণ করেই চাকরিগুলো করেছে। নতুন করে এগুলো দেওয়া অবান্তর না?

আরেকটা অভিযোগ আছে, আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সিন্ডিকেটই চেঞ্জ করে দিয়েছেন?
ছি! ছি! কী ঢাহা মিথ্যা কথা। সিন্ডিকেটের মেয়াদকাল দুই বছর। কারা সেখানে থাকবেন সেটা নিয়মে বাঁধা। শিক্ষক ক্যাটাগরিতে নির্দিষ্ট কয়েকজন থাকবেন। এরপর যুগ্ম-সচিবের নিচে নয় এমন দুজন থাকবেন সরকার কর্তৃক মনোনীত। দুজন থাকবেন শিক্ষাবিদ। আরও দুজন থাকবেন রাষ্ট্র কর্তৃক মনোনীত। তো দুই বছর শেষ হয়ে গেলে আমাকে কি আইন অনুযায়ী সিন্ডিকেট বদল করতে হবে না? আমি বদলালাম মানে কী?

কেউ কেউ দাবি করছে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাদের প্রযত্নে। কিন্তু সিন্ডিকেটে আপনি তাদের রাখছেন না?
সিন্ডিকেট তো উপাচার্য বানায় না। সিন্ডিকেট হয় রুলস অনুযায়ী, সেখানে তো আমার কিছু করার নেই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে যায়, তিনি যাদের নামের পাশে টিক দিয়ে দেন, তাদেরকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন। নাম তো গিয়েছে, যদি প্রধানমন্ত্রী না দেন, তার জন্য আমি কি দায়ী? আমি যদি প্রধানমন্ত্রীকে বলি, অমুককে নিয়োগ দেন, উনি তো দেবেন না। তাছাড়া এখন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার আগে ডিজিএফআই, এনএসআই- সবার কাছ থেকে খবর নিয়েই উনি টিক দেন। তো আমাকে এসব বিষয়ে অভিযুক্ত করার মানে কী?

কালের কণ্ঠে একটা রিপোর্টে এসেছে, নিয়োগের বেলায় আপনি স্বজনপ্রীতি করেছেন, সাবেক ছাত্র নিয়োগ দেওয়ার জন্য...
ওগুলো সব বানোয়াট। আমার যা বয়স, তাতে আমার তো অসংখ্য ছাত্র থাকবে। সে যদি কোয়ালিফাইড হয় তাহলে তাকে কি আমি নিয়োগ দেব না? আগের উপাচার্য কী করেছিলেন? ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে প্রার্থীর রেজাল্ট সেকেন্ড ক্লাস হওয়ার পরও নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখন যার কথা বলা হচ্ছে, হি হ্যাজ গট ফার্স্ট ক্লাস ইন এসএসসি, ফার্স্ট ক্লাস ইন এইচএসসি, ফার্স্ট ক্লাস ইন মাস্টার্স, শুধু অনার্সে সেকেন্ড ক্লাস। তারপর পিএইচডিও আছে। তো এখানে সমস্যাটা কোথায় হলো? এটা ক্রাইটেরিয়ার মধ্যেই আছে, সব সময় আমরা একটা সেকেন্ড ক্লাস এলাউ করি। ঢাবিতেও তাই হয়।

তাহলে কি স্থানীয় রাজনীতি, গণমাধ্যম- সবাই আপনার প্রতি অবিচার করছে?
আমার মনে হয় তারা আমার প্রতি অবিচার করছে না, তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অবিচার করছে। প্রধানমন্ত্রী যখন একজনকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেন, তখন তো জেনেশুনেই দেন। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড তো আপনারা জানেন। চাইলে খোঁজও নিতে পারেন।

আমি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করেছি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তো আমরাই লাঠিসোটা নিয়ে গিয়ে শুনেছি। বন্দুকের সামনে সাত-আট বার পড়েছি একাত্তরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নীল দলের কনভেনার ছিলাম দুই দুইবার। তো আমাকে তো জেনেশুনেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। তাই এখন যেটা করা হচ্ছে, সেটা আসলে প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা। উনারা বলে বেড়ান, বরিশালের লোক না হলে হবে না। তাহলে প্রধানমন্ত্রী বরিশালের লোক দেননি কেন? তাছাড়া যারা এসব অভিযোগ করে তারা কি আওয়ামী লীগ করে? তারা কি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক? তারা তো প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও অনুগত না। তাদের তো বলা উচিত ছিল, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু দিয়েছেন, আমরা মেনে নিচ্ছি।

এসব ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কি আপনার কথা হয়েছে?
না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তো চাইলেই কথা বলা যায় না। টেলিফোন করলে তো উনি ধরবেন না। আমি চেষ্টা করেছি উনার পিএসের মাধ্যমে, এখনো পাইনি।

বলা হচ্ছে, আপনাকে নাকি ছুটিতে পাঠানো হয়েছে?
এগুলো অপপ্রচার। আমি যদি ছুটি না চাই, নোবডি ক্যান সেন্ড মি টু লিভ। এটা কি ছেলেখেলা? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যদি আমরা কাউকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাই, সে হাইকোর্ট থেকে তা বাতিল করে নিয়ে চলে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন ঘটনা ঘটেছিল। একজনকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়েছে, সে সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্টে গিয়ে তা বাতিল করে নিয়ে এসেছে। সুতরাং এটা এত সহজে হয় না। আর একজন উপাচার্যকে কে ছুটি দেবে? সে দেবে আচার্য অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি। প্রথমে চিঠি যাবে মন্ত্রণালয়ে, সেখান থেকে যাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে, তারপর যাবে রাষ্ট্রপতির কাছে। রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করলে তবেই না আমার ছুটি।

উপাচার্যের সব ছুটিই কি রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে নিতে হয়?
বিশেষ করে দেশের বাইরে গেলে অবশ্যই রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ছুটি নিতে হয়। অনেক সময় ছুটি না পাওয়ার কারণে বিদেশে যেতে পারি না আমরা। সেই ছুটি আবার কাগজে কলমে নিতে হয়, নচেৎ এয়ারপোর্টে আটকে দেবে তো।

এই পরিস্থিতিতে আপনারা প্রতিবাদ করছেন না কেন?
আমরা বলতে আমি তো করছি। আমি একলা মানুষ। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ব্যাপারে আমার মনে খুব কষ্ট। শিক্ষকদের একটা অংশ ওই গড্ডলিকা প্রবাহে চলে গেছে। তারা লোকাল পলিটিক্সের খপ্পরে পড়েছে। আমি অনেকবার বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের উন্নতি অবনতি- সবই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করে, কোনো পলিটিক্যাল লিডার কিছু করতে পারে না। এমনকি ছুটিটাও কিন্তু তারা দিতে পারে না।

অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তারা...
আমাদের কোনো প্রোভিসি নেই। ট্রেজারার আছেন। উনার ভূমিকা আমার কাছে সন্তোষজনক নয়। শিক্ষক সমিতি আছে, তাদের ভূমিকাও সন্তোষজনক নয়। তারা বিভক্ত। একদল ভাবছে, ভিসির তো মেয়াদ প্রায় শেষ...। তাদের নৈতিক অবস্থানে আমি খুব আহত। আমরাও তো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। ৭৫ থেকে ৯৬ পর্যন্ত দুঃসময়ের মধ্যে শিক্ষকতা করেছি। ওই সময় আমি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের কাজ করেছি কিন্তু এমন অবস্থা কখনো ফেস করিনি।

আপনি যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন, সে ব্যাপারে মন্তব্য কী?
আমি তো মনে করি এগুলো সাহসী পদক্ষেপ। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেটা করতে পারেনি, সেটা আমরা করেছি। বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ওয়ালে লাগিয়েছেন, রাজাকারমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ধূমপান মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, মাদকমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। কেউ লাগাতে পারেনি, আমি লাগিয়েছি। আমার ওপর গোস্যার এটাও একটা কারণ। এই আন্দোলনের নামে ওগুলো সব ছিঁড়েছে তারা। আমরা যতই বলি না কেন, এখনো কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি সব জায়গায় আছে। সুযোগ পেলেই তারা এসব কাজ করছে। আমি তো আগেও বলেছি, এই আন্দোলনে যে ছেলেটি লিড দিচ্ছে, তার বাবা বরিশাল বিএনপির সহ-সভাপতি। তাকে আবার আমরা আওয়ামী লীগের লোকেরা সাপোর্ট দিচ্ছি।

স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আপনার কথাবার্তা হয়নি?
ওখানকার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেন, আমরা তো ভাই হেল্পলেস, সাম দেয়ার ইজ এ প্রিন্স টু কনট্রোল এভরিথিং। ভাবা যায়, আমি একজন ভাইস চ্যান্সেলর, যাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন; আমাকে থ্রেট দেওয়া হয়েছে, ওখানে গেলে ফিজিক্যালি অ্যাসল্ট করা হবে।

এর আগে কি প্রিন্সের সঙ্গে আপনার কোনো ঝামেলা হয়েছিল?
আমার সঙ্গে তো হয়নি। তারাই করেছিল। ২০১৭ সালের ঘটনা। আমার এখানে ঘুষের টাকা রেখে গেছে। আমি না করে দিয়েছি সেটা তাদের পছন্দ হয়নি। ফলে তারা নানা অভিযোগ তুলেছে, কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে যে, নাথিং ইজ কারেক্ট। পরে ওবায়দুল কাদের এসে ধমক দিয়ে বলেছেন, এগুলো বন্ধ কর। তাদের কথামতো চলতে হবে একজন ভাইস চ্যান্সেলরকে ইট ইজ নট পসিবল, অ্যাট লিস্ট এ ম্যান লাইক মি।

এ পরিস্থিতিতে তো কিছু মানুষ আপনার পাশে থাকা উচিত ছিল...
আছে। তারা হয়তো ভয় পায়। সাহসীভাবে প্রতিবাদ করার লোক পৃথিবীতে খুব কমই আছে। আমাকে তারা প্রতিনিয়তই ফোন করে কিন্তু তারা তো পথে নামবে না। যদি আবার মার খায়। আবার অনেকের ধারণা, প্রতিবাদ করে আমার কী লাভ? আমি বারবার বলেছি, লাভ আপনার আমার না, ব্যক্তি ইমামুল হক আজ আছে কাল নেই, বাট ইউ হ্যাভ সেইভ দ্য ইউনিভার্সিটি।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে আপনি কী দিয়েছেন যে কারণে আপনাকে আলাদা করে মনে রাখতে হবে?
আমি তাদের যে একাডেমিক এক্সিলেন্সি দিয়েছি, যে আইন-কানুন করে দিয়েছি, আমি চলে গেলে এটার জন্য আমাকে মনে রাখতে হবে। এটা নতুন না, আমি আরও অনেক জায়গায় ছিলাম, যেখান থেকে ছেড়ে আসার পর তারা আমাকে মনে রেখেছে। হলের প্রভোস্ট ছিলাম, ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান ছিলাম। চলে আসার পর তারা সবাই এখন বলে, আপনি যা করে গিয়েছেন, সেটা এখন আর পাচ্ছি না।

দুনিয়াতে ভালো মানুষের জায়গা কম। আমি নীতি নিয়ে চলছি, তাই যত সমস্যা। যদি আমি দুর্নীতি করতাম, তাহলে সমস্যা হতো না। আমার অবশ্যই দল থাকতে পারে কিন্তু অ্যাকশনগুলো হতে হবে নিরপেক্ষ। এই নিরপেক্ষ অ্যাকশন যখনই নিতে গেছি, তখন তারা সেটা পছন্দ করছে না।

উপাচার্যের কথা এলে আমরা আমাদের দেশের কয়েকজন আদর্শ উপাচার্যের নাম বলি। আপনার কি তেমন কোনো আদর্শ আছে, নাকি আপনি নিজেই দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে চেয়েছেন?
আমি নিজেই দৃষ্টান্ত হতে চেয়েছি। কারণ আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও তাই। আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন, তাকে কোনোদিন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে দেখিনি। কোনোদিন অসৎ কাজ করতে দেখিনি। বাবার কাছ থেকেই এই শিক্ষা পেয়েছি। তাছাড়া আমি শিক্ষিত হলাম কি জন্য যদি আমার নৈতিকতাই না থাকে। আমার সঙ্গে তাহলে অশিক্ষিত কসাইয়ের পার্থক্য কোথায়? আমি শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছি। বিসিএস হয়েছিল, যাইনি। তো শিক্ষকতা করব আবার অনৈতিক কাজ করব, এটা কি হয়?

শিক্ষকতা-ভিসির দায়িত্ব এই দুটাতে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
শিক্ষকতা তো এখনো করে যাচ্ছি। কিন্তু উপাচার্য বিষয়টা একাডেমিক প্লাস প্রশাসনিক। প্রশাসনিক দায়িত্ব আলাদা জিনিস। একটা অর্গানাইজেশনকে আমি সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে এসেছি, এটার অনুভূতি তো দারুণ। ১৯৯৬ সালে আজাদ চৌধুরীর সঙ্গে খুব ক্লোজ ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দলাদলি থাকলেও একটা নর্মস আছে কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটাও নেই।

ভিসি হিসেবে আপনি কি এই প্র্যাক্টিসটা শুরু করতে পারতেন না?
অবশ্যই পারতাম, করেছিও কিন্তু আমাকে তো সুযোগ দিতে হবে। আমি এসে পেয়েছি কর্মকর্তা-শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এগুলো নিরসন করে একটা পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলাম। আমি বলেছি, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই প্রয়োজনীয় পার্ট, কেউ কারও প্রতিপক্ষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে যিনি ছিলেন তাকে বলেছি, শিক্ষক, সে যত ইয়াং-ই হোক না কেন, তাকে আপনি করে বলতে হবে। সবাইকে নিয়মানুবর্তী করার চেষ্টা করেছি। আর ওখানে তো সিনিয়র টিচার নেই। সবকিছুই আমাকে করতে হয়।

আপনি বারবার স্থানীয় রাজনীতির কথা বলেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের কেউ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি?
না, করেনি। এটা আমার জন্য দুঃখজনক। এখানে আমার করার কিছু ছিল না। এখানে আমাকে দোষ দিলে হবে না। এটা নিরসনে তারা এগিয়ে আসতে পারত। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারত কিন্তু তারা তা করেনি। আমি রাজাকারকে রাজাকার বলব না, এটা তো হতে পারে না। রাজাকারকে আমি রাজাকার বলেই যাব।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির পরিবেশ কেমন?
ছাত্র রাজনীতি নেই। ওখানে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। কিছু গ্রুপ আছে তারা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু অফিসিয়ালি করতে পারে না। আইনেও বোধ হয় নেই।

এত কিছুর পরও আপনাকে যদি দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়, আপনি কি যাবেন?
আমাকে ভেবে দেখতে হবে। নিয়োগ দিলে তো প্রধানমন্ত্রী-ই দেবেন, তারপরও আমি ভেবে দেখব। কারণ আমি মনে করি, আমার প্রতি সবদিক থেকেই এক ধরনের অবিচার করা হয়েছে। একজন লোকাল লিডার এসে বলল, আমার একটা লোককে চাকরি দিতে হবে। না দিতেই আমি তার শত্রু হয়ে গেলাম। এটাই তো হয়েছে। ওখানকার আওয়ামী লীগের যে নেতা, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, উনি একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি যে আপনাকে সুপারিশগুলো পাঠাই, আপনি তো রাখেন না। আমি উনাকে বললাম, আপনি যা দেন সব তো ফেল করা, পাস করা একজন দেন আমি চাকরি দিয়ে দেব। তারপর লোকাল এমপি যিনি ছিলেন, বেগম জেবুন্নেসা আফরোজ, উনিও তদবির করতেন। আমি বললাম, তদবির আপনারা করেন, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে যদি তদবির আসে, তাহলে কিন্তু আমি কোনো চাকরি দেব না। কয়জন উপাচার্য এভাবে বলতে পারবে? কারণ আমি নিজে তো তদবির করে চাকরি নিইনি। আমাকে এটা দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে আমি রিটায়ারমেন্টে চলে যাচ্ছিলাম, তখন আমাকে বলা হয়েছে, তুমি এটা নাও।

তার আগে আপনার সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি?
না। আমি কোনো তদবিরও করিনি। হঠাৎ করে শিক্ষামন্ত্রীর মেয়ে নাদিয়া, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ফোন দিয়ে বলল, স্যার, বাবা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমি বললাম, কেন? বললাম, তোমার বাবার ফোন নম্বরটা দাও আমি নিজেই কথা বলব। ও বলল, এখনই, আমার ফোনেই কথা বলেন। আমি ফোন নিলাম, তিনি বললেন, কিছু মনে করবেন না, আপনার বয়স কত? উত্তর দেওয়ার পর আমার বায়োডাটা চাইলেন। কেন দরকার, সেটাও আমি জিজ্ঞাসা করিনি। মে মাসে ওই মেয়ে আবার ফোন দিয়েছে। বলে, স্যার, বাবা আপনাকে কংগ্রাচুলেট দিতে বলেছে, আপনার ফাইলটা রাষ্ট্রপতির কাছে গেছে। তখন সে আমাকে বিষয়টা খুলে বলল। এই প্রথম আমি আমার উপাচার্য হওয়ার খবর জানলাম। আমি তো কারো কাছে কোনো তদবির করিনি।

কিন্তু বাইরে এমন কথাও বলা হয়, আপনি ফরিদপুরের বলে...
ফরিদপুরের বলে যদি প্রধানমন্ত্রী দেন, সেই দোষ কার? আর ফরিদপুরেরই-বা দোষ কোথায়? বরিশালের লোক যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। বরিশালের লোক যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। বরিশালের লোক যে নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। সেগুলো কি গায়ে লাগছে না কারও? এখন আমরা যদি বলি, ওই পদগুলোতে ফরিদপুরের লোক নেই কেন? যারা এগুলো বলে, তারা অর্বাচীনের মতো কথা বলে। ফরিদপুরের লোকদের তো সেই অর্থে কিছু দেওয়াই হয় না। ফরিদপুরের লোক তো বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। এটা কি গায়ে লাগে না কারও? আমার সবচেয়ে বেশি দুঃখ লাগে যখন ভাবি যে, আমি সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন মানুষ, অথচ আমাকে তারা বলে ওখানে গেলে ফিজিক্যালি অ্যাসল্ট করা হবে!

আপনার মেয়াদ তো মে পর্যন্ত। এর মধ্যে বরিশালে যাবেন?
বরিশালে তো আমি যেতে চাই। কিন্তু আমাকে প্রোটেকশন দেবে কে? পুলিশ প্রশাসন তো আমাকে কোনো সহায়তা করল না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ ছাত্রলীগকে মারছে অথচ আমি বলেছিলাম, আপনাদের উপস্থিতি থাকলেও আমাদের জন্য ভালো, কিন্তু পুলিশ আসবে না। আন্দোলনকারীরা রাস্তা দখল করে বসে আছে, রাস্তা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের কিছু? পুলিশ তো তাদের সরিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু পুলিশ বলছে ওপর থেকে নির্দেশ আছে এটা না করার জন্য। তাহলে তো আমার আর কিছু বলার নেই।

আপনার নিজের থেকে কিছু বলার থাকলে...
আমার কথা হচ্ছে, এভাবেই যদি চলতে থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিন্তু চালানো যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ই। কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয়কে কলেজ মনে করে, তাহলে তারা ভুল করছে। যারা ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে যাবেন, তাদের উদ্দেশে আমার বক্তব্য থাকবে, নৈতিকতাকে আপহোল্ড করে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে হবে। কারো প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা চলবে না। অবশ্যই আমরা একটা পার্টি করি বলেই তো আমাদের দেওয়া হয়েছে কিন্তু দাসের মতো কাজ করা যাবে না।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
খোলা কাগজ পরিবারকে শুভেচ্ছা।

গতকালের খবরটি পড়ুন...

কলকাঠি নাড়াচ্ছেন স্থানীয় রাজনীতিকরা: ড. এসএম ইমামুল হক