বিক্ষোভে উত্তাল বৈরুত

ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

বিক্ষোভে উত্তাল বৈরুত

ডেস্ক রিপোর্ট ১০:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০২০

print
বিক্ষোভে উত্তাল বৈরুত

সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে লেবাননের রাজধানী বৈরুত। ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হাজার হাজার জনতা গত বৃহস্পতিবার পার্লামেন্ট ভবনের সামনে বিক্ষোভে শামিল হন। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার শেল নিক্ষেপ করলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। গত মঙ্গলবারের জোড়া বিস্ফোরণে শহরটির বিশাল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। পারমাণবিক বোমার মতো শক্তিশালী এ বিস্ফোরণে অন্তত ১৩৭ জন নিহত ও ৫ হাজারের বেশি আহত হন। খবর বিবিসির।

বৈরুত বন্দরের একটি গুদামে ২০১৩ সাল থেকে মজুত রাখা ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে পুরো একটি জেলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে হাজারো ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এতে অসংখ্য মানুষ হতাহত ছাড়াও তিন লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়েছে। শহরটিতে মজুত খাবারের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে।

যা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ, আতঙ্ক আর হতাশা। এত বছর ধরে কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য গুদামটিতে পড়ে ছিল, এমন প্রশ্নে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিক্ষুব্ধ মানুষ বৈরুতের পার্লামেন্ট ভবনসহ বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভে শামিল হয়। বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে সরকারবিরোধী সেøাগান দিতে দেখা যায় মানুষকে।

তাদের অভিযোগ, সরকারের অবহেলার কারণে এতগুলো মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটল। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ঘেরাও করতে গেলে তাদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। এতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এদিকে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বিস্ফোরণের এ ঘটনার তদন্তে ১৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সরকারের পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। গত বুধবার মারওয়ান হামাদেহ নামে একজন এমপি পদত্যাগ করেন। পরদিন তাকে অনুসরণ করেন জর্দানে লেবাননের রাষ্ট্রদূত ট্রাসি সামাউন।

এমন বিপর্যয়ের ফলে নেতৃত্বের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে তাদের দাবি। বিস্ফোরণের পর পরিস্থিতি দেখতে গত বৃহস্পতিবার বৈরুত সফরে গেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোন। বিদেশি নেতাদের মধ্যে তিনিই প্রথম বৈরুত সফরে গেলেন। বৈরুতে পৌঁছে বিস্ফোরণস্থলসহ ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তাঘাট ঘুরে দেখেন তিনি। আরও অনেক দেশ লেবাননের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।

ঘরহারা তিন লাখ মানুষ, মজুদ খাদ্যের ৮৫% ধ্বংস : লেবাননের রাজধানী বৈরুতকে তছনছ করে দেওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় হতাহতের পাশাপাশি প্রায় তিন লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছেন বলে জানিয়েছেন শহরটির গভর্নর মারওয়ান আবুদ। মঙ্গলবারের ওই বিস্ফোরণে বৈরুত শহরের অর্ধেক অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেকে আটকে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা মারওয়ানের। বিস্ফোরণে লেবাননের মজুদ খাদ্যশস্যের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে বুধবার জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি আমদানি করা খাদ্যশস্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। খাদ্যশস্যের এখন যা মজুদ আছে তা দিয়ে দেশটি বড় জোর আর এক মাস চলতে পারবে বলে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আসলে কী : এখন পর্যন্ত ওই বিস্ফোরণের কারণে ১৩০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ। প্রায় ৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মূলত কৃষি জমিতে সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া খনিতে এ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় পাথর ভাঙতে। এছাড়া এর সামরিক ব্যবহারও আছে কিছু। এর আগেও বহু শিল্প দুর্ঘটনার কারণ ছিল অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। সন্ত্রাসবাদেও ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে ওকলাহোমা সিটির আলফ্রেড পি. মুরে ফেডারেল বিল্ডিং উড়িয়ে দিতে এই রাসায়নিক ব্যবহার করেছিল শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা। ৪ আগস্ট বৈরুতের ওই বিস্ফোরণের বেশ কয়েকটি ভিডিও অনলাইনে এসেছে।

এতে দেখা গেছে ভয়ানক গতির এক বিস্ফোরণ। গুদাম থেকে সাদা ধোয়া হঠাৎ করেই কালো-লাল বিস্ফোরণের সৃষ্টি করে। তার চেয়েও বড় আকারে পানির বাষ্প ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। কেঁপে উঠে পুরো শহর। তীব্র বাতাসের ঝটকায় বহু দূরের বাড়িঘরের কাঁচ ভেঙে যায়। এমনকি ভিডিও ক্যামেরা পর্যন্ত মানুষের হাত থেকে পড়ে যেতে দেখা গেছে। লেবানিজ সরকার বলছে বৈরুতের উপকূলে এক গুদামে ২৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সার রাখা ছিল। সেখানেই আগুন ধরে যায়, যা পরে বিস্ফোরিত হয়।

প্রায় ৬ বছর আগে রাশিয়ান মালিকানাধীন একটি কার্গো জাহাজে করে এসেছিল এই সার। বন্দর কর্মকর্তারা বলেন, তারা অনেকদিন ধরেই আদালতে আবেদন করেছেন যেন এ মজুত সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এতদিন কেউই ব্যবস্থা নেয়নি। আগেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমনটা ঘটেছে। ১৯৪৭ সালে টেক্সাস সিটিতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বহনকারী দুটি কার্গো জাহাজে আগুন লাগলে ৫৮১ জন নিহত হয়, আহত হয় ৩৫০০ জন। ২০১৩ সালে টেক্সাসের একটি সার কারখানায় আগুন লাগলে বিস্ফোরিত হয়।

নিহত হয় ১৫ জন। ২০১৫ সালে চীনের তিয়ানজিনে এক সার বিস্ফোরণে একটি ব্যস্ত সমুদ্র বন্দরে ১৬৫ জন মানুষ নিহত হয়। আমেরিকায় বহু মানুষ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ভয়াবহতার সঙ্গে পরিচিত হয় ১৯৯৫ সালে। সেই বছর ওকলাহোমা সিটির আলফ্রেড পি মুরাহ ফেডারেল বিল্ডিং উড়িয়ে দিতে এই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা।