পরিচ্ছন্নতাকর্মী লাগে না জাপানের

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পরিচ্ছন্নতাকর্মী লাগে না জাপানের

ডেস্ক রিপোর্ট ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০১৯

print
পরিচ্ছন্নতাকর্মী লাগে না জাপানের

এশিয়ার অন্যতম প্রধান এবং উন্নত রাষ্ট্র জাপানের ভালোর শেষ নেই। তাদের নিয়ে অভিযোগও কম। রীতি-নীতি, আচার সংস্কৃতির দিক দিয়েও এগিয়ে জাপান। আর জাপানের অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চর্চা। বিবিসি বাংলা অনলাইনের প্রতিবেদন এমনটাই বলছে। প্রতিবেদনের শুরুতেই জাপানের স্কুলগুলোর প্রসঙ্গ টানা হয়। সেখানে বলা হয়, সারা দিনের সব ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা তাদের স্কুল ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করছে কখন বাড়ি যাবে।

তারা ধৈর্য সহকারে শুনছে যে, তাদের শিক্ষক পরবর্তী দিনের সময়সূচি সম্পর্কে কিছু বলছেন। শিক্ষক বলছেন, ‘সবাই শোনো আজকের ক্লিনিং রোস্টার। প্রথম ও দ্বিতীয় সারি শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করবে। তৃতীয় ও চতুর্থ করিডোর, সিঁড়ি আর পঞ্চম লাইনে যারা আছ তারা টয়লেটগুলো পরিষ্কার করবে।’

পঞ্চম সারি থেকে কিছুটা কান্নার মতো শব্দ আসলেও শিশুরা উঠে দাঁড়াল এবং ক্লাসরুমের পেছনে রাখা সব উপকরণ নিয়ে টয়লেটের দিকে দৌড়ে গেল। এটি জাপানের স্কুলগুলোর একটি পরিচিত দৃশ্য।

জাপানে যারা প্রথমবার বেড়াতে যান তারা অবাক হন এই ভেবে- ‘দেশটি এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন’। চলতে ফিরতে গিয়ে তারা দেখেন, কোথাও ময়লা ফেলার ডাস্টবিন কিংবা ময়লা-আবর্জনা নেই। পরিচ্ছন্নতাকর্মীও চোখে পড়ে না। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগতেই পারে- ‘তাহলে জাপান এত পরিষ্কার কীভাবে?’ এর সহজ উত্তর হলো- জাপানিজরাই তাদের দেশকে পরিচ্ছন্ন রাখেন।

হিরোশিমার একজন সরকারি কর্মকর্তা মাইকো আওয়ানে বলেন, ‘১২ বছরের স্কুল জীবনে, এলিমেন্টারি থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত, শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের রুটিনে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া থাকে। বাসা বাড়িতে বাবা-মা শিক্ষা দেন, আমাদের নিজেদের ব্যবহার্য জিনিস ও থাকার জায়গা নিজেরাই পরিষ্কার না করাটা খারাপ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জাপানিরা অন্যদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তির বিষয়ে খুবই স্পর্শকাতর। আমরা চাই না কেউ আমাদের খারাপ ভাবুক।’

চিকা হায়াশি নামে এক ফ্রিল্যান্সার অনুবাদক বলেন, ‘আমি কখনো কখনো স্কুলের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিতে চাইতাম না। কিন্তু পরে আমি মেনে নেই, কারণ এটা আমাদের রুটিনের অংশ ছিল।’

জানা যায়, জাপানে স্কুলে পৌঁছেই শিক্ষার্থীরা তাদের জুতা খুলে লকারে রেখে দেয়। আবার বাড়িতেও প্রবেশপথেই জুতো রেখে ভেতরে প্রবেশ করে সবাই। এমনকি বাড়িতে কাজের লোক এলেও তাই করে। বাচ্চারা যখন বড় হতে থাকে আস্তে আস্তে তারা ক্লাসরুম, নিজের বাড়ি কিংবা প্রতিবেশী, তারপর তাদের শহর এবং দেশ নিয়ে ধারণা পেতে থাকে। এভাবে ছোট শিশুর মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আর এই শিশুরাই বড় হয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে আরও সচেতন হয়।

জাপানে পরিচ্ছন্নতার কিছু ঘটনা স্মরণীয়। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে জাপানের খেলা শেষে সমর্থকদের স্টেডিয়াম পরিষ্কার করার ঘটনা বিশ্বকে আলোড়িত করে। খেলোয়াড়রাও ড্রেসিংরুম ছাড়ার আগে সেটি পরিষ্কার করে রেখেছিল।

সে সময় ফিফার কর্মকর্তা প্রিসিলা জানসেনস টুইটে বলেন, ‘সব টিমের জন্য এটা দারুণ অনুকরণীয়।’

একই দৃশ্য দেখা গেছে জাপানিজ মিউজিক ফেস্টিভ্যালেও। ‘ফুজি রক ফেস্টিভ্যাল’ জাপানের সবচেয়ে বড় ও পুরনো সংগীত উৎসব। ওই অনুষ্ঠানে আগত ভক্তরা বর্জ্য ততক্ষণ সঙ্গেই রেখেছেন যতক্ষণ না তারা একটি ডাস্টবিন খুঁজে পেয়েছেন। ধূমপায়ীদের পোর্টেবল অ্যাশট্রে নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল যাতে করে অন্যরা সমস্যায় না পড়েন।

এদিকে জাপানে সবার চিত্রটাও বেশ বিচিত্র। স্থানীয় সময় সকাল ৮টার মধ্যেই দেখা যায়, অফিস কর্মী বা দোকানের কর্মীরা তাদের কর্মস্থলের সামনের রাস্তাও পরিষ্কার করছেন। বাচ্চারা স্বেচ্ছাসেবী হয়ে কমিউনিটি ক্লিনিংয়ে অংশ নেয়। স্কুলের কাছে রাস্তা থেকে ময়লা আবর্জনাও সরিয়ে ফেলে তারা। সড়ক সংলগ্ন অধিবাসীরাও এই কাজে অংশ নেন। ঘরের সামনের সড়কের ময়লা সরাতে কারও জন্য তারা অপেক্ষা করে না।

বিবিসি বলছে, বৌদ্ধ ধর্ম আসার আগে থেকে জাপানিদের একটি নিজস্ব ধর্ম আছে যা ‘শিনতো’ নামে পরিচিত। এর মূল মর্মবাণীই হলো পরিচ্ছন্নতা। বৌদ্ধ ধর্মে পরিচ্ছন্নতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও জাপানিরা এমনিতেই পরিচ্ছন্নতার চর্চা করেন। সে কারণেই জাপান এত পরিচ্ছন্ন।