যে কারণে লেবাননে বিক্ষোভ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

যে কারণে লেবাননে বিক্ষোভ

ডেস্ক রিপোর্ট ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৯, ২০১৯

print
যে কারণে লেবাননে বিক্ষোভ

কয়েক সপ্তাহ ধরেই লেবাননে চলছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে এত বড় বিক্ষোভ হয়নি। ইতোমধ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু তাতেও শান্ত হননি বিক্ষোভকারীরা। তারা দেশের রুগ্ন অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং দুর্নীতির অবসান চান। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীরা দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনও চায়। ধর্মের ভিত্তিতে ক্ষমতার ভাগাভাগির যে ব্যবস্থা দেশটিতে এখন রয়েছে, সেটির পরিবর্তন চায় তারা। এ বিষয়গুলো সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা থাকার কারণেই সম্প্রতি ফুঁসে উঠেছে লেবাননের নাগরিক সমাজ।

বিবিসি বাংলা অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়, লেবাননের জন্য অক্টোবর মাস বেশ ঘটনাবহুল ছিল। সরকারও একের পর এক সমস্যা নিয়ে নাকাল হচ্ছিল। শুরুতে লেবাননের আমদানিকারকরা অভিযোগ করেন, দেশটির বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে মার্কিন ডলারের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর দেশটির পশ্চিমে পাহাড়ি এলাকায় শুরু হয় ভয়ানক দাবানল এবং দেখা যায় আগুন নেভানোর জন্য লেবাননের যথেষ্ট অর্থ ও সরঞ্জামাদি নেই। সে সময় পার্শ্ববর্তী সাইপ্রাস, গ্রিস এবং জর্ডান আগুন নেভাতে এগিয়ে আসে। দেশটির সামাজিক মাধ্যমে তখন সরকারের ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর কয়েক দিন পরেই সরকার তামাক, পেট্রল এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং সার্ভিসের মাধ্যমে ভয়েস কলের ওপর কর বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সরকার কর প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হলেও অসন্তোষ নতুন করে উঠে আসে।

এরপরই প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির পদত্যাগের দাবিতে লেবাননের হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে যোগ দেয়।

লেবানন তার ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির ঋণের ভার ক্রমে বাড়ছে, তবু আন্তর্জাতিক দাতা গোষ্ঠীদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্যাকেজ নিয়ে সরকার নানান অর্থনৈতিক সংস্কার করার চেষ্টা করছে। জিডিপি ও বৈদেশিক ঋণের অনুপাতের হিসাবে লেবানন এই মুহূর্ত বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ ঋণগ্রস্ত দেশ।

দেশটির সরকারি হিসাবে দেখা যায়, তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ৩৭ শতাংশ, সার্বিক বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির এক-তৃতীয়াংশ জনগণ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশটির অবকাঠামো পুনর্গঠন শেষ হয়নি। এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী সিরিয়া থেকে দশ লাখের বেশি শরণার্থী এসেছে দেশটিতে। এই সব কিছু মিলিয়ে দেশটিতে একটু-একটু করে অসন্তোষ তৈরি।

বিশ্লেষকরা মনে করেন এর পেছনে বড় একটি কারণ ধর্মীয় বিভেদ। লেবাননে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮টি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ১৯৪৩ সালের এক জাতীয় ঐকমত্য অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি পদ সংখ্যাগুরু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে নির্বাচিত হবে। রাষ্ট্রপতি সবসময় হবেন একজন ম্যারোনাইট খ্রিস্টান অর্থাৎ বিশেষ গোষ্ঠীর সিরিয় খ্রিস্টান। পার্লামেন্টের স্পীকার হবেন একজন শিয়া মুসলিম এবং প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন সুন্নি মুসলমান।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করতে গিয়ে, প্রায়শই সুশাসনের ব্যাপারে ছাড় দিতে হয় রাজনৈতিক নেতাদের। সুশাসন ছাড়া দারিদ্র দূরীকরণ, দুর্নীতি রোধ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। যে কারণে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় ভাব টানাও লেবাননে বিক্ষোভের একটি বড় কারণ।