এনআরসি কি ভোটের ট্রাম্পকার্ড

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

এনআরসি কি ভোটের ট্রাম্পকার্ড

তুষার রায় ১০:১০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

print
এনআরসি কি ভোটের ট্রাম্পকার্ড

দেশটির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এনআরসি নিয়ে মাঠ গরম করতে শুরু করেছে বিজেপি। এভাবেই ঠিক দুবছর আগে আসামে ভোটের আগে থেকে এ ইস্যু তুলে রাজ্য দখল করেছিল বিজেপি। এখানেও একই ফর্মুলা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজেপি বুঝতে পারছে, এনআরসি, নাগরিকত্ব বিল এবং অনুপ্রবেশ-এই তিন ইস্যু পশ্চিমবঙ্গের আমজনতাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। এই তিন ইস্যুই রাজ্য দখলের হাতিয়ার। তাই তারা এসব করছে। তাদের আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগ নিলে নিশ্চিতভাবেই তা বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রভাবিত করবে। পাশাপাশি ভারতজুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।

বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হবেই। তাতে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাদ যাবে। বিদেশি নাগরিকরা এসে রাজ্য তথা দেশের সম্পদ নষ্ট করছে। তা রুখতেই এনআরসি প্রয়োজন।’

গত বুধবার কলকাতায় বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক তালিকা করা হবে। পুরো ভারতে কার্যকর করা হবে এনআরসি। বাংলায় এনআরসির ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এদিকে গতকাল এনআরসি রুখতে কলকাতায় বিশাল রোড মার্চ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। মমতা লাগাতার বলে আসছেন, ‘বিজেপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছে। এনআরসির নাম করে মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলায় কোনো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চলবে না। রাজ্যের সব বাসিন্দাই নিরাপদে থাকবেন। এভানে এনআরসি হতে দেব না।’

মমতার এ প্রতিবাদকে কটাক্ষ করে দিলীপ বলেন, ‘২০২১ সালের পরে তো রাস্তাতেই নামতে হবে। তবে যে-ই রাস্তায় নামুক, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হবেই।’

এনআরসি নিয়ে মমতার অবস্থানের বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বলছেন, মমতা টের পেয়েছেন তার জনপ্রিয়তা কমছে। পায়ের নিচের মাটি ক্রমশ সরে যাচ্ছে। তাই মরিয়া হয়ে প্রতিবাদে নামছেন তিনি। কারণ পশ্চিমবঙ্গে ইতোমধ্যে বিজেপি জাঁকিয়ে বসেছে। বেড়েছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি। এনআরসি হলে তা রাজ্যের ভোটব্যাংক রাজনীতি ধ্বংস করে দেবে। তার ফায়দা তুলবে বিজেপি।

রাজ্যের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এখানে সুপরিকল্পিতভাবে এনআরসি নিয়ে একটু একটু করে সুর চড়াচ্ছে বিজেপি। এভাবে আমআদমির মনোভাব বুঝে নিতে চাইছে তারা। দলটির লক্ষ্য, ২০২১ সালে রাজ্যের ক্ষমতা দখল। সেজন্য মোক্ষম অস্ত্র এনআরসি। কারণ ঐতিহাসিকভাবে রাজ্যে প্রচুর বাংলাদেশি বাসবাস করেন। ১৯৪২ সালের পর থেকে বানের মতো বাংলাদেশি এখানে এসেছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বেশি সংখ্যক মানুষ এসেছে। এদের অধিকাংশই হিন্দু। তারা নানা তিক্ততার মুখোমুখি হয়েই এ রাজ্যে আসে। এ ছাড়া ব্যবসা, আত্মীয়তাসহ নানা কারণে কিছু মুসলমানও পশ্চিমবঙ্গে থিতু হয়েছে। ফলে এনআরসির মাধ্যমে অবৈধ মুসলমান শনাক্ত করে তাদের তাড়ানোর উদ্যোগ নিলে তা হিন্দু জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশের সমর্থন বিজেপির বাক্সে যাবে। এই হিসাব কষেই বিজেপি এগুচ্ছে। এখানেই প্রমাদ গুনছেন মমতা। কারণ বড় তার ভোটব্যাংক রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম। এনআরসি থেকে বাঁচতে তারা বিজেপির শিবিরে ভিড় করলে মমতার পরাজয় নিশ্চিত।

কারণ মমতা টের পেয়েছেন, তার জনপ্রিয়তা হু হু করে নামছে। তাই এনআরসি মমতার জীবন-মরণ ইস্যু। মমতার আরও বড় একটা অস্বস্তি খোদ তিনি বাম শাসনামলে এরকমই একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্য থেকে তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের (মুসলিম) তাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন। বিধানসভা ও সংসদে পর্যন্ত এ নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। এসব ডকুমেন্ট প্রস্তুত করে জনগণকে বোঝানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিভাজনের রাজনীতির ধারক বিজেপি। ফলে এনআরসি এখন মমতার জন্য ‘শাঁখের করাত’।
এখানে এনআরসি বাস্তবায়নের অন্যতম রূপকার খোদ বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। গত ১২ এপ্রিল রায়গঞ্জে লোকসভা নির্বাচনের জনসমাবেশে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় এলে আসামের মতো এ রাজ্যেও নাগরিকপঞ্জি হবেই। অনুপ্রবেশকারীদের এক একজনকে চিহ্নিত করে তাদের সাগরে ফেলে দেওয়া হবে। মমতা সব শক্তি দিয়ে বাধা দিলেও এনআরসি ঠেকাতে পারবেন না।’

অমিতের এ ঘোষণা ভালো সাড়া জাগিয়েছিল হিন্দুত্ববাদীদের মনে। যার ফল রাজ্যে অভূতপূর্ব ইতিবাচক ফল। ফলে উজ্জীবিত বিজেপি আরও বিভাজনের তাস হিসেবে এনআরসিকে তুলে ধরছে।

এদিকে মরিয়া মমতার নেতৃত্বে রাজ্যজুড়ে চলছে এনআরসিবিরোধী আন্দোলন, সভা-সমাবেশ, মিছিল, প্রতিবাদ সভা। এ ছাড়া এনআরসির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে জাতীয় কংগ্রেস, বামফ্রন্টসহ রাজ্যের বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সংস্থা। তারা বলছেন, এখানে কোনো বাঙালিকে তাড়ানো চলবে না। এনআরসি কার্যকর করতে দেওয়া হবে না। এনআরসির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিধানসভায় একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। তবে বিজেপি এর বিরোধিতা করে অধিবেশন বয়কট করেছিল।

দেশটির অন্যতম বৃহৎ এ রাজ্য দখলে মরিয়া বিজেপি ইতোমধ্যে সংগঠনকে ঢেলে সাজাচ্ছে। নেপথ্যে তাদের সহায়তা দিচ্ছে দলের থিংকট্যাংক আরএসএস। এ ছাড়া রাজ্যজুড়ে কাজ করছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং, শিবসেনাসহ বিভিন্ন আদর্শিক সংগঠনের প্রায় লাখো স্বেচ্ছাসেবক কর্মী। আসন্ন দুর্গাপুজোর আগে এনআরসি নিয়ে হিন্দুত্ববাদের সলতে পাকাচ্ছে দলটি। তারা ভাবছে, মমতার মরিয়া ভাবই প্রমাণ করে এনআরসি ইস্যুটি এ রাজ্যে ভালো মার্কেট পাবে। এখন আতঙ্কিত মমতাই এ ইস্যুটি ভোট পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখবেন। ফলে নিশ্চিতভাবে ব্যালটবাক্সে তার ফায়দা পাওয়া যাবে। এভাবেই তারা বাঙালিদের মনে এনআরসি পুশ ইন করছে। উদাহরণ হিসেবে আসাম তো আছেই।
তবে বিষয়টি যে এত সহজ নয় তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে বিজেপি। কারণ আসামে বাদ পড়া ১৯ লাখের মধ্যে লাখ লাখই হিন্দু। আর প্রায় লাখ মুসলিম। বাদপড়া হিন্দুরা বিজেপির ভোটব্যাংক। এ ঘটনায় অস্বস্তিতে বিজেপি। কারণ তারা মনে করেছিল, বাদ পড়াদের তালিকায় মূলত সংখ্যালঘুদের নাম থাকবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে ঠিক উল্টো। ফলে আগামী দিনে দলের হিন্দু ভোট-ব্যাংক ধাক্কা খাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিজেপি নেতারা। তবে বিজেপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, ‘ভারত সরকার নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেবে।

কিন্তু এ কথায় ভুলছে না আসামবাসী। কারণ বিজেপি বলেছে ‘নাগরিকত্ব বিলে ১৯৭১ সালের পরে যারা ভারতে এসেছেন, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। তার আগে যারা এসেছেন, তারা ওই সুযোগ পাবেন না।’ ফলে ক্ষুব্ধ হিন্দুদের শান্ত করা যাচ্ছে না। আসাম ইস্যু এখন দলের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠছে।

ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অর্থনীতি এখন খাবি খাচ্ছে। নতুন কোনো বিনিয়োগ নেই, বাড়ছে বেকারত্ব। এদিক থেকে নজর ঘোরাতে বিজেপি রাজ্যে রাজ্যে পরিস্থিতি অনুযায়ী ফাঁদ পাতছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এসব কৌশল ব্যর্থ হবে। কারণ নৃ-তাত্ত্বিকভাবে আসাম আর বাংলা এক নয়। এখানে এ ধরনের গোঁজামিলের তালিকা প্রকাশ ও তার বাস্তবায়ন কঠিন। তা ছাড়া একের পর এক এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে নেবে না। প্রতিবেশী অশান্ত হয়ে উঠলে তা আখেরে ভারতের জন্যই বুমেরাং হবে।

তারা মনে করেছেন, এসব হিসাব বিজেপি ভালোই বোঝে। কিন্তু শুধু পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটব্যাংক টালমাটাল করে দেওয়াই বিজেপির প্রধান লক্ষ্য। এতে মমতাকে হঠানোর কাজটা খুব সহজ হবে। আসলে এনআরসি যত না মুসলিম বিভাজনের হাতিয়ার তারও বেশি ক্ষমতা দখলের ব্রহ্মাস্ত্র। তাই বাস্তবায়ন হোক বা না হোক আগামী দুবছর বাংলার রাজনীতিতে একমাত্র ট্রাম্পকার্ড এনআরসি।