কাশ্মীর ইস্যুতে সার্ক কোথায়

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

কাশ্মীর ইস্যুতে সার্ক কোথায়

ডেস্ক রিপোর্ট ১০:২২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০১৯

print
কাশ্মীর ইস্যুতে সার্ক কোথায়

কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে নেওয়ার পর অবরুদ্ধ কাশ্মীরি জনগণের পাশে দাঁড়াচ্ছে না কেউ। ভারতের সঙ্গে চিরবৈরী পাকিস্তান কাশ্মীর ইস্যুতে বেশ সরব হলেও দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশ তেমন একটা গা করছে না। এমনকি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা- সার্কও এ ইস্যুতে রয়েছে একেবারে নীরব। গত শুক্রবার জাতিসংঘের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ফোরাম নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে কাশ্মীর সংকটকে ‘আন্তর্জাতিক ইস্যু’ হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যাপারে চীনের প্রস্তাব এক বাক্যে না করে দিয়েছে ফোরামের অন্য সদস্যরা।

পাকিস্তানের মরিয়া তদবির এবং তাদের মিত্র চীনের অনুরোধে এ ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক ডাকা হলেও কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীন রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকে বসে। তাদের সঙ্গে ছিল পরিষদের অস্থায়ী ১০ সদস্য।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে বৈঠকে চীন কাশ্মীর পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিলেও নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ দেশ এ নিয়ে একমত হতে পারেনি। বেশির ভাগ দেশই একমত হয় যে, ‘এটা একেবারেই ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু। কাশ্মীরকে অযথা আন্তর্জাতিক ইস্যু করে তোলার প্রয়োজনই নেই।’ এমন কি কাশ্মীর ইস্যুতে একটা মামুলী বিবৃতি দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়নি ওই বৈঠকে।

পরিস্থিতি যখন এই- তখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক ফোরাম সার্ক-এর এই মুহূর্তের সক্রিয়তা বা কাশ্মীর বিষয়ে সংগঠনটির ভূমিকার প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। কাশ্মীর যখন অবরুদ্ধ, সেখানে যখন সাধারণ মানুষ দিন কাটাচ্ছে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়, যখন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কাশ্মীরি জনগণের মৌলিক অধিকার তখন সার্কই হতে পারতো শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর উদ্যোক্তা। কিন্তু ২০১৪ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সম্মেলনের পর অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে এশিয়ার ঐক্য ও সৌহার্দ্যরে মোর্চা সার্ক।

২০১৬ সালে পাকিস্তানে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের জেরেই তা হতে পারেনি। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে তা হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন না অনেকে। কারণ ‘সার্ক’ বা দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা জোটের ভাবনা নিয়ে এখন যে আদৌ এগোনো সম্ভব নয়, তা কয়েক মাস আগে ভারত সফররত নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে দিয়েছে দিল্লি। পাকিস্তান যেভাবে সীমান্ত-পারের সন্ত্রাসবাদে মদত দিয়ে চলেছে তাতে ভারত একেবারেই নিরুপায়।

মোদির বরাত দিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখল পাকিস্তানের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেছিলেন, যেভাবে সীমান্তের অন্য পার থেকে সন্ত্রাসবাদে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে এবং এই অঞ্চলে একটি শক্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে, সেই পরিস্থিতিতে সার্কের উদ্যোগ নিয়ে এগোনো আমাদের পক্ষে খুবই কঠিন।’

এখন তো কাশ্মীর ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি সরব ভারতের তরফ থেকে সন্ত্রাসবাদে মদতদানের অভিযোগ ওঠা সেই পাকিস্তানই। পাকিস্তানের সরব হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ভূরাজনৈতিক কারণকেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। কেননা পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরেও প্রায় একই অস্থিরতা চলছে। জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারত কেন্দ্রের শাসনাধীন করায় পাকিস্তান তার সীমান্ত সম্পর্কিত নানা কৌশলে ধরাশায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে কথা বলার মতো বাস্তবতাই নেই সার্কের। তার ওপর ভারত তো আগেই বলে দিয়েছে সার্ক নিয়ে তারা ভাবছেই না। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ শক্তি ভারতকে বাদ দিয়ে সার্কের সক্রিয়তা কল্পনাও করতে পারেন না পর্যবেক্ষকরা।

শুধু পাকিস্তানের দোহায় টেনে ভারতের এমন অবস্থানের কারণে সার্কের মৃত্যু ঘটেছে বলে কেউ কেউ মনে করলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সার্ক এখনো মারা যায়নি- কিন্তু কোমায় আছে। উপমহাদেশের খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ইমন কল্যাণ লাহিড়ীর মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ফুলস্টপ হয় না- হয় শুধু কমা। সুতরাং সার্কের ক্ষেত্রেও সেটা সত্যি। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান দেশটা আমাদের পশ্চিম সীমান্তে থাকবেই- আর তাদের সঙ্গে আজ না-হয় কাল আলোচনাও চালাতে হবে। এই দুটো দেশের বিদেশনীতিও একে অন্যকে ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না।

ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে পাকিস্তান প্রথম থেকেই কাশ্মীর ইস্যুতে নানাভাবে ভারতকে হুশিয়ারি দিয়েছে। এমনকি পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাকও দিয়েছেন। সর্বশেষ গতকালের খবর পাকিস্তান সেনা বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গাফুর বলেছেন, কাশ্মির সংকটকে কেন্দ্র করে পাক-ভারত পারমাণবিক যুদ্ধের সূত্রপাত হতে পারে। নিজেদের পক্ষে বিশ^মত বা মুসলিম বিশে^র সমর্থন আদায়ে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে ফোনালাপে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিরোধীয় জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তুরস্ক।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় কাশ্মীর স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ছিল। গত ৫ আগস্ট মুসলমান অধ্যুষিত জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে নেয় ভারত সরকার। ফলে সেখানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ ধারা সংশোধনের ফলে বিষয়টি পাকিস্তান, চীন ও ভারতের সঙ্গে ত্রিমুখী বিরোধ শুরু হয়।

ইতোমধ্যে লাদাখ অঞ্চল নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে পাল্টা-পাল্টি হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও কাশ্মীরের জনগণের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। হিমালয় অঞ্চলটি পাকিস্তান ও ভারতের অংশে রয়েছে। তবে দেশ দুটি সম্পূর্ণ কাশ্মীর তাদের বলে দাবি করে আসছে। ১৯৪৮, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে হওয়া তিনটি যুদ্ধে কাশ্মীর দুদেশের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এর মধ্যে দুটি যুদ্ধ হয় কাশ্মীর নিয়ে।

কাশ্মীর সংকট পরমাণু যুদ্ধের কারণ হতে পারে : পাক সেনাবাহিনী
কাশ্মীর সংকটকে কেন্দ্র করে পাক-ভারত পারমাণবিক যুদ্ধের সূত্রপাত হতে পারে বলে হুঁশিয়ার করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সেনামুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গাফুর মনে করছেন, কাশ্মীর থেকে দৃষ্টি সরাতে ভারত পাকিস্তানে হামলা করতে পারে।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশির সঙ্গে যৌথ এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের যে কোনো হুমকি মোকাবেলা করতে পাকিস্তান ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ বলেও মন্তব্য করেন আসিফ গাফুর।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত-পাকিস্তান তিনটি যুদ্ধের মধ্যে দুটি অনুষ্ঠিত হয়েছে কাশ্মীর ইস্যুতে। গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এর প্রতিবাদে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস করাসহ ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করেছে পাকিস্তান। দুই দেশের সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। কাশ্মীর সীমান্তে চলছে টানটান উত্তেজনা। একই সঙ্গে সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত ও ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে কালো দিবস হিসেবে পালন করেছে পাকিস্তান।

মেজর জেনারেল আসিফ বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে ভারত কাশ্মীর থেকে দৃষ্টি সরাতে হামলা চালাতে পারে। আর আমরাও যে কোনো হামলা মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।’ তিনি বলেন, কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। কাশ্মীর ইস্যুতে দুই দেশ এখন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোরেশি বলেন, দেশটির শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাশ্মীর নিয়ে বিশেষ একটি দল গঠনের ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কাশ্মীর ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশে^র প্রত্যেকটি দূতাবাসে নিয়োগ দেওয়া হবে যেন তারা বৈশি^কভাবে এই বিষয়টিকে তুলে ধরতে পারে।’

জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকার বাতিলের প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে চীনের আহ্বানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এক অনানুষ্ঠানিক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৯০ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠক কাশ্মীর পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বললেও নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দিতে সম্মত হয়নি সদস্য রাষ্ট্রগুলো।

পরিষদের ১৫ সদস্য দেশের মধ্যে বেশির ভাগ সদস্যই কাশ্মীর সংকটকে ভারত ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। তবে শাহ কোরেশির দাবি- জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর নিয়ে সফল আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, পঞ্চাশ বছর পর নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর নিয়ে কথা হয়েছে। বিশেষ করে ভারত যখন এর বিরোধিতা করে যাচ্ছে তখন এটা আশাব্যঞ্জক।