কাশ্মীরে বিষণ্ন ঈদ

ঢাকা, রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ | ৩ ভাদ্র ১৪২৬

কাশ্মীরে বিষণ্ন ঈদ

তুষার রায় ৮:৫৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০১৯

print
কাশ্মীরে বিষণ্ন ঈদ

সপ্তাহ খানেক আগে বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করায় কাশ্মীরের মানুষ হতবাক, ব্যথিত ও অপমানিত। ভারতীয় সেনার অবিরাম বুটের শব্দ আর সরকারের একের পর এক উপত্যকাবিরোধী পদক্ষেপ তাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। আগামীকাল সোমবার বিশ্বের প্রায় কোটি কোটি মুসলমান পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করবেন। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের মুসলিমদের মনে ঈদ আনন্দ নেই। রয়েছে একরাশ বিষণ্নতা, বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা আর প্রতিশোধস্পৃহা। সেখানকার মানুষ এতটাই আতঙ্কিত যে, অন্য রাজ্যে কর্মরত সন্তানদের ঈদের ছুটিতে কাশ্মীরে আসতে নিষেধ করছেন।

রাজ্যের পশু ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা পশুর পাল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কিন্তু ক্রেতা নেই। অনাগত আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তাই তাদের কাছে এখন বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। এর আগে কাশ্মীর ইস্যুতে বহু সংঘাত হয়েছে, রক্ত ধরেছে। এমনটি যুদ্ধও হয়েছে। কিন্তু সেইসব ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিও কাশ্মীরবাসীর ঈদ আনন্দ ম্লান করতে পারেনি। মূলত অস্তিত্বের সংকট তাদের এতটাই আতঙ্কিত করেছে, ঈদটাও তাদের কাছে আর আনন্দময় মনে হচ্ছে না।

যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরবাসীকে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। নির্বিঘ্নে তারা যাতে ঈদ করতে পারে সে নির্দেশনাও দিয়েছেন। কিন্তু এসব আশ্বাস তাদের কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা বলে মনে হচ্ছে। ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ৭০ বছর ধরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় জাঁতাকলে পিষ্ট কাশ্মীরীদের নীরবতা আর ক্ষোভ এবার নজীরবিহীন বিস্ফোরণে পরিণত হতে পারে। এজন্য তাদের জন্য অন্তত ‘উইন উইন সিচুয়েশান’ তৈরী করা উচিত ভরত সরকারের।

গত এক সপ্তাহজুড়ে কাশ্মীরে কবরের নীরবতা নেমে এসেছে। তারা ঘটনার আকস্মিকতার ঘোর এখনও কাটাতে পারেননি। চারিদিকে শুধু সাইরেন আর বুটের শব্দ। এর মধ্যেই একটু একটু করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সরকারী বিভিন্ন বিধি নিষেধ তুলে নেওয়া হচ্ছে। মানুষ সীমিত পরিসরে ঘর থেকে বের হচ্ছে, সদাইপাতি কিনছে। সরকারি টেলিসংযোগে দূরের প্রিয়জনের কথা বলার সুযোগ মিলছে। সেনা নজরদারিতে মসজিদের দরজাও খুলে দিয়েছে সরকার।

গত বৃহস্পতিবারের ভাষণে নরেন্দ্র মোদি আশ্বাস দিয়েছেন যে, কাশ্মীরিদের ঈদ পালনে সহায়তা করবে প্রশাসন। ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার দেখছে যাতে ঈদ পালনে কোনও অসুবিধা না হয়। যারা কাশ্মীরের বাইরে থাকেন এবং যারা ঈদে ঘরে ফিরতে চান তাদের ঘরে ফেরানোর দায়িত্ব সরকারের।

তাদের নির্বিঘ্ন ঈদ উদযাপনে করণীয় নির্ধারণে বৈঠক করেছেন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। রাজ্যপাল বলেছেন, ‘উপত্যকায় ঈদ পালন হবে। খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহে যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য ডেপুটি কমিশনারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

তবে যাদের জন্য এসব আয়োজন সেই কাশ্মীরীদের মধ্যে কোনো আনন্দের রেশ নেই, আছে সীমাহীন উদ্বেগ আর অশ্রুধারা। ভূস্বর্গ এখন যে ভয়-ভীতি-আতঙ্কের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে, কোনো কিছুতেই কারও কোনো আশা নেই, কোনো ভরসা নেই। তাই এবারের ঈদটা তাদের নিরানন্দই কেটে যাবে।

ভূস্বর্গের অধিবাসীরা মনে করছেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে কাশ্মীরের দখল নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে অসংখ্য প্রক্সি ওয়ার হয়েছে, সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে। রাজ্যটিতে প্রায় ৪২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কামানের গোলা-বারুদের গন্ধ তাদের সবচেয়ে চেনা। প্রাপ্তি শুধু মৃত্যু আর বঞ্চনা। কিন্তু এভাবেই ৭০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছে তারা। বিশেষ রাজ্যের রক্ষাকবচ ৩৭০ ধারা বহুবার কাটাছেড়া হয়েছে। ধারাটিকে প্রায় নখদন্তবিহীন করে ফেলা হয়েছে, তা নিয়ে রক্তপাতও হয়েছে। কিন্তু রাজ্যবাসী কখনো এতটা ব্যথিত হয়নি। ৭০ বছরেও এমন নিরানন্দ ঈদ তাদের জীবনে আসেনি।

তারা বলছেন, মোদি সরকার সবাইকে অন্ধকারে রেখে একধাক্কায় বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে রাজ্যহীন করে দিয়েছে। সরাসরি কেন্দ্রের শাসনে নিয়েছে কাশ্মীরকে। ৩৫-ক ধারা তুলে দিয়ে সবাইকে এ রাজ্যে সম্পত্তি ক্রয় ও ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে অবশ্যই সেখানে জনমিতির পরিবর্তন ঘটবে। এবং কয়েক দশকের মধ্যের কাশ্মীরে মুসলিমরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে।

ক্ষুব্ধ কাশ্মীরীরা মনে করছেন, এর অভিঘাত হবেই। আজ হোক কাল হোক এর তীব্র প্রতিবাদ হবে। সরকারও ছাড় দেবে না ফলে সেখানে প্রাণহানি অনিবার্য। পাকিস্তানও নিজের স্বার্থে সেখানে নানা ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই নিজেদের জীবন ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ কি হবে ভেবে তারা উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিতে তারা ঈদ আয়োজনের কথা চিন্তাও করতে পারছেন না। তাই মায়েরা সন্তানদের ফোন করে কাশ্মীরে আসতে নিষেধ করছেন। ভেড়ার পাল নিয়ে পশু বিক্রেতারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন কিন্তু কেউ কিনছে না এসব পশু।

হতাশ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এরকম একটা পরিবেশে কে কোরবানি দেবেন, কার কাছে মাংস বিতরণ করবেন। কোথাও ছুরি-কাঁচি শানানোর আওয়াজ নেই। ভিড় নেই শপিংমলগুলোতে। অনেকে এবার পশু কোরবানি না দেওয়াকে একটা প্রতিবাদ হিসেবে মনে করছেন। এক নিরানন্দ ঈদের অপেক্ষায় কাশ্মীরিরা। তারা বিশ^বাসীর কাছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছেন।

এদিকে আগামী ৩১ অক্টোবর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ১৪৪তম জন্মবার্ষিকী। ওইদিন কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। বল্লভ ভাই প্যাটেল ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সোচ্চার ছিলেন।

এর আগে গত ৫ আগস্ট কাশ্মীরের সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও দ্বিখণ্ডিত করার বিল দেশটির সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় পাস হয়।