বিক্ষুব্ধ কাশ্মীর

ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বিক্ষুব্ধ কাশ্মীর

ডেস্ক রিপোর্ট ১০:৫২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০১৯

print
বিক্ষুব্ধ কাশ্মীর

সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের আগেই নিরাপত্তার চাদরে অবরুদ্ধ করে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল কাশ্মীরকে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ইন্টারনেট, মোবাইল, টেলিফোনের সব সংযোগ। বিশে^র সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত এলাকা কাশ্মীরে আগে থেকেই মোতায়েন ছিল ৫ লাখ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। নতুন করে সেখানে আরও এক লাখ বাড়তি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। রোববার থেকেই সেখানে বলবৎ রয়েছে কারফিউ। রাস্তায় টহল দিচ্ছে হাজার হাজার সেনা। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ, মুফতি মেহবুবাসহ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিক নেতাদের গ্রেফতার ও গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। পুরো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করেই কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। একই সঙ্গে কেটে দুই টুকরো করে দেওয়া হয়েছে কাশ্মীরকে। কিন্তু নিরাপত্তার সব আয়োজন করেই হঠাৎ করে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও বিক্ষোভ ঠেকানো যায়নি কাশ্মীরে।

আজ জম্মু-কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের রাস্তায় শত-শত কিশোর-তরুণ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এ চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষও হয়েছে। নিহত হয়েছেন এক কাশ্মীরি তরুণ। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বেশ কয়েকজন। গ্রেফতার করা হয়েছে অন্তত একশ প্রতিবাদীকে। বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে ভারতের আনন্দবাজার এ খবর দিয়েছে। তবে শ্রীনগরের চিত্র এটা। ইন্টারনেটসহ অন্য যোগাযোগ বন্ধ থাকার পরও বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসব বিচ্ছিন্ন খবর পাওয়া গেছে। বাকি কাশ্মীরে কি অবস্থা এ নিয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সামনের দিনগুলোতে সেখানকার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে পারে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে আশঙ্কা করা হয়েছে।

আনন্দবাজারের খবরে সাবেক আইএএস অফিসার শাহ ফয়সলের বিকল্প মাধ্যমে ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্ট উল্লেখ করা হয়েছে। পোস্টটিতে কাশ্মীরের থমথমে অবস্থার কথা জানা যাচ্ছে। তিনি লিখেছেন, ‘শ্রীনগরে জিরো ব্রিজ থেকে বিমানবন্দর, সব জায়গায় কার্যত কার্ফুর চেহারা নিয়েছে। রোগী ও কার্ফু পাসধারী ছাড়া কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। জম্মু-কাশ্মীর পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে নিরাপত্তার ভার তুলে নিয়েছে সেনা। শ্রীনগরের বাইরে অন্য জেলাগুলোতে ১৪৪ ধারা আরও কঠোর। রাজ্যের ৮০ লাখ মানুষ এ রকম পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেনি।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘স্যাটেলাইট ফোন ছাড়া টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ। কেবল পরিসেবা বন্ধ থাকলেও ডিরেক্ট টু হোম (ডিটুএইচ) যাদের রয়েছে, তারা টিভি দেখতে পারছেন। তবে অধিকাংশেরই এখনো স্পষ্ট ধারণা নেই, ঠিক কী হয়েছে। জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের শ্রীনগরের বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।’

থমথমে কাশ্মীরে বিক্ষোভের খরর দিয়েছে বিবিসিও। ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি হিন্দির সাংবাদিক আমীর পীরজাদা শ্রীনগরের পরিস্থিতি জানাতে গিয়ে বলেন, কাশ্মীর এখন ক্রোধে ফুটছে। তিনি জানান, শ্রীনগর এবং কাশ্মীরের উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পাথর ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে সরকারিভাবে এসব খবরের কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।’

আমীর পীরজাদা জানান, ‘আমরা শ্রীনগরে আছি, কিন্তু কাশ্মীরের অন্য জায়গায় কি হচ্ছে তা জানার কোনো উপায় নেই। কারণ কোনো যোগাযোগ নেই। বিপুল পরিমাণ সৈন্য মোতায়েন হয়েছে। তারা সবকিছু চেক করছে। পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে কে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে-সবকিছু চেক করছে।’

মুসলিমপ্রধান কাশ্মীরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চললেও হিন্দুপ্রধান জম্মুতে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি শিবির আনন্দ-মিছিল করেছে। এদিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এবং কাশ্মীরের মতামতের তোয়াক্কা না করে বিজেপি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। বিরোধী দল কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে বলা হয়, জম্মু-কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল একটি রাজ্য হিসেবে। কোনো সরকারের ক্ষমতা নেই এ অবস্থা পরিবর্তন বা দ্বিখ-িত করা অথবা কোনো অংশকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার।

এদিকে কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি বলেছেন, ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে আমরা এখন এটি পর্যালোচনা করে দেখছি, এটি সাধারণ পরিষদে তুলব আমরা, সব ফোরামেই রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করব, এটি গণমাধ্যমে তুলে ধরব এবং বিশ্বকে জানাব।’

চীন-ভারতের টানাপড়েন
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করেছে বলে এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় চীন জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, ভারতের সিদ্ধান্ত অগ্রহণযোগ্য, এর কোনো আইনি প্রভাব নেই। এর পাল্টায় ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র বলেছেন, ‘ভারত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলে না এবং অন্য দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করবে বলে আশা রাখি আমরা।’

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র কার্লোস মার্টিন রুইজ বলেছেন, ‘আমরা প্রধানত যে বার্তাটি দিতে চাই, তা হলো কাশ্মীরসহ গোটা অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি না হওয়াটাই সব থেকে জরুরি।’