ফেব্রুয়ারিতেই দেশে করোনার টিকা

ঢাকা, রবিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১ | ৩ মাঘ ১৪২৭

ফেব্রুয়ারিতেই দেশে করোনার টিকা

আরিফ সাওন ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০২১

print
ফেব্রুয়ারিতেই দেশে করোনার টিকা

২১ থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে দেশে করোনার টিকা আসবে। ২৬ জানুয়ারি থেকে টিকা নেওয়ার জন্য নাম-ঠিকানা নিবন্ধন শুরু হবে। টিকা দেশে এসে পৌঁছানোর এক সপ্তাহ পর অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শুরুতে সারাদেশে টিকা প্রয়োগ শুরু করা হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পরিকল্পনা রয়েছে।

সোমবার স্বাস্থ্য ভবনে ‘কোভিড ভ্যাকসিন প্রয়োগ পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করা হয়। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর এবিএম খুরশিদ আলম জানান, যাদের মাধ্যমে ভ্যাকসিন আনা হচ্ছে, তারা জানিয়েছেন, ২১ থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়ে আসতে পারবেন। এখানে তারা ২ দিন সংরক্ষণ করে রাখবেন। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী জেলায় জেলায় পৌঁছে দেবেন। এ জন্য ৬৪টি জেলা ও ৪৮৩টি উপজেলা ইপিআই স্টোর প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মহাপরিচালক জানান, ২৬ জানুয়ারি থেকে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন শুরু হবে এবং দেশে আসার এক সপ্তাহ পর অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শুরুতে সারাদেশে টিকা প্রয়োগ শুরুর পরিকল্পনার কথা রয়েছে। গর্ভবতী মা এবং ১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের দেহে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সকলকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে। ধাপে ধাপে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে বিনামূল্যে দেওয়ার জন্য ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন আসবে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের জন্য ৭৩৪৪ দল নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবিএম খুরশিদ আলম বলেন, প্রথম ডোজের পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার জন্য আমরা দুই মাস সময় পাব। সেই দিক থেকে প্রথমবার আমরা যে পরিকল্পনা করেছিলাম, ৫০ লাখ ডোজ এলে সেখানে আমরা প্রথম বারে ২৫ লাখ মানুষকে দেব এবং ২৮ দিন পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেহে দ্বিতীয় ডোজটা দেওয়া হবে। কিন্তু গত রোববার আমরা জানতে পেরেছি যে, প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়ার ৮ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার আগে ৮ সপ্তাহ সময় পাব। তাই এই সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে যারা থাকবেন তাদের আমরা দিয়ে দেব। এভাবে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।

টিকা বিতরণ কমিটির সদস্য ডা. শামসুল হক বলেন, প্রথমেই ৫০ লাখ মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। প্রথম মাসে ৫০ লাখকে আবার পরের মাসে নতুন করে ৫০ লাখ মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এভাবে ধাপে ধাপে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ভ্যাকসিন পাবেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা সদর হাসপাতাল, সরকারি -বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত হাসপাতাল, পুলিশ বিজিবি হাসপাতাল ও সিএমএইচ, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল হবে টিকা কেন্দ্র।

নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন করা নামের তালিকা অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত কেন্দ্রে টিকা নিতে আসতে হবে। প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর রেজিস্ট্রেশন কার্ড সংরক্ষণ করে রাখতে হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বলা হয়, তালিকাভুক্ত জনগোষ্ঠীকে ৮ সপ্তাহ ব্যবধানে (১ম ডোজের ৮ সপ্তাহ পর ২য় ডোজ) ভ্যাকসিন প্রদান করা হবে। প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে অবস্থানকালে কেউ যদি প্রথম ডোজ টিকা নেন এবং দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণে ইচ্ছুক হন তবে তাকে অবশ্যই ২ ডোজের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান নির্ধারিত ৮ সপ্তাহ দেশে অবস্থান করতে হবে। এক্ষেত্রে তাকে বৈধ কাগজপত্রাদি (পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ইত্যাদি) দাখিল করতে হবে।

ভ্যাকসিন পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রদানের সময় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দেশের পুলিশ বাহিনী সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করবে। ভ্যাকসিন বিষয়ক সরকারি প্রচার-প্রচারণা নিশ্চিত করতে তথ্য মন্ত্রণালয় সার্বিক দায়িত্ব পালন করবে।

ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনলাইন নিবন্ধন, ভ্যাকসিন কার্ড, সম্মতিপত্র, ভ্যাকসিন সনদ প্রদানে আইসিটি বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর কর্তৃক ‘সুরক্ষা ওয়েবসাইট’ প্রস্তুত করা হয়েছে।

পর্যায়ক্রমে যারা ভ্যাকসিন পাবেন
সবার আগে ভ্যাকসিন পাবেন কোভিড-১৯ স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি সম্পৃক্ত সকল সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী। এরপর পর্যায়ক্রমে কোভিড-১৯ স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি সম্পৃক্ত সকল অনুমোদিত বেসরকারি ও প্রাইভেট স্বাস্থ্যকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মুখ সারির সদস্যরা, সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা, রাষ্ট্র পরিচালনায় অপরিহার্য কার্যালয়, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সম্মুখসারির গণমাধ্যমকর্মী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।

সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সম্মুখসারির কর্মচারী; ধর্মীয় প্রতিনিধিগণ; মৃতদেহ সৎকার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, জরুরি পানি, গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, ফায়ার সার্ভিস, পরিবহন কর্মচারী; স্থল, নৌ ও বিমানবন্দর কর্মী; প্রবাসী অদক্ষ শ্রমিক, জেলা ও উপজেলাসমূহে জরুরি, জনসেবায় সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারী, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বল্প রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জনগোষ্ঠী (যক্ষ্মা, এইডস রোগী)।
বয়স্ক জনগোষ্ঠী কম-বেশি ৮০ বছর, বয়স্ক জনগোষ্ঠী ৭৭-৭৯ বছর, বয়স্ক জনগোষ্ঠী ৭৪-৭৬ বছর, বয়স্ক জনগোষ্ঠী ৭০-৭৩ বছর, বয়স্ক জনগোষ্ঠী ৬৭-৬৯ বছর, বয়স্ক জনগোষ্ঠী ৬৪-৬৬ বছর, জাতীয় দলের খেলোয়াড় (ফুটবল, ক্রিকেট, হকি ইত্যাদি), বয়স্ক জনগোষ্ঠী কম-বেশি বছর, বাফার, ইমারজেন্সি, আউটব্রেক।

সংরক্ষণ সম্পর্কে জানানো হয়- কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন সংরক্ষণের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণপূর্বক তা যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য দেশের সকল জেলা ও সিটি করপোরেশনের ইপিআই স্টোরসমূহকে ইতোমধ্যেই পত্র প্রদানের মাধ্যমে যথাযথ নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে জাতীয় পর্যায়ে কোল্ড চেইন ধারণক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে বিএডিসি ও অন্যান্য জায়গা হতে কোল্ড রুম ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে ৩ কোটি বা ততোধিক ডোজ ভ্যাকসিন ছয় ধাপে সরাসরি বাংলাদেশের নির্ধারিত জেলার ইপিআই কোল্ড স্টোরসমূহে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করবে বেক্সিমকো ফারমাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

সম্মতিপত্র:
ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশনের পর সকলকেই সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে। সম্পতিপত্রে লেখা থাকবে- টিকা গ্রহণের সময় বা পরে যে কোনো অসুস্থতা, আঘাত বা ক্ষতি হলে তার দায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বা সরকারের নয়। আমি সম্মতি দিচ্ছি যে টিকা গ্রহণ ও এর প্রভাব সম্পর্কিত তথ্যের প্রয়োজন হলে আমি তা প্রদান করব। জানামতে আমার কোনো প্রকার ওষুুধজনিত এলার্জি নেই। টিকাদান পরবর্তী প্রতিবেদন/গবেষণাপত্র তৈরির ব্যাপারে অনুমতি দিলাম। আমি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে এই টিকার উপকারিতা ও পার্শপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হয়ে টিকা গ্রহণে সম্মত আছি।

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বা কারও কোনো সমস্যা হয় কি না তা ফলোআপ রাখা হবে। এ ছাড়া টিকা নেওয়ার পর যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তাহলে সংশ্লিষ্ট টিকা কেন্দ্র বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়- মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, মাথা ঝিমঝিম করা। এর হার কিন্তু খুবই কম। দেখা যাচ্ছে এটা শতকরা ৩ জনের ক্ষেত্রে অ্যানাফ্রেক্সের সমস্যা হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, তবে এসব বিষয় মাথায় রেখেই সেইভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মোবাইল টিম থাকবে ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা উপস্থিত ছিলেন।