যাদের জন্য কর্মসূচি তাদেরই অজানা

ঢাকা, সোমবার, ১ মার্চ ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

যাদের জন্য কর্মসূচি তাদেরই অজানা

কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা

মৃন্ময় মাসুদ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১১, ২০২০

print
যাদের জন্য কর্মসূচি তাদেরই অজানা

প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীদের অধিকার। তাদের এ বয়সে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ বিষয়ে সরকারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। সরকারি হাসপাতালগুলোতে আলাদা করে দেওয়া হয় না ‘কৈশোরবান্ধব’ বা ‘যুব স্বাস্থ্যসেবা’। এমনকি এ সংক্রান্ত কর্নারও নেই হাসপাতালগুলোতে।

পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অন্যান্য সেবার সঙ্গে এ সংক্রান্ত সেবা দেওয়া হলেও রাজধানীতে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এছাড়া সচেতনতার অভাব, গোপনীয়তার প্রবণতা ইত্যাদি কারণেও পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছে না তরুণ-তরুণী বা যুব শ্রেণি। সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো- অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী এ সেবা সম্পর্কে জানেই না!

১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী ১০ জন (পাঁচজন মেয়ে, পাঁচজন ছেলে) শিক্ষার্থীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নয়জনই জানিয়েছে- তারা ‘কৈশোরবান্ধব’ বা ‘যুব স্বাস্থ্যসেবা’ শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচিত নয়। এর বাইরে ২৪ থেকে ৩০ বছর বয়সী সাতজনের (চারজন মেয়ে, তিনজন ছেলে) সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। এদের মধ্যে ছয়জন জানিয়েছেন তারা এ সম্পর্কে জানেন না। অন্যজন বিটিভির অনুষ্ঠান থেকে এ সক্রান্ত ধারণা পেয়েছেন বলে জানান।

রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদমান সাদের (ছদ্মনাম) কাছে ‘কৈশোরবান্ধব’ বা ‘যুব স্বাস্থ্যসেবা’ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে- প্রথমে জানায়, এ শব্দগুলোর সঙ্গে সে পরিচিত নয়। পরে ‘প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা’র কথা বললে ১৪ বছর বয়সী এ শিক্ষার্থী বলে, ‘হ্যাঁ, এটার কথা শুনেছি। তবে বিষয়টি আমার কাছে খুব একটা স্বচ্ছ নয়।’

সে আরও জানায়, তাদের ‘শারীরিক শিক্ষা’ বিষয়ে এ সংক্রান্ত অধ্যায় থাকলেও বিষয়টির ওপর কোনো পরীক্ষা হয় না বলে সেটি ক্লাসে পড়ানো হয় না। এমনকি তাদের স্কুলশিক্ষক বলে দিয়েছেন- এ বিষয়ে কেউ জানতে চাইলে তারা যেন বলে- ‘হ্যাঁ, এটা আমাদের পড়ানো হয়েছে।’

একই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারুফা বিনতে আনানও (ছদ্মনাম) জানায়, বিষয়টি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর গার্লস স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিপুলা দাস (ছদ্মনাম) জানায়, এ বিষয়ে সে তেমন কিছু জানে না। স্কুলেও পড়ানো হয়নি। কোথায় এ ধরনের সেবা দেওয়া হয় তাও জানা নেই তার।
শেরেবাংলা নগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী দিয়া (ছদ্মনাম) জানায়, ‘কৈশোরবান্ধব’ বা ‘যুব স্বাস্থ্যসেবা’ সম্পর্কে সে কিছু জানে না। শারীরিক শিক্ষা বইয়ে বিষয়টি হয়ত থাকতে পারে। তবে করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় ক্লাসে পড়ানো হয়নি।

তবে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তিশা (ছদ্মনাম) জানায়, সে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানে। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জেনেছে। এছাড়া তাদের পাঠ্যবইয়েও এ সংক্রান্ত অধ্যায় আছে। ক্লাসে পড়ানোও হয়েছে। অবশ্য কোথায় এ ধরনের সেবা পাওয়া যায় সেটা জানা নেই তিশার। হটলাইনের বিষয়টিও তার অজানা।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বর্তমানে ৯০৩টি কৈশোরবান্ধব কেন্দ্র আছে। এসব কেন্দ্র থেকে তরুণদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া তরুণদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়াতে এবং সেবা পৌঁছে দিতে ১৬৭৬৭ কল সেন্টার চালু করা হয়েছে।
তবে এ কল সেন্টারের বিষয়ে জানে না বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী। এমনকি হটলাইন নম্বরটিও জানা নেই তাদের। ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী যে ১০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে তাদের কেউই এ কল সেন্টার এবং হটলাইন নম্বরটি জানে না বলে জানিয়েছে।

পরে ওই নম্বরে কল দিলে তৌহিদ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ‘সুখী পরিবার’ প্রকল্পের আওতায় তারা এ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এখানে কল করে অনেকে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কথা জানান। কল সেন্টার থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শসহ কোথায় গেলে তারা যথাযথ সেবা পাবেন তাও জানিয়ে দেওয়া হয়।

কী কী সমস্যা নিয়ে তাদের কাছে কল আসে- জানতে চাইলে বলেন, ‘অনিয়মিত মাসিক, অরক্ষিত যৌনমিলন, অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ, মেয়েদের একান্ত কিছু সমস্যা (জরায়ু, ব্রেস্ট সংক্রান্ত) ইত্যাদি সমস্যা বেশি আসে। এছাড়া নবদম্পতিরা পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন পরামর্শের জন্য কল করেন।’
এদিকে রাজধানীর কোনো সরকারি হাসপাতালে আলাদা করে ‘কৈশোরবান্ধব’ বা ‘যুব স্বাস্থ্যসেবা’ দেওয়া হয় না। এমনকি যুবদের জন্য কোনো কর্নারও নেই হাসপাতালগুলোতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, ‘যুববান্ধব না; কিশোর-কিশোরীদের জন্য আমাদের অবস্থান আছে। কৈশোর সংক্রান্ত যেসব সমস্যা, সেগুলোর জন্য পরামর্শক কেন্দ্র আছে। সেখান থেকে কিশোর-কিশোরীদের পরামর্শ দেওয়া হয়।’ তবে ঢামেক হাসপাতালে এ সংক্রান্ত কোনো কর্নার নেই বলে জানান তিনি।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সদ্য সাবেক পরিচালক (বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওএসডি) অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া জানান, সোহরাওয়ার্দীতে যুববান্ধব কর্নার নেই। তিনি থাকাকালেও ছিল না। হাসপাতালের নবনিযুক্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমানও যুববান্ধব কর্নার না থাকার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া মুগদা হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানেও যুববান্ধব কর্নার নেই।

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে যুববান্ধব কর্নার আছে কিনা- জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এফএমএইউ) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এডুলেসন হেলথ একটা আছে। যুববান্ধব কর্নার নেই।’

রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে এ কর্নার করার পরিকল্পনার আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে এমন কোনো পরিকল্পনার কথা জানা নেই।’