চিকিৎসকের বিকল্প রোবট

ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০ | ২৮ আষাঢ় ১৪২৭

চিকিৎসকের বিকল্প রোবট

আবু নাসের রতন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২০

print
চিকিৎসকের বিকল্প রোবট

বিজ্ঞানের এ যুগে প্রতিদিনই গবেষণা হচ্ছে। আবিষ্কার হচ্ছে নানা ধরনের জিনিস। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাঁচ শিক্ষার্থী তেমনই এক আবিষ্কার করে চমকে দিয়েছেন স্থানীয়দের। তারা ব্যতিক্রমী এক রোবট আবিষ্কার করেছেন। যা চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। আর বাংলাদেশেও প্রথমবারের মতো এটি নতুন এক আবিষ্কার। শিক্ষার্থীদের বানানো ‘মিস্টার ইলেক্ট্রোমেডিকেল’ নামের এ রোবট মানুষের শরীরের তাপমাত্রা, হার্টবিট, অক্সিজেনের পরিমাণ ও রক্তচাপ পরিমাপসহ রোগ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সক্ষম। তা ছাড়া চলাফেরা করার পাশাপাশি সালাম দিয়ে নিজের নাম, দেশের নাম, জাতির জনকের নাম ও প্রধানমন্ত্রীর নাম বলতে পারে মিস্টার ইলেক্ট্রোমেডিকেল।

ওই শিক্ষার্থীরা হলেন- টেকনোলজি বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. আশিকুর রহমান, মো. আনাসুর রহমান, মো. মীর আমিন, মেহেদী হাসান ও ষষ্ঠ ব্যাচের শিক্ষার্থী আবদুল মোন্নাফ। এ কাজে তাদের প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন ইলেক্ট্রোমেডিকেল টেকনোলজি বিভাগের জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর (টেক) মো. আবুল কাশেম। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের নামেই রোবটটির নাম দিয়েছেন মিস্টার ইলেক্ট্রোমেডিকেল।

ইলেক্ট্রোমেডিকেল টেকনোলজি বিভাগের ল্যাবে বানানো রোবটটির জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এ টাকার সিংহ ভাগই জোগান দিয়েছেন বিভাগের অন্য শিক্ষার্থীরা। আর কিছু টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ। গত ৭ জানুয়ারি রোবট বানানোর কাজ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। মাত্র ১৫ দিনে ‘মিস্টার ইলেক্ট্রোমেডিকেল’ এ রোবটটি বানাতে সক্ষম হন তারা। গত ২৩ জানুয়ারি রোবটটি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন শিক্ষার্থীরা। রোবটটির নিয়ন্ত্রণে স্থাপন করা হয়েছে রেসবেরি পাই, আরডোইনো মেগা ও আরডোইনো ইউএনও।

মিস্টার ইলেক্ট্রোমেডিকেল মানুষের শরীরের রক্তচাপ, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ, ইসিজি, হার্টবিট, কোলেস্টেরল, ইউরিক এসিড ও ব্লাড সুগার পরিমাপসহ রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সক্ষম। এজন্য রোবটটিতে যুক্ত করা হয়েছে বিপি মনিটর, ইসিজি সেন্সর পালস অক্সিমেটরি সেন্সর, জিসিইউ সেন্সর, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর ও থার্মাল স্ক্যানার। আর চলাফেরা করার জন্য ক্যামেরা ও আল্ট্রাসনিক সেন্সর লাগানো হয়েছে।

জানা যায়, আগুন লাগার খবর ও মাদকাসক্ত কাউকে শনাক্ত করতে রোবটটিতে নতুন ফিচার হিসেবে ফায়ার অ্যালার্ম ও অ্যালকোহল ডিটেক্টর যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। রোবটটি যে কোনো জায়গা থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি মোবাইল অ্যাপস তৈরির কাজও করছেন ওই পাঁচ শিক্ষার্থী। পরীক্ষামূলকভাবে এসব ফিচার ব্যবহারও করা হয়েছে। সবকটি ফিচারই যথাযথভাবে কাজ করেছে বলে দাবি করেছেন ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ। পালস অক্সিমেটরি সেন্সরে আঙ্গুল রাখলেই দেখা যাচ্ছে হার্টবিট ও অক্সিজেনের পরিমাণ। রোবটের হাতে থাকা থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে পরিমাপ করা যাচ্ছে শরীরের তাপমাত্রা ও রক্তচাপ পরিমাপ যন্ত্র দিয়ে সহজেই জানা যাচ্ছে উচ্চ নাকি নিম্ন রক্তচাপ। এ ছাড়া জিসিইউ সেন্সরের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে কোলেস্টরল, ইউরিক এসিড, ব্লাড সুগার ও ব্লাড গ্রুপ।

ইলেক্ট্রোমেডিকেল টেকনোলজি বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. আশিকুর রহমান জানান, মেডিকেল রোবট দেশে আগে কখনো তৈরি হয়নি। আমরাই প্রথম এটি বানিয়েছি। সাধারণত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যে ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় তার সবগুলোই আমাদের রোবট দিয়ে করা সম্ভব। হাসপাতালে ডাক্তার না থাকলেও আমাদের এ রোবট যেন বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে সেজন্য আমরা এটিকে আরও আধুনিক ও উন্নত করার চেষ্টা করছি।

ষষ্ঠ ব্যাচের শিক্ষার্থী আবদুল মোন্নাফ জানান, যেহেতু মেডিকেল সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ নিয়ে আমাদের লেখাপড়া। সেজন্যই আমরা মেডিকেল রোবট বানিয়েছি। এ রোবট মানুষের শরীরের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সক্ষম। এখনো এটি প্রাথমিক অবস্থায় আছে। আরও উন্নত ও আধুনিক করার কাজ করছি।

ইলেক্ট্রোমেডিকেল বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান করোনা ভাইরাস ইস্যুতেও মিস্টার ইলেক্ট্রোমেডিকেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে কেউ না গেলেও মিস্টার ইলেক্ট্রোমেডিকেল আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে গিয়ে তার শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ, হার্টবিট ও অক্সিজেনের পরিমাণ পরিমাপ করতে পারবে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য বানানো হলেও ভবিষ্যতে আর্থিক সহযোগিতা পেলে মিস্টার ইলেক্ট্রোমেডিকেল এ রোবট বাণিজ্যিকভাবে বানানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ছাত্র-শিক্ষকরা তাদের স্বল্প সামর্থ্যরে মধ্যে এ রোবট তৈরি করেছেন। যদি কেউ অর্থায়ন করেন তাহলে রোবটটিকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহ আলম বলেন, মেডিকেল রোবটের ধারণাটি আমাদের দেশে একেবারেই নতুন। শিক্ষার্থীদের এ উদ্যোগ খুবই প্রশংসনীয়। যদি এ রোবট চিকিৎসা ক্ষেত্রে কাজে আসে, তাহলে এটিকে আমরা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করব।