সাপের দংশনে করণীয়

ঢাকা, রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ | ৩ ভাদ্র ১৪২৬

সাপের দংশনে করণীয়

ডা. হাফিজ উদ্দীন আহমদ ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৬, ২০১৯

print
সাপের দংশনে করণীয়

বাংলাদেশে সাপুড়েরা বাঁশি বাজিয়ে সাপ নাচিয়ে পয়সা কামায়। আসলে সাপের শ্রবণশক্তিই নেই! সে হাতের নাড়াচাড়া ও হাত দিয়ে মাটিতে যে আঘাত করা হয় তার কম্পন শুনে সে অনুযায়ী দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ফণা তুলে দোলে। তার চোখে কোনো পাতা নেই তাই তা বন্ধও করতে পারে না। সিলেটে একটা কুসংস্কার আছে, সাপ মেরে গোবরের মাঝে ফেললে তা জীবিত হয়ে যে মেরেছে তাকে কামড়ে প্রতিশোধ নেয়। এ সবের সত্যতা নেই।

এখন বর্ষাকাল। দেশের অনেক জেলা ডুবে আছে বন্যার পানিতে। তাই সর্প দংশনের ঘটনাও ঘটছে বেশি। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সাধারণত ৫০ শতাংশ সর্প দংশন বিষাক্ত নয়। সাপের মুখে উপর পাটিতে দুটো দাঁত থাকে। কাউকে দংশনের সময় সুচালো দাঁতগুলো সরাসরি সামনের দিকে সরে যায়। আর ফলে দংশিত স্থানে দুটি ছিদ্র হয় যাকে ফ্যাংস মার্ক বা দন্তচিহ্ন বলে এবং সর্প দংশন নিশ্চিত করে। সাপের বিষ হলো তার প্যারোটিড গ্রন্থির লালা যার উপাদান অনুযায়ী বিষাক্ততা নির্ভর করে। ধোড়া সাপের বিষ নেই। কোবরা বা কেউটে তথা শঙ্খচূড় সাপের বিষ হলো স্নায়ু ধ্বংসকারী যার ফলে মাংসপেশি অবশ হয়ে যায়।

এ ছাড়া তা রক্তকণিকা ধ্বংস এবং রক্ত জমাটবাঁধা নিরোধ করে। ফলে রক্তপাত হতেই থাকে। ২০ মিনিট থেকে ৩০ ঘণ্টার মাঝে মৃত্যু হতে পারে। ভাইপারের বিষে রক্ত নালিকাগুলো ধ্বংস হয়। রক্তচাপ কমে গিয়ে তা সঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটে। ২-৭ দিনে মৃত্যু ঘটে। কেউটে সাপগুলো লম্বা ও দেহ গোলাকার তবে ভাইপার এত লম্বা নয় এবং গলা সংকীর্ণ।

মজার ব্যাপার কেউটে ডিম পাড়ে কিন্তু ভাইপার সন্তান প্রসব করে। কেউটাজাতীয় সবাই কিন্তু স্থলে বাস করে না সমুদ্রেও থাকে। এদের কামড়ে জায়গাটি লাল হয়ে উঠে, জ্বালাপোড়া করে, স্থানটি অবশ লাগে। ঘুম পায়, কথা জড়িয়ে যায়, মাতালের মতো টলে, চোখের মণি সঙ্কুচিত হয়। চরম ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে বালবার প্যারালাইসিস হয়ে রোগী ঢোক গিলতে পারে না। জিহ্বা অসাড় ও শ্বসন ক্রিয়া হ্রাস পায়। খিঁচুনি দেখা দিয়ে অজ্ঞান হয়ে একসময় মারা যায়।

ভাইপার দংশনে স্থানটিতে তীব্র ব্যথা হয় ও ফুলে ওঠে। ফোস্কা পড়ে, বমন হতে পারে এবং ক্রমাগত রক্ত ঝরতে থাকে। থুতু ছিটানো কোবরার ক্ষেত্রে ১৫ মিনিটে এসব দেখা দেয়। শরীরের প্রান্তদেশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় ও দেহে নীলাভতা দেখা দেয়। রক্তচাপ কমে যায়। অজ্ঞান হয়ে ২-৭ দিনে মারা যায় সে। তবে মৃত্যু নির্ভর করে বিষের পরিমাণ, রোগীর ওজন ও কত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা নিয়েছে তার ওপর।

সাপ হাতে বা পায়ে দংশন করলে স্থানটির একটু উপরে আট মিনিটের মাঝে (টুর্নিকেট) বেঁধে ফেলতে হবে তবে বাঁধন এক নাগাড়ে আধঘণ্টার বেশি রাখা উচিত নয়। এরপর পটাশিয়াম পারমাঙ্গানেট দ্রবণ বা ১০ শতাংশ ভায়োডিন বা সেভলন দ্বারা জায়গাটি পরিষ্কার করে ধারালো ব্লেড বা কিছু দিয়ে প্রতিটি ক্ষতচিহ্নের উপর কেটে (যাতে ধমনি না কাটে) ব্রেস্ট পাম্প বা মুখ লাগিয়ে চুষে বিষাক্ত রক্ত বের করে আনতে হবে। মুখ, জিহ্বা বা মাড়িতে ক্ষত থাকলে চোষা নিষেধ। কেননা তা দিয়ে বিষ শরীরে ঢুকে যেতে পারে। দৈবাৎ বিষ গিলে ফেললে কোনো ক্ষতি নেই। পাকস্থলি বা অন্ত্র থেকে তা শোষিত হতে পারে না। অবিলম্বে তাকে হাসপাতালে নিতে হবে।

চিকিৎসক প্রয়োজনে বিষ নির্মূল করতে দংশনের ৩ ঘণ্টার মাঝে ৮০-১০০ সিসি এন্টিভেনম ইনজেকশন অত্যন্ত ধীরে সমঘনত্বের লবণাক্ত দ্রবণ বা আইসোটোনিক সেলাইনের সঙ্গে মিশিয়ে শিরায় দেবেন।

বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে তৎক্ষণাৎ এড্রেনালিন বা কর্টিসোন দিতে হবে। এছাড়া গরম পানির বোতল দিয়ে শরীরের তাপ রক্ষা, শ্বসন ক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে অক্সিজেন ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তপাতে রক্ত ভরা এবং বীজঘ্ন বা এন্টিবায়োটিক তথা ধনুষ্টঙ্কার প্রতিরোধী (টিটেনাস টোক্সোয়েড) দ্বারা চিকিৎসা করা হয়। তবে সাপুড়ে বা বারবার যাদের সাপে দংশন করে তাদের ভেতর সাপের বিষের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ শক্তি গড়ে ওঠে। সাপের আগমন ঠেকাতে বিষাক্ত কার্বলিক এসিড দরজার কাছে রাখেন অনেকে। আফ্রিকায় সর্প দংশন থেকে বাঁচতে ঘরের দেয়ালে কার্বলিক এসিড লেপা হয়। গ্রামের পথেঘাটে অন্ধকারে চলতে পায়ে জুতা, হাতে লাঠি ও আলো থাকা উচিত।

অধ্যাপক ডা. হাফিজ উদ্দীন আহমদ
অধ্যক্ষ, মনোয়ারা সিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কার্তিকপুর, শরীয়তপুর