ঋতুস্রাব নিয়ে নীরবতা ভাঙুন

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

ঋতুস্রাব নিয়ে নীরবতা ভাঙুন

ছাইফুল ইসলাম মাছুম ১১:০০ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০১৯

print
ঋতুস্রাব নিয়ে নীরবতা ভাঙুন

মাসিক বা ঋতুস্রাব লজ্জার বিষয়; মাসিকের রক্ত দূষিত হয়; মাসিকের সময় টক খাওয়া যাবে না; মাসিকের সময় শরীর অপবিত্র হয়ে যায়; এই সময় সব ধরনের কাজ করা যায় না। ঋতুস্রাব নিয়ে এমন ভুল ধারণার শেষ নেই। এসব কারণে অনেক মেয়ের ঋতুকালীন স্বাভাবিক জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। তার ওপর রয়েছে নানা ধরনের কুসংস্কার।

ঋতুকালীন অনেকে স্কুলে যাওয়াও ছেড়ে দেয়। মাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ে ব্যবহারিক ও প্রাথমিক জ্ঞান অনেক মেয়েরই থাকে না। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকের মনে আতঙ্ক কাজ করে এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ঋতুকালীন পরিচর্যা করতে পারে না। ঋতুস্রাব নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সারা বিশ্বের মতো মঙ্গলবার বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে ‘ঋতুস্রাব স্বাস্থ্যবিধি দিবস’ (মেন্টরস হাইজিন ডে)। এই উপলক্ষে রাজধানীর কাকরাইলের জনস্বাস্থ্য অধিদফতরে সেমিনারের আয়োজন করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, ইউনিসেফ ও এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম। এই বছরের মাসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়, ‘মাসিক ব্যবস্থাপনায় সচেতন হই, আজই এখনই’।

ঋতুস্রাব স্বাস্থ্যবিধি দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়ির সচিব এস এম গোলাম ফারুক, অতিরিক্ত সচিব বেগম রোকসানা কাদের, ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ মায়া বেনজামিন্ট, প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রাহমান বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী শর্মিষ্ঠা দেবনাথ। প্রবন্ধে তিনি বাংলাদেশে নারীদের মাসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চিত্রটি তুলে ধরেন।

শর্মিষ্ঠা দেবনাথ বলেন, মাসিক বিষয়টা শুধু মেয়েদের বোঝালেই হবে না, এটা নিয়ে ছেলেদের সঙ্গেও কথা বলা সমান জরুরি। এটা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক বিষয়, তাই এটা নিয়ে লুকোচুরি বা গোপনীয়তার কিছু নাই। ২০১৪ সালে ৬ ভাগ স্কুলে মাসিক নিয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো সেখানে ২০১৮ সালে ৩৬ ভাগ স্কুলে মাসিক নিয়ে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

ইউনেসকোর মতে, মাসিক স্বাস্থ্যের জন্য বয়ঃসন্ধিসংক্রান্ত শিক্ষা, ঋতুস্রাববিষয়ক উপকরণ, সাবান, পানি, নিরাপদ টয়লেট ও বর্জ্য ফেলার উপযুক্ত জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু সীমিত সম্পদ ও বিদ্যমান অবকাঠামো এবং যথাযথ উদ্যোগের অভাবে অনেক স্কুলেই এসব সুবিধা থাকে না।

সেমিনারে কিশোরী প্রতিনিধি উদয়ন স্কুলের ছাত্রী আফরিন ফিজা (১৭) বলেন, ‘মানুষ মনে করে এটা লজ্জার বিষয়, এটা প্রকাশ করা যাবে না, কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। আমি চাই, মানুষের এই ভুল ধারণা ভেঙে যাক। সবাইকে জানা দরকার মাসিক বা ঋতুস্রাব খুব স্বাভাবিক বিষয়। সব মেয়েকে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারে মায়েরা ঋতুস্রাব সম্পর্কে প্রথম ধারণা দিয়ে থাকেন। আমার মা নেই, আমি ঋতুস্রাব সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি আমার চিকিৎসক বাবার কাছ থেকে।’
আফরিন বলেন, ‘ঋতুস্রাবজনিত মেয়েদের অনেক সমস্যা হয়ে থাকে। যেমন অনিয়মিত ঋতুস্রাব হওয়া, ঋতুস্রাব কম হওয়া। এ জন্য মেয়েদের অনেক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে হয়। আমি নিজেই এমন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছি এবং চিকিৎসাও নিয়েছি। আমাদের সমাজের মেয়েরা সাধারণত ঋতুস্রাব নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়লে কারও সঙ্গে শেয়ার করে না, এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।’
কিশোর প্রতিনিধি ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র শাকির (১৭) বলেন, ‘আমাদের সমাজে পিরিয়ড হলো সামাজিক ট্যাবু। এটা নিয়ে অনেক রাখঢাক ব্যাপার রয়েছে। মেয়েদের পিরিয়ড নিয়ে বন্ধুরা গসিব করত। আমাদের বুঝতে হবে মেয়েদের পিরিয়ড একটি স্বাভাবিক বিষয় বরং পিরিয়ড না হওয়ায় অস্বাভাবিক। শাকির বলেন, স্কুল-কলেজে ঋতুস্রাববান্ধব স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। পাঠ্যপুস্তকে ঋতুস্রাব নিয়ে লেখা থাকলেও, শিক্ষকরা বলেন, ‘বাসায় গিয়ে এই অধ্যায় পড়ে নিও।’

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য নারীদের ঋতুস্রাব বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ নারী। তারা যদি সুস্থ না থাকে তাহলে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে না। নারীদের সক্ষমতা বাড়াতে হলে তাদের সুস্থ রাখতে হবে। তাই মাসিকের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, মাসিকের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক নারীই নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। মাসিক চলাকালে তারা নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় পড়ছেন। তাই এ বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রাহমান জানান, আমরা কাজ করছি এসডিজি ৩,৫ এবং ৬ নিয়ে। আগে আমারা দেখতাম ৩০-৪০ ভাগ ছাত্রীরা মাসিকের সময় স্কুলে অনুপুস্থিত থাকত। এখন এ হার আরও অনেক কমে এসেছে।

নারীদের জীবনে ঋতুস্রাব একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। প্রজননক্ষম একজন নারীর মাসিকের সময় প্রায় ৩৮ বছর। যার শুরুটা হয় সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, বয়ঃসন্ধিকাল সময়ে। প্রতিটি নারীর জীবনে গড়ে ৪৫০ বার মাসিকচক্র সংঘটিত হয়। কিন্তু সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশের সমাজে ঋতুস্রাব এখনো অনেক লজ্জার আর গোপনীয় বিষয়।

ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন ২০১৪ অনুযায়ী, মাত্র ৪৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার আলাদা জায়গা রয়েছে। স্কুলগুলোতে পানি স্যানিটেশন ও এর স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনার অভাব প্রকট। ৮৬ শতাংশ শিক্ষার্থী মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী মাসিকের সময় স্কুলে যায় না এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মনে করে মাসিকের সমস্যা স্কুলের কর্মকাণ্ডে তাদের স্বাভাবিক অংশগ্রহণে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। গ্রাম অঞ্চলে মাত্র নয় শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী স্যানিটারি প্যাড এবং ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। ৯০ শতাংশ গ্রামীণ শিক্ষার্থী বারবার ব্যবহারের জন্য তাদের মাসিকের কাপড় গোপনে সংরক্ষণ করে। শহর এলাকার ২১ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী স্যানিটারি প্যাড এবং ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাপড় ব্যবহারও নিরাপদ হয়, যদি তার রক্ষণাবেক্ষণ সঠিক নিয়মে হয়।