আকাশছোঁয়ার অনুভূতি

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

আকাশছোঁয়ার অনুভূতি

আলী ইউনুস হৃদয় ২:৪৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৭, ২০১৮

print
আকাশছোঁয়ার অনুভূতি

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে একঝাঁক গ্র্যাজুয়েটের পদচারণা। কিছুক্ষণ পর পর মাথার হ্যাটগুলো নীল আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছে। আবার নীল আকাশ পানে উড়িয়ে দিচ্ছে। একটু পর পর যেন শূন্যে লাফিয়ে উঠছেন। এরই মাঝে নিজেদের মুঠোফোন কিংবা ক্যামেরার গ্যালারিতে জায়গা করে নিতে প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হচ্ছেন। সমাবর্তন গ্র্যাজুয়েটদের এমনই আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে মতিহারের সবুজ চত্বর যেন পুরনো যৌবন ফিরে পেয়েছিল। বলছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রত্যাশিত দশম সমাবর্তনের কথা। গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ছয় হাজার ১৪ জন গ্র্যাজুয়েটদের অংশগ্রহণে জমকালো সমাবর্তন।

স্নাতকোত্তরের পরীক্ষা দিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন, আর আসিনি। সমাবর্তনে নিবন্ধন করেছেন; কিন্তু অনাগত সন্তানের আগমনের সময় খুবই নিকটবর্তী হওয়ায় অংশ নিতে পারিনি। ব্যাংক কর্মকর্তা হেলাল এ সিয়াম তাদের একজন।

সিয়াম বলেন, অনেক দিন অপেক্ষার পর যখন সমাবর্তনের তারিখ হলো মনের মধ্যে খুশির জোয়ার বইতে শুরু করছিল। আহা! প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব, অগ্রজ ও অনুজদের সঙ্গে মিলনমেলায় অংশগ্রহণ করব। অন্যরকম শিহরণ কাজ করছিল। সময় যতো এগিয়ে আসছিল আমিও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে পরিকল্পনা করতে থাকলাম। কী কী করব? কোথায় থাকব? বড় ভাইদের কাছ থেকে কী কী ট্রিট নিবো ইত্যাদি। হঠাৎ গত ২৪ তারিখে অনাগত সন্তানের পৃথিবীতে আগমনের দিন নির্ধারিত হয়। কিন্তু সমাবর্তন ২৯ তারিখে! অন্যদিকে সাত বছরের স্বপ্ন আমাদের সন্তানের পৃথিবীতে আসার খবর, দোটানায় পড়ে গেলাম।

অবশেষে শত আকাক্সক্ষার প্রিয় সন্তানের প্রাপ্তির আনন্দে সমাবর্তনে যাওয়া হলো না। সমাবর্তনের দিন গাউন পরে বন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাসের আনাচে কানাচে মাতিয়ে বেড়ানো হলো না! কিন্তু সন্তানটি পৃথিবীতে সুস্থ্যভাবে আসার আনন্দে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে সকল না পাওয়া নিমেষেই ভুলে গেলাম। আজ যখন কথাগুলো লিখছি তখন ছোটভাই পিযুষ ও আমার বন্ধু সেতু সাগর, নুর, শাওন ও অরূপের সাহায্যে সমাবর্তনের উপকরণ আমার হাতে পৌঁছায়। আমি হাসপাতালের কেবিনে গাউন পরে আমার সন্তানকে কোলে নিয়ে ইচ্ছেমতো ছবি তুললাম। কলিজার টুকরোকে বুকের মধ্যে রেখে ছবিগুলো তোলার পরে আর কোনো কষ্ট নেই। সবাই আমার সন্তানের জন্য দোয়া করবেন।

ক্যাম্পাসের খবর সংগ্রহ আর পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন শামীম রাহমান। এমন সমাবর্তনের গল্প মনের মাধুরী মিশিয়ে তুলে ধরছেন সংবাদপত্রে। একটা সময় পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। এখনো সাংবাদিকতা করছেন শামীম।

তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে সমাবর্তনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস খুব কাছ থেকে উপভোগ করেছি। আবার আনন্দের খবরও সংগ্রহ করেছি। সত্যি মনে হচ্ছে আজকের আনন্দ! একবারে অন্যরকম, হ্যাট আর গাউন পরার আনন্দ! গ্র্যাজুয়েট হয়ে সমাবর্তনে উপস্থিত হতে পেরে শিক্ষা জীবনের পূর্ণতা অনুভব করছি।

সমাবর্তন ঘিরে ক্যাম্পাস লাল-নীল আলোয় সেজেছে। ক্যাম্পাসে এসেই প্রিয় বিভাগে শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন গ্র্যাজুয়েটরা। ক্যাম্পাসের সর্বত্রই গ্র্যাজুয়েটদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে। ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক, জোহা চত্বর, পুরনো ফোকলোর চত্বর, রাকসু প্রাঙ্গণ, শহীদ মিনার চত্বর, টুকিটাকি চত্বর ও স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ গ্র্যাজুয়েটদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। অনেকদিন পরে প্রিয় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হয়ে ফেসবুকে ছবি শেয়ার করেন।

সমাবর্তনে অংশ নেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের লাকমিনা জেসমিন সোমা। সোমা বললেন, ‘সমাবর্তনে অংশগ্রহণের স্বপ্ন সব গ্রাজুয়েটদেরই থাকে। সে স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে। খুবই ভালো লাগছে। পুরনো বন্ধুদের কিছু সময়ের জন্য হলেও ফিরে পেয়েছি। বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেছি, ছবি তুলেছি। সব মিলিয়ে একটি স্বপ্নের অধ্যায় পার করেছি।

পরিসংখ্যান বিভাগের গ্র্যাজুয়েট আরিফুল ইসলাম বললেন, সমাবর্তনে অংশ নেয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বিজ্ঞান ভবন, প্যারিস রোড, লাইব্রেরি, টুকিটাকি চত্বর সব জায়গায় হেঁটেছি। যেন আমি আমার হারিয়ে যাওয়া সময়ে ফিরে গেছি। সেই সাথে রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে সমাবর্তনে অংশ নেওয়া, পুরোটাই যেন স্বপ্নের মতো ছিল।

সমাবর্তনে অংশ নিতে ক্যাম্পাসে এসেছেন আসাদুজ্জামান রিয়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলে কাটিয়েছেন ছাত্রজীবনের চারটি বছর। যেখানে শত আনন্দ ও দুঃখের গল্প রয়েছে। সে হলও ঘুরে দেখেছেন।

রিয়াল বলেন, স্বপ্ন ছিল আমাদের। আগে তো দেখতাম সবাইকে গাউন পরা। প্রথমবার সমাবর্তনের দিন ঘোষণা হওয়াও খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কিন্তু না হওয়ায় হতাশ হয়েছিলাম। আবার সমাবর্তনের দিন নির্ধারিত হওয়ায় স্বপ্ন পূরণের আকাক্সক্ষাটা বেড়ে গেল। গাউন পরে ছবি তুলেছি, আড্ডা দিয়েছি। সমাবর্তনের সবটুকু আনন্দ উপভোগ করেছি। আসলে এই আনন্দের অনুভূতি অন্যরকম!