সবুজের রাজ্যে দাঁড়িয়ে স্মৃতির মিনার

ঢাকা, রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১ | ৫ বৈশাখ ১৪২৮

সবুজের রাজ্যে দাঁড়িয়ে স্মৃতির মিনার

খলিলুর রহমান ২:০২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১

print
সবুজের রাজ্যে দাঁড়িয়ে স্মৃতির মিনার

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাঙালী জাতীর এক গৌরবগাথা ইতিহাস। যেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে অর্জিত হয়েছে এই ভূমির স্বাধীনতা। সেই ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) নির্মিত হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনার। নান্দনিক ও মনমুগ্ধকর স্থাপত্যশৈলীর অনন্য উদাহরণ এই স্মৃতির মিনার। ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা বীর শহীদরা। স্বাধীনতা উত্তর প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শহীদদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ক্যাম্পাসের আঙিনায়। অমর একুশে, শহীদ মিনার, সংসপ্তককের মত স্মৃতিস্তম্ভ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় এই জাতির সংগ্রামের ইতিহাস।

ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ এ শহীদ মিনারের নির্মাণশৈলীতে অসাধারণ স্থাপত্যকর্মের সমন্বয় ঘটেছে। সৌন্দর্যমন্ডিত এ শহীদ মিনারের স্থপতি শিল্পী রবিউল হোসাইন। বিধৃত ইতিহাসের পরম্পরার প্রতিচ্ছবি রয়েছে এখানে। ১৯৫২ সালকে সব অর্জনের ভিত্তি বিবেচনা করে লাল ইটের তৈরি এ শহীদ মিনারের ভিত্তিমঞ্চের ব্যাস রাখা হয়েছে ৫২ ফুট। ১৯৭১ সালের অবিস্মরণীয় মর্যাদার প্রতি সম্মান জানিয়ে ভিত্তিমঞ্চ থেকে উন্মুক্ত আকাশগামী তিনটি স্তম্ভের উচ্চতা রাখা হয়েছে ৭১ ফুট। ঊর্ধ্বগামী স্তম্ভ তিনটি পৃথক পৃথক বিশেষ তাৎপর্য ধারণ করে।

প্রথম স্তম্ভটি ‘বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি’, দ্বিতীয়টি ‘মাটি-মানুষ, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, আন্দোলন-সংগ্রাম’ এবং তৃতীয়টি ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি, মুক্তি ও গণতান্ত্রিক চেতনার’ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। মূল বেদিতে শুয়ে উন্মূক্ত আকাশের দিকে তাকালে তিনটি স্তম্ভকে মুক্ত পাখির মত মনে হয়, যা আমাদের স্বাধীন হতে শেখায়। বিহঙ্গের মত অসীমের দিকে গন্তব্যকে নির্দেশ করে। এর ভিত্তিমঞ্চে ব্যবহার করা হয়েছে ৮টি সিঁড়ি। শহীদ মিনারটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয় ২০০৪ সালে ৬ নভেম্বর ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে ২০০৬ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। শহীদ মিনারটি ক্যাম্পাসের কেন্দ্রস্থলে। রাস্তা দ্বারা ত্রিভুজ আকারের মাঝে স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে মিনারটি। রাস্তার দু পাশে সারি সারি গাছ এর সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে। বর্ষাকালে এক পসরা বৃষ্টির পর এর দৃশ্য মন কাড়ার মত। ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্যের। এ স্মৃতিস্তম্ভ ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেয় এসব তাৎপর্যপূর্ণ স্থাপনা।

বিভিন্ন আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণে এসব স্থাপনার গুরুত্ব রয়েছে। এসব স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের প্রেরণার উৎস। এটি শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদ করতে হয়। ভাষা শহীদদের স্মরণে ক্যাম্পাসে দুটি হলও রয়েছে।’ এমন অনুভূতির কথা জানালেন জাবি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমগীর কবীর । বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী রনি ঘোষ বলেন, ‘শহীদ মিনার আমাদের মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায়।

এসব ভাষ্কর্য আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বাঙালী চেতনার প্রতিক এই মিনার। আমাদের সাহসের বাতিঘর।’ এই শহীদ মিনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি আদায়ের আন্দোলনের কেন্দ্র। সকল অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়তে সাহাস যোগায়। শত শত মিছিল, সমাবেশ, প্রতিবাদের ধারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই মিনার। পড়ন্ত বিকেলে শহীদ মিনারকে ঘিরে গল্প-আড্ডা ও গ্রুপ স্টাডিতে মেতে উঠে শিক্ষার্থীরা। দর্শনার্থীরাও ভিড় জমান এখানে। পরিবারের ছোট সদস্যকে নিয়ে আসেন ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। সামাজিক সংগঠনগুলোর সদস্যদের মিলনমেলাও বসে এখানে। প্রতিবছর জাতীয় দিবসগুলোতে শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।