তারুণ্যের প্রত্যাশা

ঢাকা, রবিবার, ৭ মার্চ ২০২১ | ২২ ফাল্গুন ১৪২৭

ভাষার মাসে

তারুণ্যের প্রত্যাশা

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ ১২:৩৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১

print
তারুণ্যের প্রত্যাশা

বাঙালি জাতির কাছে আত্মত্যাগ, শ্রদ্ধা ও অহংকারের মাস ফেব্রুয়ারি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রেরণার মাস। বছর ঘুরে ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ভাষা শহীদদের, যাদের বুকের তাজা রক্তে ১৯৫২ সালে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার পিচঢালা রাজপথ। মহান এ ভাষার মাসে বাংলা ভাষাকে নিয়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের ভাবনা, মতামত ও প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ। 

বাংলা ভাষা আমাদের গর্ব
আসিক আদনান
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বাঙালি জাতি হিসেবে গর্ব করার মতো অনেক কিছুর মধ্যে একটি হচ্ছে আমাদের ভাষা। পৃথিবীতে এটিই একমাত্র ভাষা যে ভাষায় কথা বলার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন ১৯৪৭ এ শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এসে তা পূর্ণতা পায়। মাতৃভাষার সঙ্গে মানুষের সখ্যতা ও পথচলার ব্যাপ্তি পুরো জীবন পর্যন্ত। শৈশবের সেই আধো বোল থেকে শুরু করে পৌঢ়তা ও বার্ধক্য পর্যন্ত এই মাতৃভাষাই আমাদের মনের ভাব অন্যকে জানানোর প্রধান সম্বল। বাংলা ভাষা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে একসূত্রে গাঁথতে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। আমি গর্বিত বাঙালি হিসেবে; একজন বাংলাভাষী হিসেবে আমার ভাষাই আমার গর্ব।

বাংলা ভাষা চর্চায় অনীহা নয়
নিগার সুলতানা সুপ্তি
শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে বাংলা ভাষা বিশ্বে একটি দুর্লভ মর্যাদা পেলেও বর্তমানে বাংলা ভাষায় চলছে অবাধ বিকৃতি। নিজেদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়া সন্তানটি প্রথিত বাংলায় কথা বলতে জানে না কিন্তু এটাই যেন মা-বাবার জন্য গর্বের হয়ে ওঠে। আমাদের নবীন প্রজন্মের মুখে আজ উচ্চারিত হয় ইংরেজি, হিন্দি মেশানো এক জগাখিচুড়ি বাংলা ভাষা। বাংলা নাটক, সিনেমার চেয়ে হিন্দি, কোরিয়ান তাদের কাছে পছন্দের শীর্ষে। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অপ্রয়োজনে ভিনদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। শুদ্ধ বাংলা ভাষার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। নতুন প্রজন্মকে ভাষার অপব্যবহার না করে জাতীয় জীবনে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ও সাংবিধানিক বাস্তবায়ন করতে হবে।

ভাষা হোক প্রতিবাদের ধ্বনি
সিনথিয়া সুমি
শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভাষার প্রতি কতটা আবেগ ও ভালোবাসা থাকলে নিজের শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ছিনিয়ে আনতে পারে তার প্রমাণ বায়ান্নর ভাষা শহীদরা।
আমাদের দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা সচেতনতার অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। নতুন প্রজন্ম বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি সব ভাষা একত্রে বলছে ও লিখে কোনো ভাষাতেই সুনির্দিষ্টভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারছে না। বাংলা ভাষার ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্যে সবার প্রতি সচেতনতা তৈরির বিকল্প কিছু হতে পারে না। একুশের চেতনায়, ভাষা আন্দোলনের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে আমাদের নতুন প্রজন্মকে। আমরা মাতৃভাষা ছিনিয়ে আনতে পারলেও এখনো সম্পূর্ণ মর্যাদা দিতে পারিনি। ভাষার মাসে একটাই প্রত্যাশা মাতৃভাষাকে যথার্থ সম্মান দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। তাই আমাদের উচিত মাতৃভাষা বাংলাকে শ্রদ্ধা করা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা।

সর্বস্তরে হোক বাংলা ভাষার প্রচলন
খন্দকার নাঈমা আক্তার নুন
শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

বাঙালি জাতির দিন বদলের সূচনা হয়েছিল শহীদ সালাম, বরকত, জব্বারের হাত ধরেই।
বাঙালিরাই ইতিহাসের প্রথম জাতি যারা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছে, জীবন দিয়েছে। আজ সেই বাংলা ভাষাকে আমরা ভুলতে বসেছি। কথায় কথায় বাংলার সঙ্গে ইংরেজির মিশ্রণ ঘটাচ্ছি। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ইংরেজি শিক্ষাতে জোর দিচ্ছে।
দেশে গড়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষায় নাকি কথা বলতে জানে না, বাংলা বলতে নাকি তাদের কষ্ট হয়; যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমাদের সন্তানদের এ অভ্যাস থেকে বের করে বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্ম দিতে হবে। শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চা ও বাংলার ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতনতামূলক কাজ করতে হবে এবং বাংলা ভাষার ব্যবহার সর্বত্র নিশ্চিত করতে হবে। ভাষার মাসে শপথ হোক শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা ও বাংলা ভাষার প্রচলন।

আঞ্চলিক ভাষার সম্মান হোক
রেজওয়ান আহম্মেদ
শিক্ষার্থী, ইংরেজি ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা ভাষার একটা বড় বৈশিষ্ট্যই হলো বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন রকম আঞ্চলিক ভাষার প্রচলন। যাদের রয়েছে নিজস্ব শব্দকোষ ও রীতি। যা বাংলা ভাষাকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শব্দ দিয়ে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করছে। শুধু কথায় নয় প্রাচীন যুগ থেকে আঞ্চলিক ভাষা কবিতা গান, সাহিত্য বা নাটকের সংলাপে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, অনেকেই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ তো করেনই না বরং হীনম্মন্যতায় ভোগেন। আমাদের মনে রাখা উচিত আঞ্চলিকতা মানে সংকীর্ণতা বা অনাধুনিকতা নয়, এটা আমাদের ঐতিহ্য। তাই ভাষার এই বৈচিত্র্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে।