উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা হতাশার বছর

ঢাকা, রবিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১ | ৩ মাঘ ১৪২৭

ফিরে দেখা শিক্ষাঙ্গন ২০২০

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা হতাশার বছর

ওয়ালিয়ার রহমান ৩:৩৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০২০

print
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা হতাশার বছর

বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের কারণে বিদায়ী বছর জুড়ে শিক্ষাঙ্গন ছিল উৎকণ্ঠা অনিশ্চয়তা হতাশায় ভরপুর। দেশে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা কর্মচারী বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উচ্চশিক্ষা স্তরে বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ সেশনজটের শঙ্কা। সারা বছরই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উৎকণ্ঠায় পার করছেন। করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। যা ১৬ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত বর্ধিত আছে। বিশ্বব্যাপী করোনা প্রাদুর্ভাব আবার বৃদ্ধির কারণে কবে খোলা হবে এখনো অনিশ্চিত।

বিদায়ী বছরে চরম আর্থিক সংকটে ছিলেন বেসরকারি শিক্ষকরা। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা যে বেতন ভাতা পান তা দিয়ে হয়তো কোনো রকম চলে যাচ্ছেন কিন্তু নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক লাখ শিক্ষক কর্মচারী চরম অর্থসংকটের মধ্যে সময় পার করছেন। দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় ৯৭ শতাংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনানির্ভর। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত প্রায় ২৮ হাজার, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এবং স্বীকৃতিবিহীন আরও প্রায় দশ হাজার নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। হাতে গোনা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারীদের ভালো বেতন ভাতা দিলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান করোনার কারণে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দিতে পারেননি। ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে শিক্ষকদের। বিশেষ করে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক এবং কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রায় ৬ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীদের সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকট ও বিপদে পড়তে হয়েছে। অনেকে বেঁচে থাকার তাগিদে পেশা পরিবর্তন করে কায়িক শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হয়েছে এবং দেখা দিয়েছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার শঙ্কা। 

বিদায়ী বছরে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাতে সংসদ টিভি ও অনলাইনে পাঠদান, পরীক্ষা না নিয়ে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ করা, পিইসি-জেএসসি পরীক্ষা বাতিল এবং এইচএসসিতে অটোপাসের মতো ঘটনা ঘটেছে।

দেশে বর্তমানে ৬৮৩টি সরকারি ও ১৯ হাজার ৪২১টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। রাজধানীতে আছে ৪২টি। ১৬ হাজার ৭৭৫টি এমপিওভুক্ত, বাকি দুই হাজার ৬৪৬টি ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব স্কুলে পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে ভর্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নন-এমপিও শিক্ষকদের আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করে সরকারের তরফ থেকে কিছু প্রণোদনাও দেওয়া হয়েছে। বিদায়ী বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা হারিয়েছি অনেক প্রিয় শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের। এদের মধ্যে রয়েছেন-

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : কিংবদন্তি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান (জন্ম : ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭, মৃত্যু : ১৪ মে ২০২০)। তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক ছিলেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।

অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ (জন্ম : ১৫ ডিসেম্বর ১৯৩৩, মৃত্যু : ১৭ জুলাই ২০২০) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৯২ সালে একুশে পদক লাভ করেন।

সুফিয়া আহমেদ : সুফিয়া আহমেদ (জন্ম : ২০ নভেম্বর, ১৯৩২, মৃত্যু : ৯ এপ্রিল, ২০২০ ) একজন শিক্ষাবিদ। ১৯৯৪ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর : বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর (জন্ম : ৯ জানুয়ারি ১৯৩৬, মৃত্যু : ২৩ মার্চ ২০২০) একজন লেখক, চিত্র সমালোচক এবং শিক্ষাবিদ। তিনি ছোটগল্পে অবদানের জন্য ১৯৬৯ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রদত্ত বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের জন্য ২০০৯ সালে একুশে পদক লাভ করেন।

জামিলুর রেজা চৌধুরী : জামিলুর রেজা চৌধুরী (জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৪৩, মৃত্যু : ২৮ এপ্রিল ২০২০) একজন প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি ২০০১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ২০১২ থেকে আমৃত্যু ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য ছিলেন।
এছাড়া হারিয়েছি প্রিয় শিক্ষক- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য এম. শামসুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য এম ওয়াজেদ আলী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাবেক উপাচার্য এজেএম নুরুদ্দীন চৌধুরী প্রমুখ।
বিগত বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সাফল্যেরও কমতি নেই। নতুন বছরে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বছরের শেষ দিকে এসে গত ৭ ডিসেম্বর নতুন তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো- নারয়ণগঞ্জের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নাটোরের ড. এম ওয়াজেদ মিয়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেহেরপুরের মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

স্বাধীনতা-উত্তর দেশে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই বৃদ্ধি পায়নি, অসংখ্য বাংলা ও ইংরেজি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ হয়েছে। মাত্র ছয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যাত্রা করা দেশটিতে এখন ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কার্যক্রম চালাচ্ছে ও ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থসামাজিক উন্নয়নে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিসহ শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রী সমতা বিধানের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় উপবৃত্তি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহ চালু আছে। শিক্ষার উন্নয়নে যুগোপযোগী পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪.৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

সরকারের নানা উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা গ্রহণের ফলে প্রায় ৯৯ শতাংশ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। ১০০ শতাংশ শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার জোর প্রচেষ্টা চলছে। সবমিলে নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়তে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছে সরকার।