নব্বই একরে ফেরার অপেক্ষায়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

নব্বই একরে ফেরার অপেক্ষায়

রেজাউল ইসলাম রেজা ২:৩০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০

print
নব্বই একরে ফেরার অপেক্ষায়

উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়ি ছেড়েছি ২০১৫ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর, ঈদ কিংবা পূজোর সরকারি ছুটি ব্যতীত বাসায় আসার তেমন সুযোগ হয় না। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বাবা মার সঙ্গে দেখা করার জন্য মন ছটফট করতো সবসময়। তবুও ভবিষ্যতের আশায় নিজেকে একপ্রকার সান্ত¡না দিতাম। প্রথমদিকে জোর করে হলেও মনটাকে বেঁধে রাখতাম পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ একর জায়গায়। শুরুতে কষ্ট হলেও একটা সময় মানিয়ে নিয়েছি, ভালোবাসতে শিখেছি। প্রাণের ক্যাম্পাসকে ছেড়ে আসতে যেন মন চাইতো না। 

দেখতে দেখতে চারটা বছর কেটে গেল, গ্র্যাজুয়েশনের ঠিক কাছে গিয়েও তাকে স্পর্শ করার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হলাম। অদৃশ্য শত্রুর কাছে জিম্মি হয়ে ফিরতে হলো নিজ ঠিকানায়। করোনা সংক্রমণ কমাতে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে। শুরুতে মনে হতো এই তো আর কটা দিন, তারপরই ভালোবাসার আঁতুরঘরে ফিরতে পারব, প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে আবার দেখা হবে। আবার ক্লাস, আড্ডা, গান-বাজনা, খেলাধুলা করে সময় পার করব। কিন্তু না, দীর্ঘমেয়াদি ছুটির মেয়াদ যেন বেড়েই চলছে।

অপেক্ষার প্রহর কাটছে না। প্রিয় ক্যাম্পাস, প্রিয় মানুষগুলোর জন্য অপেক্ষায় মশগুল আমরা। আর কত অপেক্ষা? ক্যাম্পাসে কাটানো মুহূর্তগুলোই এখন সুমধুর স্মৃতি হয়ে যন্ত্রণাগুলোকে বাড়িয়ে দেয়। মোবাইল ফোনে তোলা ছবিগুলো দেখে নিজেকে শান্ত রাখলেও, এভাবে আর কত দিন। শেষ যখন ক্যাম্পাস ছেড়ে আসি, হলের বারান্দায় কিছু গাছ রেখে এসেছিলাম।

ভোরে ঘুম থেকে উঠে হলে বসবাসরত পাখিগুলোর জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেছিলাম। জানিনা ওরা এখন কেমন আছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হলে কাটানো সময়গুলো সবচেয়ে মধুর হয়। থাকে না কারও অনুশাসন কিংবা পরাধীনতার বেড়াজাল। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ওটাই যে মোক্ষম সময়। হলের বড় ভাই, ব্যাচমেট, জুনিয়রদের সঙ্গে মিলে তৈরি হয় এক নতুন পরিবার।

ইচ্ছে হলেই গভীর রাতে ছাদে গিয়ে গিটারের তালে গলা ছেড়ে গান গাওয়া কিংবা বৃষ্টির দিনে বন্ধুরা মিলে খিচুড়ি পার্টি। আবার কখনো বৃষ্টিতে ভিজে হলের মাঠে ফুটবল খেলার আনন্দ নিয়ে যায় ছোটবেলার সেই দুরন্তপনাময় জীবনে। সভ্যতার প্রাচীর ভেঙে বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে হারিয়ে যেতাম আমরা। মনে পড়ে সেদিনগুলোর কথা, যেদিন ক্লাস শেষে প্যারিস রোডে বসতাম, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাত, তবুও আড্ডা শেষ হতো না। আর যদি বন্ধুদের কারও জন্মদিন হয়, তাহলে তো কথাই নেই, তাকে ‘ঝালমুড়ি’ নামক অদ্ভুত মাইর দিতে না পারলে যেন আমাদের শান্তি নেই।

তারপর সবাই মিলে লালকমলে গোসল, মনে করলে আজও স্বর্গ সুখের হাতছানি দিয়ে যায়। আর ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যমন্ডিত নীলবাসে চড়ে এদিক সেদিক ঘুরতে যাওয়া তো আছেই। করোনা নামক এই অভিজ্ঞতা আমাদের সবসময় আতঙ্কে রাখলেও আমরা কি আমাদের বাঙালিয়ানা, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে কখনো ভুলতে পারব। কখনোই পারব না। বন্ধুদের দেখলে এখনো গায়ে জড়ানোর দুঃসাহস করতেও ভয় করবে না। কবি গুরু লিখেছিলেন, ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়, ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।’

সেই পুরনো দিনগুলোই এখন স্মৃতির ক্যানভাসে জমা পড়ে আছে আবার ফিরে যেতে চাই চেনা শহরে। ভালোবাসার বন্ধনে থেকে প্রিয় মুখগুলোর সঙ্গে থাকতে চাই আরও কিছুদিন।