ভালোবাসার প্যারিস রোড

ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

ভালোবাসার প্যারিস রোড

আশিক ইসলাম ১২:২৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৯, ২০২০

print
ভালোবাসার প্যারিস রোড

নির্মল বাতাস। পিচঢালা রাস্তা। রাস্তার একপাশে ফুটপাত। রাস্তার দুই ধারে সুবিশাল গগনশিরীষ গাছ। সড়কের দুই ধারে বেড়ে উঠা গাছগুলো যেন একে অপরকে আলিঙ্গন করতে মরিয়া। গাছগুলোকে রৌদ্রস্নান করাতে সূর্যমামার কত প্রচেষ্টা। সূর্যের আলো কখনো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রাস্তায় নেমে আসছে, কখনো বা পাতায় আটকে যাচ্ছে। এমনই আলো-ছায়ার খেলায় সৌন্দর্যের প্রতিমা হয়ে জেগে আছে একটি রাস্তা। বলছিলাম সৌন্দর্যম-িত প্যারিস রোডের কথা।

প্যারিস রোড! নামটা শুনেই আপনি হয়তো কল্পনায় ভাবছেন এটা ফ্রান্সের কোনো এক রাস্তা। কিন্তু না! ফ্রান্সের নয়, এটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্যারিস রোড’। ৫০ বছরের পুরনো এই রাস্তাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোরই একটি অংশ। যা এখনও মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ধারণা করা হয়, এই গাছগুলো ফ্রান্সের প্যারিস থেকে আনা হয়েছিলো। তাই রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে প্যারিস রোড।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করে কিছুটা এগিয়ে বামদিকে চোখে পড়ে সুবিস্তৃত একটি রাস্তা। রাস্তার দুই ধারে উচু গগনশিরীষ গাছগুলো দেখলেই যেন মন ভরে যায়। মনে হয় গাছগুলো যেন রাস্তাটিকে পরম আদরে মুড়িয়ে রেখেছে। হাজারো শিক্ষার্থীর বয়ে বেড়ানো এ রাস্তাটির নামকরণ নিয়ে রয়েছে এক ইতিহাস।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণের লক্ষে ক্যাম্পাসের কাজলা রোড থেকে শের-ই-বাংলা হল পর্যন্ত এই গগনশিরীষ গাছ লাগানো হয়। তৎকালীন উপাচার্য এম শামসুল হক ফিলিপাইন থেকে কিছু গাছ নিয়ে আসেন। তিনি এই গাছগুলো রোপণের দায়িত্ব দেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সভাপতিকে। তাঁর হাত ধরেই লাগানো হয় গাছগুলো। রাস্তাটির নাম প্যারিস রোড কেন?

এমন প্রশ্নের উত্তরে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাদিরউজ্জামানের নেতৃত্বে গাছগুলো লাগানো হয় যা শিগগিরই ক্যাম্পাসের দৃষ্টিনন্দনে পরিণত হয়। রাস্তাটির সঙ্গে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাস্তাগুলোর অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এটিকে প্যারিস রোড বলতে থাকেন। সেই থেকে রাস্তাটি প্যারিস রোড নামে পরিচিত হয়ে উঠে।

ভালোবাসা-বন্ধুত্ব, রক্ত-সংগ্রাম, জীবন-মৃত্যু, হাসি-কান্না, একাকিত্ব সময় কিংবা প্রেমিকযুগলের হাতের উষ্ণ ছোঁয়া যুগের পর যুগ ধরে এমন বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে আছে এই রাস্তাটি। এ রাস্তা বহন করে চলেছে কালের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। কখনও বিদ্রোহে কেঁপে উঠেছে তার বুক, কখনও ভালোবাসায় শীতল হয়েছে। আবার কখনও বা তাজা রক্তের সঙ্গে মিশেছে প্যারিসের চোখের জল। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আন্দোলন ছাড়া যেমন প্যারিস রোড প্রাণ পায় না, তেমনি ক্যাম্পাসের ভালবাসাও প্রাণ পায় না প্যারিস রোড ছাড়া।

এই রাস্তাটি অনেক জুটির প্রেমময় স্মৃতি বহন করছে বা অনেক জুটির প্রেমময় মুহুর্তের স্মৃতি বহন করছে। অনেকের প্রেম নিবেদনের মুহূর্তের স্মৃতিগুলোকে বহন করছে, অনেকের হয়তো বা প্রেমে বিরহের স্মৃতিবহন করছে। আবার সে প্রেম বিরহ কাটিয়ে নতুন করে প্রেমে পড়ার স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে রেখেছে এই প্যারিস রোড। আবার বর্ষার কোন এক বিকেলে প্রিয়তমার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে অল্প বৃষ্টিতে সূর্যাস্তের অপেক্ষা করতে করতে অনেকের সময় কেটে গেছে এখানেই।

ক্যাম্পাসের অতীত বর্তমানের শিক্ষার্থী তো বটেই বাইরের দর্শনার্থীদের কাছে এটি একটি দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে শিক্ষা সফরে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান এমন কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না, যার সঙ্গে এই প্যারিস রোডের কোনো স্মৃতি জড়িত নেই। সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা কিংবা রাতে আড্ডা, গান, গল্প ও নানা মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে সবার ভালোবাসার ‘প্যারিস রোড’। করোনামুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হোক প্যারিস রোড সেই প্রত্যাশা।