করোনা ও বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ঢাকা, শনিবার, ৬ জুন ২০২০ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

করোনা ও বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু ৭:৫৭ অপরাহ্ণ, মে ০২, ২০২০

print
করোনা ও বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারা বিশ্ব আজ চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্বের অর্থনীতি আজ চরম হুমকির মধ্যে পড়েছে। অন্যন্য সেক্টরের মত শিক্ষা সেক্টরও চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন । আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও এখন মুখথুবড়ে পড়েছে। গত প্রায় দুইমাস যাবৎ দেশের সকল স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এতে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর পড়ালেখা চরম সংকটের মধ্যে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস সিডিউল সব ওলটপালট হয়ে গেছে। সরকার টেলিভিশনের মাধ্যমে এবং কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা এইচএসসি স্থগিত রয়েছে। কিন্তু কখন এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এই মুহূর্তে তা বলাও সম্ভব নয়। ফলে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। নতুন প্রজন্মের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত দেশের বর্তমান চরম এই অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্যে বাড়িতে বসে তারা যে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিবে সেই পরিবেশও নেই। যারা দরিদ্র পরিবারের সন্তান বিশেষ করে যারা শ্রমজীবী কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের তাদের করুণ অবস্থা। তাদের পরিবারে অনেকের বাড়িতে ঠিকমত চুলাই জ্বলছে না। এমতাবস্থায় তারা কিভাবে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করবে?

কিভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিবে? করোনার সংকটের ফলে দেশের সরকারি, বেসরকারি সকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এবং সকল পরীক্ষা স্থগিতের ফলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিতের ফলে শিক্ষার্থীরা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন। এমনও শিক্ষার্থী আছে যাদের একটি বা দুইটি পরীক্ষা বাকি ছিল তারাও আটকা পড়ে গেছেন। আকস্মিক এই অনির্ধারিত বন্ধের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটের কবলে পড়তে যাচ্ছে।

করোনার প্রভাবে শুধু শিক্ষার্থী নয় শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও চরম হুমকির মধ্যে পড়েছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা যে বেতন পান তা দিয়ে হয়ত চালিয়ে নিতে পারবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা সরকারি যে বেতন পান তা দিয়ে তাদের সংসার চালানো দায়।

তারা প্রতিষ্ঠান থেকে যে বাড়ি ভাড়া ও অন্যন্য সুযোগ সুবিধা পান তা দিয়ে কোনরকমে সামলে নেন। অনেক প্রতিষ্ঠান এ বাড়ি ভাড়া ও অন্য সুযোগ সুবিধাও দেয় না। প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের জীবনধারণও কঠিন হয়ে পড়ছে। বেসরকারি নন-এমপিও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যারা মুলধারার শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নামমাত্র কিছু বেতন পেয়ে থাকেন। কোথাও কোথাও তাও পান না।

বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও বন্ধ। এছাড়া টিউশনি করে যারা কোনো রকম জীবন নির্বাহ করতেন তাদের টিউশনিও বন্ধ। এমতাবস্থায় তাঁরা চরম আর্থিক সংকটে আছেন। এমপিওভুক্ত কলেজে যে সকল নন-এমপিও অনার্স মাস্টার্স শিক্ষক রয়েছেন তাঁরাও এখন চরম আর্থিক সংকটের সম্মুখীন। স্বতন্ত্র এবতেদায়ি ও আলীয়া মাদ্রাসা শিক্ষকও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এছাড়া দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ৫৫৩ টি বেসরকারি পলিটেকনিক ও প্রায় ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। করোনায় এ সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতনও বন্ধ। তবে আসার কথা হলো দীর্ঘদিন পর সরকার এবার ২৭৩০ টি (স্কুল,কলেজ,মাদরাসার ও কারিগরি) প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছে। দেশের এই সংকটে শিক্ষকদের সমস্যার কথা বিবেচনা করে শিক্ষামন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এই সব প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

যদি করোনার ভাইরাস আরো দীর্ঘায়িত হয় সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করবে। এমতাবস্থায় সরকারকে এই বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় ৯৭% বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বেসরকারি শিক্ষার উপর নির্ভরশীল।

জাতীয় স্বার্থেই এই শিক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এখনই যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিক্ষাখাতে ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে। এব্যাপারে প্রয়োজনে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট স্কুল কলেজ মাদরাসা, কারিগরি, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বস্তরের বরেণ্য শিক্ষক প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে উদ্ধুত পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অংশ থেকে শিক্ষার জন্য একটি বিশেষ ফান্ড গঠন করা যেতে পারে।

শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বিকল্প চিন্তা করতে হবে। বর্তমানে টেলিভিশনে ক্লাস নেওয়ার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এ ছাড়াও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানকে অনলাইন, ফেইসবুক, ইউটিউব, মোবাইল ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে পাঠদান করা যেতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর নির্ধারিত ছুটি কমিয়ে ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।

শিক্ষকদের স্ব-উদ্যোগে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। ছুটি দীর্ঘায়িত হলে পাঠ্যবইয়ের গুরুত্ব অনুযায়ী সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে।