তারুণ্যের একুশে ভাবনা

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০ | ২৭ চৈত্র ১৪২৬

তারুণ্যের একুশে ভাবনা

সোয়াদুজ্জামান সোয়াদ ৪:৩৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

print
তারুণ্যের একুশে ভাবনা

বাঙালি জাতির কাছে একুশ মানেই সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পর একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কী ভাবছে তরুণরা! বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন- সোয়াদুজ্জামান সোয়াদ

বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে সচেতন হতে হবে
আলী ইউনুস হৃদয়

একটি ভাষা একটি জাতির পরিচয়কে ধারণ করে। ঠিক তেমনই বাঙালি জাতির গৌরব ও ঐতিহ্যের ধারক হচ্ছে বাংলা ভাষা। আমরা সবাই জানি, এই ভাষার অধিকার কারোর দেওয়া নয়। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভাষার মর্যাদা অর্জন করেছে বাঙালি জাতি। বাঙালির ভাষার অধিকারের ইতিহাস স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস।

এই ইতিহাস ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সেই বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের মর্যাদা এখনও সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর একবিংশ শতাব্দীর এই দেশে বাংলা ভাষার বিকৃত ব্যবহারও দেখা যায়। যা অত্যন্ত লজ্জার ও কষ্টের! একটু খেয়াল করলে দেখতে পাই, ভাষার বিকৃতি যারা করছে তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত। আবার অনেকেই ভাষার বিকৃত ব্যবহারকেই আধুনিকতা মনে করে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বাংলা ভাষার বিকৃত ব্যবহারের দেখা মেলে। কিন্তু এমনটি তো প্রত্যাশিত ছিল না।

আলী ইউনুস হৃদয়, শিক্ষার্থী , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন
ফাতেমা তুজ জিনিয়া

আমাদের দেশের স্বাধীনতার বীজ বপন হয়েছিলো ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা নিজেদের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম ভাষা কেবল মনের ভাব প্রকাশ কিংবা যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা একটা জাতির অস্তিত্ব, একটা জাতির পরিচয়।

৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা নিজের জীবন দিয়ে যেই ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করেছি আজ নিজেরাই সেই ভাষাকে অবহেলা করছি। ভাষার প্রতি ভালোবাসা আর ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান এখন শুধুমাত্র শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা বৃদ্ধিতে সরকারসহ সবার উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।

ফাতেমা তুজ জিনিয়া, শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে যাবে মায়ের ভাষা
এম এম মুজাহিদ উদ্দীন

বিশ্বের খুব কম দেশের মানুষই আছে যারা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। আমরা ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য আন্দোলন করেছি। রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি এই আমার মায়ের ভাষা বাংলা। বছর ঘুরে বাঙালি জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি আসে। আমরা অনেক সেজেগুজে প্রভাতফেরিতে যাই। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই শহীদ মিনারে। কিন্তু অনেকেই আমরা ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ভালো জানি না। রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ভাষাকে বিকৃত করে বিভিন্ন সময় বলে থাকি, লিখে থাকি। ইংরেজি, উর্দু, হিন্দির অহেতুক ও অবান্তর ব্যবহার করে থাকি। যা জাতি হিসেবে লজ্জাজনক।

অন্যদিকে দেশের সর্বস্তরে এখনো বাংলা ভাষা ব্যবহার হয় না। শহীদদের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি সর্বস্তরে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করা। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা, অনুধাবন করা। আমার প্রত্যাশা থাকবে এই নব প্রজন্ম একুশে ফেব্রুয়ারির যথাযথ মর্যাদা দিবে।

এম এম মুজাহিদ উদ্দীন, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


ভাষা শহীদদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা
মারিয়া তুল জান্নাত মৌ

২১ ফেব্রুয়ারি, দিনটার কথা মনে পড়লেই মনের মধ্যে অন্য রকম একটা শিহরণ জাগে, ভাষার জন্য মানুষ জীবন দিতে পারে এ যেন কল্পনা করাও কঠিন।

ছোটবেলা থেকেই এই অনুভূতির সূত্রপাত, বাবার হাত ধরে শহীদ মিনারে হেঁটে যেতাম আর বাবা শোনাতেন মাতৃভাষা অর্জনের সময়ের সেই নৃশংসতা, ভয়াবহতা, মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যারা নিঃস্বার্থভাবে পথে নেমেছেন এবং এনে দিয়েছেন আমাদের মাতৃভাষা। বর্তমানে একুশের সকালটা শুরু হয় ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে র‌্যালির মাধ্যমে, পুষ্প অর্পণ করে। ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের ছাত্রী প্রতিনিধি হিসেবে আমার নিজের ও কিছু দায়িত্ব থাকে। এই ভাষা আমার, শত প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করা আমাদের বাংলা ভাষা, বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই সেসব শহীদদের প্রতি।

মারিয়া তুল জান্নাত মৌ, শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নাটক সিনেমা নির্মাণ করা হোক
কেএম হিমেল আহমেদ

বাঙালি জাতির জীবনে এক অন্যরকম ইতিহাস হয়ে আছে ৫২’র ভাষা আন্দোলন। এই ইতিহাস যারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে রচনা করে গেছেন তাদের সম্পর্কে আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে সঠিক ভাবে তুলে ধরাটা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘ ৬৮ বছর পার হয়ে গেলেও ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তেমন কোনো নাটক, সিনেমা, গান তৈরি হয়নি।

যদিও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা, নাটক রয়েছে। কিন্তু ভাষা আন্দোলন নিয়ে তেমনটা নেই। নাটক সিনেমা তৈরি না করা হলে আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস অজানা থেকে যাবে। আমি মনে করি, ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নাটক সিনেমা আরও তৈরি করা হোক।

কেএম হিমেল আহমেদ, শিক্ষার্থী
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।


ভাষা শহীদরাই সত্যিকার নায়ক
তাসনীম আমিন সোমা

বায়ান্ন তথা একুশের ভাষা আন্দোলনের চরিত্র প্রধানত চারটি সেøাগানের ভিত্তিতে প্রকাশ পেয়েছিল। সে চরিত্র রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিনির্ভর।

স্লোগান চারটি হচ্ছে- ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’, ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ এবং ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কর’। প্রতিটি স্লোগান বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর জন্য তাৎপর্যমণ্ডিত। অর্থাৎ তাদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমি আবিষ্কার করেছি কী পরিমাণ দেশপ্রেম থাকলে একজন মানুষ সচেতনভাবে নিজের তাজা প্রাণ সঁপে দিতে পারে মৃত্যুর দুয়ারে।

কারণ, ওই সময় সারা শহরে কারফিউ চলছিল, মিছিলের সামনে যে যাবে সেই গুলি খাবে, এটি জেনেও আমাদের ভাষাশহীদরা মিছিলে মিছিলে ভাষার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। তারাই সত্যিকার নায়ক, সত্যিকার নেতা।

তাসনীম আমিন সোমা, শিক্ষার্থী
ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়।