আবেগ ভালোবাসার বিদায়

ঢাকা, শনিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২০ | ১২ মাঘ ১৪২৬

আবেগ ভালোবাসার বিদায়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরাফাত সাহীন ২:২৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০১৯

print
আবেগ ভালোবাসার বিদায়

প্রখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘কবি’ উপন্যাসে বড় আক্ষেপ নিয়ে বলেছেন, ‘জীবন এত ছোট কেনে!’ আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ করার পর মনে হচ্ছে আমাদের জীবনটা যেন ছোটই! এই তো সেদিনই মতিহারের সবুজ চত্বরে এক বুক স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে আমরা এসেছিলাম। কিন্তু সময়টা যেন বড্ড দ্রুত ফুরিয়ে এলো! কত তাড়াতাড়িই না আমরা ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছি! আর তো কিছুদিন পর চিরতরেই চলে যাব এই ক্যাম্পাস ছেড়ে। কিন্তু এখানে যে কত ভালোবাসা এবং আবেগ জমা রয়ে গেল!

এই অল্প সময়ে ক্যাম্পাসকে ঘিরে কত স্মৃতি এসে জমা হয়েছে আমাদের হৃদয়ের কোণে। প্রথম যেদিন ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম সেদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম; ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিল আমার বুক। আমার মতো সবার বুকই হয়তো ভয়ে দুরুদুরু করে উঠেছিল। তারপর তো ভর্তির সুযোগ পেলাম। সে কী আনন্দ! আনন্দে আমাদের সঙ্গে সেদিন ভেসে গিয়েছিল পুরো পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমরা নতুন একটা পরিবার পেয়ে গেলাম। পুরনো অনেক স্মৃতি হাতড়ে আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম আগামীর দিকে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হয়ে আমি এমন অনেককে পেয়েছি, যাদের সঙ্গে আমার আত্মার একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে আপনাআপনিই। শুধু আমার বিভাগেই নয়, ভার্সিটির অনেক বিভাগের অনেকের সঙ্গেই গড়ে উঠেছে গভীর বন্ধুত্ব। অনার্স জীবনটা শেষ করার পর মনে হচ্ছে এসব বুঝি এবার শেষ হতে চলেছে! টানা দুই মাস পরীক্ষা দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম সকলে। তারপর একদিন বাদেই ভাইভা দেওয়ার জন্য হাজির হয়ে গেলাম। ভাইভা শেষ করেই প্যারিস রোডের দিকে ছুটে গেলাম স্মৃতি হিসেবে কিছু ছবি জমিয়ে রাখার জন্য। বিভাগের সামনে রজবের চায়ের দোকান। এখানে বসে কতই না আড্ডা জমে উঠেছে!

সারাক্ষণ খুনসুটি লেগেই থাকে বন্ধুদের মাঝে। আমাদের বন্ধুরা সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও নিজেদের দারুণভাবে মেলে ধরতে পেরেছে। কেউ কেউ দারুণ গান গায়; অভিনয়েও বেশ পারদর্শী অনেকেই। আমরা সুযোগ পেলেই মেতে উঠতাম নাচ-গানে। মুহূর্তেই জমে উঠত আমাদের আসর। সুরের রাজ্যে হারিয়ে যেতে মোটেও সময় লাগত না। ভাইভা দিতে এসে সবাইকে বেশ হাসিখুশি বলে মনে হলো। কিন্তু আমি জানি, সবার হৃদয়েই দুঃখের একটা ঝড়ো বাতাস বয়ে যাচ্ছে।

হয়তো এখান থেকেই অনেকে আলাদা হয়ে যাবে! আমরা যারা একসঙ্গে থেকে অনার্স শেষ করেছি তারা সবাই যে এখানে মাস্টার্সে ভর্তি হবো তেমনটা নয়। অনেকেই মাস্টার্স শেষ না করেই বের হয়ে যাবে জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। আবার যারা এখানে মাস্টার্সে ভর্তি হবো, তারাও যে সবাই একসঙ্গে থাকব বিষয়টা তেমন নয়। মাস্টার্সে এসে আমরা চারটা গ্রুপে ভাগ হয়ে যাব। ফলে অনার্সের এই সময়টাতে আমাদের ভেতরকার যে সম্পর্ক ছিল তাতে ভাটা পড়বে এমনিতেই। আবার অনেকেই চাকরির প্রস্তুতির জন্য নিজেকে একেবারেই গুটিয়ে নেবে। ফলে আমরা চাইলেও আর সবাই আগের মতো একত্র হতে পারব না; একসঙ্গে কাটানো এই মধুর সময়গুলো হয়তো আর ফিরে পাব না।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মনে হচ্ছে, হায়! কত কিছুই না হারাতে চলেছি! আর মাত্র একটি বছর এখানে থাকার সুযোগ পাব; তারপরই তো জীবন সংগ্রামে হাবুডুবু খাওয়ার মতো অবস্থা হবে। যে সময়টুকু এখানে কাটিয়ে গেলাম পরম আনন্দে; সকলের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে একদিন সেটাই স্মৃতি হয়ে বাজবে। আমরা আলাদা হয়ে যাব একদিন ঠিকই। কিন্তু আমাদের স্মৃতি কখনো আলাদা হবে না।