শিক্ষার্থীদের জানার সম্মুখ প্রয়াস থাকতে হবে

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সাক্ষাৎকার

শিক্ষার্থীদের জানার সম্মুখ প্রয়াস থাকতে হবে

মো. নাজমুল ইসলাম ১২:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০১৯

print
শিক্ষার্থীদের জানার সম্মুখ প্রয়াস থাকতে হবে

মো. নাজমুল ইসলাম ২৮তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। বর্তমানে ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) হিসেবে কর্মরত আছেন। কাজের সফলতা হিসেবে পেয়েছেন বিপিএমসহ (সেবা) একাধিক পুরস্কার। তিনি তরুণদের মধ্যে সাইবার অপরাধপ্রবণতা, ক্যারিয়ার, বিসিএস প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- ওয়ালিয়ার রহমান

বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে আপনার অনুভূতি কেমন?

এটা অবশ্যই একটা সম্মানের। কারণ বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের জব আছে। এই ধরুন করপোরেট মাল্টিন্যাশনাল ও গভর্মেন্ট জব। এর মধ্যে বিদেশি করপোরেট জবগুলো আমাদের ইয়াং প্রফেশনালদের জন্য ভালো এবং অবশ্যই ভালো কিছু বয়ে নিয়ে আসছে। এছাড়া যারা সরকারি জব করতে আগ্রহী এর মধ্যে বিসিএস অবশ্যই অন্যতম এবং সম্মানের। এখানে সরাসরি জনগণের সেবা করার জায়গা আছে। বিশেষ করে আমি মনে করি পুলিশ ক্যাডারে তো আরও বেশি। এখানে পুলিশ লিডার হিসেবে কাজ করার সুযোগ আছে। আমরা যারা বিসিএস দিয়ে এখানে এসেছি- we are leaders and managers. আমরা leaders and managers হিসেবে আমাদের অধীনস্থ কর্মকর্তা ও ফোর্সেস নিয়ে জনগণের দৌড়গড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে চাই বা পারব।

দীর্ঘদিন সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করছেন, এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
সাইবার নিয়ে আমি কাজ করছি প্রায় ৪-৫ বছর। আসলে আমাদের দেশে প্রাযুক্তিক উন্নয়নটা আরও আগেই হওয়ার দরকার ছিল আমরা ২০০৪-এ সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হই। এর পরে আমরা ২জি ৩জি ৪জি পেরিয়ে এখন ৫জি দেশে আনার জন্য প্ল্যান করছি। এই জিগুলো মিন করে আমাদের ইন্টারনেট সক্ষমতা। ইন্টারনেট সক্ষমতা এ রকম যে, আমাদের দেশে ৯ কোটি লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে, এর মধ্যে ৪ কোটি ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়া। এ কথাগুলো এই জন্য বলছি, আমাদের দেশে বার্থরেটের চেয়ে ফেসবুক আইডির গ্রোথরেট বেশি। ৪০ মিলিয়ন এখন আমাদের দেশে ফেসবুক গ্রাহক। এগুলো মিন করে আমাদের ইন্টারনেট সক্ষমতার উন্নয়ন কতটা ঘটছে। আর ইন্টারনেট বা প্রাযুক্তিক উন্নয়ন যখন বাড়ে তখন সামাজিক ডেভিয়েশন বাড়ে। কারণ সামাজিক মোভিলাইজেশনের পেছনে প্রযুক্তি কাজ করে, এখানে নতুন নতুন ক্রাইম তৈরি হয়- এর মধ্যে সাইবার ক্রাইম অন্যতম। আমি মনে করি আমাদের দেশে-বিটিআরসি এটু আই অথবা আইসিটি ডিভিশন প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। আর প্রযুক্তি উন্নয়নের পাশাপাশি যে ডেভিয়েশন তৈরি হচ্ছে আমরা যারা সাইবার পুলিশ তারা মনে করি এই ডেভিয়েশনগুলো আঁকড়ে ধরে নিচে নামাব আর উন্নয়নগুলো কিক করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাইবার অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে আপনার কোনো মতামত...
হ্যাঁ, সাইবার অপরাধ লক্ষণীয়। আমাদের এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩০টির মতো অভিযোগ আসে, এর মধ্যে ৯০ শতাংশ অভিযোগ আসে গার্লস বা টিনেজারদের কাছ থেকে। এর মধ্যে যারা অপরাধী এর মধ্যে অধিকাংশ হচ্ছে কিশোর। বিশেষ করে হ্যাকিংয়ের সঙ্গে যারা জড়িত বা যারা অন্যদের ব্লাকমেল করছে এদের বয়স আঠারো বা তার চেয়ে কম। এর সংখ্যা ৬০ শতাংশেরও বেশি হবে। আমি মনে করি, সাইবার ওয়ার্ল্ডে ভিকটিমাইজড হচ্ছে কিশোর-কিশোরী এবং যারা অপরাধ করছে তাদের বয়সও আঠারোর নিচে। এটা আমাদের জন্য একটা রেডসংকেত। এটা থেকে উত্তোরণের জন্য শুধু পুলিশ না, সামাজিক সংযুক্তির বিষয়গুলো আছে। সমাজের অন্য লেভেল থেকেও কাজ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এজেন্সি, অভিভাবক ও পরিবার থেকে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ সবাই মিলে আমরা একটা সাইবার ভিজিলেন্স টিম হিসেবে কাজ করতে পারি।

শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ে সচেতন করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন।
আসলে ‘ল’ দিয়ে মানুষকে ঠেকানো যায় না। কারণ মানুষের মননকে ‘ল’ দিয়ে ঠেকানোর সুযোগ নেই। মানুষের মননকে রাউটিং করে দিতে হয়। আমরা যারা শিক্ষক-সিনিয়র, আমাদের উচিত এই মননটাকে রিসেইপ করানো। এই রিসেইপ হয় প্রথমে পরিবারে। এর পর স্কুলে বিভিন্ন কমিউনিটির মাধ্যমে। পরিবার স্কুল এবং কমিউনিটির পর আসে ‘ল’ এনফোরস। প্রথমে পরিবার থেকেই সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। স্কুল-কলেজে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমেও করা যেতে পারে। এছাড়া সবাই মিলে আমরা নবম-দশম শ্রেণিতে সাইবার অ্যাওয়ারনেস নামে একটা কোর্স বা বিষয় চালু করতে পারি। অর্থাৎ সাইবার অ্যাওয়ারনেসটা জরুরি।

আপনি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফবিএই ন্যাশনাল একাডেমি থেকে সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধের ওপর গ্র্যাজুয়েশন করেছেন- এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
হ্যাঁ। আমি বলব বাংলাদেশ পুলিশের খুব কম অফিসার এই সুযোগ পায়। এটা আমার জন্য একটা অনন্য সুযোগ। সেখানে আমরা ৩৪টি দেশের ২৩৪ জন একসঙ্গে গ্র্যাজুয়েশন করেছি। সবার সঙ্গে নেটওয়ার্কটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আমরা যারা সাইবার অপরাধ বা জঙ্গিবাদ দমনের জন্য কাজ করি। আর আমেরিকা অবশ্যই সিস্টেমেটিক্যালি গুডস আর সেখান থেকে সিস্টেম টা শেখাও জরুরী। সেখান থেকে সাইবার অপরাধ এবং কাউন্টার টেররিজমের ওপর যে কোর্সগুলো ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছি সেগুলো আমার দায়িত্ব ও ক্যারিয়ার উন্নয়নে কাজে লাগবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য বিসিএস প্রস্তুতি সম্পর্কে...
বিসিএস লেগে থাকার বিষয়। এখানে খুব বেশি মেধাবী হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের আনাচে-কানাছে যা কিছু আছে এটাই বিসিএস। আলাদা পড়তে হবে- তা হলে বিসিএস নয়। আমি মনে করি শিক্ষার্থীদের কলেজ বিশ^বিদ্যালয় থেকে জানার একটা সম্মুখ প্রয়াস থাকতে হবে। তা হলেই হয়ে যাবে।

তরুণদের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ-
আমি মনে করি বর্তমান তরুণরা অনেকটাই এককেন্দ্রিক হয়ে গেছে। পারস্পরিক ক্লাবিং করাটা তাদের মধ্যে নেই। এটা হয়তো মোবাইল বা ইন্টারনেটের জন্য হতে পারে। তরুণদের জন্য নেটওয়ার্কিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি বলি তোমরা এক সঙ্গে বসো, গল্প করো, বিজ্ঞানবিষয়ক বই পড়ো, একে অপরকে ভালোবাসো, শ্রদ্ধাশীল হও এবং হিংসাগুলো দূরে রাখ। ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখো। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সহানুভূতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু বলুন...
আমি প্রশাসনিক ভাবে অনেক বড় কিছু হবো এটা নিয়ে ভাবি না। তবে দেশের জন্য-দেশের মানুষের জন্য চিন্তা করি এবং তাদের জন্য কাজ করতে চাই। আমি এখন যা করছি এটা নিয়ে সম্মানবোধ করি এবং আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব কর্তব্যগুলো যথার্থভাবে পালন করার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতেও যেকোনো জায়গায় যে দায়িত্ব দেওয়া হবে সেটা পালন করব। আর একটা বিষয় আমার মাথায় থাকে তা হচ্ছে নেতৃত্ব আসে সেবার মাধ্যমে।