বিদায় আবিরে মলিন ভুবন

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

বিদায় আবিরে মলিন ভুবন

নাজমুল মৃধা ১২:১০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৪, ২০১৮

print
বিদায় আবিরে মলিন ভুবন

সুমি আর নিঝুম প্রতিদিন সকালে যেভাবে ঘুম থেকে উঠে বিদায়ী দিনে একটু অন্যরকম দেখাচ্ছিল। তাদের মতো বিদায়ী আরও অনেকের একই অবস্থা। মুখের মলিনতা আর ভাষাই বলে দিচ্ছে তাদের বিদায় বার্তা। ক্যাম্পাস জীবনের সোনালি সময় তাদের কাছ থেকে বিদায় নেবে। কয়েকদিন ধরেই তাদের বিদায়কে ঘিরে হলে বিরাজ করছে নানা আয়োজন।

ক্যাম্পাসে আবির মাখামাখি করে তারা শিক্ষাজীবনের শেষ মজাটা করে নিচ্ছে। শিক্ষাজীবনে নানা আয়োজন অনুষ্ঠান আসে হয়তো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮টি বিভাগের বান্ধবীদের সঙ্গে পথচলার শেষ রাঙা ভুবন এটি।

বিদায় উপলক্ষে ক্যাম্পাসে তারা ভ্যানগাড়িতে সাউন্ড বক্স বাজিয়ে হয়তো নাচানাচি করেছে, কিন্তু মনের ভেতরে সেই সময়ে ছোট করে একটি অনুভূতি ধাক্কা দিচ্ছিল। মনের গভীরে হয়তো কারও ভাসছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতার কয়েকটি লাইন-
‘আজো তুমি নিজে
হয়তো-বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু, বিদায়।’

গাছের সবুজ পাতাগুলোও যেন তাদের বিদায় অনুভব করে মলিন হয়ে কাঁদছিল, শূন্যতার হাহাকারে দেখাচ্ছিল ধূসর। বিদায়ীদের মলিন মুখের নিশ্চুপ ভাব কালিদাসের যক্ষ চরিত্রের প্রিয়া হারানোর বেদনা প্রকাশ। পিচঢালা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বিদায়ী শিক্ষার্থী ইফফাত স্মৃতির পা আটকে যাচ্ছিল। ইবলিশ চত্বর, টুকিটাকি চত্বর, শাবাশ বাংলাদেশ মাঠ, সাগর ক্যান্টিন, বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত নানা অনুষ্ঠান দেখার ছলে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তসে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়া আর কিছুই উপভোগ করা সম্ভব হবে না তাদের।

রাজশাহীর কালাই-রুটি খাওয়া আর হবে না। হবে না লাল শাড়ি পরে পহেলা বৈশাখে বন্ধুদের নিয়ে পান্তা-ইলিশ খাওয়া। হবে না প্রিয় তাপসী রাবেয়া হলের খালাদের সঙ্গে তিক্ত মধুর ঝগড়া করা। হবে না বান্ধবীদের সঙ্গে মান-অভিমানের পথচলা। এরই নাম ছাত্রজীবন।

যেন দূরে কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে একটি ট্রেনে তারা কয়েকজন যাত্রী, পথ চলতে চলতে তাদের পরিচয়, ভালোবাসা, কথোপকথন, আড্ডা, তিক্ততার শেষে শেষ স্টেশনে নামার পালা। যে স্টেশন থেকে যে যেভাবে পারে চলে যাবে নিজেদের স্বপ্নপূরণ করতে। তাদের জায়গায় অন্য কেউ আসবে, নতুনরা। দেখা হবে না কথা হবে না। হয়তো হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু আধটু হায় হ্যালো! কিন্তু সেই এক হলে, এক রুমে থাকা, খাওয়া, আড্ডা আর কোনোদিন সম্ভব নয়। অনেকের সঙ্গে হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না। কেমন থাকবে তারা? হয়তো ভালো, হয়তো মন্দ। হয়তো কেউ রাতের আকাশের তারা হয়ে মিটমিট করে জ্বলবে। তাই তো এই এই পাগলীগুলোর জন্য ভাবতে ভাবতে নিঝুম আর সুমির মন খারাপ। এমন ভাবনা হলের বিদায়ী বাকি ছাত্রীরাও হয়তো ভাবছিল।

সিরাজাম মুনিরা বলছিলেন, ‘সেই প্রথম যখন ২০১৩ সালে ময়মনসিংহ থেকে ক্যাম্পাসে প্রথম আসি তখন রাজশাহীর শীত আর গরম দিয়েছিল তিক্ত এবং মিশ্র অনুভূতি। তখন খুব খারাপ লাগত আর এখন এই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেন আমার পরিবারের কেউ। একে ছেড়ে যেতে ভালো লাগছে না। অথচ আর কয়েকদিন পরে যে আমরা এই ক্যাম্পাসে পুরাতন হয়ে যাব’।

জীবনে ফেলে আসা কত স্মৃতি আর শৈশব শিক্ষাজীবনে আসে। মাঝে মাঝে মনের ভেতরে সেইসব দিনগুলোর কথা মনে হলে চোখের এক কোণে কখন এক ফোঁটা জল এসে যায় বুঝাই যায় না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নেওয়ার যন্ত্রণাটা একটু অন্যরকম। এখানে সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে একটি প্রস্তাব নিয়ে। চাকরি করো, বিয়ে করো। আহ! কি জীবন ছাত্রজীবন। মানুষ কি সাধে বলে ‘ছাত্রজীবন সুখের জীবন’। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া মানে তো ছাত্রজীবনেরই পরিসমাপ্তি। তারপরে জীবনকে ঘিরে ধরবে নানা ব্যস্ততা, অন্যের চাহিদা, আকাক্সক্ষা পূরণের নানা শর্ত!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপসী রাবেয়া হলের ২০১৩-১৪ সেশনের বিদায়কে ঘিরে তাপসী রাবেয়া হল সেজেছিল বিয়ে বাড়ির আলপনায়। মেয়েদের গায়েহলুদসহ নানা আয়োজন করা হয়েছিল।

সব বিদায়ী ছাত্রীদের সজল নয়নে সেদিন ছলছল করছিল রঙিন ভুবন ছেড়ে যাওয়ার বিষণ্নতা। আলোর ভুবন ছেড়ে অন্ধকারে আলো ছড়ানোর দায়বদ্ধতার আশঙ্কা, পারবে তারা আলো ছড়াতে?