তিনি, মানে আমার শ্বাশুড়ি...

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯ | ৬ ভাদ্র ১৪২৬

তিনি, মানে আমার শ্বাশুড়ি...

খোলা কাগজ ডেস্ক ১:১২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৮

print
তিনি, মানে আমার শ্বাশুড়ি...

প্রথম প্রথম তিনি আমাকে কিছুই ডাকতেন না। দেখা হলে ‘অ্যাই শোনো’ বলে কথা চালিয়ে নিতেন। যখন ছেলেকে দেখতে আসতেন- দুপুরে খাবার টেবিলে একসাথে বসতাম আমরা তিনজন... তখন নাম ধরে ডাকতেন।
“শাওন মাছের বাটিটা এদিকে দেও” কিংবা “এক চামচ ডাল দেও তো শাওন”- এ—ই ছিল কথোপকথন।

একদিন তাঁর ঘরে ডাকলেন। বললেন- “এই যে এই ঘরে তোমার শ্বশুরের ছবি, এইটা কে রাখছে?”
“আপনি যেন মাঝে মধ্যে এসে এখানে থাকতে পারেন, তাই আপনার জন্য এ ঘরটা আমি সাজিয়েছি।”- বললাম আমি।
তিনি মনে হলো একটু খুশি হলেন। তিনি, মানে আমার শ্বাশুড়ি, বেগম আয়েশা ফয়েজ। ভালো মতো ঘরটা দেখলেন। উত্তরের দেয়ালে টাঙানো তেলরঙে আঁকা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ এর ছবি। পূর্বের দেয়ালে পল্লবীর বাড়ির ভেতরের উঠোনে কাঁঠাল গাছের নিচে বসা তাঁর নিজের একটা স্থিরচিত্র। পশ্চিমের দেয়ালে তাঁর খাটের মাথার কাছে বইয়ের তাক। সেখানে তিন সন্তানের লেখা বই... তার অবসর যে কাটে তিন ছেলের লেখা পড়ে! সবচেয়ে উপরের তাকে পবিত্র কোরআন শরীফ। সঙ্গে আরো কিছু ধর্মীয় বই। লাগোয়া বাথরুম ছিল না ঘরটায়। দেয়াল ভেঙে তাঁর জন্য বাথরুমের নতুন দরজা করা হয়েছে। বারান্দার এক কোনে রকিং চেয়ার- সাথে পা রাখার ছোট্ট দোলানো টুল।

আমার হাতে তাঁর ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন- “তোমার ফোন নম্বরটা এইখানে সেভ করে দেও। কত দরকারে ফোন করা লাগতে পারে..!”
আমার নম্বর লিখে ‘শাওন’ নামে সেভ করে দিলাম।
ফোন করে দু’একদিন পরপর খোঁজ নিতেন আমার। তখন আমি কন্যা ‘লীলাবতী’র পৃথিবীতে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছি। যখন বাসায় আসতেন, শুঁটকির তরকারী রান্না করে নিয়ে আসতেন আমার জন্য। কেন জানি তাঁর ধারনা হয়েছিল অন্যকিছু খেতে না পারলেও শুঁটকির তরকারী হয়তো পছন্দ করে খাবো আমি। উনার এইটুকু খেয়ালে আমি তখন সুখের ভেলায় ভাসতাম।

সুখের দিন রইল না আমার। পৃথিবীর রূপ দেখা হলো না আমার কন্যা লীলাবতী’র। আমি তখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালের বিছানায়। বিছানার পাশে সোফায় খুঁটি গেড়ে বসলেন আমার শ্বাশুড়ি। ততদিনে আমি তাঁকে ‘আম্মা’ ডাকতে শুরু করেছি। ৭ দিন ছিলাম হাসপাতালের বিছানায়- একদিনের জন্যেও আম্মাকে সোফা থেকে নড়ানো যায়নি। আমার মা’কে বলতেন- “আমি তো বুড়া হইসি, আপনার মতো মেয়ের সেবা করতে পারবো না। কিন্তু আমি এখান থেকে নড়বো না। আল্লাহর কাছে বউমা’র দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করবো।”

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমাদের সঙ্গী হলেন তিনি। তাঁর জন্য সাজিয়ে রাখা ঘরটিতে সংসার সাজিয়ে ফেললেন। নিয়মিত থাকতে শুরু করলেন সেই নতুন গোছানো সংসারে।
একদিন আমাকে ডেকে তাঁর ফোন থেকে কার যেন নম্বর বের করে দিতে বললেন। আমি ফোনবুক স্ক্রল করতে গিয়ে দেখি এক জায়গায় লেখা ‘বড় বউমা’। আমি ভয়ে ভয়ে (উনি যেন বুঝতে না পারেন) নম্বরটা দেখে নিলাম। ‘শাওন’ নামে আমার সেভ করে দেয়া নম্বরে তিনি কখন যে ‘বড় বউমা’ নাম দিয়ে দিলেন..!
সবকিছু অন্যরকম হয়ে যেতে লাগলো! দুপুরের খাবার পর নিজের জন্য বানানো পান মুখে পুরে আমার হাতেও জর্দা দেয়া একখানা পান দিয়ে বলতেন “খাও বউমা”। সন্ধ্যায় তাঁর বিছানায় পাশাপাশি আধশোয়া হয়ে জি বাংলায় ‘কেয়া পাতার নৌকো’ দেখে কিরণমালার সুখ-দুঃখের হিসাব কষতাম দু’জন মিলে। রাতের খাবারের পর ৩ মাসের নিষাদকে সঙ্গে নিয়ে গল্প চলতে থাকতো তাঁর খাটে বসে। গল্প শেষে ঘুমন্ত নিষাদকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে আসতে গেলে আস্তে করে বলতেন-
“থাক না আমার কাছে রাতটা... বড় হইলে তো আর বুড়া মাইনষের কাছে বেশি আসব না...”
আমি উনার বুকের কাছে নিষাদকে শুইয়ে দিয়ে আরামে একটা ঘুম দিতাম...
ছোট্ট নিনিতকে বুকের ভিতর নিয়েও ঘুমাতেন। মাঝরাতে পা টিপে টিপে তাঁর ঘরে গেলে বলতেন- “চিন্তা কইরো না বউমা- নিনিত তার দাদার সাথে আরামেই আছে।”

হুমায়ূন এর কর্কটকালের দিনগুলোতে রোজ কথা হতো আম্মার সাথে। ‘বউমা’ থেকে ততদিনে ‘মাগো’ ডাকে পৌঁছে গেছি আমি। নিউইয়র্কে ২০১২ সালের জুন-জুলাই মাসটায় সবচাইতে অস্থিতিশীল ছিলাম আমি। দেশ থেকে ফোন এলে বেলভিউ হাসপাতালের করিডোরে এলোমেলো ভাবে হাঁটতাম আর কথা বলতাম। ২৪/২৫ ঘণ্টা হাসপাতালে কাটিয়ে বাসায় ফিরলে মাথায় হাত বুলিয়ে আমার মা। আর দেশ থেকে ফোন করে আম্মা বলতেন- “ধৈর্য্য হারা হইস না রে বেটি... আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখ।”
‘বেটি’... ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা অঞ্চলের খুব আদরের ডাক...
‘শাওন’.., ‘বউমা’.., ‘মাগো’.., ‘বেটি’...
কি যেন হয়ে গেল তারপরের কিছুদিন..! কারা যেন দূরে টেনে নিয়ে গেল তাঁকে..! কিন্তু দূরে রাখতে পারেনি বেশিদিন...
একদিন ফোন করে আমাকে বললেন- “হুমায়ূন কি আমার উপর রাগ করে আছে! আমার স্বপ্নে আসে না কেন..? তোমার স্বপ্নে আসে..?”

পল্লবীর বাসায় গেলে নিষাদ-নিনিত কে বুকে চেপে ধরে রাখতেন। বারবার করে বলতেন- “আমার হুমায়ূন এর বাচ্চা... আমার দাদা...”
তাঁর শেষদিককার সময়ে ল্যাব এইড হাসপাতালে বিছানার পাশে গেলে হাতটা ধরে থাকতেন... শেষ যেদিন দেখা হলো অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ফিসফিস করে বললেন- “মাগো আমার উপর মনে কোনো কষ্ট রাইখো না।”

২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় খবরটা পেলাম। শাহীন ভাইকে ফোন করে জানলাম বাসায় নিয়ে আসা হবে কিছুক্ষণের মধ্যে। সরাসরি পল্লবীর বাসায় চলে গেলাম। তখনও মুখটা দেখার সাহস হয়নি। দায়িত্বে নিয়োজিত একজন এসে বললেন, গোসল করানোর জন্য নিরব নিথর শরীরটাকে খাটিয়া থেকে নির্ধারিত জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে। তার জন্য ৪ জন মহিলা প্রয়োজন। আমি এগিয়ে গেলাম তাঁর কন্যাদের সাথে। তাঁর নিথর শরীরটা একটা চাদরের উপর রেখে চারপাশে ৪ জন ধরে স্থানান্তর করলাম। তারপর একটু ছুঁয়ে দিলাম তার মুখ... চুপচাপ ধরে থাকলাম তাঁর একটি হাত...

স্বাধীনতা যুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে ৬ সন্তান নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়া সাহসী নারীর বরফ শীতল হাত থেকে অনেকখানি উষ্ণতা পেলাম যেন... আর পেলাম সাহস... শক্তি... ভরসা...

আম্মা, আপনার হুমায়ূন আমার স্বপ্নে আসে... আসেন আপনিও। সেই স্বপ্নে কি যে সুখী দেখায় আপনাদের দু’জনকে...

(মেহের আফরোজ শাওনের ফেসবুক থেকে নেয়া)