‘গেস্টরুম করানো’ মানে কী?

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

‘গেস্টরুম করানো’ মানে কী?

খোলা কাগজ ডেস্ক ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

print
‘গেস্টরুম করানো’ মানে কী?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শত অত্যাচারের মুখেও হলে সিট না পাওয়া একজন শিক্ষার্থী নিশ্চুপ থাকেন কেন? এ কারণে যে, মারুক-ধরুক যাই করুক, তাকে অন্তত হলের গণরুমে থাকার ব্যবস্থা করে দেন হলের নেতারাই। এই আশ্রয়টুকু নবীন ছাত্রটি যদি হারিয়ে ফেলেন তবে তার আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। সীমিত এই সুযোগও সবাই পান না। যারা পান তাদের সদাসর্বদা আনুগত্যের পরীক্ষা ও প্রমাণ দিতে হয়।

আনুগত্যের পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা তার এলাকার ছাত্রনেতাদের নাম, যে গ্রুপের হাওলায় তিনি আশ্রয় পেয়েছেন তার নেতাদের নাম-পরিচয়, হলের নেতাদের নাম-ঠিকানা-বিভাগ, কেন্দ্রীয় নেতাদের নাম-পদবি-পরিচয় ইত্যাদি ইত্যাদি মুখস্থ বলতে পারা। এমনও হয়, প্রথম আশ্রয় পাওয়া শিক্ষার্থীরা রাত-দিন শত শত নেতা-পাতিনেতা-উপনেতার নাম সারাক্ষণ মুখস্থ করতে থাকেন।

এই মুখস্থ করার কারণ, যে কোনো সময় তাকে ‘গেস্টরুম করতে’ হতে পারে। প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে না পারলে চলতে পারে অকথ্য গালিগালাজ থেকে দৈহিক নির্যাতন। হলের অতিথি বা গেস্টদের বসার কক্ষে অয়োজিত এই ইন্টারোগেশন ও শাস্তি দেওয়াকেই বলা হয় গেস্ট-রুম করা বা করানো।

এই গেস্টরুম করানোর যে আয়োজন তা নবীনদের জন্য যেমন অপমানের তেমনই ভীতিকর। অতিথি-কক্ষে যে সোফাগুলো থাকে তাতে এসে বসেন নেতারা আর নবীনদের বসতে বলা হয় তাদের পায়ের নিচে অর্থাৎ মেঝেতে। এইবার শুরু হয় নানান জিজ্ঞাসা। কোনো কোনো হলে কাউকে গান গাইতে, কবিতা বলতে বা নাচতেও বলা হয়। যদি নেতাদের চোখে ‘উল্টাপাল্টা’ মনে হয় কোনো নবীনের আচরণ তখন শুরু হয় অপমান-অত্যাচার।

পরিস্থিতি বেশি প্রতিকূল হলে শাস্তি হতে পারে ‘সিঙ্গেল গেস্ট রুম করার’। এই সিঙ্গেল গেস্টরুম মানে, অতিথি কক্ষে সোফাগুলোতে বসবেন বেশ ক’জন নেতা, চেয়ারে বসবেন আরও বেশ কিছু পাতিনেতা আর যিনি ডাক পাবেন ‘সিঙ্গেল গেস্টরুম করার’ তাকে একা বসতে হবে মেঝেতে। সেখানে বসে তাকে নানান ইন্টারোগেশনের উত্তর দিতে হবে। বেকায়দা কথাবার্তা বললে চড়-থাপ্পড় থেকে আরও গুরুতর দৈহিক শাস্তি পেতে হতে পারে।

আবার, গণরুমে বা হলের কক্ষে আশ্রয় পাওয়াদের আনুগত্যের প্রমাণ দিতে হয় প্রতিনিয়ত। নেতাদের নানান হুকুম-হাকাম আমল করতে হয় তাদের। এই আদেশের মধ্যে থাকে যে কাউকে বলা মাত্র মারধর করা, চাঁদা-সংগ্রহে যাওয়া, মিছিল-মিটিংয়ে হাজিরা দেওয়া, এমন কি পরীক্ষা না দেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা হাসিমুখে মেনে নেওয়া।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে হলে নবীন শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া-পদ্ধতিগুলো নানান নামে পরিচিত। র‍্যাগিং সবচে পরিচিত পরিভাষা। এই র‍্যাগিং, গেস্টরুম করানো বা ভয় দেখিয়ে শাস্তি দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা জারি রাখার ব্যবস্থা যেমন ভিন্ন ভিন্ন হয় তার নামও বিবিধ। এ বিষয়ে নানান লোমহর্ষক বিবরণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শোনা যায়। যেমন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য আছে ‘প্রপোজ পানিশমেন্ট’। এই শাস্তিতে বিভাগের ছাত্রীদের বাধ্য করা হয় প্রকাশ্যে, অনেকের সামনে, কোনো নির্দিষ্ট নেতাকে প্রেম-প্রস্তাব দিতে। যদি যথাযথভাবে প্রেমের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট ছাত্রীটি দিতে না পারেন তাহলে সেই ছাত্রীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা হয়ে ওঠে বিভীষিকাময় বা অসম্ভব।

বি. দ্র. বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম ও গেস্টরুমে কোনো সিসি ক্যামেরা থাকে না।