এক মুক্তিযোদ্ধার হাহাকার

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

এক মুক্তিযোদ্ধার হাহাকার

খোলা কাগজ ডেস্ক ৪:৩৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯

print
এক মুক্তিযোদ্ধার হাহাকার

আরেকটা শুক্রবার এসে গেল এবং মনে পড়ছে, গেল শুক্রবার তাকে দেখতে গিয়েছিলাম মিরপুরে-রাজাকারদের সহায়তায় পাকবাহিনী যাকে মারতে এসে বাজারের মধ্যে গুলি করে মেরেছিল তার আপন বড় ভাইকে। দেখতে কাছাকাছি ছিলেন এবং এক রাজাকার ভুল করে বলেছিল, ইনিই তিনি। তিনটি গুলি করা হয়েছিল ভুল মানুষকে, তার শব্দ শুনেছিল সবাই আর কাপড়ের দোকানটি ভেসে গিয়েছিল রক্তে।

ভাইয়ের লাশ মনে মনে কাঁধে নিয়ে ফেরেন যিনি আজও আর বলেন- আমারই তো গুলি খেয়ে মরে যাওয়ার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধে, তার সম্প্রতি একটা জটিল অপারেশন হয়েছিল। অনেক কষ্ট সইতে হয়েছে হাসপাতালে আর ঘরবন্দি হয়ে। সেদিন তার বাসায় পৌঁছেই টিভিটা চালু করি নিজেই এবং তিনি এসে পাশে বসেন। দুপুর থেকে সেদিন বেসরকারি টিভিগুলো ব্যস্ত ছিল টেন্ডারবাজ জি কে শামীমের অফিসে পরিচালিত অভিযান নিয়ে।

এর স্ক্রল আর সচিত্র প্রতিবেদন দেখে তার আহত মুখভঙ্গিতেই বুঝলাম, এতক্ষণ টিভি দেখেননি তিনি আর ফেসবুকেও ছিলেন না। দেখি, টিভি স্ক্রিন থেকে চোখ ফেরাতে পারছেন না আর চোখেমুখে স্পষ্ট বিষাদ এবং এক পর্যায়ে তিনি বলেই ফেললেন, ‘দেশটা শেষ হইয়া গেল। অল্প কিছু গুন্ডা-বদমাইশ শেষ কইরা দিল দেশটা!’

শহীদ পরিবার হিসেবে উল্লেখ করার মতো কোনো সুযোগ-সুবিধা তারা পেয়েছেন বা নিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। এক্সটেনশন পাওয়া জীবনে সততার সঙ্গে ওকালতি করে যা কামাই করেছেন সুদূর মফস্বলে, তা দিয়েই পথ চলেছেন মাথা উঁচিয়ে। অবসর নিয়ে নিজের সঞ্চিত অর্থ সরকারকে ধার দিয়ে তার ওপর চলছেন এখন স্বচ্ছতার সঙ্গে।

অতঃপর তিনি আমাকে করেন সেই পুরনো প্রশ্নটি-একটা মানুষের, এমনকি একটা পরিবারের কত টাকা লাগে চলতে? আর এগুলো কার টাকা! সরকারের টাকা মানে তো তোমার-আমার টাকা।

এর মধ্যে তার পুত্রও এসে বসে। আমরা আলাপ করি দেশের প্রায় সবখানে ছড়িয়ে পড়া ঘুষ-দুর্নীতির কথা। ১০০ কোটির প্রকল্প কীভাবে ২০০-৩০০ কোটির হয় এবং তা কীভাবে কারা পায় আর কত টাকা ওখান থেকে সরিয়ে কীভাবে হজম করা হয়, এসব আলোচনা করি আমরা। চা-নাশতা আসে। কিন্তু তিনি কিছু খান না। এমনিতেই মুখের স্বাদ ঠিকমতো ফেরেনি।

এর মধ্যে এসব দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতে তার বোধহয় মনে হচ্ছিল, মুক্তিযুদ্ধে হানাদারদের গুলি খেয়ে মরলেই ভালো হতো। তাহলে একটা সুস্থ-স্বাভাবিক দেশের স্বপ্ন দেখতে দেখতে চলে যেতে পারতেন।

হাসান মামুন
সাংবাদিক