‘ইকোফেমিনিজম’ নিয়ে কিছু কথা

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

‘ইকোফেমিনিজম’ নিয়ে কিছু কথা

ফরিদা আখতার ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯

print
‘ইকোফেমিনিজম’ নিয়ে কিছু কথা

নারীবাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ‘ইকোফেমিনিজম’। এ ধারার অন্যতম প্রবক্তা এনেট কোলোডনি (Annette Kolodny) সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখ (২০১৯) যুক্তরাষ্ট্রে টাকসনের নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। উনিশ বছর বয়স থেকেই তিনি rheumatoid arthritis রোগে ভুগছিলেন এবং গত ১০ বছর হুইল চেয়ারে বসে চলাফেরা করেছেন। তবুও তার কাজ কখনো থেমে থাকেনি। কোলোডনি তার লেখায় দেখাতে চেয়েছেন প্রকৃতির ওপর প্রভুত্ব কায়েম বা প্রকৃতিকে অধীনস্ত করার সঙ্গে নারীর ওপর প্রভুত্বকায়েম এবং তাদের অধীন করা আদতে একই কথা।

একই সূত্রেগাঁথা। এটাই তার ইকোফেমিনিজম চিন্তার ভিত্তি। যদিও তিনি ফেমিনিস্ট লিটারেরি ক্রিটিসিজমের জন্য বেশি পরিচিত ছিলেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ইকোফেমিনিজম নিয়ে লেখালেখিতে তিনিই ছিলেন প্রথম কয়েকজনের অন্যতম, যারা ১৯৬০ সালের পরিবেশ আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তার বিখ্যাত লেখা ‘Dancing Through the Minefield : Some Observations on the Theory, Practice, and Politics of a Feminist Literary Criticism’ (১৯৮০) অনেক একাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

তার লেখা বই ‘The Lay of the Land : Metaphor as Experience and History in American Life and Letters’ (১৯৭৫) -এ তিনি দেখিয়েছেন জমি ধ্বংস করার সঙ্গে নারীকে ধ্বংস করা সরাসরি জড়িত। এ ধরনের লেখার জন্য তাকে পেশাগত জীবনে অনেক বাধাবিপত্তি মোকাবেলা করতে হয়েছিল, কিন্তু তিনি ইকোফেমিনিজম নিয়ে লেখা চালিয়ে গেছেন।

যদিও ইকোফেমিনিজম মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটেই ছিল, তবুও তিনি বিশ্বের সব নারীদের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নারীবাদের এই ধারা অনেকের কাছেই অপরিচিত। যার ফলে প্রকৃতির বিনাশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যে মূলত নারীর লড়াই, এই দিকটা অনেক নারী সহজে ধরতে পারেন না। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় জমি, মাটি, প্রকৃতি সব কিছুরই বিনাশ চলছে অপ্রতিহত গতিতে। প্রকৃতিকে ভীষণভাবে দমন করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে নারী নির্যাতন ধর্ষণ, হত্যা দিনে দিনে বাড়ছে।
আমরা কি এই দুটোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক দেখি না? কৃষিতে নারীই বীজ রক্ষার কাজ করে আসছে হাজার বছর ধরে। সে কারণে প্রকৃতি ও কৃষি এত বৈচিত্র্যময়।

বিচিত্র বীজের হাজার হাজার জাত আমাদের সংগ্রহে আছে। কিন্তু এখন কৃষিতে হাইব্রিড, জিএমও ইত্যাদি প্রবর্তনের বিষয়টি শুধু নতুন প্রযুক্তির প্রবর্তনের প্রশ্ন হিসেবে দেখলেই চলবে না, এর মাধ্যমে আসলে সরাসরি নারীর ওপরই আক্রমণ করা হচ্ছে। কৃষি জমিতে যেখানে খাদ্য উৎপাদন হতো, সেখানে যখন আগ্রাসী তামাক চাষ করা হয়, সেটা একদিকে জমির অবদমন, অন্যদিকে নারীর অবমাননা।

তামাক চাষের এলাকায় নারীদের যে প্রজনন স্বাস্থ্যের সমস্যা হচ্ছে, তা অবর্ণনীয়, অথচ তা গ্রামের গরিব নারীর শরীর বলে উপেক্ষিত হচ্ছে। ক্ষতিকর চাষাবাদ ব্যবস্থা নারী নির্যাতনেরই আরেকটি ধরন।

পাহাড়ের বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছ কেটে এক একটা দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগানো পাহাড়ি নারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুন্দরবন ধ্বংস করে উন্নয়নের কথা বলে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে যে মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে তাও তো নারীর ওপর দমন পীড়ন। যেভাবে নদী দূষিত হচ্ছে এবং মরে যাচ্ছে, তাতে শুধু নদীর জল শুকায় না, নারীর চোখের জলও শুকিয়ে যায়।

ইকোফেমিনিজম শুনতে খুব দূরের ব্যাপার মনে হতে পারে, অথচ প্রাণ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে ভায়োলেন্স মূলত নারীর প্রতি সহিংসতা এই সত্য বোঝার ক্ষমতা বাংলাদেশের নারীদের নেই তা হতে পারে না।

এই সত্যের উপলব্ধির ওপরই ইকোফেমিনিজম দাঁড়ায়। বাংলাদেশে ইকোফেমিনিজমের সব ক্ষেত্র উপস্থিত, শুধু আমরা এই সম্পর্ক খোলাসা করে দেখছি না।

ফরিদা আখতার
নারী অধিকারকর্মী